দাওয়াতে তাবলীগের চলমান সংকট ও করণীয়

মুফতী হারুন ইজহার চৌধুরী | রাষ্ট্র ও সমাজ চিন্তক



তাবলীগ জামাতের সঙ্কটের চলমান আবহে চট্টগ্রামে বিশাল ওয়াজাহাতি জোড় অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। শ্রদ্ধেয় বড় ভাই বিদগ্ধ আলেমে রব্বানী হাদীস বিশেষজ্ঞ শাইখ আব্দুল মালেক হাফিঃ উক্ত সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন। তার মতামতটা এ জাতীয় সঙ্কটে খুবই জরুরী। কেননা তিনি কওমী ধারার ঐ স্কুল অব থ্যটের অনুসারী যাদের বৈশিষ্ট্য হলো বস্তুনিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা আর মধ্যপন্থা।
এ স্কুল অব থ্যটের সমকালীন অগ্রনায়কদের অন্যতম হলেন জাস্টিস আল-উস্তাদ্ মুফতি তাকী উসমানী হাঃ। আমরা তার শিষ্যই শুধু নই, গবেষণা ও চিন্তার জগতে আমরা তার ভারসাম্যপূর্ণ ই’তিদালী চিন্তার অনুসারীও।

আমার ভগ্নিপতি জনাব মুফতি রহিমউদ্দিন সাহেব শাইখ আব্দুল মালেক সাহেবের সহপাঠী এবং মুফতি তাকী উসমানী সাহেবের বিশিষ্ট শাগরেদ। তাঁর বাসায় মাওলনা সা’দ সাহেবের কর্ম ও চিন্তার দরুন ভারত ও বাংলাদেশে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে সে বিষয়ে আমরা তিনজন ওয়াজাহাতী জোড়ের ব্যস্ততার ফাঁকে পরস্পর মতবিনিময় করেছি। মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের মূল্যায়নে আমি উপকৃত হয়েছি।

আরো বহু বহু বছর আগে তাবলীগ জামাত সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম আল্লামা তাকী উসমানী বেশকিছু অবজারভেশন দিয়েছিলেন। চিঠিপত্র চালাচালি হয়েছিলো। আমি সেগুলো হযরতের অফিসে ফাইলবদ্ধ অবস্থায় দেখে এসেছি।

তাবলীগ সম্পর্কে তারও পূর্বে শাইখ আবুল হাসান নদভী রাহ. পর্যবেক্ষণ ও নসীহা দিয়েছিলেন।

সর্বশেষ আমার মনে আছে হাটহাজারীর সাবেক মুফতিয়ে আজম উসতাদে মরহুম হযরত আল্লামা মুফতি আহমদুল হক্ক সাহেবের নির্দেশনায় আমার আব্বা আল্লামা মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী কিছু পর্যবেক্ষণ তৈরি করেছিলেন।

যাহোক, চলমান তাবলীগ জামাতের এ সঙ্কট আমাদের মোকাবেলা করতে হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে। নিপুণ কৌশলের সাথে এটাকে ওভারকাম করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন ইসলাহ আর নসীহার ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন। বাতিলকে বাতিল বাতিল বলে চিৎকার করলে বাতিল হেদায়াত হয়ে যায় না বা পরাজিত হয়ে যায় না।

আমরা আগেই নানা প্রসঙ্গে বলেছি ইসলামি সমাজের আভ্যন্তরীণ অরাজকতাকে প্রিয় নবীজীর বিবৃত ফিতান্ সংক্রান্ত হাদীসগুলোর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা চায়। উপরন্তু মুসলমানদের মতদ্বৈধের সঙ্কটকে মোকাবেলার জন্য সুস্পষ্ট শারঈ মূলনীতিগুলো ঘোষিত আছে। এসবকে পাশ কাটিয়ে কূপমণ্ডকের মত গতানুগতিক চিন্তা করা এবং বিকারগ্রস্তের মত হাহাকার দ্বারা সমাধানের পথ সুগম হবেনা।

আমাদের আস্থার অনেক ঠিকানা হারিয়ে গেছে। কিন্তু ‘এ উম্মত কোন গোমরাহীর উপর একতাবদ্ধ হবেনা’ – এটা মহানবী হজরত মুহাম্মাদ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াদা। সুতরাং ইসলামের স্বকীয়তাকে রাজা বাদশাহ আর তাদের আশ্রিত উলামায়ে সূ’র অক্ষশক্তি বিনষ্ট করতে পারবেনা। এটাকে নষ্ট করতে পারবেনা বে-ইলম জাহেল দরবেশদের কোন বিশাল বাহিনী।

মাওলানা সা’দ সাহেব কি ইজতিহাদী বয়ান দিচ্ছেন সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু এতায়াতের নামে নিজ এলাকার দ্বীনের রাহবারদের বাদ দিয়ে হাজার মাইলের ব্যবধানে কোন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির আনুগত্যকে জরুরী মনে করা এটা কোন শারঈ মানদন্ডে পড়ে না।

আবার কতিপয় উলামায়ে সূ’র কিছু পদস্খলনকে কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়ে বৃহত্তর স্থানীয় ওলামাদের আনুগত্য থেকে মুক্ত থাকারও কোন শারঈ কারণ নেই। কেননা বিচ্ছিন্ন ঘটনা দ্বারা পুরো মূলধারাকে কালিমালিপ্ত করা যায়না।

ওয়াজাহাতি জোড়ে খুবই সামান্য সময় আমাকে কিছু বলতে বলা হলে আমি অতি সংক্ষেপে আমার মতামত দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার পর্যবেক্ষণগুলো গ্রহণের জন্য দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আহ্বান জানাই। কিন্তু আফসোস! আয়োজকরা তাঁকে কাঙ্ক্ষিত সময় দেননি। এমনিতেই মঞ্চের লোকজন সাধারণ অডিয়েন্সের পাল্স কম বোঝেন।

মনে রাখা চাই, অবস্থার গতি পাল্টাতে পারে নিষ্ঠা আর প্রজ্ঞার গুণে ধন্য ক্যারিশমাটিক ব্যক্তি আর নিষ্কলুষ মনের অধিকারী আম-জনতা। শুধু কাগুজে ঘোষণাপত্র নয়।