হাজ্বী আব্দুল ওয়াহহাব রহ. সম্পর্কে মুফতি জসীম উদ্দিনের স্মৃতিচারণ

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | সোহেল আহম্মেদ



দাওয়াতে তাবলীগের প্রবীণ মুরব্বী পাকিস্তানের রায়বেন্ড মারকাজের আমীর হাজ্বী আবদুল ওয়াহহাব ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আজ (১৮ নভেম্বর) তিনি ইন্তকাল করেন। তার ইন্তেকালে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সাড়া বিশ্বের দাওয়াতে তাবলীগের সাথে যুক্ত মুসলমানদের মধ্যে। একজন সাধারণ মানুষ আলেম না হয়েও কিভাবে দ্বীনের সর্বোচ্চ খিদমতগুলোকে সঠিক ও সুন্দর ভাবে আনজাম দিতে পারেন, তার উজ্জ্বল প্রমাণ ছিলেন হাজ্বী আবদুল ওয়াহহাব রহ। দাওয়াতে তাবলীগের শীর্ষ মুরব্বীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে প্রবীণ। দ্বিতীয় আমীর হজরতজী ইউসুফ রহ ও তৃতীয় এবং শেষ আমীর হজরতজী মাওলানা ইন’আমুল হাসান রহ -এর সাথে দাওয়াতী কাজ করেছেন হাজ্বী আবদুল ওয়াহহাব রহ।

দাওয়াতে তাবলীগের সবচেয়ে বড় মজমা টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা দীর্ঘ অনেক বছর ধরে তাঁর বয়ানের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হতো। বয়সের ভারে অসুস্থ থাকা অবস্থাও তিনি দাওয়াতী কার্যক্রমে সার্বক্ষণিক ভাবে যুক্ত ছিলেন। আলেম না হলেও সারা বিশ্বের আলেম-উলামাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব ও সম্মানের পাত্র ছিলেন হাজ্বী আবদুল ওয়াহহাব রহ।

হাজী আব্দুল ওয়াহহাব রহ. সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর সফর সঙ্গী ও সান্নিধ্য প্রাপ্ত মুবাল্লিগ ও হাটহাজারী মাদরাসার মুহাদ্দিস মুফতী জসিমউদ্দীন ইনসাফকে বলেন, আব্দুল ওয়াহহাব (রঃ) ছিলেন ঈমান, ইখলাস ও আখলাকের গুনে গুণান্বিত জবরদস্ত একজন দীনের দায়ী। উনার সাথে সফর করার ও উনার সান্নিধ্য লাভ করার সুবাদে উনার সম্বন্ধে আমি যতটুকু জেনেছি, উনি উম্মতের হেদায়েতের জন্য সদা ফিকিরবান থাকতেন। উনার দিলে এত পরিমান দ্বীনের ফিকির ছিল যে, বর্তমানে সারা দুনিয়ার দ্বীনের ফিকির করনে ওয়ালাদের ফিকির এক পাল্লায় আর আব্দুল ওয়াহহাব রহ. এর ফিকির অন্য পাল্লায় রাখলে সমান সমান হবে।

আব্দুল ওয়াহহাব (রঃ) বলতেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন দ্বীনের কথা বয়ান কর তখন শুধু উপস্থিত মজমাকে লক্ষ করে বয়ান করবেনা বরং সারা দুনিয়াকে সামনে নিয়ে বয়ান করবে। তাহলে তোমার বয়ানের প্রভাব আমেরিকা ইউরোপ সহ সারা দুনিয়ায় পড়বে এবং ওখানের মানুষেরও হেদায়েতের জরিয়া হবে।

দ্বীনের জন্য তাঁর ফিকির আর মেহনত ছিল একমাত্র মহান আল্লাহ তা’আলাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। এই মেহনতের বদৌলতে দুনিয়াবী কোন স্বার্থ তথা ধনসম্পদ ও মান সম্মান হাসিল করার বিন্দু মাত্র আকাঙ্খাও তার মনে কখনো স্থান পায়নি।

তিনি বলতেন, যদি কোন মুবাল্লিগ কোন দোকানে গিয়ে নিজেকে তাবলীগের সাথী হিসেবে পরিচয় দেয় আর সে কারনে দোকানদার তার কাছ থেকে পন্যের দাম কম রাখে তাহলে সে যেন তাবলীগকে বিক্রি
করে দিল।

আব্দুল ওয়াহহাব (রঃ) মহান আল্লাহ তা’আলার উপর এত তাওয়াক্কুল করনে ওয়ালা ছিলেন যে, নিজ অভাবের কথা কোনদিন কারো কাছে প্রকাশ করতেন না। উনার জীবনে এমন দিনও অতিবাহিত করেছেন, চার আনার ছানাবুট দিয়ে প্রথম রাতে ইফতার করতেন আবার শেষ রাতে সেহরিও খেতেন। এরপরও নিজের সমস্যার কথা মানুষের সামনে প্রকাশ করতেন না।

ব্যক্তিগত অভাবতো দূরের কথা মার্কাজের জরুরতের ব্যাপারেও তিনি কাউকে কিছু বলতেন না। একবার হযরতজি মাওলানা ইউসুফ সাহেব (রঃ) রায়বেন্ড সফরে আসলে স্থানীয় জিম্মাদার সাথীরা হযরতকে বললেন, আব্দুল ওয়াহহাব তো মার্কাজের জরুরতের কথা কারো কাছে বলেননা। সাথীদের মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী আছেন যারা মার্কাজের জরুরত পুরা করার জন্য মাল খরচ করতে চায়। তখন আব্দুল ওয়াহহাব (রঃ) কে হযরতজি (রঃ) একথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি মার্কাজের জরুরতের কথা মাখলুকের কাছে কেন প্রকাশ করবো? যার কাছে প্রকাশ করলে জরুরত পুরা হবে আমি তাঁর কাছেই প্রকাশ করছি।

তিনি মাখলুক থেকে এতটাই অমুখাপেক্ষী ছিলেন যে, করাচিতে উনার যে সমস্ত মালদার বন্ধু বান্ধব ছিল তারা উনাকে একবার বললেন, আপনি অনুমতি দিলে আমাদের ব্যবসায় আপনার জন্য একটা শেয়ার নির্ধারন করে ব্যবসার লভ্যাংশ আপনার কাছে পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোন টাকা পয়সা দিতে হবেনা। কিন্তু উনি তাদের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তারপরও ব্যবসায়ীরা বছর শেষে উনার কাছে এসে বললেন, ব্যবসায় আপনার এত টাকা লাভ হয়েছে। দয়া করে গ্রহণ করুন। তখন আব্দুল ওয়াহহাব (রঃ) বললেন, আমিতো ব্যবসা করিনি! এগুলো নিয়ে যান, আমার প্রয়োজন নেই।

মুফতী জসীম আরো বলেন, আব্দুল ওয়াহহাব (রঃ) খুব সাদাসিধা ভাবে জীবন যাপন করতেন এবং অন্যদেরকেও সাদাসিধা জিন্দেগী যাপন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন।

মুফতি জসিম উদ্দিন আরো বলেন, আব্দুল ওয়াহহাব (রঃ) দ্বীনের জন্য হীরা মুক্তার মতই মূল্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালে উম্মতের যে ক্ষতি হয়েছে সেটা কখনো পূরণ হবার নয়। আমি দুআ করি মহান আল্লাহ তা’আলা যেন উনাকে মাগফিরাত ও উচ্চ মর্যাদা নসীব করেন এবং আমাদেরকেও তাঁর মত দ্বীনের ফিকির ও মেহনত করার তাওফিক দান করেন।