মাহে রবিউল আউয়াল : করণীয় ও বর্জনীয়

মাহে রবিউল আউয়াল : করণীয় ও বর্জনীয়

মুফতি মুজিব তাশফীন | সিনিয়র শিক্ষক জামিয়া ওসমান ইবনে আফফান রা.


মাহে রবিউল আউয়াল চলছে। হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসালাম “রাহমাতুল্লিল আলামিন” হিসেবে এই ধরণীতে রবিউল আউয়াল মাসে আবির্ভূত হন, আবার এ মাসেই আল্লাহপাকের ডাকে সাড়া দেন। সুতরাং বিশ্ব মুসলিমের কাছে এই মহান মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আল্লাহর হাবীব “রাহমাতুল্লিল আলামিন” হযরত রাসুলে আকরাম (সাঃ) সমগ্র বিশ্ব ভূমণ্ডলের জুলুম, অত্যাচার, অবিচার, নির্মম নির্যাতন,ফেতনা-ফ্যাসাদ,পৈশাচিকতা, হত্যাকাণ্ডের মূলোৎপাটন ঘটিয়ে সত্য ও ন্যায়ের রাজত্ব কায়েম করে বিশ্বমানবের কল্যাণ, মুক্তি ও মানবতা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, মানব জাতির সঠিক (সিরাতুল মুস্তাকিম) পথের নির্দেশনায় হযরত রাসুল (সাঃ)-এর মতো অন্য কোনো মানব বিশ্বজনীন আহবান রাখতে পারেননি। তাঁরা নিজ নিজ সীমিত পরিসরে ধর্ম প্রচার ও প্রসার করেছিলেন। এ মাসে তাই আমরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সিরাত অর্থাৎ জীবন আলোচনা, পবিত্র কোরআন পাঠ, দরসে হাদিস, দরূদ, সালাত ও সালাম এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিকের ওপর সবিস্তারে আলোকপাত করে নিজ নিজ জীবনে বাস্তবায়িত করার ব্রত নিতে পারি এবং এটা আমাদের কর্তব্য।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে স্মরণ ও বরণ করে তাঁর আদর্শ, শিক্ষা, সীরাত ও নীতিমালাকে নিজেদের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালনের অঙ্গীকার করতে হবে। এ অঙ্গীকার শুধু রবিউল আউয়াল মাসেই নয়, সারাবছর যেন একইভাবে তাঁর সিরাত, আদর্শ, শিক্ষা, দিক-নির্দেশনা নিজ নিজ জীবন ও কর্মধারায় বাস্তবায়ন করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি সে ব্যাপারে আমাদের যত্নবান হতে হবে। সুতরাং শুধু ইয়া নবী সালামু আলাইকা, ইয়া রাসুল সালামু আলাইকা,মাহফিলে মিলাদ পড়াকে রাসূল প্রেম জ্ঞান না করে মহানবী হযরত রাসুলে কারীম (সা.)-এর প্রতি পরম ভক্তি, শ্রদ্ধা, অকুণ্ঠ ভালোবাসা রেখে তাঁর নীতি, আদর্শ, শিক্ষা, সীরাত তথা আল্লাহপাকের হুকুম-আহকাম, বিধানাবলী পালন করা। একই সঙ্গে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর সুন্নাত তরিকা যথাযথ আমল করার মাধ্যমে খাঁটি উম্মত ও মহান আল্লাহপাকের দরবারে কবুলিয়্যাত হাসিল করতে পারি এবং সমগ্র ভূমণ্ডলের মানব জাতিকে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-এর আদর্শ, শিক্ষা ও নীতিমালা এবং সীরাতের প্রতি অনুপ্রাণিত করতে পারি।

বর্তমান সমাজে কিছু সংখ্যক মুসলিম ভাই “ঈদে মিলাদুন্নবী” নামে নতুন বেদআ’তে মগ্ন হয়েছেন।১২ রবিউল আউয়ালে নবী (সাঃ) এর জন্মদিবস পালন করে র্যালী বের করে,মিষ্টি ও সিন্নি বিতরন করে।এটাকেই রাসূল প্রেম জ্ঞান করে।

ইসলাম ধর্মে ঈদে মীলাদুন্নবী বলতে কি কিছু আছে? ইসলামে ঈদ কয়টি? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম দিবস কি ১২ই রবিউল আউয়াল? নিশ্চিত ও সর্ব সম্মতভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত বা মৃত্যু দিবস কি ১২ই রবিউল আউয়াল নয়? যে দিনে রাসূলে কারীম সা. ইন্তেকাল করলেন সে দিনে আনন্দ উৎসব করা কি নবী প্রেমিক কোন মুসলমানের কাজ হতে পারে? শরীয়তের দৃষ্টিতে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করা কি জায়েয? এটা কি বিধর্মীদের অনুকরণ নয়?

এটি রাসূলুল্লাহ(সাঃ) কিংবা তাঁর খলীফাদের সুন্নাত ছিল না।ফলে এটি একটি নিষিদ্ধ নব উদ্ভাবন।কেননা নবীজী(সাঃ) বলেছেন:”আমি তোমাদেরকে আমার এবং আমার পরবর্তী সঠিক পথপ্রাপ্ত খলীফাদের অনুসরণের ব্যাপারে তাগিদ দিচ্ছি;তোমরা একে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাক।[দ্বীনের মধ্যে] নব উদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সাবধান হও,কেননা প্রতিটি নবোদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত,এবং প্রতিটি বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা,আর প্রতিটি পথভ্রষ্টই জাহান্নামী”। (আহমাদ, তিরমিযী)

মিলাদুন্নবী একটি বিদআত। যা মুসলিমদের দ্বীনকে নষ্ট করার জন্য শিয়ারা চালু করেছিল প্রথম তিনটি শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের সময়কাল অতিবাহিত হওয়ার পর।

কেউ যদি আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে এমন কিছু করে যা রাসূল(সাঃ) করেননি কিংবা করতে বলেননি এবং তার উত্তরসূরী খলীফারাও করেন নি,তাহলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে,সে দাবী করছে যে রাসূল(সাঃ) মানুষের কাছে পরিপূর্ণভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি ব্যাখ্যা করেননি [নাউযুবিল্লাহ]। ফলে সে আল্লাহর এই আয়াতকে অস্বীকার করে: “আজ আমি, তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পূর্ণ করে দিলাম।” (সূরা আল মায়িদাহ, ৫:৩)

দ্বিতীয় কথা হলো- মিলাদুন্নবী উদযাপনের দ্বারা খ্রীস্টানদের অনুসরণ করা হয়।কেননা তারা ঈসা(আঃ) এর জন্মদিন পালন করে। আর তাদের অনুসরণ করা চূড়ান্ত হারাম কাজ।হাদীসে আমাদেরকে কাফিরদের অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং তাদের থেকে ভিন্ন হতে আদেশ করা হয়েছে।

নবীজী(সাঃ) বলেছেন:”যে কেউই কোন জাতির অনুসরণ করে, সে তাদেরই একজন হিসেবে পরিগণিত।”(আহমদ, আবু দাঊদ) এবং তিনি আরো বলেন:”মুশরিকদের থেকে ভিন্ন হও।”(মুসলিম)
বিশেষত এই নির্দেশ সেসব বিষয়ের ক্ষেত্রে যা তাদের ধর্মীয় নিদর্শন এবং আচার অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত।

বিদআত এবং খৃস্টানদের অনুসরণ করার মত হারাম কাজ হওয়া ছাড়াও মিলাদুন্নবী উদযাপন অতিরঞ্জন এবং নবীজীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির পথ উন্মোচন করে। যা কিনা আল্লাহকে ডাকার পরিবর্তে নবীজী (সাঃ) কে ডাকা এবং তাঁর সাহায্য চাওয়া পর্যন্ত রূপ নিতে পারে।

যেমনটি বিদাআতী এবং মিলাদ পালনকারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ঘটে থাকে।যখন তারা আল্লাহর পরিবর্তে রাসূল (সাঃ)কে ডাকে,তাঁর সহযোগিতা চায়।এবং “বিভিন্ন কাসীদায়ে”এ জাতীয় শিরকপূর্ণ প্রশংসাসূচক কাসীদা আওড়ে থাকে।

নবী করীম (সাঃ) তাঁর প্রশংসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করে বলেছেন:“আমাকে এমনভাবে প্রশংসা করো না যেমনটি খৃস্টানরা মরিয়মের পুত্রকে করে থাকে।কেননা আমি তাঁর (আল্লাহর) বান্দাহ মাত্র। সুতরাং [আমার সম্পর্কে] বল: আল্লাহর বান্দাহ ও রাসূল।” (বুখারী)

অর্থাৎ খৃস্টানরা যেমন ঈসা(আঃ)এর প্রশংসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর পরিবর্তে তাঁর ইবাদত করা শুরু করে দিয়েছে,তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তেমনটি করো না। আল্লাহ তাদেরকে এ ব্যাপারে নিষেধ করে আয়াত নাযিল করেছেন-
“হে আহলে কিতাব! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ছাড়া অন্য কথা বলো না। মরিয়মের পুত্র মসীহ ঈসা তো আল্লাহর রাসূল ও মরিয়মের নিকট প্রেরিত তাঁর বাণী ছাড়া আর কিছুই নন, এবং আল্লাহর সৃষ্টি করা এক রূহ।” (সূরা আন নিসা, ৪:১৭১)
তাই রাসূল (সাঃ) বলেছেন:“অতিরঞ্জনের ব্যাপারে সাবধান!কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা অতিরঞ্জনের কারণেই ধ্বংস হয়েছিল।” (নাসাঈ, আলবানী কর্তৃক সহীহ হিসেবে স্বীকৃত)

আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ সা.কে ভালবাসতেন। এতোটাই ভালবাসতেন যে, তাঁর জন্মগ্রহণের সুসংবাদ যে ক্রীতদাসীর কাছে শুনলেন, আনন্দের অতিশয্যে সে ক্রীতদাসী সুয়াইবাকে মুক্ত করে দিলেন। এবং নবুয়্যত পূর্ব পুরো চল্লিশ বছর তার ভালবাসা ছিল অক্ষত। কিন্তু রাসূলের আনুগত্য না করার কারণে পাল্টে গেল আবু লাহাবের পুরো চেহারা।

আবু তালেবের কথা কারো অজানা নয়। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর একেবারে শৈশব থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত তাকে নিজ সন্তানের মত ভালবেসেছেন। লালন-পালন করেছেন আদর, স্নেহ, মমতা, ভালবাসা দিয়ে। আর এ ভালবাসতে গিয়ে অনেক কষ্ট স্বীকার করেছেন। দীর্ঘ তিন বছর খেয়ে না খেয়ে উপোস থেকে “শোআ’বে আবু তালেব” উপত্যকায় নির্বাসিত জীবন-যাপন করেছেন তাঁরই জন্য। ছায়ার মত সাথে থেকেছেন বিপদ-আপদে। রাসূল (সাঃ) এর অনুসরণ করা দরকার এটা মুখে স্বীকারও করেছেন। কবিতাও রচনা করেছেন তাঁর উদ্দেশ্যে। কিন্তু অনুসরণ করলেন না তাঁর আনীত দাওয়াত ও পয়গামের। ফলে সব কিছুই বৃথা গেল। তার জন্য দুআ-প্রার্থনা করতেও নিষেধ করা হল।

পশ্চিমা বহু লেখক ও চিন্তাবিদরা মুহাম্মাদ (সাঃ)কে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বলে স্বীকার করেন। কিন্তু তিনি যে সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয় নির্ভুল আদর্শ, তাঁর নির্দেশিত পথই একমাত্র মুক্তির পথ, এ বিষয়টি তাদের কাছে বোধগম্য হয়ে উঠে না।

গ্যেটে কারলাইল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি অতি সাম্প্রতিক মাইকেল হার্ট (দি-হান্ড্রেড লেখক) পর্যন্ত বহু লেখক, গবেষক, চিন্তাবিদ ও রাজতৈনিক নেতা মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে অনেক সপ্রশংস উক্তি, সীমাহীন ভক্তির নৈবদ্য পেশ করেছেন, অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করেছেন, আবহমান পৃথিবীর সর্বকালীন প্রেক্ষাপটে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সর্বোত্তম ব্যক্তি।

কিন্তু প্রশ্ন হল তাদের এ প্রশংসা, ও ভালোবাসার দাবি কি কোন কল্যাণে আসবে?

আজকে যারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বত ও ভালবাসার দাবি নিয়ে তাঁরই নির্দেশ লংঘন করে বিভিন্ন বেদআতি কাজ-কর্মের প্রসারে লিপ্ত। তার ধর্মে যা তিনি অনুমোদন করে যাননি, তা যারা অনুমোদন করতে ব্যস্ত, তাদের পরণিতি কি হবে?

এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি বাণী পেশ করা যেতে পারে।
“শুনে রাখো! হাউজে কাউছারের কাছে তোমাদের সাথে আমার দেখা হবে। তোমাদের সংখ্যার আধিক্য নিয়ে আমি গর্ব করব। সেই দিন তোমরা আমার চেহারা মলিন করে দিওনা। জেনে রাখো! আমি সেদিন অনেক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালাব। কিন্তু তাদের অনেককে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হবে। আমি বলব: হে আমার প্রতিপালক! তারা তো আমার প্রিয় সাথী-সঙ্গী, আমার অনুসারী। কেন তাদের দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে? তিনি উত্তর দেবেন: আপনি জানেন না, আপনার চলে আসার পর তারা ধর্মের মধ্যে কি কি নতুন বিষয় আবিস্কার করেছে।” (ইবনে মাজাহ)

অবশ্যই রাসূল সা.কে ভালবাসতে হবে। তার জন্য বেশী বেশী করে দরূদ ও সালাম পেশ করতে হবে। তার প্রশংসা করতে হবে। সর্বোপরি তাঁর সকল আদর্শ ও সুন্নাতের অনুসরণ অনুকরণ করতে হবে। কিন্তু এগুলো করতে যেয়ে তিনি যা নিষেধ করেছেন আমরা যেন তার মধ্যে পতিত না হই। যদি হই তাহলে বুঝে নিতে হবে ভাল কাজ করতে গিয়ে শয়তানের ফাঁদে আমরা পা দিয়েছি।

রাসূল প্রেমের চূড়ান্ত বহির্প্রকাশ হলো,নবীয়ে কারীম (সাঃ) এর সকল সুন্নতকে নিজের সাড়ে তিনহাত শরীরে বাস্তবায়ন করা।রাসূল (সাঃ) এর আদর্শে জীবন পরিচালনা করা। তবেই সম্ভব ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে দ্বীনের সহীহ বুঝ দান করুক।দ্বীনের সঠিক পথে জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুক।আমিন