ঝটিকা সফরে ঢাকায় পৌঁছেছেন জন কেরি

190249keri1_kalerkantho_pic

ঝটিকা সফরে ঢাকা পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। সোমবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে তাকে বহনকারী বিশেষ ফ্লাইট জেনেভা থেকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বিমানবন্দরে জন কেরিকে স্বাগত জানান।

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে আসলেন জন কেরি। তার সফর উপলক্ষে বিমানবন্দরসহ রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স’ (এসএসএফ) সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। এর বাইরে নিরাপত্তা তদারকি করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অগ্রবর্তী দল ঢাকায় অবস্থান করছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর আমন্ত্রণে জন কেরি ঢাকায় এসেছেন। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে মাহমুদ আলী ওয়াশিংটন সফরে গেলে কেরির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তখনই তাকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান। তখন কেরি বাংলাদেশ সফরে সম্মতি জানিয়েছিলেন।

ঢাকায় ফিরে মাহমুদ আলী একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠান। তারপর ফ্রান্স সফরে গিয়ে সাইকেল চালানোর সময় পড়ে গিয়ে আহত হন। ফলে তখন আর কেরির ঢাকায় আসা হয়নি।

এবার নাইজেরিয়া, সৌদি আরব, জেনেভা হয়ে ঢাকায় এলেন জন কেরি। ঢাকা থেকে তিনি নয়াদিল্লি সফরে যাবেন।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের পাশে থাকার বার্তা নিয়েই মূলত জন কেরি ৯ ঘণ্টার এ ঝটিকা সফর করছেন। এছাড়া গণতন্ত্র, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো ইস্যুও জন কেরির সফরের এজেন্ডায় আছে।

এছাড়া দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু কেরির বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় ঠাঁই পাবে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সফরকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করছেন।

সফরে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জন কেরির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে তিনি আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এ বৈঠকের পাশাপাশি জন কেরিকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী।

কেরি ও তার সফরসঙ্গী তিনজনকে বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম উপহার দেয়া হবে। মধ্যাহ্নভোজের মেন্যুতে অন্যান্য আইটেমের পাশাপাশি খাবারের টেবিলে দেয়া হবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পিঠা।

কেরি সফরকালে একের পর এক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার মাধ্যমে ঢাকায় ব্যস্ত সময় কাটাবেন। তিনি সকালে ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকটি হবে দুপুর ১২টায়। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ ১টায়। বেলা আড়াইটায় ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর সড়কের ইএমকে সেন্টারে সুশীল সমাজ ও তরুণ সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। বিকাল ৩টায় মিরপুরে একটি গার্মেন্ট কারখানা পরিদর্শন করবেন।

তিনি মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করবেন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন জন কেরি।

এরপর সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে বিশেষ ফ্লাইটে কেরি নয়াদিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানাবেন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আমলা ও কূটনীতিক পর্যায়ে খুব ভালো যোগাযোগ থাকলেও রাজনৈতিক পর্যায়ে খানিকটা আস্থার অভাব রয়েছে। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসকে ঘিরে এ টানাপোড়েন। ২০১২ সালে হিলারি ক্লিনটনের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আর বড় কোনো রাজনৈতিক নেতা বাংলাদেশ সফর করেননি।

এ অবস্থায় জন কেরির মতো জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদের বাংলাদেশ সফরকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। জন কেরি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে আসছেন। এতে রাজনৈতিক পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ জোরদার হবে।

কেরির সফরে রাজনীতির ইস্যুও গুরুত্বের সঙ্গেই থাকবে। বিশেষ করে গণতন্ত্রের চর্চা যাতে সাবলীল থাকে সেই বিষয়টার প্রতি জোর দিতে পারেন তিনি। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ দিতে পারেন কেরি।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ইস্যুও তার সফরের এজেন্ডায় থাকছে।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা ইস্যু উঠে আসবে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে বৈঠক হবে। এতে ১০ সদস্যের দুটি প্রতিনিধি দল অংশ নেবে।

সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি রাশেদ চৌধুরী বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।

সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতার আওতায় রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত চাইবে বাংলাদেশ। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আরেক আসামি আশরাফুজ্জামান খানকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সুবিধা জিএসপি স্থগিত আছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য ইস্যু হিসেবে এ বিষয়টি আলোচনায় তোলা হবে।

বাংলাদেশ মনে করে, স্বল্পোন্নত অপরাপর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে যত বাণিজ্য সুবিধা পায়; বাংলাদেশ তা পায় না।

বাংলাদেশ তাই স্বল্পোন্নত সব দেশকে সমান বাণিজ্য সুবিধা দেয়ার অনুরোধ জানাবে। পাশাপাশি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, জাপান, ইইউসহ সব ধনী দেশেই বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যেন ব্যতিক্রম না থাকে সেই অনুরোধ জানানো হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউএসএআইডি কর্মকর্তা ও সমকাম অধিকার কর্মী জুলহাজ মান্নান ও মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ রায় হত্যার তদন্তে অগ্রগতি জানতে চাওয়া হতে পারে।

পোশাক শিল্পের শ্রম অধিকার ও কারখানার নিরাপত্তাসহ নানা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনা উত্থাপনের সম্ভাবনা আছে।