আলবদর সদস্যের তালিকায় মীর কাসেম আলীর নাম নেই বলে স্বীকার করেছেন সাক্ষী

মীর কাসেম আলীজামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর আপিল শুনানিতে গতকাল তিনটি অভিযোগ বিষয়ে শুনানি শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ছয় নম্বর অভিযোগ হলো হারুন অর রশিদ খান নামে একজনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেল ও সালমা মঞ্জিলে নির্যাতনসংক্রান্ত। এ অভিযোগের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে একমাত্র সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন হারুন অর রশিদের স্ত্রী জুলেখা খান। জেরায় জুলেখা খান বলেছেন, তার স্বামী কয়েকটি বই লিখেছেন। পত্রপত্রিকায়ও তিনি নিয়মিত লিখতেন। তার লেখার বিষয়বস্তু ছিল মুক্তিযুদ্ধ। তবে মীর কাসেম আলী কর্তৃক হারুন অর রশিদকে অপহরণ করে ডালিম হোটেল ও সালমা মঞ্জিলে নির্যাতন বিষয়ে কোথাও কখনো তিনি কিছু লিখেছেন কি না মনে করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন জুলেখা খান। জেরায় জুলেখা খান আরো স্বীকার করেছেন মাহবুবুল আলম তার বইয়ে তার স্বামীর অপহরণ ও নির্যাতন বিষয়ে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি তা পড়েছেন। সেখানে আল-বদর সদস্যদের নাম উল্লেখ থাকলেও মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ নেই।

মীর কাসেম আলীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সময় তার আইনজীবী এস এম শাহজাহান গতকাল এসব তথ্য তুলে ধরেন। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করেন।

৪ নম্বর অভিযোগের বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরে এই আইনজীবী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর ৪ নম্বর অভিযোগের ঘটনা ঘটে মর্মে রাষ্ট্রপক্ষের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর মীর কাসেম আলী ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের সামনের একটি সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন এবং পরদিন ২৪ নভেম্বর পত্রিকায় তার নাম ছাপা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট যে, ঘটনার সময় মীর কাসেম আলী চট্টগ্রামে ছিলেন না; তিনি তখন ঢাকায় ছিলেন।

এ দিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কর্তৃক আপত্তি উত্থাপনের প্রেক্ষাপটে গতকাল মীর কাসেম আলীর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে নাম প্রত্যাহার করে নেন সদ্য অবসরে যাওয়া বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, প্রচণ্ড বৈরী পরিবেশের কারণে তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
মীর কাসেম আলীর পক্ষে গতকাল ৪, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া ৯ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে আংশিক যুক্তি উপস্থাপন শেষে শুনানি আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। ৪, ৬, ৭ ও ৯ নম্বর অভিযোগের প্রতিটিই অপহরণ, নির্যাতনবিষয়ক এবং প্রতিটি অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে সাত বছর করে দণ্ড দেয়া হয়।

৬ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দী : “১৯৭৬ সালে হারুন অর রশিদ খানের সহিত আমার বিবাহ হয়। আমার বিয়ের আগে বাবার কাছ থেকে জানতে পারি যে হারুন অর রশিদ খান একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমার ভাই শহীদ ওমর ফারুক তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং আমার স্বামীর সহিত তার সখ্যতা ছিল। আমি আমার বাবার কাছ থেকে আরো জানতে পারি ১৯৭১ সালে হারুন অর রশিদ খান আল-বদর কমান্ডার মীর কাসেম আলী কর্তৃক নাকি ধৃত হয়ে নির্যাতিত হন।

বিয়ের পরে আমার স্বামী আমাকে বলেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন যে, স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী সরকারের ১ নম্বর সেক্টরের লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি উক্ত দায়িত্ব পালনকালে ১৯৭১ সালে ২৮ নভেম্বর আনুমানিক সকাল সাড়ে ১০টা কি ১১টার দিকে চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক চায়ের দোকান থেকে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আল-বদররা তাকেসহ তার সহকারী শহিদুল আলমকে ডালিম হোটেলে তুলে নিয়ে গিয়ে ৩-৪ দিন যাবৎ নির্যাতন করে। পরবর্তীতে সেখান থেকে আমার স্বামীকে পাঁচলাইশ থানার পিছনে ‘সালমা মঞ্জিল’ নামে আল-বদরদের একটি টর্চার সেলে নিয়ে যায় এবং তার হাত, মুখ এবং চোখ বেঁধে একটি বাথরুমে আটকিয়ে রেখে মীর কাসেম আলী ও অন্যান্য আল-বদর সদস্যরা নির্যাতন করতো, যেখানে আগে থেকেই আরো ১৭-১৮ জন বন্দীকে রাখা হয়েছিল যার মধ্যে শহিদুল আলমও ছিল। সালমা মঞ্জিলে অবস্থানকালে আমার স্বামীকে মীর কাসেম আলী ৫-৬ বার মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। সেখানে আমার স্বামীর সাথে আটককৃত ১৫-১৬ জন বন্দীকেও মেরে ফেলা হয়েছিল।

আমার স্বামীকে না মারার কারণ হিসেবে জানতে পারি যে, সালমা মঞ্জিলের কোন এক আল-বদর সদস্যদের সঙ্গে এ কে খান পরিবারের কোন এক মেয়ের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল (শাহজাহান হোটেলের মালিক শফি সাহেবের মেয়ের) বিষয়টি শফি সাহেবের স্ত্রীকে সেই আল-বদর সদস্য জানায়। সে আরো জানায়, আল-বদর ক্যাম্পে এ কে খান পরিবারের হারুন খান নামে এক সদস্যকে আটক করা হয়েছে এবং তাকে আজ মেরে ফেলা হবে। এই কথা শোনার পর শফি সাহেবের স্ত্রী বলেন যে, হারুন খান আমার মামা তার কোনোরূপ ক্ষতিসাধন করার চেষ্টা করবে না। যদি করো তাহলে আমার মেয়েকে তোমার (ঐ আল-বদর সদস্যের) কাছে বিয়ে দেবো না। এ কারণে হারুন খানকে আল-বদররা হত্যা করেনি।

আমার স্বামীর কাছ থেকে জানতে পারি যে, তিনি চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং একই কলেজের ‘ছাত্র শক্তি’ নামে ছাত্রসংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি আরো জানিয়েছিলেন যে, মীর কাসেম আলী একই কলেজের ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। স্বামীর কাছ থেকে আরো জানতে পারি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাকে আহত অবস্থায় সালমা মঞ্জিলের টর্চার সেলের বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয়।

আমার স্বামী ২০০১ সালের ২৬ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন। তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা ২৬/০৩/২০১৩ তারিখে আমার কাছে থাকা আমার স্বামী হারুন অর রশিদ খান কর্তৃক লিখিত ও প্রকাশিত ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সূচনা পর্ব’ শীর্ষক লেখাটি যা দৈনিক পূর্বকোণ এর বিজয় দিবস বিশেষ সংখ্যা-১৯৮৯ এর প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয় তার ফটোকপি জব্দ করেন। মূল কপিটি আমার জিম্মায় দেয়া হয়। এই জব্দ তালিকা এবং আমার স্বাক্ষর প্রদর্শনী- ১, ১/১ এবং জিম্মানামা ও আমার স্বাক্ষর প্রদর্শনী- ২, ২/১। আমি এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট জবানবন্দী দিয়েছিলাম।”

অভিযোগের বিরুদ্ধে যুক্তি : গতকাল আপিল শুনানিতে যুক্তি উপস্থাপনকালে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, সাক্ষী বলেছেন, তার স্বামী হারুন অর রশিদ খান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন পত্রপত্রিকায়। এ ছাড়া এ বিষয়ে তিনি কয়েকটি বই লিখেছেন। কিন্তু ৬ নম্বর অভিযোগ তথা মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে অপহরণ করে ডালিম হোটেল ও সালমা মঞ্জিলে নিয়ে নির্যাতন বিষয়ে হারুন অর রশিদ কখনো কোথাও কিছু লিখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না তিনি। মীর কাসেম আলী কর্তৃক হারুন অর রশিদকে অপহরণ এবং ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন বিষয়ে হারুন অর রশিদ কোথাও কোনো লেখায় লিখেছেন এ রকম কোনো ডকুমেন্ট রাষ্ট্রপক্ষও জমা দিতে পারেনি। হারুন অর রশিদের স্ত্রী জুলেখা খান জেরায় বলেছেন, হারুন অর রশিদ খানের লেখা কয়েকটি বই আছে এবং পত্রিকাতে নিয়মিত লিখতেন। পত্রিকা এবং বইয়ের লেখার বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ। .. এটা আমি জানি না যে, আমার স্বামী কর্তৃক বিভিন্ন পত্রপত্রকায় যেসব লেখালেখি ছাপা হয়েছে তার কোনটিতে মীর কাসেম আলী সাহেবকে জড়িয়ে কোনো কিছু লিখেছেন কি না।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, কাজেই এটা বলা যায় যে, হারুন অর রশিদ যদি মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে অপহরণ এবং ডালিম হোটেল ও সালমা মঞ্জিলে নির্যাতনের শিকার হতেন তাহলে তিনি তা কোথাও না কোথাও লিখতেন।

সাক্ষী জেরায় স্বীকার করেছেন যে, মাহবুবুল আলম লিখিত ‘বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত’ বইয়ে ৬ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে উল্লেখ আছে। সাক্ষী বইটি পড়েছেন এবং সেখানে আল-বদরের তালিকায় মীর কাসেম আলীর নাম নেই বলে স্বীকার করেছেন। জেরায় সাক্ষী বলেছেন, “আমি মাহবুবুল আলম কর্তৃক লিখিত ‘বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত’ বইটিতে আমার স্বামী সম্পর্কে বর্ণিত অংশটুকু আমি পড়েছি। তবে ঐ অংশে আলবদর ও তার সদস্যদের নাম উল্লেখ থাকলেও মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ নেই।”

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ৬ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে একমাত্র সাক্ষী হলেন, ভুক্তভোগীর স্ত্রী জুলেখা খান। তিনি ঘটনা শুনেছেন তার পিতা এবং স্বামীর কাছ থেকে। রাষ্ট্রপক্ষ এ শোনা সাক্ষীর বক্তব্যের সমর্থনে আর কোনো সাক্ষী হাজির করেনি। অথচ সাক্ষীর বক্তব্যে যেসব ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে তারাই হতে পারত ৬ নম্বর অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। যেমন শফি, তার স্ত্রী অথবা এ কে খান পরিবারের কাউকে হাজির করতে পারেনি। এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই। রাষ্ট্রপক্ষের জমা দেয়া ডকুমেন্ট থেকেও দেখা যায় মীর কাসেম আলী ডালিম হোটেলকেন্দ্রিক কোনো কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন না। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, জেরায় সাক্ষীর বক্তব্য যথাযথভাবে খণ্ডন করা হয়েছে এবং এটা পরিষ্কার যে, মীর কাসেম আলীকে ৬ নম্বর অভিযোগে সাজা দেয়া সঠিক হয়নি। এ অভিযোগ থেকে আমরা তার খালাস দাবি করছি।

৪ নম্বর অভিযোগ ও যুক্তি : মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ৪ নম্বর অভিযোগে সাইফুদ্দীন খান নামে এক ব্যক্তিকে ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর অপরহণ করে ডালিম হোটেলে বন্দী রেখে নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে। এ অভিযোগের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, ১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর মীর কাসেম আলী তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে এক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। পরের দিন ২৪ নভেম্বর বিভিন্ন সংবাদপত্রে এ খবর প্রকাশিত হয় এবং খবরে মীর কাসেম আলীর নাম ও বক্তব্য উল্লেখ করা হয়। এ থেকে প্রমাণিত যে, ঘটনার সময় তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন না।

অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহানকে যুক্তি উপস্থাপনে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন ও ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন মিয়া প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।