ইজতেমার ময়দানে সা’দ-ওয়াসিফ গংদের হাতে গুরুতর আহত এক মাদরাসা ছাত্র যা বললেন

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | সোহেল আহম্মেদ



গতকাল টঙ্গী ইজতিমার ময়দানে তাবলীগের বিতর্কিত আলেম মাওলানা সা’দ কান্ধলবীর অনুসারীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছে মাদরাসা ছাত্র রেদোয়ান আহমাদ (২০)।

রেদোয়ানের মাথায় ১৫ টি সেলাই লেগেছে এবং ডান পা ভেঙে গেছে। এছাড়াও হাত ও শরীরের অন্যান্য স্থানে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।

রেদোয়ান নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার চিরাম ইউনিয়নের বামনগাঁও নোয়াগাঁও গ্রামের আলাউদ্দিনের পুত্র এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরস্থ জামিয়া রাহমানীয়া মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসের ছাত্র।

ইনসাফের সাথে আলাপকালে রেদোয়ান আহমাদ বলেন, আমি গত বুধবার রাতে নিজ মাদরাসা থেকে অন্যান্য ছাত্রদের সাথে টঙ্গী ইজতিমা ময়দানে কাজ করতে যাই। পরে শনিবার (০১ ডিসেম্বর) ফজরের আগে আমরা খবর পেলাম, মিরপুর-৬ থেকে ৩টি বাস এবং মিরপুর-১২ থেকে ২টি বাস ভরে সাদপন্থীরা মাঠে আসছে।

আহত মাদরাসা ছাত্র রেদোয়ান আহমাদ (২০)

ফজরের নামাজ পড়েই আমরা গেটে উপস্থিত হলাম। প্রত্যেক গেটে তাবলীগের বেশ কিছু সাথী ছিলেন। ফজরের কিছুক্ষণ পর সাদপন্থীরা আসতে শুরু করে। সময় বাড়ার সাথে সাথে তাদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এতে আমাদের উদ্বেগও বাড়তে থাকে। মুরব্বিরা আমাদের আগ থেকে লাঠি বহন এবং তা প্রদর্শন করা থেকে নিষেধ করে দেন। আমরা অনুরোধ করেছিলাম আমরা নিরাপত্তার জন্য লাঠিগুলো নিয়ে নিচে রেখে দেই। কিন্তু তারা এই অনুমতিও না দিয়ে আমাদেরকে মাঠে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করতে এবং উত্তেজনাপূর্ণ কোনো কথাবার্তা না বলতে আদেশ করেন।

তিনি বলেন, অন্যদিকে সাদপন্থীরা লাঠি দেখিয়ে, বিভিন্ন কটূমন্তব্য করে আমাদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করছিলো। তবুও আমরা ধৈর্যসহ অপেক্ষা করছিলাম। কারন গেটে ডিউটিরত পুলিশ সদস্যরা আমাদেরকে বলেছিল, সা’দ পন্থীরাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হবে আপনারা চুপচাপ থাকেন গন্ডগোল করবেননা। আনুমানিক ১১ টার দিকে হঠাৎ দেখি সাদপন্থীরা গেটের উপর আক্রমণ করে বসলো। আর পাহারায় থাকা পুলিশ গেটের দুই পাশে সরে গেলো। সাদপন্থীদের সরাতে তারা একবার বাঁশিতেও ফুঁ দিলো না। সা’দ পন্থীরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গেট ভেঙ্গে ফেললো। আমাদের সাথীরা ছিলো একবারে অপ্রস্তুত। মুরব্বিদের নিষেধ ও পুলিশের আশ্বাসের কারণে কোনরকম প্রতিরোধের প্রস্তুতি ছিলো না আমাদের। তাই ওরা গেটের ভিতর ঢোকার সাথে সাথে গেটের কাছে অবস্থানরত আমাদের সাথীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের হাতের কাছে তেমন কিছুই ছিলো না অন্যদিকে তাদের সব ধরনের প্রস্তুতি ছিলো। তারা মাঠে ঢুকেই বেধড়ক পিঠানো শুরু করলো। ছাত্র-শিক্ষক-বয়স্ক-বৃদ্ধ কেউ তাদের হাত থেকে রক্ষা পেলো না। তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিলো মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষক। ছাত্র-শিক্ষকদের পেলেই তাদের দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করছিলো আর অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করছিলো। কাউকে হাতের কাছে পেলেই প্রথমে তাদের মাথায় আঘাত করছিলো। কোনো রকম মাথা রক্ষা করতে পারলে পায়ে আঘাত করছিলো যাতে পালিয়ে বাঁচতে না পারে। কেউ মাটিতে পড়ে গেলে তার আর রক্ষা নেই তখন ৫/৭ জন এসে একসাথে পিটানো শুরু করে। যারা টয়লেটে বা অন্য কোথাও আশ্রয় নিয়েছিলো তাদেরকেও খুঁজে বের করে করে মারধর করেছে ওরা।

রক্তাক্ত মাদরাসা ছাত্র রেদোয়ান আহমাদ (২০)

এ সময় তাদের ভয়ে দৌড়ে ময়দান থেকে বের হতে চাইলে আমাকে ধরে ফেলে হামলাকারীরা। কাঁচা বাঁশের তৈরি লাঠি দ্বারা বেধড়ক পেঠাতে থাকে। হাত পা ধরে কোন রকমে ওদের কাছ থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে কিছুদূর যেতেই আবার অন্য একটি দল আক্রমন করে আমার উপর। এভাবে ৪/৫ দফায় নিষ্ঠুরভাবে মারধর করে তারা আমাকে মেইন রাস্তার কাছে নিয়ে আসে। একপর্যায়ে ইট দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করলে আমার মাথা কয়েক জায়গায় ফেটে যায় এবং সমস্ত শরীরসহ কাপড় চোপড় রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। তখন আমি চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করি। আমার মনে হচ্ছিল, আমি বোধহয় এখনি মারা যাব, তাই দিলে দিলে কালিমা পড়ছিলাম। এ অবস্থায় কয়েকজন পথচারী আমাকে টঙ্গী হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল ও পরে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বর্তমানে বাসায় অবস্থান করছি। আমার মাথায় ১৫ টি সেলাই দিতে হয়েছে, ডান পা ভেঙে গেছে। হাতে এবং শরীরের অন্যান্য স্থানেও অনেক মেরেছে তাঁরা।

এসময় রেদোয়ান কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি আরো বলেন,আমি সহ অসংখ্য মাদরাসার ছাত্র, আলেম উলামা ও উলামায়ে কেরামের অনুসারী তাবলীগী সাথী ভাইদের উপর যারা নৃশংসভাবে এই হামলা চালিয়েছে মহান আল্লাহ কখনো তাদেরকে ক্ষমা করবেন না।

রেদোয়ানের ঘনিষ্ট বন্ধু, নেত্রকোনা দ্বারুল উলুম মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ মুহাম্মদ হামিম হাসান বলেন, রেদোয়ান আমার ঘনিষ্ট বন্ধু। আমাদের বাড়ি পাশাপাশি এলাকায় হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই আমরা একসাথে চলাফেরা করি। সে খুব মেধাবী ছাত্র। তার উপর এই ন্যাক্কারজনক হামলার আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।


চলছে ইনসাফ শো | পর্ব : ৫৬

ইনসাফ সম্পাদক সাইয়েদ মাহফুজ খন্দকারের (Mahfuj Khandakar) সঞ্চালনায় চলছে ইনসাফ শো।বিষয় : দাওয়াতে তাবলীগের চলমান সমস্যা ও আজকের সংবাদ সম্মেলন।অতিথি : মাওলানা মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, মাওলানা জহির ইবনে মুসলিম, মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী ও মাওলানা লোকমান মাজহারী।পর্ব : ৫৬

Posted by insaf24.com on Sunday, December 2, 2018