মার্চ ২৬, ২০১৭

খালেদা জিয়ার টুইটার আর বিশ্ব টুইটারী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

সাহেদ আলম (সাংবাদিক)


সাহেদ আলম
সাহেদ আলম

সত্যিইতো দেখি, বেগম খালেদা জিয়া একখানা টুইটার অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। একিদনে তার ফলোয়ার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এবং দ্বিতীয় টুইটে তিনি ‘প্রতিষ্ঠা দিবসের আহ্বান’ জানিয়ে বলেছেন– ‘আসুন আমরা স্বৈরশাসনকে পরাজিত করি, ঐক্যবদ্ধ হই এবং মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ি’।

অনেকেই ফেসবুক স্ট্যাটাসে তাকে ‘ডিজিটাল’ বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়েছেন। বলার চেষ্টা করেছেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশের কাছে নতি স্বীকারের মত একটি বিষয়। সেটা হতে পারে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সংর্কীর্ণতা। কিন্তু সত্য কথাটা হলো, নেতাদের টুইটার আর টুইটারী ভাব-কর্ম, বিশ্বরাজনীতির একটি বড় বাস্তবতা।

অতি সাম্প্রতিক একটি টুইটার তথ্য দিয়ে শুরু করি। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ দিন আগে মেক্সিকো সফর করে এখনকার রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা বড় চাল দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। নিজেকে এতদিন তিনি দেশ পরিচালনার শক্ত আর কঠোর প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন, করছেনও।

একজন সাধারণ মানুষ হয়ে তিনি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে গিয়ে বৈঠক করেছেন এর পর মেক্সিকো রাষ্ট্রের প্রটোকল উলঙ্গ করে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এর সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে, দাম্ভিকতার সাথেই বলেছেন, আমরা মেক্সিকো সীমান্তে প্রস্তাবিত দেয়াল নির্মাণ নিয়ে আলোচনা করেছি, কিন্তু দেয়াল নির্মাণের খরচ কে বহন করবে, সেটা নিয়ে আলোচনা হয়নি।

মেক্সিকো প্রেসিডেন্ট পেনি নেইটো এতে চাপে পড়েছেন একদিকে, কেননা ডোনাল্ড ট্রাম্প তার হিসপ্যানিক বিরোধী বক্তব্য দিয়ে এতদিন মাঠ গরম করার পর এখন আবার সবাইকে এই মিটিং দেখিয়ে বলতে পারছেন, আমি আসলেই শক্ত প্রেসিডেন্ট হতে পারবে।

কিন্তু ট্রাম্পের কথার জবাব পেনি নেইটো তার টুইটারে বলেছেন, ‘ট্রাম্পের সাথে বৈঠকের শুরুতেই বলে দেয়া হয়েছে, দেয়াল নির্মাণের জন্য খরচ মেক্সিকো বহন করবে না’ এটা সাথে সাথে লুফে নিয়েছে এখানকার মূল ধারার সবগুলি গণমাধ্যম। অন্যদিকে হিলারী সাথে সাথে টু্ইট করেছে, ডোনাল্ড্র ট্রাম্প তার প্রথম দিপাক্ষিক বৈঠকে ব্যর্থ হয়েছেন, কুটনীতি কোন একগুঁয়ে লোকের কাজ নয়’ ।

যুক্তরাষ্ট্রে টুইটার যুদ্ধ এখানকার রাজনীতির মূল খোরাক। প্রতিটি মুহূর্তে খবর তৈরী হচ্ছে যেখানে, সেখানে প্রতিটি বিষয়ে নেতা নেত্রীদের মতামত টেলিফোন কিংবা ভিডিও সাক্ষাৎকার নেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তথ্য তো যাচাই বাছাই করতে হয় , সেখানে নিজের সঠিক অবস্থান তুলে ধরতে টুইটারের তথ্য বিনিময় এখানকার একটি স্বীকৃত পন্থা।

ক’ দিন আগে, হিলারী ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন, ‘ডিলিট ইওর অ্যাকাউন্ট’ যেটা এ যাবৎ কালের সবচে বেশি বা রি-টুইটে’র স্থান দখল করে নিয়েছে। কেননা টুইটারে বাক পটু ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদিন হিলারীর বিরুদ্ধে ব্যাক্তিগত আক্রমণ করে গেলেও হিলারী তার সাথে নোংরা দ্বন্দ্বে যাবেন না বলেই আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন। তাই তার ভক্ত কর্মি সমর্থকরা একযোগে হিলারীর সমস্বরে সুর মিলিয়ে প্রতিবাদ করতে পেরেছিল।
এটা তো গেল এখানকার দুই প্রার্থীর টুইটারি। আসলেই প্রেসিডেন্ট, বিরোধী দল, দলীয় প্রতিজন কংগ্রেসম্যান, সিনেটর সবাই যার যার স্থান থেকে টুইট করে নিজের কাজ কর্ম আর মতাদর্শ প্রচার করেন এখানে। বিশ্বজুড়ে একই পরিস্থিতি, সেটা নরেন্দ্র মোদির টুইটার অ্যাকাউন্ট দেখলে বোঝা যায়।

পৃথিবীর শীর্ষ জনপ্রিয় ১০টি টুইটার অ্যাকাউন্টের একটি নরেন্দ্র মোদির টুইটার। সেখানে তিনি কি করলেন, কার সাথে বৈঠক করলেন, কোথায় যাচ্ছেন, কি ভাবছেন সবই প্রকাশ করেন তিনি। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশ সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে করমর্দন করে ছবি দিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের একটা অসাধারণ উন্নয়নের গল্প আছে’।

তার পূর্বপুরুষ হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন, আর কেরি যখন এই অসাধারণ উন্নয়নের গল্প প্রচার করছেন, তা নিশ্চয়ই মার্কিন মুল্লুকের সকল জীবিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর বিশ্বের সকল পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মোবাইলে একটা বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এখন খালেদা জিয়া অবশ্যই জন কেরিকে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে একটা টুইট করতে পারে, ছবি সহ।

তাতে সকলেই জানতে পারবেন খালেদা জিয়ার কথা। নিশ্চয়ই তাকে ফলো করা শুরু করবেন কেউ কেউ। এভাবেই হবে ভাবের আদান প্রদান আর বিশ্ব রাজনীতিতে খালেদার যোগাযোগ বৃদ্ধি।

এক বছর আগে যখন তিনি বাংলাদেশ সফর করছিলেন, তখন বাংলাদেশ পক্ষে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেটার চেয়ে ভারত আর নরেন্দ্র মোদি কি করছেন, সেটির সর্বশেষ খবরাখবর পাওয়া গেছে বেশি। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব কোনো টুইটার অ্যাকাউন্ট নেই, ফেসবুক অ্যাকাউন্টও নেই।

তাই সংবাদ সম্মেলন আর জনসভার ভাষন ছাড়া বোঝা যায় না তার সাথে জনগণ বা সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কতটুকু, বোঝাপড়া কতটুকু। রাজনৈতিক নেতাদের এই টুইটারি বা ফেসবুকি একটি আধুনিক জন সম্পৃক্ততার মাধ্যম, যার মাধ্যমে জনগণের সাথে অনেকটা সরাসরি সম্পর্ক তৈরী হয় রাজনৈতিক নেতাদের আর সরকারী কর্তাদের। যেটা আমরা প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কিছুটা খবর পাই।

ক’দিন আগে তার বিমান দূর্ঘটনার একটি গুজব ছড়িয়ে পড়লে, নিঃসন্দেহে কিছু নেতাকর্মী তো সংশয়ে ছিলেন, খবরের সত্যতা আর ব্যক্তি সজীব ওয়াজেদ জয়ের সুস্থতা নিয়ে। সেটা নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশের পর একটি অনলাইনের ৩ জন সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়েছে। সেদিকে, সরাসরি না বলেও সজীব ও্য়াজেদ জয় ওয়াশিংটনে ফেরার পর ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘ভালো ভাবেই পৌঁছেছি ওয়াশিটনে’।
এর সাথে আরেকটা বিতর্কের জবাব তিনি দিয়েছিলেন, দেশে কারা জানি ‘সজীব ওয়াজেদ জয় লীগ’ নামের যে সংগঠন খুলেছে, তার সাথে যে কোনো সম্পর্ক নেই, সেটাও তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়ায়, সেই আলোচনা থেমে গিয়েছিল। অর্থাৎ টুইটারি বা ফেসবুকির মাধ্যমে নেতা কর্মী আর সংবাদ মাধ্যমের কাছে পৌঁছাচ্ছেন সজীব ওয়াজেদ জয়।

যেটা আমরা দেখি না তারেক রহমানের বেলায়। তার নামে বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট দেখা যায়, অনেক সময় অনেক বিতর্কিত বিষয়ে পোষ্ট দেখা যায়। জানার উপায় নেই সেটির মালিক আসলে তারেক রহমান কি না। ভেরিফায়েড বলে একটি অপশন আছে সেটার মাধ্যমে অ্যাকাউন্টের মূল মালিকের তথ্য জানা যায়।

তারুণ্যর অহঙ্কার বলে দলীয় নেতারা তারেক রহমানকে জানেন, কিন্তু সেই তারুণ্যের কাছাকাছি যাওয়ার কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না তারেক রহমানের। সেই হিসেবে বেগম জিয়া যে একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট আর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট করেছেন সেটাকে সাধুবাধ জানাই। বাংলা এবং ইংরেজি দুটি ভাষায় তিনি তার প্রথম বার্তা দিয়েছেন। বোধ করি প্রতিদিন দলীয় গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে এখন থেকে তিনি নিয়মিতই টুইট করবেন।
এমন হতে পারে, স্থায়ী কমিটির একটি বৈঠক ডেকে কি বিষয়ে আলাপ করলেন, তার একখানি ছোট্ট সারমর্ম তুলে দিলেন। কিংবা কোন্ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান, সেখানে ফলোয়ারদের মতামত চাইতে পারেন তিনি। এর বাইরে, তার নিজস্ব একটি ইউটিউব অ্যাকাউন্ট থাকাটা ভালো। সংবাদ সম্মেলন এর নাম করে তিনি তো আসলে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নই নেন না, তাই নিজের বক্তব্য খানি ভিডিও আকারে ইউটিউবে দিতে পারেন।
এটাই এখানকার বিশ্ব নেতাদের বড় মাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শহরের মেয়র, এমনকি হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল আছে। বারাক ওবামা ছুটিতে থাকলেও, প্রতি শনিবার ইউটিউবে একখানি ভিডিও বার্তা প্রদান করেন। আর ক্ষণে ক্ষণে টুইট করা তো তাদের নেশার মত একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ। খালেদা জিয়ার টুইটার অ্যাকাউন্টে একটি এখন একটি বিষয়ের স্বপ্ন দেখছি…।

স্বপ্নটা হলো, দেখা গেল রামপাল নিয়ে খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাকে টুইট করে বলছেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যে উপকারিতা আপনি দেখিয়ে এই জনবিরোধী প্রকল্প চালিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা প্রতিহত করার জন্য আমি আন্দোলনে নামছি’। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াকে বলছেন টুইট করে, ‘আপনি করবেন আন্দোলন?

আপনি পরীক্ষায় ফেল, আন্দোলনেও ফেল করা নেত্রী’ আবার এই টুইটার চালাচালিতে কিছু গণভবনকেন্দ্রিক সুবিধাভোগী, অতি সংবেদনশীল সাংবাদিক বলবে, ‘নেত্রী, আপনাকে মেরে ফেলতে চাওয়া শত্রুর সাথে এই টুইট সম্পর্ক আপনি মানলেও, আমরা অন্তত মানি না’…ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে কি হবে, এটা নিয়ে আমাদের গনমাধ্যম নিশ্চয়ই আলোচনার সুযোগ তৈরী হবে। কেউ হাসবে, কেউ রি- টুইট করবে। ভাবুন তো একবার দৃশ্যটা!

হুম, ভাবার অবকাশ আছে। আমি ভাবছি, তেমন কিছু হলে আমাদের দু’নেত্রীর ভিতরের ক্রোধটুকু গলবে। টুইটার-র্যা ন্ট বা টুইটার যুদ্ধ এখনকার বিশ্ববাস্তবতায় একটি বিশেষ ভাবেন আদান প্রদান মাধ্যম। সেই ভাবের আদান প্রদান এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক জরুরী। দু’নেত্রীর মধ্যকার বিরোধ আর হিংসা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা নিজেরা তো বটেই, তাদের দলীয় সমর্থকরা একজন আরেকজনকে আততায়ী ভেবেই পথ চলেন।

এমন ভাবনার রাজনীতিতে দম বন্ধ আসলে সাধারন মানুষের। যে মানুষেরা সুষ্ঠু রাজনীতির স্বপ্ন দেখে, সমৃদ্ধশালী, একই সাথে টেকসই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, তারা এই দম বন্ধ করা অবস্থায় সুযোগ মত দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। সেটা বন্ধ হওয়া দরকার। আজ খালেদা জিয়ার টুইটার যদি শুধুই নিয়ম রক্ষার একটি অ্যাকাউন্ট হয় তাহলে কিছু বলার নেই।

কিন্তু এই সামাজিকতার একটি ভালো দিক আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরূপ একটু টুইটার অ্যাকাউন্ট হোক, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হোক। লাল টেলিফোনে না হোক, টু্ইটারে দু’নেত্রীর ভাবের আদান প্রদান হোক। অন্ধ জনে আলো আসুক, ছোঁয়া লাগুক, কোটি প্রাণে, যারা বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে।

নিউইয়র্ক ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬