মার্চ ২৩, ২০১৭

“তুরস্কে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান : ঐক্যবদ্ধ জনতার বিজয়”

“তুরস্কে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান : ঐক্যবদ্ধ জনতার বিজয়”

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন (বিশিষ্ট আলেম, চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখক)


ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

গত ১৫জুলাই তুর্কী সেনাবাহিনীর একটি অংশ প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েব এরদোয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করার নিমিত্ত অভ্যুত্থানে অংশ নেয়। ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান নিয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারী দফতর, রেডিও-টেলিভিশন সেন্টার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ঠিক এ মুহূর্তে ৮কোটি জন অধ্যুষিত তুরস্কের সর্বস্তরের জনগণ সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মূখর হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে এমনকি ট্যাংকের সামনে শুয়ে জীবনদানের প্রস্তুতি নেয়। ইস্তাম্বুল, আংকারা, ইজমির, বুরসা, আনাতুলিয়া, কুনিয়া, দিয়ারবকর প্রভৃতি অঞ্চলে বিক্ষুদ্ধ জনতা সেনা সদস্যদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। উল্লেখ্য যে জনগণ সৈন্যদের ভয় পায় না, কারণ সংবিধান অনুযায়ী শারীরিকভাবে সক্ষম তুরস্কের যে কোন নাগরিক ৩সপ্তাহ থেকে ১বছর সেনাবাহিনীর যে কোন ইউনিটে শিক্ষাগত যোগ্যতা সাপেক্ষে সেবা করার সুযোগ পায়। ন্যাটোর অধীনে দ্বিতীয় বৃহত্তর সেনা সদস্য রয়েছে তুরস্কের। মোতায়েনযোগ্য চৌকশ সৈন্য সংখ্যা ৪লাখ ৯৫হাজার। এ ছাড়া Incirlik বিমান ঘাঁটিতে ৯১টি বি-৬১ পারমাণবিক মজুদ রয়েছে। এত সামরিক শক্তি থাকার পরও ঐক্যবদ্ধ জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে অভ্যুত্থানে অংশ গ্রহণকারী সেনা সদস্যগণ পিছু হটতে বাধ্য হয়। বিজয় হয়েছে জনতা সমর্থিত প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের। তুরস্কের জনগণ মনে করে সংবিধান নির্ধারিত মেয়াদের পর নির্বাচিত সরকারের স্থলাভিষিক্ত হবে আরেকটি নির্বাচিত সরকার। কোনক্রমেই সামরিক শাসন নয়।

তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে তুর্কী জনগণের; ১৯২৩ সালে সেনা অফিসার মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক রাস্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে ‘আধুনিক তুরস্ক গড়ার’ শ্লোগানের আড়ালে ইসলামের বারোটা বাজিয়ে দেন। আরবী ভাষায় আযান, আরবী হরফে তুর্কী ভাষা লেখা, পুরুষের দাড়ি রাখা, মহিলাদের পর্দা-হিযাব নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। আতাতুর্ক তুরস্কে ইসলাম, ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী ঐতিহ্যকে দাফন করতে সচেষ্ট ছিলেন। রাস্ট্রীয় ফরমান জারি করে তিনি ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

মাত্র ৫০বছরের ব্যবধানে তুরস্কে ইসলাম আবার স্বমহিমায় জেগে উঠে। ইসলামপন্থীরা জনগণের সহায়তায় ক্ষমতায় আসতে থাকে। এরদোয়ানের জাস্টিস এ- ডেভেলপমেন্ট পার্টি (AKP)-এর রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ তুরস্ককে ইসলামীকরণের (Islamisation) -এর অংশ। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি ক্ষমতায়; কখনো মেয়র, কখনো প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট। আতাতুর্কের অনুসারীরা কিন্তু তখনো এবং এখনো সক্রিয়। প্রশাসন, সেনাবাহিনীর ও বিচার বিভাগের একটি অংশ এখনো আতাতুর্কের চেতনায় বিশ্বাসী। সময় ও সুযোগ পেলে নির্বাচিত সরকারের উপর সেনাবাহিনী ছড়ি ঘুরাতে দ্বিধা করে না। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ইসলামের চেতনাধারী ও পতাকাবাহী। অবশেষে তাদের বিজয় সূচিত হয়েছে।

শত শত বছরের ইসলামী কৃষ্টি, সভ্যতা ও ঐতিহ্যের কেন্দ্রভূমি তুরস্ক। সাহাবী হযরত আবু আইয়ুব আনসারী ও মুহাম্মদ আল ফাতেহ-এর স্মৃতিধন্য তুরস্ক। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত উসমানিয়া সুলতানগণ (Ottomans) বিশেষত উসমান, অরখান, মুরাদ, বায়েজিদ, মুহাম্মদ, সেলিম, মহামতি সুলায়মান, আবদুল মজিদ ও ২য় আবদুল হামিদ দোর্দ- প্রতাপে তুরস্ক শাসন করেন। ইউরোপের বুকে ইসলামের ক্রমবিকাশধারায় উসমানিয়া খলিফাদের ভূমিকা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁরা ছিলেন এক সময় পুরো মুসলিম উম্মাহর অভিভাবক। হাঙ্গেরি থেকে সোমালিয়া এবং আলজিরিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত ছিল তাদের রাস্ট্রসীমা। তুরস্কের জনগণ যে আজো ইসলাম ও ইসলামী ঐতিহ্যকে মনে প্রাণে ভালবাসে সেনা অভ্যুত্থানের কার্যকর প্রতিরোধ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আমরা তুর্কী জনগণকে বিপ্লবী সালাম জানাই।