মাদরাসার জন্য চাঁদা ও চামড়া সংগ্রহঃ আকাবিরের নীতি

মাদরাসার জন্য চাঁদা ও চামড়া সংগ্রহঃ আকাবিরের নীতি

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

সাঈদ হোসাইন


মাদরাসার জন্য চাঁদা ও চামড়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে আকাবিরদের নীতি কী ছিল, বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে সে সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করার প্রয়াস পাব, ইনশাআল্লাহ। বর্তমানে আমাদের কিছু ওলামায়ে কেরাম চাঁদা ও চামড়া সংগ্রহের জন্য যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েন, তাতে আমাদের আলেমসমাজের আত্মমর্যাদা কতটা অধোগতির শিকার হয়, তা বিবেকবান ব্যক্তিমাত্রই জানেন। হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, ‘আলেমদের চাঁদা কালেকশনের দ্বারা দীনের বড় অসম্মানী হচ্ছে। সাধারণ জনগণ মনে করে, আলেমরা বুঝি নিজেদের জন্যই এত দৌড়ঝাঁপ পারছে। এ জন্য আমার অভিমত হল, আলেমগণ কিছুতেই চাঁদা কালেকশনে যাবেন না; বরং দীনের কোন কাজ করতে হলে সমাজের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একত্রিত করে বলে দিবেন, দীনের হেফাজতের জন্য অমুক কাজটি করা দরকার। আপনারাও চিন্তা করে দেখুন এর প্রয়োজন রয়েছে কিনা। যদি আপনাদের দৃষ্টিতেও প্রয়োজনীয় মনে হয় তাহলে সকলে মিলে এ কাজটি আঞ্জাম দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

আলেমগণ মূল কাজ করবেন। সম্পদশালীগণ অর্থের যোগান দিবেন। আর যদি সমাজের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বলে এ কাজের প্রয়োজন নেই; বরং এটি অনর্থক তাহলে আলেমদের পক্ষে চাঁদা কালেকশনের প্রয়োজন নেই। সে কাজ বন্ধ করে ঘরে বসে থাকবেন। ব্যবসা, চাষাবাদ কিংবা অন্য কোন পেশায় লিপ্ত হোন এবং অবসর সময় যতটুকু সম্ভব দীনের কাজ করুন। এ অবস্থায় কেয়ামতের দিন আলেমদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না। যদি করতে হয় তাহলে পরিষ্কার বলে দিবেন, আমরা তো মুসলমানদের সামনে দীনি খেদমতের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলাম। তারা এটাকে অনর্থক বলেছে এবং অর্থের ইন্তেজাম করেনি। আর আমাদের চাঁদা কালেকশনের কারণে দীনের অসম্মানী হচ্ছিল বিধায় আমরা তা থেকে বিরত থেকেছি। জীবিকা উপার্জনের পাশাপাশি যতটুকু সম্ভব আমরা দীনের কাজে জড়িয়ে ছিলাম। তখন এর জবাবদিহিতার ভার তাদের কাঁধে গিয়ে পড়বে যারা দীনের খেদমতকে অনর্থক আখ্যা দিত। আলেমগণ এভাবে কছু কাজ করলে দেখতে পাবেন যে, জনগণ সংশোধিত হয়ে গেছে। তখন তারা নিজেরাই চাঁদা তুলে তুলে নিয়ে আসবে।

আমার মতে আলেমদের দ্বারা চাঁদা কালেকশন করাবেন না। তাদেরকে চাঁদা আদায়ের কাজে নিযুক্ত করবেন না। এতে তাদের গুরুত্ব ও মর্যাদা কমে যায়। আমার মত হল, চাঁদা কালেকশনের কাজটি সমাজের ধনাঢ্যশ্রেণী করবেন। তাদের কালেকশনের প্রভাবও বেশি হবে। কেননা, তারা নিজেরাও দিবেন। আলেমদের ব্যাপারে তো এ ধারণা হবে যে, তারা কেবল অন্যদেরকেই দিতে বলে, নিজেরা কিছুই দেন না। ধনীদের বেলায় এ মন্দ ধারণাটি হবে না। কেননা, যে ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা দান করে সে অন্যের পকেট থেকে পঁচিশ টাকা বের করতে পারে। আর এটা ধনীদের দ্বারা সম্ভব। এ জন্য আলেমদের এ কাজ না করা উচিত। তাছাড়া এ কাজ আলেমদের মূল যিম্মাদারী পালনের পথে প্রতিবন্ধকও বটে। (আল ইলমু ওয়াল উলামা, অনুবাদ- আব্দুল গাফ্ফার শাহপুরী, পৃষ্ঠা- ৩১০-৩১১)

মাদরাসা (3)আমাদের আকাবিররা একমাত্র আল্লাহর উপরই তাওয়াক্কুল (ভরসা) করতেন। তাঁদের তাওয়াক্কুলের কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করছি। আল্লামা সুলতান যওক নদভী (দা.বা.) তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার জীবনকথা’তে লিখেন, ‘হজরত মাওলানা হারুন বাবুনগরী (মৃত্যু ১২ই জিলহজ্ব ১৪০৫হিঃ) ছিলেন একজন উঁচুমাপের মুতাওয়াক্কিল। সৃষ্টি থেকে বিমুখতা ও আল্লাহ নির্ভরশীলতা তাঁর প্রতিটি কথাবার্তা ও চাল চলনে প্রকাশ পেত। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হুজুর বলেন, শুরুর পনের ষোল বছর আমি কারো কাছ থেকে চাঁদা চাইনি। আজও আমি শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলি যে, ছাত্র ও শিক্ষকরা যেন কোন চাঁদার জন্য কারো কাছে না যায়। আল্লাহ পাক বর্তমান অবস্থার চাইতে ভালো চালাবেন। কিন্তু আমার এ কথার উপর তারা আস্থা রাখতে পারছে না। মাদরাসার অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থায়ও হুজুর শহরে বন্ধু-বান্ধবদের কাছে চাঁদার জন্য অথবা মাদ্রাসার কোন প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ করতে যান নি। বিদেশেও কাউকে পাঠানোর চিন্তা করেন নি। একবার হজ্ব সফরে কেউ হুজুরকে বলল, হুজুর! মাদ্রাসার প্রয়োজনীয়তার কথা বললে অনেক সহযোগিতা পাওয়া যেত। তখন হুজুর বললেন, আমি এখানে মানুষের কাছে আসি নি। এসেছি আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেবার জন্য। তাঁর কাছে যদি মাদরাসা কবুল হয়ে যায় তা-ই যথেষ্ট নয় কি? (পৃষ্ঠা-১১২)

এবার জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার সাবেক মুহতামিম হাজী ইউনুস (হাজী সাহেব হুজুর) রহ. এর তাওয়াক্কুল প্রকাশের ভাষা ও ভঙ্গিটা একটু লক্ষ্য করুন, ‘মাওলানা রমীজ আহমদ সাহেব বর্ণনা করেন, আমি হাজী সাহেব হুজুরের সাথে চন্দনাইশ থানার অন্তর্গত (বর্তমান সাতকানিয়া থানার অন্তর্গত) বশরতনগর মাদরাসার বার্ষিক সভায় যাচ্ছিলাম। মাদরাসা থেকে আমাদের নিতে এসেছে মাওলানা শামসুল আলম। আমরা যখন দোহাজারী থেকে ডিঙিতে চড়ি বশরতনগরের উদ্দেশ্যে, তখন মাওলানা হুজুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, হুজুর মানুষের মুখে শুনি, ব্যাংকে নাকি পটিয়া মাদরাসার অনেক টাকা জমা আছে। কথা ঠিক কিনা, বা কত টাকা জমা আছে সেটা হুজুরের মুখে শুনলে একটু খুশি লাগত আর কি। হুজুর উত্তরে বললেন, ‘কেয়ামত পর্যন্ত পটিয়া মাদরাসা চলার জন্য যত টাকা প্রয়োজন সব জমা আছে আল্লাহর ব্যাংকে, যখন যতটুকু দরকার চেক নিয়ে তুলে আনব; তবে পরিমাণ সম্পর্কে আমাদেরকে অবগত করা হয় নি।’ এ কথা শুনে তিনি একেবারে থ মেরে যান। তিনি আমাকে বলেন, দেখছেন, কেমন দাঁতভাঙ্গা জবাব। আল্লাহওয়ালাদের কথা এমনই ধারালো ও প্রজ্ঞাদীপ্ত। (কুতবে জমান, শাইখুল আরব ওয়াল-আজম আল্লামা শাহ হাজী মুহাম্মদ ইউনুস রহ. জীবন কর্ম অবদান, পৃষ্ঠা-৩৬০)

আকাবিরের যোগ্য উত্তরসুরী মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ (দা.বা.) বলেন, মানুষের কাছে দীনের খাদেমরা কিছু চাবে এটা তো হতেই পারে না। আর যদি চাওয়া ছাড়া কেউ কিছু দিতে চায় তবে দেখ তার উদ্দেশ্য কী। যদি তার উদ্দেশ্য হয় তোমার প্রয়োজন পূর্ণ করা তোমার প্রতি রহম করা তাহলে বল আমার (বা আমাদের প্রতিষ্ঠানের) আপনার কাছে কোন প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রয়োজন আল্লাহই দেখবেন। আর যদি তার উদ্দেশ্য হয় দ্বীনের খেদমত করে নিজে সৌভাগ্যবান হওয়া, আখেরাতের জন্য কিছু ছামান যোগাড় করা তবে তাকে ফিরিয়ে দেয়ার কারো অধিকার নেই। (জীবন সফলতার পাথেয়, পৃষ্ঠা-১৫৩)

হাকীমুল উম্মত আশরাফা আলী থানভী রহ বলেন, ‘আল্লাহর কসম করে বলছি, আলেমগণ যদি ধনীদের কাছ থেকে বিমুখ হয়ে যান যেমন কিনা আলহামদুলিল্লাহ আহলেহক বিমুখ রয়েছেন তাহলে বড় বড় অহংকারীরাও তাদের সামনে মাথা নিচু করতে বাধ্য হবে। আলেমদের জন্য এটাই উত্তম যে, যদি কোন দুনিয়াদার তাদেরকে কোন কিছু হাদিয়া দেয় তো গ্রহণ করতে অসম্মতি জানাবেন। বস্তুত, আলেমদের অস্তিত্ব তো এমন ‘মাহবুব’ ও প্রিয় ছিল যে, কারো ঘরে গেলে তার জন্য ঈদের দিন বলে গণ্য হত।

কিন্তু আফসোস! আজ ‘ঈদের দিনের’ বদলে ‘ভীতির দিন’ হয়ে গেছে। এ অবস্থা সৃষ্টির নেপথ্যের নায়ক হল কিছু লোভী আলেম। তাদের কারণে এখন আলেমরূপী কাউকে দেখলেই মনে করে কিছু চাইতে এসেছে বুঝি। আলেমদের উচিত সম্পদ এবং মর্যাদার মোহের উপর আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া। আলেমগণ যদি ধনীদের দরজায় যাওয়া বন্ধ করে দেন, তাহলে তারা নিজেরাই তাদের দরজায় আসতে বাধ্য হবে।’ (আল ইলমু ওয়াল উলামা, অনুবাদ- আব্দুল গাফ্ফার শাহপুরী, পৃষ্ঠা-৩১৮)

আমাদের আকাবিররা কারো কাছ থেকে কোন অনুদান নিলে তা খুব যাচাই-বাছাই করে দেখতেন। দাতার মাল সন্দেহযুক্ত বা হারাম কিনা সে সম্পর্কে ভাল করে জেনে নিতেন। এ সম্পর্কে জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার সাবেক মুহতামিম হাজী ইউনুস (হাজী সাহেব হুজুর) রহ. এর একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। জামিয়া দারুল মাআরিফের নায়েবে মুহতামিম সুলেখক মাওলানা ফুরাকানুল্লাহ খলিল (দা.বা.) তাঁর ‘আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস (পটিয়ার হাজী সাহেব হুজুর )রহ. একজন অনন্য মানবহিতৈষী ও আমরণ কর্মোচ্ছল দরবেশ’ নামক দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেন, ‘যে কোনো কওমী মাদরাসায় সাধারণ দান-অনুদান ও যাকাত-সদকার দু‘টি ফান্ড আছে। সাধারণ চাঁদার অর্থ শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অবকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদিতে ব্যয় করা হয়। যাকাত-সদকার পয়সা গরীব-ইয়াতীম ছাত্রদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। উভয় ফান্ডের হিসাব-কিতাব আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়। আসলে একমাত্র দ্বীনী শিক্ষা-দীক্ষার জন্যে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলোর আয়-ব্যয়ের বিষয়টি অতীব স্পর্শকাতর। তাই আবহমান কাল থেকেই দ্বীনদার মুত্তাকী মাদরাসা-পরিচালকগণ সচেতনতার স্বাক্ষর রেখে আসছেন। সুস্পষ্ট হারাম ও সন্দেহয্ক্তু অর্থকড়ি যাতে মাদরাসার তহবিলদ্বয়ে ঢুকতে না পারে, সে ব্যাপারে তাঁরা যারপরনাই সতর্ক থাকেন। পাঠ্যকাল থেকেই পটিয়ার রশিদ বই ও সভার প্রচারপত্রে দেখে আসছি, নীচে লেখা থাকে, ‘হারাম ও এতিমদের মাল থেকে দান করবেন না।’ সরকারী অনুদান যেহেতু সন্দেহযুক্ত উৎস থেকে সংগ্রহীত সেহেতু সে যুগে সরকারী কোনো অনুদান গ্রহণ করা হতো না। করতে চাইলেও আল্লাহ তা থেকে রক্ষা করেছেন। আমাদের পাঠ্যকালীন সময়ে ফ্রান্সভিত্তিক একটি দাতাসংস্থার কিছু লোক পটিয়া মাদরাসায় এসে আর্থিক সাহায্য দানের প্রস্তাব করলে হযরত হাজী সাহেব হুজুর তা প্রত্যাখান করেন। মাদরাসায় অভাব থাকা সত্ত্বেও তাঁর এই অস্বীকৃতিকে অনেকে ভালো চোখে দেখেননি। অনুরূপ আরেকটি ঘটনার কথা নির্ভরযোগ্য সূত্রে শুনেছি,পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর (সম্ভবত ওমর খান) পটিয়া মাদরাসার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যে ৫০,০০০/= পঞ্চাশ হাজার টাকার অনুদান বরাদ্দ করেছিলেন। (তৎকালের পঞ্চাশ হাজার টাকা অনেক বড় অংক) টাকা গ্রহণের লক্ষ্যে মরহুম এ এ রিজাউল করীম প্রিন্সিপাল ও হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ (নয়া মৌলভী সাহেব হুজুর) কে সাথে নিয়ে হযরত হাজী সাহেব হুজুর ঢাকা যান। গভর্নর হাউস বর্তমান বঙ্গভবনের কাছে কোনো এক হোটেলে সম্ভবত হোটেল পূর্বাণীতে রাত্রিযাপন করেন। কিন্তু তাঁর ঘুম আসছিলো না। তাঁর মনে বার-বার একটি জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খাচ্ছিলো, গভর্নর সাহেব যে টাকা দিবেন তা কোন্ ফান্ডে খরচ করা যাবে। যাকাতের টাকা হলে তো অবকাঠামো উন্নয়নে খরচ করা যাবে না। পরদিন সময় মতো গভর্নর হাউসে গিয়ে গভর্নর সাহেবের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার অনুদান কোন্ ফান্ডে খরচ করা যাবে? আমাদের মাদরাসার চাঁদা ও যাকাতের দুটি ফান্ডই আছে। গভর্নর সাহেব উত্তরে বললেন, এটি চাঁদাও না, যাকাতও না; এটি ভ্রাইটিস সোর্স থেকে সংগৃহীত। হযরত হাজী সাহেব হুজুর এই বলে সেই লোভনীয় অনুদান গ্রহণে অপারগতা জানালেন যে, নিরেট হালাল পয়সা না হলে তা আমি মাদরাসার জন্যে গ্রহণ করতে পারবো না। টাকা গ্রহণ না করেই চলে আসলেন। এটি পটিয়া মাদরাোসার কাঁচা ভবনগুলো বিদ‘আতী দুস্কৃতিদল কর্তৃক জ্বালিয়ে দেওয়ার পরবর্তী ঘটনা। তখন ভবনগুলো পূনঃনির্মাণের খুবই প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু সন্দেহযুক্ত হওয়ায় অনন্য আল্লাহভীরু ও আল্লাহর গায়েবী রহমতের ওপর সদা নির্ভরশীল হযরত হাজী সাহেব হুজুর এতো বড় অংকের অনুদান গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন,যা দিয়ে তৎকালে কয়েকটি বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা যেতো। আল্লাহ রহীম ও করীম যে তাঁর ওপর নির্ভরশীল মুত্তাকী বান্দাদের জন্যে রাস্তা খুলে দেন এবং গায়েব থেকে অনুদান প্রদান করেন তার নগদ প্রমাণও পাওয়া গেলো, তাকওয়া-তাওয়াক্কুলের সেই অনন্য ঘটনার পর। উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা আজিজউদ্দীন লিমিটেড তথা আজিজ কোম্পানীর সত্ত্বাধিকারী মরহুম হাজী বশিরউদ্দীন পটিয়া মাদরাসায় গিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করে বললেন, ভবিষ্যতে যে কোনো উন্নয়নের কাজে আজিজ কোম্পানী পাশে থাকবে ইনশাআল্লাহ। পাকিস্তান আমলে পটিয়া মাদরাসার অবকাঠামোগত যে বিস্ময়কর উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং যে সব সুরম্য দালান নির্মিত হয়েছে, সবগুলোর সিংহভাগ অর্থায়ন করেছে আজিজউদ্দীন লিমিটেড। হাজী সাহেব হুজুরের মাধ্যমে যেনো আল্লাহপাক গায়েবী দরজা খুলে দিয়েছেন, যা অদ্যাবধি খোলা রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত খোলা থাকবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন,
অর্থ:‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে তাঁর বিধি-নিষেধ মেনে চলবে তিনি (আল্লাহ) তার জন্যে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরী করে দেবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক (অনুদান) দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। (সুরা তালাক, আ. ২-৩)’ (মাসিক আল-হক, নভেম্বর ২০১৪)

আমাদের দেশের কাউমি মাদরাসাগুলো থেকে কিছু শিক্ষককে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাঁদা কালেকশনের জন্য পাঠানো হয়। এ সম্পর্কে আকাবিরের জীবন্ত নমুনা মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ (দা.বা.) এর কী মত তা উল্লেখ করছি। তিনি তাঁর ‘বাইতুল্লাহর মুসাফির’ নামক বইয়ের এক জায়গায় লিখেন, ‘একটা বিষয় খুব উপলব্ধি করেছি, গোরবত ও দারিদ্রের সঙ্গে দ্বীনী মেহনতের যে হৃদ্যতা রয়েছে প্রাচুর্যের সঙ্গে তা নেই। প্রাচুর্য দ্বারা সাজ যতটা হয় কাজ ততটা হয় না। পরে আমি এ অনুভূতি হযরত হাফেজ্জী হুযুরের খিদমতে আরয করে বলেছিলাম, আমাদের দেশে দ্বীনী কাজের জন্য আরবদের পয়সার প্রয়োজন নেই। গোরবতের মাঝে যে কাজ হবে, প্রাচুর্যে তা হবে না। আজ এতো বছর পরো আমার সে বিশ্বাস অটুট রয়েছে। আমাদের দেশে আল্লহ এই পরিমাণ সম্পদ রেখেছেন যা দ্বারা দ্বীনের সব প্রয়োজন পূর্ণ হতে পারে, প্রয়োজন শুধু মালদারদের দ্বীনদার হওয়া, আর আহলে ইলমের দুনিয়া-বিমুখ হওয়া। আরবদের কাছে আমাদের যাওয়া উচিত দ্বীনের দাবী নিয়ে, অর্থের চাহিদা নিয়ে নয়। (পৃষ্ঠা-৪৭)

যুগশ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) এর একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। বরেণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ কারজাভী লিখেন, ‘আমার স্মৃতির আয়নায় তিরিশ বছর আগের একটি স্মৃতি ঝলমল করে ভাসছে। শায়খ নদভী কাতার সফরে এসেছেন। কথায়-কথায় তাঁর কাছ থেকে নদওয়াতুল উলামা’র কিছু অর্থ-সঙ্কট ও প্রয়োজনের কথা আমরা জেনে ফেললাম। তখন আমাদের ভিতরে কেউ কেউ তাঁকে প্রস্তাব দিয়ে বললো :
-আমরা কি আপনাকে নিয়ে কাতারের কোনো বিশিষ্ট শায়খ ও বড় ব্যবসায়ী’র সাথে দেখা করে নদওয়ার প্রয়োজনের কথা তুলে ধরতে পারি?
জবাবে তিনি মৃদু হেসে বললেন :
-এ আমার পক্ষে সম্ভব নয়!
জানতে চাইলাম :
-কেনো?
তিনি তখন জানালেন :
-যাদের কাছে যেতে বলছেন তারা তো রুগী। তাদের রোগের নাম― حب الدنيا (দুনিয়া প্রীতি)। আর এ ক্ষেত্রে আমরা হলাম ডাক্তার। ডাক্তার হয়ে কীভাবে আমরা রুগীর কাছে চিকিৎসা চাইতে পারি? সাহায্য চাইতে পারি?
আমরা তখন বিনয়ের সাথে আরজ করলাম :
-আপনি তো নিজের জন্যে চাইছেন না, চাইছেন প্রতিষ্ঠান এবং ছাত্র-শিক্ষকদের জন্যে।
-কিন্তু কার জন্যে চাওয়া হলো এরা-যে তা বুঝতেই সক্ষম না! এরা শুধু বুঝে কে চাইলো এবং কী চাইলো!
তখন রমজান চলছিলো। আমরা বললাম :
-আপনি ঈদ পর্যন্ত আমাদের এখানে অবস্থান করুন! যেখানে যাওয়ার আমরাই যাবো এবং যা চাওয়ার আমরাই চাইবো!
তিনি তখন অপারগতা প্রকাশ করে বললেন :
-কিন্তু রমজানের শেষ দশকে-যে আমার গুরুত্বপূর্ণ আমল আছে! আমি কোনোভাবেই তা থেকে বঞ্চিত হতে চাই না! আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ সময় কাটানোর ওটাই তো শ্রেষ্ঠ সময়!’
ততোক্ষণে আমরা বুঝে ফেললাম কার সাথে কথা বলছি! তিনি-যে আল্লাহর এক বিশিষ্ট ওলী! আল্লাহর সান্নিধ্যধন্য এক মহান পুরুষ! কী করে আমরা তাঁকে আটকে রাখি― দিরহাম-দিনারের জাল ফেলে! তাঁর ইচ্ছে মতোই আমরা সাথে সাথে তাঁর ফিরতি সফরের যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করলাম। আশ্চর্য! আমরা তাঁকে কিছুই দিতে পারলাম না। দিয়ে গেলেন শুধু তিনিই একা!! (সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভীঃ এমন ছিলেন তিনি- ড ইউসুফ কারজভী, অনুবাদ- ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী, পৃষ্ঠা-২২-২৩)

উল্লিখিত আলোচনা ও ঘটনাগুলোর মাধ্যমে মাদরাসার জন্য চামড়া ও চাঁদা সংগ্রহে আমাদের আকাবিরদের নীতি সুস্পষ্ট হয়েছে। এসমস্ত আকাবিররা আমাদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। সব ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসরণ করলে ইনশাআল্লাহ আমাদের পদস্খলন ঘটবে না। আল্লাহ আমাদের তাঁদের অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।