ছয়জন সাক্ষীর কেউ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নন, সবই শোনা সাক্ষী

মীর কাসেম আলীবাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর আপিল শুনানিতে গতকাল আরো চারটি অভিযোগের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে ১১ নম্বর অভিযোগ হলোÑ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসীম উদ্দিন ও অপর পাঁচজনকে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করে হত্যাসংক্রান্ত। এ অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল মঙ্গলবার আপিল শুনানিতে এ অভিযোগের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপনকালে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের ছয়জন সাক্ষী ও অ্যাডভোকেট শফিউল আলম লিখিত ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইটির ওপর নির্ভর করেছেন মীর কাসেম আলীকে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে। রাষ্ট্রপক্ষের যে ছয়জন সাক্ষী এ অভিযোগ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা কেউ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নন, বরং সবই শোনা সাক্ষী। সাক্ষীরা সবাই বলেছেন অ্যাডভোকেট শফিউল আলম ও অন্য কয়েকজনের কাছ থেকে তারা এ ঘটনার বিষয়ে শুনেছেন। কিন্তু অ্যাডভোকেট শফিউল আলম তার বইয়ে ডালিম হোটেলকেন্দ্রিক হত্যা নির্যাতনের ঘটনা বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে কোথাও মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ করেননি। মীর কাসেম আলীকে তিনি কোথাও ‘খান’ বা ‘খান সাহেব’ বা ‘বাঙ্গালী খান’ হিসেবেও উল্লেখ করেননি। অথচ ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে ‘খান সাহেব’ হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রেও অ্যাডভোকেট শফিউল আলমের বই এবং দুইজন সাক্ষীর ওপর নির্ভর করেছেন।
তা ছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসীমকে ১৯৭১ সালের ২৮ নভেম্বর ডালিম হোটেলে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগ আনা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী সালেহ উদ্দিন তার ‘প্রামাণ্য দলিল মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ নামক বইয়ে উল্লেখ করেছেন জসীম কবে কোথায় শহীদ হয় তা জানা যায়নি।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ গতকাল শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানিতে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহানকে যুক্তি উপস্থাপনে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমিন ও ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, জসীম উদ্দিন ও অপর পাঁচজনকে অপহরণ, বন্দী রাখা, ডালিম হোটেলে নির্যাতন ও হত্যার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করেনি। ছয়জন সাক্ষীই শোনা সাক্ষী। শুধু তা-ই নয়, এর মধ্যে একজন সাক্ষী ছাড়া বাকি কোনো সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে আসার আগে তদন্তকালে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এ ঘটনা উল্লেখ করেননি। যে একজন মাত্র সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে আসার আগে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এ ঘটনা বিষয়ে উল্লেখ করেছিলেন তিনিও ট্রাইব্যুনালে ১১ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে এমন কিছু নতুন কথা বলেছেন, যা আগে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি। কাজেই এ থেকে বলা যায় সাক্ষীরা মূলত শেখানো মতে ট্রাইব্যুনালে এসে মীর কাসেম আলীকে জড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আর ট্রাইব্যুনাল পারিপার্শ্বিক কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মীর কাসেম আলীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এ হত্যা ঘটনার সাথে মীর কাসেম আলী জড়িত এ রকম একটি রেকর্ড বা প্রমাণও রাষ্ট্রপক্ষ দেখাতে পারেনি। সম্পূর্ণ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তাকে সাজা দেয়া হয়েছে।
শাহজাহান বলেন, চার্জ ফ্রেমিং অর্ডারে হত্যা ঘটনার তারিখ ও সময় উল্লেখ করা হয়নি। তা ছাড়া জসীম উদ্দিন ছাড়াও অপর পাঁচজনের নাম-পরিচয়ও পাওয়া যায়নি।
১১ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে সাক্ষীদের জবানবন্দী : সাক্ষীদের বক্তব্য খণ্ডন করে যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে অ্যাডভোকেট শাহজাহান সাক্ষীদের জবানবন্দী থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ পড়ে শোনান আদালতকে। এসব অংশ হচ্ছে :
রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ নম্বর সাক্ষী হাসিনা খাতুন তার জবানবন্দীতে বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমার পরিবারের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তার মধ্যে আমার ফুপাতো ভাই জসীম ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র ছিলেন। সে একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। জসীম আমাদের চট্টগ্রাম শহরের ব্যাপারীপাড়ার বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করত। জসীম যখন আমাদের বাসায় আসত তখন তার সাথে অনেক সহযোদ্ধা থাকত এবং ঈদের দিনেও মনসুর নামে এক সহযোদ্ধা তার সাথে আমাদের বাসায় এসেছিল।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি খুব অস্থিরচিত্তে বিভিন্ন জায়গায় জসীমের খোঁজ করতে থাকলাম। এরই একপর্যায়ে বোস ব্রাদার্সের কাছে মতিন বিল্ডিংয়ে অবস্থিত তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে গিয়ে ন্যাপ নেতা অ্যাডভোকেট শফিউল আলম সাহেবের সাথে দেখা করি এবং যখন তাকে জসীমের নিরুদ্দেশের কথা বললাম তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই জসীমের বাড়ি কি সন্দ্বীপে?’ আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে বললাম, জসীম আমার ফুপাতো ভাই, তার বাড়ি সন্দ্বীপ। তখন অ্যাডভোকেট শফিউল আলম সাহেব বললেন, ‘তিনি ডালিম হোটেলে আটক থাকা অবস্থায় জসীমকে ওই হোটেলের একই কক্ষে যেখানে তিনিও আটক ছিলেন সেখানে নিয়ে জসীমকে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আল-বদরের সদস্যরা নির্যাতন করে ফেলে দেয়। শফিউল আলম সাহেব আরো বলেন, তখন কক্ষটি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং তার চোখ বন্ধ ছিল। জসীমকে ফেলে দিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর অনেক কষ্টে নিজের চোখের বাঁধন আলগা করে জসীমকে মরণাপন্ন অবস্থায় দেখতে পান এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই জসীম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এ কথা শোনার পর আমি কান্নাকাটি করছিলাম তখন শফিউল আলম সাহেব আমাকে জনৈক সাইফুদ্দিন খানের কাছে যেতে বললেন। তার কথামতো আমি সাইফুদ্দিন খানের কাছে গেলে তিনিও একই ধরনের কথা বলেন। আমি জসীমের লাশটি কোথায় আছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আপনারা তার লাশটি পাবেন না কারণ তাকে হত্যা করার পর তার মৃতদেহটি কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে’। আমি যখন সাইফুদ্দিন খানের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি এসব বিষয় কি করে জানলেন তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি যখন ডালিম হোটেলে আটক ছিলাম তখন স্বপন নামে একটি ছেলে ডালিম হোটেলে আটক বন্দীদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করত, সে আমাকে এসব তথ্য প্রদান করেছে’। শফিউল আলম সাহেবও অনুরূপ বক্তব্য আমার কাছে বলেছিলেন। …
প্রাসঙ্গিক সাক্ষী অনুপস্থিত : অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, হাসিনা খাতুনসহ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্যে ১১ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাদের নাম উঠে এসেছে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের কাউকেই হাজির করেনি।
সাক্ষী হাসিনা খাতুনের বর্ণনা মতে, জসিমের সাথে মনসুর নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তার বাসায় আসত। মনসুর এখনো জীবিত। সেই হতে পারত জসিমের হত্যা বিষয়ে সবচেয়ে ভালো সাক্ষী। কিন্তু তাকেও আনা হয়নি।
হাসিনা খাতুন স্বীকার করেছেনÑ ‘ঈদের দিনে জসীমের সাথে মনসুর নামে যে সহযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে এসেছিল সে আমার আত্মীয়, সে রেলওয়েতে অডিট বিভাগে কর্মরত আছেন। হাসিনা খাতুন আরো বলেছেন, ‘স্বাধীনতার পরে সন্দ্বীপের দুইজন মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল মওলা এবং আলিম মাস্টারের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল। আমি শুনেছি রফিকুল মওলা বর্তমানে বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন, আলীম মাস্টার সাহেব যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী ছিলেন, জীবিত আছেন কি না বলতে পারব না।’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ অ্যাডভোকেট শফিউল আলম তার ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইয়ে ডালিম হোটেলকেন্দ্রিক কোনো নির্যাতনের ঘটনায় কোথাও মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ করেননি।
অথচ সাক্ষী হাসিনা খাতুন দাবি করেছেনÑ ‘আমি আমার জবানবন্দীতে যে শফিউল আলম সাহেবের কথা বলেছি তার লেখা ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইটির জসীম সংশ্লিষ্ট অংশ আমি পড়েছি। আমার চোখের দৃষ্টি কমে যাওয়ায় সম্পূর্ণ বইটি পড়তে পারিনি। আমার যতটুকু মনে হচ্ছে ওই অংশে আল-বদর কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ আছে।’
তিনি শপথ নিয়ে আদালতে মিথ্যা কথা বলেছেন। সুতরাং তার সাক্ষ্য কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস করা যায় না।
স্বাধীনতার পরপরই তিনি স্থানীয় ‘সাপ্তাহিক স্বীকৃতি’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি জেরায় স্বীকার করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন। এমনকি কিলিং স্পট নামে তিনি লিখেছেন। অথচ তিনি স্বীকার করেছেন ডালিম হোটেল বা ফুফাতো ভাই জসীম উদ্দিন বিষয়ে কোনো লেখা লেখেননি।
জসীম উদ্দিনের ভাই জীবিত : জসীম উদ্দিনের ভাই প্রফেসর রাজিব হুমায়ূন জীবিত। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেছেন তার সাথে তিনি কথা বলেছেন। অথচ তিনি তাকে সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির করেননি। সাক্ষী হাসিনা খাতুন বলেছেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, প্রফেসর রাজিব হুমায়ূন কোর্টে সাক্ষ্য দিতে না আসার মধ্যে অনেক সত্য লুকিয়ে আছে। তার ভাই হত্যায় যদি সত্যিই মীর কাসেম আলী জড়িত থাকতেন তাহলে তিনি কোর্টে আসতেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন তিনি বৃদ্ধ। অথচ তিনি বলতে পারেননি তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসরে গেছেন কি না। কাজেই তার দাবি সত্য নয় বলে ধরে নেয়া যায়। তিনি তার জবানবন্দী রেকর্ড করতে পারতেন এবং তা গ্রহণের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারতেন। মূলত ডালিম হোটেলকেন্দ্রিক নির্যাতনের ঘটনা এবং তার ভাই হত্যার সাথে মীর কাসেম আলীকে তিনি জড়াননি বলেই তাকে আনা হয়নি মর্মে আমরা ধরে নিতে পারি। কারণ তিনিই হতে পারতেন এ অভিযোগের পক্ষে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী।
সাক্ষীদের বক্তব্যে গরমিল : অ্যাডভোকেট শফিউল আলম তার ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইয়ে উল্লেখ করেছেনÑ তাকে ২৭ নভেম্বর আটক করে ডালিম হোটেলে নেয়া হয়। অথচ ১৬ নম্বর সাক্ষী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, তিনি ২৩ নভেম্বর অ্যাডভোকেট শফিউল আলমকে দেখেছেন ডালিম হোটেলে আটক অবস্থায় অন্যদের সাথে।
জাহাঙ্গীর আলম আরো দাবি করেছেন, তিনি ২৩ অথবা ২৪ নভেম্বর সৈয়দ এমরানকে ডালিম হোটেলে দেখেছেন। অথচ সৈয়দ এমরান দাবি করেছেন তাকে ডালিম হোটেলে আনা হয় ৩০ নভেম্বর।
জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন তিনি ২৪ নভেম্বর জসীমকে ডালিম হোটেলে দেখেছেন; অথচ চার্জে এবং অন্যান্য তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে জসীমকে ২৮ নভেম্বর ডালিম হোটেলে আনা হয় এবং সে দিনই তার মৃত্যু হয়।
মুক্তিযোদ্ধা গাজী সালেহ উদ্দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর। তিনি ‘প্রামাণ্য দলিল মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ শীর্ষক বই লিখেছেন। তিনি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিরও সদস্য। তিনি বইয়ের ২০১ পৃষ্ঠায় ‘সন্দ্বীপ উপজেলা, বধ্যভূমি ও শহীদদের তালিকা শিরোনামে লিখেছেন জসীমের মৃত্যুর তারিখ এবং স্থান সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।
১৭ নম্বর সাক্ষী বলেছেন, ‘শফিউল আলম সাহেব আরো বলেন, তখন কক্ষটি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং তার চোখ বন্ধ ছিল। জসীমকে ফেলে দিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর অনেক কষ্টে নিজের চোখের বাঁধন আলগা করে জসীমকে মরণাপন্ন অবস্থায় দেখতে পান এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই জসীম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।’
কাজেই জসীমকে কে রুমে ফেলে যায় এবং কে মীর কাসেম তা তখন তার পক্ষে চেনা সম্ভব হওয়ার কথা নয়।
দুই নম্বর সাক্ষী সানাহউল্লাহ চৌধুরী দাবি করেছেন অ্যাডভোকেট শফিউল আলম মীর কাসেম আলীকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাকে বলেছেন তিনি বাঙ্গালী খান। এটা যে মিথ্যা তার কারণ হলো অ্যাডভোকেট শফিউল আলম তার বইয়ে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি।
খান সাহেব বিতর্ক
মীর কাসেম আলীকে রাষ্ট্রপক্ষ ‘খান’, ‘খান সাহেব, ‘বাঙ্গালী খান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়েও মীর কাসেম আলীকে ‘খান’, ‘খান সাহেব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মীর কাসেম আলীকে খান সাহেব হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল-২ ও ১৯ নম্বর সাক্ষী এবং রাষ্ট্রপক্ষ সরবরাহকৃত ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইটির ওপর নির্ভর করেছেন।
২ নম্বর সাক্ষী বলেছেন, ‘একপর্যায়ে ছেলেটিকে আমাদের রুমে ফেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে যায়। তখন অ্যাডভোকেট শফিউল আলম কানে কানে আমাকে বলে যে, ইনি মীর কাসেম আলী, বাঙ্গালী খান বদর বাহিনীর কমান্ডার।’
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, শফিউল আলম তার বইয়ের কোথাও মীর কাসেম আলীকে ‘খান’ বা ‘খান সাহেব’ হিসেবে উল্লেখ করেননি।
এমনকি তার পুরো বইয়ের কোথাও মীর কাসেম আলীর নামই উল্লেখ করা হয়নি। বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে ও তখন মীর কাসেম আলী একজন পরিচিত ব্যক্তি এ দেশে।
শফিউল আলম বইয়ের ২৫৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘আবার হঠাৎ বুটের আওয়াজ কানে এলো। মনে হলো বেশ ক’জন ক্রমশ নিকটতর হচ্ছে। সেন্ট্রি দরজা খুলে হাঁক দিলোÑ ‘খান সাহেব এসেছে, সকলে উঠে দাঁড়াও।’ বাইরে থাকতে শুনেছিলাম এ ‘খান সাহেব’ ভয়াল নিষ্ঠুর শক্তিধর এক লোক।’
এস এম শাহজাহান বলেন, এখানে বর্ণিত খান সাহেব এবং বুটের আওয়াজ থেকে এটা পরিষ্কার যে, এই খান সাহেব হলো কোনো পাকিস্তানি আর্মি অফিসার। কারণ ১৬ নং সাক্ষী জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ডালিম হোটেলের দুষ্কৃতকারীরা উর্দুতে কথা বলত। “প্রথমে আমাকে ডালিম হোটেলের বারান্দায় বসিয়ে পিঠে ও ঘাড়ে ২-৩ টা লাথি মেরে এবং বলে ‘শালা বহুত মজবুত হ্যায়’…..”।
শাহজাহান বলেন, ডালিম হোটেল নিয়ন্ত্রণ করত পাকিস্তান আর্মি ও বিহারিরা। কাজেই এখানে বর্ণিত খান সাহেব মীর কাসেম আলী নন এবং লেখক বইয়ে মীর কাসেম আলীকে খান সাহেব হিসেবে উল্লেখ করা তো দূরের কথা, বইয়ের কোথাও তার নামই উল্লেখ করেননি।
এর প্রমাণ হিসেবে এস এম শাহজাহান বলেন, ৮ নম্বর সাক্ষী এসকান্দার আলম চৌধুরী বলেছেন, “ঐ রুমে যাবার পর কোন একজন লোক বললো, খান কোথায়? উত্তরে কেউ একজন বলল, মীর কাসেম আলী সাহেব আমি আসছি। চোখ খুলে দেওয়ার পরে আমি মীর কাসেম আলীসহ আরেক জনকে দেখতে পাইÑ যিনি সম্ভবত পূর্বে উল্লিখিত খান হতে পারে।”
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, কোনো সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মীর কাসেম আলীকে খান সাহেব হিসেবে উল্লেখ করেননি।