মার্চ ২৯, ২০১৭

হজের খুতবা : খতিব শায়খ আব্দুর রহমান সুদাইস

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

2016-09-11_214318সৌদি আরবের মসজিদুল হারামের প্রধান ইমাম ও খতিব শায়খ আবদুর রহমান আস সুদাইস আরাফার ময়দানে হাজিদের উদ্দেশে মসজিদে নামিরা‍ থেকে খুতবা প্রদান করেছেন।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আরাফার খুতবা দিলেন নতুন খতিব। সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ আশ শায়খ স্বাস্থ্যগত কারণে খুতবা দেওয়া থেকে অবসর নিলে শায়খ আবদুর রহমান আস সুদাইসকে নতুন খতিব নির্বাচন করা হয়।

খুতবার শুরুতে আল্লাহতায়ালার প্রশংসা, নবী করিম (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করে খতীব বলেন, আল্লাহতায়ালার মেহমান হাজিদের সঙ্গে পবিত্র স্থান জাবালে রহমতে এসে একত্রিত হয়েছি। এ জন্য আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি। আমরা এ জন্য কৃতজ্ঞ যে, আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে পবিত্র এই দিনে এই পবিত্র স্থানে একত্রিত হয়ে তার কাছে দোয়া করার সুযোগ দান করেছেন।

তিনি বলেন, এই পবিত্র স্থানেই আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দেন। সেই ভাষণে বিশ্ববাসীর জন্য শিক্ষণীয় অনেক বিষয় রয়েছে।

তিনি বলেন, আমি সকলকেই তাকওয়া অর্জনের অসিয়ত করছি। হে মুসলিম জাতি, আল্লাহ তায়ালা সারা বিশ্ব বাসির জন্য অস্ংখ্য নবী পাঠিয়েছেন। তারা মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। সবশেণষে আমাদের নবী মুহাম্মদ স. কে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশে মানুষকে হেদায়েতের পথ দেখিয়েছেন। তাওহীদের দীক্ষা দিয়েছেন।সম্মানিত হাজি সাহেবগন, এই মাঠেই আমাদের নবী দাড়িয়েছেন। ইসলামের মূল বিষয়ুগুলি নিয়ে আলোচনা করেছেন। জাহিলিয়াতের সকল খারাপ বিষয়গুলোকে মিটিয়ে দিয়েছেন। মানবাধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। মানুষকে অন্ধকার ও অজ্ঞতা থেকে আলো ও জ্ঞানের দিকে আহবান জানিয়েছেন। নারির প্রতি সহানুভূতি এবং তাদের সকল অধিকারের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে বলেছেন। মুসলমানের রক্ত সম্মানিত। এক্ষেত্রে সকলকেই সতর্ক থাকতে বলেছেন।

তিনি বলেন, হে মুসলিম নেতৃবৃন্দ! সারা বিশ্বব্যাপী মুসলমানেদের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটু সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। এ বিষয় নিয়ে প্রয়োজনে আলোচনায় বসতে হবে। মসজিদে আকসাকে মুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, ইসলামে সুদকে হারাম করা হয়েছে, ইসলামে অজ্ঞতা-মুর্খতা কোনোটারই স্থান নেই। ভুলেও কাউকে গালি দেওয়া যাবে না। যে গালি-অভিশাপ দেয়, সে আমার উম্মতভুক্ত নয়’।

প্রিয় উপস্থিতি! হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এই পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে, এই জাবালে রহমতে দাঁড়িয়ে তিনি এসব কথা বলেছিলেন।

নবী বলেছেন, আমরা সবাই মুসলমান। মুসলমান কাকে বলে? যতো কঠিনই হোক না কেন, অথবা আমাদের মনপুত হোক বা না হোক, আল্লাহ যা নির্দেশ করেছেন, যে তার সেই নির্দেশের অনুগামী হয় সেই মুসলমান।

হে আল্লাহর মেহমানবৃন্দ! আমরা সবাই জানি যে, আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য এই দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। আমাদের নিঃশ্বাস বায়ু সীমিত। সকল জীবকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য আমাদের উচিত হলো, আমাদের এই সীমিত সময়কে সবচেয়ে ভালো কাজে ব্যয় করে, দুনিয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।

হে মুসলিম তরুন! বর্তমানে সারা বিশ্বে যে বিষয়টি নিয়ে সবচাইতে বেশী সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে তা হলো সন্ত্রাসবাদ। অনেক তরুণ ইসলমের মূল শিক্ষা ভুলে ভিন্ন স্থান থেকে ইসলাম শিখছে।বিভিন্নভাবে ভিবিষিকা ও উগ্রবাদ ছড়াচ্ছে। অযথাই মানুষকে কাফের বলে দিচ্ছে। হেতরুণ তোমরাই জাতির মেরুদন্ড। অতএব তোমরা সতর্ক হও। অন্যকে যেকোন কিছুতেই কাফের বলা থেকে বিরত থাকো। যেকোন বিষয় তোমরা আলেমদের নিকট থেকে গ্রহন কর। তোমাদের নিকট অনেক প্রত্যাশা। তোমরা সুন্দর আদর্শ গ্রহন কর। নিজেকে বিনির্মান করো।

আমরা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত। আমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি, ভুলে গেলে চলবে না। মানুষকে দ্বীনের পথে আনতে হবে সুন্দর হৃদয় দিয়ে। বলপ্রয়োগ করে ধর্ম প্রচার করা যাবে না। উগ্রতা পরিহার করতে হবে। ইসলাম প্রচারে সব মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে।

তিনি বলেন, আরব-অনারবের কোনো পার্থক্য নেই। জাতি ও দেশ ভেদের পার্থক্য ইসলাম সমর্থন করে না। এটা নবীর শিক্ষা। তিনি এখানে দাঁড়িয়ে এটা বলেছিলেন।

শায়খ সুদাইস বলেন, মুসলমানরা এক অঙ্গভুক্ত। একজনের থেকে আরেকজনকে আলাদা করার সুযোগ নেই। পরস্পরের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে। পরস্পরের মঙ্গল কামনা করতে হবে।

হে অভিভাবক ও মুরুব্বিগণ! চরিত্র প্রধান এক সম্পদ। ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবারের সকলের চরিত্র বিনির্মানের প্রত্রি লক্ষ্য রাখতে হবে। বিশেষত বর্তমানে যে চারিত্রিক যুদ্ধ সে ব্যাপরে সচেতন হতে হবে। প্রত্যেক সদস্যের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

তিনি বলেন, মুসলমানরা ভাই-ভাই। আমাদের সেভাবে চলতে হবে। ইসলাম মানবতার ধর্ম, সহানুভূতির ধর্ম। ইসলাম গ্রন্থিত হয়েছে ন্যায়বিচার দ্বারা, সততা দ্বারা ও ভালো ব্যবহার দ্বারা। এটা আমাদের মানতে হবে। আপনারা এটা মানবেন, আপনারা নিরাপদ ভূমিতে যেভাবে চলছেন- হজ পরবর্তী জীবনে সেভাবেই চলবেন।

হে ওলামায়ে কেরাম! আপনার সকলেই রাসুলের উ্ত্তরসূরী। অপনারা মানুষকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত না করে কোরআন সুন্নাহর প্রতি উদ্বুদ্ধে করুন। মানুষকে সঠিক বিষয়টি শিক্ষা দিন।

হে ইসলামের দায়ী ও আহবায়কগণ! আপনারা মানুষের প্রতি সহজ করুন্। দলা দলি মুক্ত থাকুন্। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর দিকে ডাকুন। মানুষের প্রতি দয়া করুন, রহমত করুন।

হে মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ! আপনারা সতর্ক হোন। মানুষের চারিত্রিক বিষয় গুরুত্ব দিন। ইসলামমের শিক্ষা ও দীক্ষা প্রচার করুন।

হে হাজিবৃন্দ! আপনারা শুকরিয়া আদায় করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে হজের জন্য কবুর করেছেন। এই আরাফায় অবস্থানের তাওফীৗক দিয়েছেন। সাথে সাথে আপনাদের জন্য যারা এই ব্যবস্বথা করেছেন, তাদের জন্য দো্‌াআ করুন। বিশেষ করে খাদেমুল হারামাই মালিক সালমানের জন্য। এবং যারা সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন

হে বায়তুল্লাহর হাজিগণ! আপনারা আরাফায় অধিক পরিমানে দোআ করুন। আরাফার দোআ সব থেকে উত্তম দোআ। এদিন আল্লহ তাআলা গর্ব করেন। অধিক পরিমানে মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এখানে জোহর আছর কসর করে জমা করুন। দোআয় লিপ্ত থাকুন। সূযাস্ত পর্যন্ত দোআ করতে থাকুন। এর পর শান্তভাবে মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হোন। সেখানে পৌঁছে মাগরিব এশা এক আজানে দুই এক্বামতে আদয়া করুন।
এরপর জামারায় পাথর নিক্ষেপের জন্য যেথে থাকুন্। কোরবানী করুন্। মাথা চেছে বা ছেটে হালাল হোন। এভাবে হজের কার্যক্রম সমাপ্ত করুন।

দোয়ার মাধ্যমে শায়খ সুদাইস খুতবা শেষ করেন। খুতবার মাঝে বলেন, মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করা বিশেষ কাজ। দীর্ঘ ৩৫ বছর এই মিম্বরে দাঁড়িয়ে শায়খ আবদুল আজিজ আশ শায়খ খুতবা দিয়েছেন। মানুষকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নসিহত করেছেন। অসুস্থতার কারণে তিনি আজ খুতবা দিতে সক্ষম হননি। তার জন্য দোয়া করি, আল্লাহতায়ালা তার ইলমে, হায়াতে বরকত দান করুন। তাকে সুস্থতা দান করুন। আমিন।