আজ সেই ‘এক-এগারো’
আজ সেই ‘এক-এগারো’

আজ সেই ‘এক-এগারো’

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | নিজস্ব প্রতিনিধি


তথাকথিত ‘এক-এগারোর’ ১৩ বছর পূর্তি আজ। ২০০৭ সালের এই দিনে নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রের ভিত আরো একবার দুর্বল হয়ে পড়ে বাংলাদেশে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট সঙ্ঘাতের সুযোগ নিয়ে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা আবির্ভূত হয় স্বরূপে। কথিত দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগে রাজনীতিকদের মুখে লেপন করা হয় কালিমা। ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নে চলে নানামুখী তৎপরতা। কিন্তু জনগণ এক বছর পেরোতে-না-পেরোতেই জেগে ওঠে। দুই বছরের মধ্যেই অবসান হয় জবরদস্তিমূলক সেই শাসনের। ক্ষমতার ইতি টেনে নিরাপদ প্রস্থানে বাধ্য হয় মঈন-ফখরুদ্দীনের সেই সরকার।

এক-এগারোর প্রেক্ষাপট ও দুই বছরের শাসন :
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে ২০০৬ সালের শেষ কয়েক মাস আওয়ামী লীগের আন্দোলনে উত্তপ্ত ছিল রাজপথ। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার আন্দোলন পৈশাচিকতায় রূপ নেয়। পল্টনে জামায়াতে ইসলামীর সাথে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ছয়জন। এমনই এক অবস্থার মধ্যে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়।

কিন্তু শুরু থেকেই এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগ আপত্তি তোলে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে। ওই সময়কার ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ছিল ৩ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ও এরশাদের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা। ৭ ও ৮ জানুয়ারি অবরোধের ডাক। ৮ জানুয়ারি বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি। ৯ জানুয়ারি বঙ্গভবনের আশপাশে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা। ১০ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিরোধে শেখ হাসিনার হরতাল-অবরোধসহ ৮ দিনের কর্মসূচি।

এমন প্রেক্ষাপটে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যাচ্ছে অভিযোগ তুলে ১১ জানুয়ারি নির্ধারিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১১ দিন আগে আনুষ্ঠানিক সামরিক অভ্যুত্থান না হলেও সেনাবাহিনী প্রধান মইন উ আহমেদসহ শীর্ষব্যক্তিরা রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত করেন। বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রপতিকে সরকার প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ এবং জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণায় স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া হয়েছিল।

একই সঙ্গে পদত্যাগ করেন উপদেষ্টা পরিষদের ১০ সদস্যের ৯ জন। এই দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং অল্প সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার লক্ষ্যে দু-এক দিনের মধ্যেই নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন।

রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে কারফিউ জারি করা হয়। তবে ২৪ ঘণ্টার মাথায় ১২ জানুয়ারি কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়।

নির্বাচনপ্রক্রিয়া স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও মার্কিন পাসপোর্টধারী ড. ফখরুদ্দীনকে প্রধান করে কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গভবনের দরবার হলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নতুন প্রধান উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করান।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দল ও মহাজোটের শীর্ষ নেতারা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অন্য দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ চারদলীয় জোটভুক্ত দলের নেতারা এই অনুষ্ঠান বর্জন করেন।

মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করার নামে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের দিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে। সেই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ‘দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ শুরুতে সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে নিলেও পরে দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের হেয় করে রাজনীতিশূন্যতা সৃষ্টির মাধ্যমে কুশীলবদের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার প্রবণতা জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দুই দলের ৭৯ জন ভিআইপি রাজনীতিবিদকে বহু মামলায় জড়িয়ে দিনের পর দিন ব্ল্যাকহোলে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতনের পর কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ গভীর রাতে যৌথবাহিনীর সদস্যরা ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন থেকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও পরে ২ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ কারাগারে বন্দী রাখা হয়।

কিন্তু এর আগেই শীর্ষ এই দুই নেত্রীকে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। পরে নিজ নিজ দলের নেতৃত্ব থেকে তাদের বাদ দেয়ার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে প্রধান দুই দলে তথাকথিত সংস্কারের চেষ্টা চালানো হয়। এই সংস্কার করা না গেলেও দলগুলোতে সীমিত আকারে ভাঙন সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। দুই নেত্রীকে বিচারের আগেই কারাবন্দী করে রাখার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।