হিন্দুত্ববাদ ও ভুলে ভরা পাঠ্যবই

মুহাম্মদ আবদুল কাহহার ●

গত ৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার একটি সংবাদ শিরোনামে বলা হয়েছে, “পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ইসলামবিরোধী বিষয়ে তত্ত্ব শেখানো হচ্ছে”। এছাড়া পাঠ্য বইয়ের অসংখ্য ভুলও ছাপা হয়েছে। এখনে কতিপয় ভুল তুলে ধরতে চেষ্টা করবো। তবে ধর্মীয় বিষয়ে যেসব ইচ্ছাকৃত ভুল করা হয়েছে তা যে কোন প্রাকটিসিং মুসলিমের কাছে নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। বর্তমান পাঠ্যপুস্তকে কট্টর ইসলামবিরোধী লেখকদের প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত গল্প ও কবিতার সংখ্যা ১৯৩টি। এর মধ্যে হিন্দু ও নাস্তিকদের লেখার সংখ্যা হলো ১৩৭টি। ২০১৬ সালের প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’তে অক্ষর পরিচয় দিতে গিয়ে গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধে ঋষি, ওঝা, হিন্দু ঢাক, হিন্দুদের রথ, বাউলের একতারা বিষয়ক টার্মগুলো শেখানো হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’য়ের অন্তর্ভুক্ত, কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা ‘নেমন্তন্ন’ কবিতা ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা শিখছে যে, ‘বাবু’ বলে একে অপরকে সম্বোধন করতে হবে, সাথে সাথে ভজন তথা হিন্দুদের ধর্মীয় সঙ্গীত শুনতে হবে। মন্দিরের ‘প্রসাদ’ও ভক্ষণ করতে হবে। পঞ্চম শ্রেণির ‘আমার বাংলা’ বইয়ে ‘শখের মৃৎশিল্প’ এর আলোচনায় শেখানো হচ্ছে রাজা রামনাথ রায়ের ‘কান্তজীর মন্দির’, পাহাড়পুরের ‘বৌদ্ধ বিহার’, বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন ময়নামতির ‘শালবন বিহার’, মৌর্য, গুপ্ত এবং পাল হিন্দু সমান্তরাজাগণের রাজধানী ‘মহাস্থানগড়’ সম্পর্কে। এগুলোও জানতে হবেÑএটাকে অস্বীকার করছি না। কিন্তু ‘মহাস্থানগড়’-এ পোড়ামাটির ফলক ও মূর্তি ছাড়াও সেখানে হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী রহমাতুল্লাহি আলাইহি’র মাজার থাকলেও তার কোনো বর্ণনা দেয়া হয়নি। কিন্তু কেন? মুসলিম সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় রীতি-নীতিকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো অসৎ চিন্তা রয়েছে! শিক্ষার্থীরা যাতে হিন্দুত্ববাদ খুব সহজেই শিখতে পারে সেজন্য সুপরিকল্পিতভাবে পাঠ্যবইয়ে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তেমনিভাবে পঞ্চম শ্রেণির ‘আমার বাংলা; বইয়ে’র ‘কাঞ্চনমালা’ ও ‘শাঁকনমালা’ গল্পে হিন্দু রানীদের পরস্পরের প্রতারণার গল্প, ব্রত অনুষ্ঠান, মন্ত্র পাঠ করে কীভাবে আসল রানী উদ্ধার পেল, নকল রানী ধ্বংস হলো। একই বউয়ে সুকুমার রায়ের ‘ধবাক জলপান’ অংশে জল, মশাই, আজ্ঞে ইত্যাদি শব্দ শেখানো হচ্ছে। এছাড়া ‘মাটির নিচে যে শহর’ এ প্রবন্ধে ‘বৌদ্ধ পদ্ম মন্দির’ ও ‘বৌদ্ধ বিহার’সহ বেশকিছু হিন্দু নিদর্শনের কথা বলা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা প্রথম পত্র ‘সাহিত্য কণিকা’ বইয়ে নাটমন্দির, দেবমন্দির, সংকীর্তন, কালী দেবীর পূজা ও সাটাঙ্গে প্রণাম বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে কোমলমতি শিশুদের হিন্দুত্ববাদ ও তাদের সংস্কৃতি শেখানো হচ্ছে। ভারতীয় আধুনিক কবিদের কবিতা বাংলাদেশে পাঠ হলেও বাংলাদেশের কোনো কবির কবিতা ভারতের পাঠ্যে প্রধান্য পায় না। কোন পথে এগুচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা? আমাদের দেশে কী মুসলিম কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিকের খুব আকাল যাচ্ছে যে, শতকরা ৭০ ভাগ পর্যন্ত হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের রচনা সিলেবাসভুক্ত করতে হবে? তাদের লিখনি থাকতে পারে সেটা অপরাধ নয়, তাই বলে এতটা প্রাধান্য দেয়া ঠিক নয়। ২০১৩ সালের নবম শ্রেণির ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ বইয়ের ৮২ পাতায় হালাল-হারাম অংশে লেখা হয়েছিল- ‘দেবদেবীর নামে উৎস্বর্গীকৃত পশুর গোশত খাওয়া হালাল” এসব কথা লিখে চরমভাবে ইসলামের অবমাননা করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো- সরকারি বইয়ে এমন জঘন্য ভুল থাকে কী করে? বইগুলো যারা লিখেন ও সম্পাদনা করেন তারা সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করছেন না বলেই এমনটা ঘটছে। অমার্জনীয় অপরাধ করলেও তাদের বিরুদ্ধে কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা-ও জানা যায়নি। এছাড়া তথ্যবিভ্রাট আরেকটি বড় সমস্যা। সপ্তম শ্রেণির ‘সপ্তবর্ণা নামের বাংলা বইটির ৭১নং পৃষ্ঠায় কালিদাস রায়ের ‘অপূর্ব প্রতিশোধ’ কবিতার তৃতীয় লাইনে ওযু ও নামায শব্দ দুটি থাকায় তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়া হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ লাইনটি হবে- ‘তার তাজা খুনে ওজু করে আজো নামাজ পড়িনি তাই/আত্মা তোমার ধরার স্বর্গে পাইনি ঠাই’। মুসলিমদের জন্য ওযু (পবিত্রতা) নামাযের পূর্ব শর্ত। কবিতায় যেভাবে এই শব্দ দুটি ছিল ঠিক সেভাবে বইয়ে এই লাইন দুটি থাকলে কী ক্ষতি হতো? সুতরাং এসব কর্মকা- থেকে বুঝা যায় ইসলামি সংস্কৃতিকে আড়াল করতেই ইচ্ছা করে বইয়ে কারসাজি করা হয়েছে। একই বইয়ে কবি জসীমউদদীন রচিত ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতার পাঠ পরিচিতিতে ঐতিহাসিক ‘আগরতলা মামলা’কে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ৬৯নং পৃষ্ঠায় সুকুমার রায়ের ‘আনন্দ’ নামের ছড়াটি কবি যেভাবে লিখেছেন সেভাবে না রেখে এলোমেলোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০১৬ সালের পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইয়ের ১৯ নং পৃষ্ঠায় বাহাদুর শাহ পার্কের ছবির নিচে ক্যাপশন লেখা হয়েছে ‘১৯৪৭ সালে নির্মিত সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিসৌধ’; যা ভুল তথ্য। সঠিক তথ্য হচ্ছে ‘এ স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয় ১৯৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের ১শ’ বছর পূর্তি উপলক্ষে।’ বিশ শতকে বাহদুর শাহ পার্ক নামটি পরিবর্তন করে ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’ নামকরণ করা হলেও বইয়ে উনিশ শতকে নাম পরিবর্তনের কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ভুলের মধ্যে হলো, ছাপা ঠিক নেই। সেলাই, বাঁধাই, ঝাপসা ছাঁপা, কোনো বইয়ের মাঝখান থেকে ১/২ ফর্মা নেই। সপ্তম শ্রেণির চারু ও কারু বইটি কাটিংয়ের সময় ত্রুটি হওয়ায় বইয়ের এক-চতুর্থাংশ কাটা পড়েছে। কভার পৃষ্ঠার উপরে লেখা সপ্তম শ্রেণি অথচ ভেতেরে অষ্টম শ্রেণির বই। তাছাড়া নিম্নমানের কাগজ, বানান ভুল, উঁই পোকায় খাওয়া, অনেকগুলো পাতায় লেখা ছাপা না হওয়া ইত্যাদি সমস্যা বিদ্যমান। বইয়ের যেসব ত্রুটির কথা তুলে ধরা হলো তা কোন একটি বইয়ের নয়। অভিভাবকরা নিয়মিত তার সন্তানের ত্রুটিপূর্ণ বই পরিবর্তন করতে আসলেও বিদ্যালয় থেকে কোনোই সমাধান করা যাচ্ছে না। বই বিতরণের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা অভিভাকদের তোপেড় মুখে পড়ছেন। পাঠ্যবইয়ের ভুলের বিষয়ে দশম জাতীয় সংসদ অধিবেশনের নবম অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ ডা. রুস্তম আলী ফরায়েজী গত ২৮ জানুয়ারি সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, “এই ধরনের বই কীভাবে ছাপালো। আপনারা কি কিছুই দেখেন না?” কথা হলো-শিশুরা ভুল শিখবে কেন? সঠিক করে জানতে ও ভুল শোধরাতে তারা বিদ্যালয়ে এসে তারা সরকার প্রদত্ত বই থেকে ভুল জানছেন! এখানেই শেষ নয়! বছরের পর বছর পাঠ্যবইয়ে ভুলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিঃসন্দেহে লজ্জাস্কর। বই উৎসব করা হলো ১ জানুয়ারি অথচ তৃতীয় কিস্তির বই পাওয়া গেল ৬ ফেব্রুয়ারি। সপ্তম, অষ্টম শ্রেণির বাংলা প্রথম পত্র ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং নবম শ্রেণির বাংলা প্রথম পত্র ও ব্যবসায় উদ্যোগ বইগুলো একমাস ৫ দিন পর পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। যা পুষিয়ে নেয়া কষ্টসাধ্য। অধিকাংশ অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকার যদি সময়মত বই দিতে না পারে তাহলে কিসের বই উৎসব! এ ধরনের লোক দেখানো উৎসব না করাটাই ভালো। এনসিটিবির তথ্যানুযায়ী, এবছর প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, এবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি বিদ্যালয়ের ৪ কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোট ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬২ হাজার পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়েছে। এটি প্রশংসনীয় হলেও পাঠ্যবইয়ে মারাত্মক ভুল ও যথাময়ে বই না পাওয়ায় সব কিছুই যেন মøান হয়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি অমরা অভিভাবকরা চাই, আমাদের সন্তানরা যেন সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর পরিচয় জানতে পারে। একজন আদর্শ মুসলিমের পাশাপাশি যথাযথ যোগ্যতার সাথে একজন সুনাগরিক হিসেবে জীবন গড়তে পারে। মুসলিম ও হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মের অনুসারী সবাই যেন তার নিজ নিজ ধর্মের বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে সঠিক পথের সন্ধান পায়। যা কিছু শিখছে, যা শিখবে সবই নির্ভুল ও সঠিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামের বিধি-বিধান লঙ্ঘিত হয় এমন কোন শিক্ষা আমাদের কাম্য নয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে যারা পরিকল্পিতভাবে ইসলাম থেকে দূরে রাখতে চায় তাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করুন- সেই প্রত্যাশা করি। যারা বই লেখেন ও সম্পাদনা করেন তারা কোনোভাবেই দায়সারা দায়িত্ব পালন না করে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেনÑএটাও প্রত্যাশা থাকবে। শিক্ষার মতো জাতীয় একটি বিষয়ে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা হলে কিংবা কোনো রকম কারসাজি করা হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে এটাও বলতে চাই, ইসলামের বিরুদ্ধে যারা লিপ্ত তাদের ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রতিটি প্রকৃত মুসলিমরা কখনোই ভুল করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

দৈনিক ইনকিলাব