সাহাবায়ে কেরামকে অনুসরণ করা ছাড়া মুক্তির কোনো পথ নেই: মাওলানা মামুনুল হক

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | সোহেল আহম্মেদ


ফাইল ছবি

দেশের প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া ঢাকার শাইখুল হাদীস মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, নব্য জাহেলী ও বর্বর সমাজ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকে সাহাবায়ে কেরামের পথ অনুসরণ করতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের পথ অনুসরণ করা ছাড়া আমাদের সামনে মুক্তির অন্য কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।

শুক্রবার (১১ জানুয়ারি) নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া মিফতাহুল উলুমের বার্ষিক ইসলামী মহাসম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মামুনুল হক বলেন, সময়ের আবর্তনে আবার সেই জাহিলিয়াতের যুগ আমাদের সমাজে ফিরে এসেছে। এ যুগে আমরা অনেকে বলি, আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। আমরা অনেকে গৌরব করে বলি, এখন আধুনিক যুগ, সভ্যতার যুগ। কিন্তু যদি আপনি আজকের যুগ, আজকের সমাজের প্রতি গভীর মনোযোগ দিয়ে দৃষ্টিপাত করেন তাহলে আপনার চোখে ধরা পড়বে, আজকে সভ্যতার নামে যে সমাজ চলছে বিশ্বের ইতিহাসে এর চেয়ে অসভ্য আর বর্বর সমাজ কখনো ছিলনা। আজকের সমাজের প্রতি যদি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করেন তাহলে দেখবেন,আজকের যুগের যে বর্বরতা তা আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। আজকে আমি আপনি যে সমাজে বাস করছি যদিও এটাকে উন্নত সমাজ বলা হয় কিন্তু আমিতো এর মধ্যে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে দেখতে পাই, এটা উন্নত মানব সমাজ নয়, এটা হলো পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত মানব সভ্যতার নামে একটি পশুত্বের সমাজ। আমার কথা শুনে অনেকে রাগ করতে পারেন, অনেকে আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তবে আমার কথার যৌক্তিকতা আছে।

তিনি বলেন, আমরা তো জাহেলী সমাজের কথা জানি। আমরা জানি জাহেলী যুগ অসভ্য যুগ ছিল, বর্বরতার যুগ ছিল, মুর্খতার যুগ ছিল। এজন্য সে যুগকে অন্ধকার যুগ বলা হয়। সে যুগে মানবতা বলতে কিছু ছিলনা। বর্বরতা আর হিংস্রতা মানব সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছিল। সে যুগে মানুষের জান মালের কোন নিরাপত্তা ছিলনা। মানুষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতো, অকারনে খুন করতো। সে যুগে দুই গোত্রের মধ্যে কোন সংঘাত সৃষ্টি হলে তা যুগ যুগ ধরে নয় বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী চলতে থাকতো। এক গোত্রের লোক আরেক গোত্রের লোককে রাস্তায় পেলে হত্যা করে ফেলতো। এরপর অন্য গোত্র সেই হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অপেক্ষায় থাকতো। হত্যাকারী গোত্রের যে কোন লোককে তারা পেত তাকেই হত্যা করে প্রতিশোধ গ্রহন করতো, যদিও প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যাকে হত্যা করা হতো সে হতো নিরপরাধ। সে ওই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কিছুই জানতো না তারপরও শুধুমাত্র গোত্রিয় শত্রুতার কারনে
তাকে হত্যা করা হতো। শুধুমাত্র গোত্রিয় শত্রুতার জেরে মানুষ খুন করা হলে যদি বর্বরতার সমাজ হয় তবে আজকের সমাজেও তো শুধুমাত্র বিপক্ষ দলের লোক হওয়ার কারনে, বিরোধী দলের লোক হওয়ার কারনে একদলের লোক আরেক দলের লোককে খুন করছে। প্রতিনয়ত ও অহরহ এমন ঘটনা যে সমাজে ঘটছে সেটা কি সভ্য সমাজ নাকি বর্বর জাহেলী সমাজ?


ইনসাফ সাংবাদিকতা কোর্স

ইনসাফ সাংবাদিকতা কোর্সদেশের প্রথম ইসলামী ঘরানার অনলাইন পত্রিকা ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আয়োজনে শুরু হতে যাচ্ছে স্বল্পমেয়াদী সাংবাদিকতা কোর্স।অংশগ্রহণ করতে যোগাযোগ করুন এই নাম্বারে-০১৭১৯৫৬৪৬১৬এছাড়াও সরাসরি আসতে পারেন ইনসাফ কার্যালয়ে।ঠিকানা – ৬০/এ পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০।

Posted by insaf24.com on Monday, October 29, 2018


তিনি আরো বলেন, আজকের যুগের বর্বরতা জাহেলী যুগকেও হার মানিয়েছে। আপনি বলবেন কিভাবে? আমি বলবো, জাহেলী যুগে মানুষ মানুষের হাতে খুন হতো ঠিক তবে খুন হওয়ার পর নিহত ব্যক্তির লাশ গুম হয়ে যেতনা। জাহেলী যুগে খুন হওয়া ব্যক্তির লাশ তার আপনজনেরা খুজে পেত। মা তার ছেলের লাশ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারতো, বাবা তার ছেলের লাশ কাঁধে বহন করে কবরে নিয়ে যেতে পারতো, ভাই তার ভাইয়ের লাশকে দাফন করার সুযোগ পেত। কিন্তু আজকের সমাজে খুন হওয়া ব্যক্তির লাশ তার আপনজনেরা খুজে পায়না। কারন কোন ব্যক্তিকে শুধু খুন করেই ক্ষান্ত হয়না দুর্বিত্তরা তারা তার লাশকেও গুম করে ফেলে। এমতাবস্থায় এই সমাজকে কিভাবে সভ্য সমাজ বলবেন? এই সমাজ তো জাহেলী সমাজের চেয়েও বর্বর। আজকের সমাজে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়, মানুষ খুন করার পর হত্যাকান্ডকে আড়াল করতে সেই নিহত হওয়া মানুষের মাথার উপর ট্রাকের চাকা তুলে দেওয়া হয়। এ কাজগুলো যে সমাজে করা হয় আপনি তাকে সভ্য সমাজ বললেও আমি এই সমাজকে জাহেলী যুগের বর্বর সমাজ বলতে চাই।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জাহেলী যুগে নারীর ইজ্জত আর সম্ভ্রমের কোন নিরাপত্তা ছিলনা। সেই যুগে নারীদের ইজ্জত লুন্ঠন করা হতো, নারীদের ধর্ষন করা হতো। আমি অনেক ইতিহাস পড়েছি কিন্তু কোথাও এমন পাইনি যেখানে তিন বছরের কন্যা সন্তানকে ধর্ষন করা হয়, পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষন করা হয়। জাহেলী যুগে নারীদের ইজ্জত লুন্ঠন করা হতো ঠিক কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত এমন ইতিহাস পড়িনি যে, স্বামীকে গাছের সাথে বেঁধে তার সামনেই স্ত্রীর ইজ্জত লুটে নেওয়া হয়। সন্তানদের সামনে মায়ের ইজ্জত লুটে নেওয়ার ইতিহাস জাহেলী যুগে না থাকলেও আজকের সমাজে চার সন্তানের জননীকে তার সন্তানদের সামনে ধর্ষন করা হয়েছে যা জাহেলী যুগের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এ সমাজকে যদি আপনি সভ্য সমাজ বলেন তাহলে বর্বরতার সমাজ কোনটা?

তিনি বলেন, আজ আমরা মনে করছি লাল নীল বাতি জ্বললেই সমাজ উন্নত হয়ে যায়। আজ আমরা মনে করছি রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হলেই সমাজ উন্নত হয়ে যায়। লাল নীল বাতি জ্বললেই আর যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হলেই সমাজ উন্নত হয়ে যায়না। যদি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা না থাকে, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ না থাকে, মানুষের জান মাল আর ইজ্জতের নিরাপত্তা যদি না থাকে তাহলে শুধু রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতিকে কখনো মানব সমাজের প্রকৃত উন্নতি বলা যায়না।

তিনি আরো বলেন, শুধু ডিগ্রি অর্জন করার নাম শিক্ষার উন্নতি নয়। শুধু সনদ বিতরণের নাম শিক্ষার উন্নতি নয়। শিক্ষার উন্নতি তো সেদিন হবে যেদিন শিক্ষার আলো সমাজের পরতে পরতে ছড়িয়ে পড়বে। যেদিন শিক্ষা মানুষকে মানবতা শিক্ষা দিবে, যেদিন শিক্ষা মানুষকে অন্যের সম্পদ লুন্ঠন করাসহ সমস্ত দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা করবে, যেদিন শিক্ষা মানুষকে মানুষের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করতে উদ্বুদ্ধ করবে সেদিন শিক্ষার উন্নতি হবে সমাজের উন্নতি হবে। এছাড়া সমাজ কোনদিন উন্নত হতে পারেনা।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, এগুলো হলো বড় দুঃখের কথা। এগুলো আমাদের জন্য বড় আফসোস ও পরিতাপের বিষয়। আজকের এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কি? উপায় হলো একটাই, আজকের এই নব্য জাহেলী আর বর্বরতার সমাজ থেকে যদি আমরা মুক্তি পেতে চাই, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে মুক্তি দিতে চাই তাহলে আমাদেরকে তাদের অনুসরণ করতে হবে যারা আরবে জাহিলিয়াতের বর্বর সমাজের কবর রচনা করে তার উপর মানবতা আর ইনসানিয়াতের বিজয় নিশান উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই সাহাবায়ে কেরামের পথ অনুসরণ করা ছাড়া আমাদের সামনে মুক্তির অন্য কোন বিকল্প পথ খোলা নেই। এই উম্মতে মুসলিমার উন্নতি ও মুক্তি হিন্দু আর খ্রিস্টানদের গোলামী করার মধ্যে নয় বরং সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণের মধ্যে রয়েছে। কাজেই আমাদেরকে নতুন করে জাগতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের খেলাফতে রাশেদার সেই সোনালী আদর্শ আকড়ে ধরতে হবে।

তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরাম মহান আল্লাহর হুকুম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের উপর পরিপূর্ণ আমলকারী ছিলেন। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সব ধরনের গুনাহ্ থেকে বেঁচে থাকতেন। তারা উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তারা রাতের বেলায় মহান প্রভুর দরবারে ইবাদতে মগ্ন হতেন আর দিনের বেলায় আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা করার, বাতিলের মসনদ চুরমার করে দিয়ে হককে প্রতিষ্ঠা করার জন্য জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হতেন। তারা এক আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা নত করেননি। আমাদেরকে তাদের পথ অনুসরণ করতে হবে এবং তাদের আদর্শকে আকড়ে ধরতে হবে।