জানুয়ারি ১৮, ২০১৭

বাংলাদেশে দেখলাম ইসলামের নিদর্শন

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী (সম্পাদক : মাসিক আদর্শ নারী)


2016-09-22_010457ঈদুল আজহার পর চাঁদপুর ও সিলেটে পর পর প্রোগ্রাম করে এলাম। গত ১৫ সে্প্টেম্বর চাঁদপুর কচুয়ায় ওয়াজ মাহফিল ছিলো। সেখানে উজানী মাদরাসার নিকটে খিড্ডা এলাকার মাহফিল সংলগ্ন গ্রামটি উলামায়ে কিরাম অধ্যুষিত। বিরাট সীমানা জুড়ে এ এলাকার প্রতিটি ঘরে আলেম রয়েছেন–যারা দেশের বিভিন্ন স্থানের বড় বড় মাদরাসার মুহতামিম, মুহাদ্দিস ও মুদাররিস। এভাবে সেই এলাকাকে আলেমনগর বলা যায়।

সেখান থেকে ফেরার একদিন পরই সিলেট প্রোগ্রামে গেলাম আল্লামা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা ও দোয়া মাহফিলে। এ সিলেটের সফরসঙ্গীগণের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ‍মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান সম্পাদক মোস্তফা মঈন উদ্দীন খান এবং মাসিক মদীনার পয়গাম সম্পাদক মাওলানা শহিদুল ইসলাম কবির। সাথে আমার ছেলে সাঈদ আল হাসানও ছিলো।

সিলেটের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট অনেক প্রোগ্রামের সাথে বিশেষ দু’টি অঞ্চলে বড় দু’টি প্রোগ্রাম হয়–প্রথমদিন কানাই ঘাটের সদরে এবং দ্বিতীয় দিন গাছবাড়ীতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-এর আয়োজনে।

সিলেটে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.কে নিয়ে এসব আলোচনা ও দোয়ার মাহফিলে তাঁর প্রতি সেখানকার উলামায়ে কিরাম ও আমজনতা নির্বিশেষে সকলের যে আন্তরিকতা দেখেছি–তা অবর্ণনীয়। সিলেটের মাটির পরতে পরতে মিশে আছে শাইখুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.-এর সুহবত ও বরকতের মতো মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর বিভিন্ন দ্বীন-বিজয়ী ঐকান্তিক সাধনা ও অবদান। যার জন্য সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের মনে তাঁর প্রতি তৈরী হয়েছে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সেতুবন্ধন। আমরা প্রতিটি স্থানে মানুষের আবেগ ও অনুরাগ থেকে তার প্রমাণ পেয়েছি।

সিলেটের সেই বড় দু’টি সম্মেলন ছাড়াও পথে-ঘাটে বিভিন্ন স্থানে আমাদের আগমনের কথা শুনে উলামা-জনতা জমায়েত হয়েছেন এবং আমাদের গাড়ী থামিয়ে আতিথেয়তা করেছেন। আর তখন সেখানে তা বিশেষ সভার রূপ পরিগ্রহ করে। এভাবে এ দিনগুলোতে সেখানে অনেকগুলো সভা হয়েছে।

040799147_nএ সফরে আরো বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সিলেট থেকে গাছবাড়ী যাওয়ার পথে গোলাপগঞ্জের বেশ কিছু এলাকায় আমরা দেখলাম, জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট সাইনবোর্ড টাঙ্গানো হয়েছে, তাতে লেখা আছে–“এই এলাকায় গান-বাজনা নিষিদ্ধ। অনুরোধক্রমে : এলাকাবাসী।” আবার কোথাও লেখা আছে–“এই এলাকায় গান-বাজনা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। অনুরোধক্রমে : এলাকাবাসী।” খোঁজ নিয়ে জানলাম, এটা মাওলানা বশির আহমদ শায়খে বাঘা (রহ.)-এর এলাকা। তিনি নসীহতের মাধ্যমে তার এলাকায় মানুষকে নাজায়িয গান-বাজনা থেকে বিরত রাখতে সফল হয়েছেন। তাই সেখানে কেউ গান-বাজনা করে না। এমনকি বাহিরের কেউ সেখানে গান-বাজনা করলে তারা বাধা দেন এবং গান-বাজনা বন্ধ করতে বাধ্য করেন।

এরপর আরো কিছু দূর যাওয়ার পর একটি বাজার চোখে পড়লো। সেখানে দেখলাম, চেয়ার-টেবিলের পরিবর্তে সেখানকার প্রায় হোটেলগুলোতে ফ্লোরে বসে দস্তরখানে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেটা আরেক শায়েখ আল্লামা মুশাহিদ বাইয়ামপুরী (রহ.)-এর এলাকা। তাঁর দাওয়াতী প্রচেষ্টায় মানুষ সুন্নাতের উপর আমলকে এভাবে গুরুত্ব সহকারে পালন করছে।

এসব অঞ্চলের রাস্তায় রাস্তায় ছোট ছোট সাইন-ফলক লাগানো হয়েছে–যার কোনটার মধ্যে লেখা–“আলহামদুলিল্লাহ”। আবার কোনটায় লেখা–“আল্লাহু আকবার”। আবার কোনটায় লেখা–“সুবহানাল্লাহ”। চলন্ত পথিকদেরকে মহান আল্লাহর জিকির বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেই এগুলো লাগানো হয়েছে।

সিলেটে অনেকে ভ্রমণ করেন জাফলং, মালনীছড়া চা বাগান, খাসীয়া পল্লী, পানতুমাই, রাতারগুল বন, মাধবকুন্ড পানিপ্রপাত, সুরমা ভেলী, লোভাছড়া পাথর কোয়ারী, ক্বীন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি, চাঁদনি ঘাটের সিঁড়ি, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, আবঙ্গির পাহাড় প্রভৃতি পরিদর্শনের জন্য। কিন্তু তাদের সেসব পরিদর্শনের আগে ইসলামের এসব নিদর্শন স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে নসীহত গ্রহণ করা উচিত। সেই সাথে হযরত শাহজালাল ও শাহ পরান (রহ.)-এর কবর যিয়ারত (কবর বা মাজার পূজা নয়) সহীহভাবে করে তাদের ইসলামের খিদমতকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করতে পারেন।

এভাবে শাহজালার রহ.-এর পুণ্যভূমি ওলীয়ে আল্লাহ-গণের বরকত-পরশিত সিলেটের মাটিতে ইসলামের উদ্ভাসিত আলোর পরিস্ফুটিত সমীরণ আমাদেরকে বিমোহিত করে। সিলেটে তিনদিন অবস্থানের মাধ্যমে আমরা ইসলামী জাগরণের নতুন এক অমিয় অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। আলহামদুলিল্লাহ।