হান্নান শাহ; সৈনিক থেকে যেভাবে হয়ে উঠলেন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

2016-09-27_123835

হান্নান শাহ (জন্ম: ১৯৪১ – মৃত্যু: ২০১৬)


১/১১ এর কঠিন সময়ে খালেদা জিয়ার পাশে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আসম হান্নান শাহ আর নেই। সিঙ্গাপুরের রাফেলস হার্ট সেন্টারে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। গত ১১ সেপ্টেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হৃদরোগে আক্রান্ত আসম হান্নান শাহকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পর তার হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার (এনজিওপ্লাস্ট) করে হৃদযন্ত্রের ধমনীতে চারটি রিং পরানো হয়েছিল।

বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের সামরিক জীবনের মতোই রাজনৈতিক জীবনও ছিলো বর্ণাঢ্য।

১৯৪১ সালের ১১ অক্টোবর গাজীপুরের কাপাশিয়ার ঘাগটিয়া গ্রামে জন্ম নেন হান্নান শাহ। তার বাবা ফকির আবদুল মান্নান ১৯৬৫-৬৮ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তার ছোট ভাই শাহ আবু নঈম মোমিনুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নীতি নির্ধারক পর্যায়ের এই নেতা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

হান্নান শাহ (3)হান্নান শাহ ১৯৬২ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন। এরপর তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিগ্রেড কমান্ডার, চট্টগ্রামের মিলিটারি একাডেমির কমান্ডেন্ট, যশোর ‘স্কুল অব ইনফ্রেন্টি এন্ড টেকটিক্স’ এর চিফ ইন্সট্রাক্টর,পাকিস্তানের কোয়েটার আর্মি কলেজ অব ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইন্সট্রাক্টরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন হান্নান শাহ।

১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপদ গামী সেনা সদস্যার হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রাঙ্গুনিয়া থেকে শহীদ প্রেসিডেন্টের মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসেন বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ।

এইচ এম এরশাদ সরকার হান্নান শাহকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। সে সময় তিনি সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এপিডি) ও বিএডিসি‘র চেয়ারম্যানও ছিলেন। ১৯৮৩ সালে বিএডিসির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন হান্নান শাহ।

রাজনৈতিক জীবনে শুরুতে ১৯৮৩ সালে হান্নান শাহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক, ১৯৮৬-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) এবং ১৯৯৩-২০০৯ সাল পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যের দায়িত্ব পালন করে।

১/১১ এর কঠিন সময়ে খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে আ স ম হান্নান শাহ বিএনপির তৃনমূল নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও দলের সংস্কারপন্থি অংশের ‘কর্মকাণ্ড’ ও ‘ষড়যন্ত্র’ এর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের সামনে এসে সাহসী কণ্ঠে কথা বলে দেশ-বিদেশে দলের নেতা-কর্মীদের দৃষ্টি কাড়েন তিনি।

জনসম্মুখে দলীয় কাজ করতে না পারলেও টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে সারাদেশে কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন। এছাড়া এক এগারোর দুই বছর মিডিয়াতে হান্নান শাহের ছিল বিএনপির পক্ষে সরব উপস্থিতি।

একদিকে বিএনপির সাবেক মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূইয়া যখন সংস্কারবাদি হিসেবে দল থেকে আলাদা ধারা তৈরি করেছিলেন তখন হান্নান শাহ মূলত মিডিয়ার মাধ্যমে সংস্কারবাদিদের বিভিন্ন পদক্ষেপের জবাব দিয়ে গেছেন।

বেগম খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার দিন দলীয় মহাসচিব বদলসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বেগম জিয়ার পক্ষে জাতীর সামনে তুলে ধরেছিলেন হান্নান শাহ।

২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে আ স ম হান্নান শাহ সবোর্চ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ষষ্ঠ কাউন্সিলেও তিনি এই পদে পূর্ণনির্বাচিত হন।

দুইবার গাজীপুর-৪ আসন (কাপাসিয়া) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হান্নান শাহ। খালেদা জিয়ার সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী ছিলেন তিনি।

স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে আ স ম হান্নান শাহ কয়েকবার কারাগারে যান। একইভাবে বর্তমান সরকারের আমলেও তাকে কয়েকবার কারাবাস করতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ৩০টিরও বেশি মামলা রয়েছে।