জানুয়ারি ১৯, ২০১৭

মুন্নি সাহাদের দুরভিসন্ধি কখনো সফল হবে না: মুফতী শামসাবাদী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%ab%e0%a6%a4%e0%a7%80-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী

সম্প্রতি এটিএন নিউজের বার্তা প্রধান মুন্নি সাহা কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, কওমি মাদরাসাগুলো দেশের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত। কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীরা দেশ ও দেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তারা দেশের ‘জাতীর পিতার’ নাম জানে না, তারা স্বাধীনতা দিবস কবে জানেনা, ইত্যাদি। বিশেষ করে মুন্নি সাহা তার প্রতিবেদনে দেখানোর চেষ্টা করেছে, আমাদের দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে জাতীয় পতাকা উড়ানো হয় না, শিক্ষার্থীদের দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানো হয় না।

মুন্নি সাহার করা লাগামহীন এইসব অভিযোগের বিষয় ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিলো দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ইসলামী ম্যাগাজিন মাসিক আদর্শ নারী’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, ইসলামী পত্রিকা পরিষদের সভাপতি, মাদরাসা খাতুনে জান্নাতের প্রিন্সিপাল ও বাংলাদেশ নূরানী তা’লীমুল কুরআন ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট-এর পরিচালক মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদীর কাছে।


মুন্নি সাহার এসব কর্মকাণ্ডকে ‘কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে চক্রান্ত’ মন্তব্য করে মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী বলেন, ‘তার (মুন্নি সাহা) করা প্রতিবেদন দেখলে বুঝা যায়, তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কওমী মাদরাসাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের কোন মিশনে নেমেছেন। কওমী মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকারী সরলমনা ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও অধ্যয়নরত কোমলমতি অবুঝ শিশুদেরকে অবাঞ্ছিত প্রশ্নবানে জর্জরিত করার দ্বারাই তার সেই হীন উদ্দেশ্য ফুটে উঠেছে।

তিনি কওমী মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা জনৈক মুসল্লীকে সরাসরি কোণঠাসা করে বলেন, আপনারা মাদরাসা কেন প্রতিষ্ঠা করলেন, স্কুল বানালেন না কেন! এ ধরনের প্রশ্ন তারাই করতে পারে-মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় যাদের গা জ্বালা ধরে।

আবার মুন্নি সাহা কওমী মাদরাসার এক প্রাথমিক ক্লাসের ছাত্রকে প্রশ্ন করেন, তোমাকে যদি মাদরাসা থেকে নিয়ে স্কুলে ভর্তি করি, তাহলে তুমি কি যাবে? সে ছাত্র জবাবে বলে, না, যাবো না। তখন মুন্নি সাহা বলেন, কেন যাবে না? মগজ ধোলাই করা হয়েছে!

এ কেমন নৃশংস সাংবাদিকতা যে, একজন মাদরাসার ছাত্রকে তার শিক্ষা থেকে হটাতে প্ররোচনা দেয়! আবার তার শিক্ষার অধ্যবসায়কে মগজ ধোলাই বলে অভিহিত করে। কট্টর মাদরাসা শিক্ষাবিরোধী না হলে এমনটি কেউ করতে পারে না।

আর কোন বিষয়ে মনে বিদ্বেষ রেখে সে ব্যাপারে প্রতিবেদন করার কারো ইখতিয়ার নেই। কেননা, সেক্ষেত্রে তার প্রতিবেদন পক্ষপাতদুষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যদি সেটাকে সে তার ধর্মের প্রতিপক্ষ মনে করে (যেরূপ ভিনধর্মী মুন্নি সাহার কীর্তিকলাপে মনে হয়), তখন তার এ ব্যাপারে কিছু বলারই অধিকার থাকতে পারে না।

এ জন্য স্বভাবতঃই মুন্নি সাহা তাদেরকে সেরূপ প্রশ্নই করেছেন, যা দ্বারা শুধুই জব্দ করা যায়। মৌলিক তথ্য সংগ্রহ বা বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট উদ্দেশ্য নয়।’2016-09-26_135248

সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত কিছু প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মুফতী শামসাবাদী বলেন, ‘এ ধরনের প্রশ্ন তো কিছুদিন আগে একাধিক টিভি চ্যানেলের পক্ষ থেকে পরিচালিত জরিপে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরকেই করা হয়েছিলো। কিন্তু তারাই সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি।

সেখানে মাদরাসা নিয়ে কথা বলার কী আছে! মাই টিভি, সময় টিভি প্রভৃতি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকবৃন্দ সেসব স্কুল-কলেজের বেশকিছু উপরের লেবেলের ছাত্র-ছাত্রীকে দেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারী প্রভৃতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন।কিন্তু তারা অনেকে জানে না বলে এবং অনেকে উল্টাপাল্টা হাস্যকর কথা বলে জবাব দেয়।

যেমন, সময় টিভির সাংবাদিক এক স্কুলছাত্রীকে প্রশ্ন করেন-২১ ফেব্রয়ারী কী? উত্তরে সে বলে-তা বলতে পারবো না। এরপর জিজ্ঞেস করা হয়, কী হয়েছিলো সেদিন? সে উত্তর দেয়-যুদ্ধ হয়েছিলো। আর স্কুল-কলেজের অন্য অনেকে উত্তর দেয়, সেদিন কী হয়েছিলো, সেটা ঠিক বলতে পারবো না। আবার আরেকজন উত্তর দিয়েছে, ৭-৮ মাস যুদ্ধ করার পর আমরা ২১ ফেব্রুয়ারী পেয়েছি। ২১ ফেব্রুয়ারীকে আমরা কেন পালন করি, এর উত্তর একজন বলেন, এদিন আমাদের অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন। তাই শোক হিসেবে এদিন পালন করি। আরেক ছেলে বলেছে, ২১ ফেব্রুয়ারী আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছিলো। এটা স্বাধীনতা দিবস। সূত্র 
ওদিকে মাই টিভির সাংবাদিকের “২১ ফেব্রুয়ারী কী হয়েছিলো? এ প্রশ্নের উত্তরে স্কুলের উপরের ক্লাসের এক শিক্ষার্থী জানায়, এদিন লাখো শহীদ প্রাণ দিয়েছিলো।

আবার মাছরাঙ্গা টিভির প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে-জিপিএ ফাইভ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী জানে না, জিপিএ মানে কী? এসএসসি-এর পূর্ণাঙ্গ রূপ কী–এটাও জানে না। তেমনি এক জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করা হয়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কবে? সে উত্তর দেয়, জানি না। আরেক পরিণত বয়সের স্কুলছাত্রকে প্রশ্ন করা হয়, স্বাধীনতা দিবস কবে? সে উত্তর দেয়, ১৬ ডিসেম্বর। আরেক জিপিএ ফাইভ পাওয়া স্কুলছাত্রকে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতির নাম কী? সে উত্তরে বলে, জানি না।’ সূত্র

তাই এ ধরনের প্রশ্ন দিয়ে মাদরাসা ছাত্রদেরকে মাপা যাবে না উল্লেখ করে মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী বলেন,  ‘বরং মাদরাসার ছাত্রদের বেসিক বিষয় নিয়ে তাদের মূল্যায়ন করা যাবে।

তাই বলি, মুন্নি সাহার যদি মৌলিক তথ্য সংগ্রহ উদ্দেশ্য হতো, তাহলে মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতাগণকে তিনি এভাবে প্রশ্ন করতেন, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে আপনারা কী সুফল প্রত্যক্ষ করছেন? মাদরাসায় যেভাবে দ্বীনী নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হয়, স্কুলে সেভাবে দেয়া হয় না, এ ব্যবধানের ব্যাপারে আপনারা কী বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন? এভাবে প্রশ্ন করলে তখন মাদরাসা শিক্ষার সুফল জনসম্মূখে প্রকাশ পেত এবং সেই রিপোর্ট তার মৌলিকতা রক্ষা করতো।

অপরদিকে মাদরাসার কচি ছাত্রকে তার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন করাই যুক্তিযুক্ত ছিলো যে, তুমি এখানে কী কী পড়ছো? এখানে শিক্ষা অর্জন করে সততা, বিশ্বস্ততা ও দ্বীনদারীকে কতটুকু মেনে চলছো? যে বয়সে বাড়ীতে থাকা শিশুরা হৈহুল্লোড় ও দুষ্টুমিতে সময় পার করে, সে বয়সে তুমি মাদরাসায় পড়ে নামায পড়ছো, দ্বীনের পাবন্দী করছো-এটা তোমার কাছে কেমন লাগে? এমন করে প্রশ্ন করা হলে মাদরাসা শিক্ষার মূল্যবোধকে সামনে আনা হতো।

কিন্তু মুন্নি সাহা তাদেরকে সে ধরনের বেসিক প্রশ্ন না করে ভিন্ন পথে গিয়ে ওপেন কৃটিসাইজ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। যা বড়ই দুঃখজনক।’

কওমী মাদরাসায় জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়া, জাতীয় পতাকা না উড়ানোর বিষয় যে অভিযোগ উঠেছে, সে প্রসঙ্গে মুফতী শামসাবাদী বলেন, ‘মুন্নি সাহার তো জানা থাকার কথা যে, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বিধিতে বলা হয়েছে : “সব স্কুলের দিনের কার্যক্রম জাতীয় সংগীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে।” এ বিধিতে কওমী মাদরাসার জন্য জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বলা বাহুল্য, কওমী মাদরাসা শিক্ষা তার নিজস্ব স্বক্রিয়তায় সমৃদ্ধ। মসজিদ যেমন ইবাদতের স্থান, তেমনি কওমী মাদরাসা ইবাদত সহীহভাবে করার পথ-পদ্ধতির শিক্ষাকেন্দ্র। সুতরাং যেমনিভাবে মসজিদে কখনো কোনরূপ সঙ্গীত-বাদ্য হয় না। তা ইসলামের হুকুমের সাথে সাংঘর্ষিক বলে হওয়া উচিতও নয়। এ হিসেবেই স্কুলগুলোতে চারুকলা শিল্পের মতো গান-বাদ্যের চর্চা থাকলেও কওমী মাদরাসাগুলোতে কোনরূপ চারুকলা কিংবা সঙ্গীত বা গান-বাদ্যের চর্চা হয় না।

তা ছাড়া দেশের বহু স্কুল-কলেজে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বা জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা নেই।তাহলে এ নিয়ে বিশেষভাবে কওমী মাদরাসার উপর অভিযোগের খড়গ পড়বে কেন!

কওমী মাদ্রাসা সুনাগরিক গড়ার কারখানা, এমন দাবি করে মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী বলেন, ‘কওমী মাদরাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষিতদের দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত। তারা দেশবিরোধী কোন তৎপরতার সাথে কখনো জড়িত হয় না। তেমনি তারা কোন অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয় না-যা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে। সুতরাং তা-ই প্রমাণ করে, কওমী মাদ্রাসা সুনাগরিক গড়ার কারখানা। এই নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষদের প্রতি অন্যায় কালিমা লেপনে মুন্নি সাহাদের দুরভিসন্ধি কখনো সফল হবে না।