সুলতান এরদোগান; নতুন তুরস্কের মহানায়ক | insaf24.com

সুলতান এরদোগান; নতুন তুরস্কের মহানায়ক

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | বেলায়েত হুসাইন


২৬ ফেব্রুয়ারিতে ৬৫ পেরিয়ে ৬৬ বছরে পা রেখেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। ৬৫ তম জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি। ভক্ত, শুভানুধ্যয়ীদের শুভেচ্ছোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে এরদোগান বলেছেন, আমি আপনাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা এক ভিডিওবার্তায় এরদোগান বলেন,আমার প্রিয় দেশবাসি, আজ আমি ৬৫ বছর বয়স অতিক্রম করছি। এ খুশির দিনে যারা আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, তাদের সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জীবনের এ দীর্ঘ পথচলায় আপনাদের সেবা করার যে সুযোগ আমি পেয়েছি,তা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ ছাড়া কিছু নয়। মানবসেবার এ পথচলায় কখনও আমি আপনাদের একাকী ছেড়ে দেবো না। আল্লাহ তায়ালা আপনাদের সুস্থ ও নিরাপদে রাখুক।

রজব তাইয়েব এরদোগান ১৯৫৪ ঈসায়ী সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ইস্তাম্বুলের কাশিমপাশায় ‘জুরজু’ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর শৈশব কেটেছে কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে। তার বয়স যখন ১৩, তখন আবার ফিরে আসেন ইস্তাম্বুলে। এরদোগানের পরিবার ছিল দরিদ্র ও অসহায়। তিনি বেড়েও উঠেছেন এই সীমাহীন দরিদ্রতার ভিতর দিয়ে। তাঁর ছোটবেলার অবস্থা তিনি নিজেই বর্ণনা করেন এক সমাবেশে।
তিনি বলেন, “আমার সামনে তখন তরমুজ ও শরবৎ বিক্রি করা ছাড়া আর কোন পথ ছিল না। যা দিয়ে আমি আমার আব্বাকে সাহায্য করতাম। এবং এটা দিয়েই আমার প্রাথমিক শিক্ষার খরচ যোগাড় করতে হতো।”

তাঁর প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা ‘ইমাদ আল খতীব’ নামক মাদরাসায় সমাপ্ত হয়। এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৯৭৩ সালে তিনি কোরআনে কারীমের হিফজ সম্পন্ন করেন।

অতপর তিনি তুরস্কের প্রসিদ্ধ ‘মারমারাহ ইউনির্ভাসিটি’ তে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক বিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। কিন্তু প্রাসঙ্গিক শিক্ষা তিনি অর্জন করেন মাদরাসা থেকেই।

তুরস্কের একটি মাদরাসার পক্ষথেকে দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, “যখন বাল্যকালে আমি মাদরাসায় পড়তে যেতাম তখন আমার এলাকার কিছু মানুষ আমাকে বলতেন, বেটা! কেন তোমার ভবিষ্যত খারাপ করছো? তুমি কি বড় হয়ে মুর্দাকে গোসল করানোর কাজ বেছে নিবে? মাদরাসার ছাত্রদের গোসল করানো ছাড়া আর কি কোনো কাজ জোটে? তাই বলছি কোনো ভালো স্কুলে ভর্তি হয়ে নিজের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করার প্রয়াসী হও”।

তিনি বলেন, আমাকে যারা এরূপ উপদেশ দিতেন তারা বেশীর ভাগই বয়স্ক-বৃদ্ধ হতেন। তাই আমি তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বগলে বই দাবিয়ে “মাদরাসা ইমাদ আল খতিব” এর পথে হাঁটা দিতাম। এখন আমি আল্লাহর রহমতে তুর্কি জাতির খেদমতে আছি।

প্রেসিডেন্ট এরদোগান শৈশবে তার পরিবারের অসচ্ছলতার বর্ণনা দেন এভাবে: আমার পিতা একজন ফল বিক্রেতা ছিলেন। সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না। কোনো কোনো দিন ‘তরকারীর’ পরিবর্তে ‘তরমুজ’ দিয়ে রুটি খেতে হতো।

পারিবারিক জীবন: তিনি যেমন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, ঠিক তেমনি তিনি তার স্ত্রী (আরবীয় রমণী আমেনা,বিবাহঃ১৯৭৮ খৃষ্টাব্দ) এর নিকট একজন আদর্শ স্বামী, এবং তার সন্তানদের খুব প্রিয় বাবা। প্রেসিডেন্ট ‘এরদোগান’ তাঁর স্ত্রী ও তিনকন্যাকে নিয়ে তুরস্কের বর্তমান রাজধানী আঙ্কারায় বসবাস করেন।

রাজনৈতিক জীবন: আজকের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ‘এরদোগান’ বাল্যকাল থেকেই তুরস্কের হারানো সমুজ্জ্বল অতীত নিয়ে গভীর আফসোস করতেন। একসময় উসমানী সাম্রাজ্যের (১২৯৯-১৯২৪) রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের(ইস্তাম্বুল) শাসনাধীন তুরকিস্তানের যে ইসলামী খেলাফত বিস্তৃত ছিলো। সেটা ইহুদি ও ইউরোপীয় ষড়যন্ত্রের ফলে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে সারা পৃথিবীর একমাত্র ইসলামী খেলাফত ধ্বসে পড়ে। পরবর্তীতে বলকান ও মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যের সাবেক অংশগুলোর প্রায় ৪২টি অংশ নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

মূলত, ১৯০৮ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরি কতৃক দখল হবার পরেই খেলাফত ব্যবস্থা দুর্বল হতে শুরু করে এবং আরো পরে বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর মতো অঞ্চলগুলি তুরকিস্তান থেকে হাতছাড়া হলেই মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে ১৯২৪ সালে কথিত আধুনিক তুরস্কের সূচনা হয়। আর এ সময়েই তিনি কলমের সামান্য এক খোঁচায় উসমানী সাম্রাজ্যের ইসলামি খেলাফত বিলুপ্তির প্রাথমিক ঘোষণা দেন।

মোস্তফা কামাল পাশা (আতাতুর্ক) তুরস্ককে ইউরোপের একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পূর্ববর্তী ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি – যা উসমানী খেলাফতের দীর্ঘ ৬০০ বছরের অধিককাল যাবত তুরকিস্তানের আপামরজনসাধারণের রক্তেমাংসে বদ্ধমূল ছিলো-ধীরেধীরে এর মূলোৎপাটন আরম্ভ করে।
মেয়েদের জন্য বোরকার পরিবর্তে শর্ট স্কার্ফ পরিধান করা , তুরকি বর্ণমালায় আরবি অক্ষর বাদ দিয়ে ইংরেজি অক্ষরের সন্নিবেশ ঘটানো থেকে শুরুকরে আরবিতে আযান দেওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয় কামাল কতৃক শাসিত আধুনিক তুরস্কে।
শাব্দিকঅর্থে, মোস্তফা কামাল পাশা আধুনিক তুরস্ক বাস্তবায়নের যে রূপরেখা এঁকে যাচ্ছিলেন তা ইউরোপীয়দের লাজ রক্ষা করা এবং নিজের ক্ষমতা দৃঢ় ও অধিক সুসংহত করার মানসে করছিলেন।
আজকের প্রেসিডেন্ট ‘এরদোগান’ তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী ভবিষ্যৎ এবং চোখের সামনের এমন বর্তমানের মাঝে কোন মিল খুঁজে পেতেন না। তাই তিনি বাল্যকাল থেকেই স্বপ্ন দেখতেন তুরস্ককে তিনি তুরকিস্তানের পথে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। এজন্য তিনি বিভিন্ন সময়ে একাধিক রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হন।

৭০ এর দশকে ‘এরদোগান’ নাজিমুদ্দিন আইবেকানের নেতৃত্বে “হিজবুল খালাসিল ওয়াতানি” দলে যোগ দেন। কিন্তু ১৯৮০সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর তুরস্কের সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৮৩ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে এরদোগান “হিজবু রাফাহ”এ যোগ দেন।
১৯৯৪সালে “হিজবুর রাফাহ”র পক্ষ থেকে ইস্তাম্বুলের মেয়র প্রার্থীর মনোনয়ন পান। এবং বিজয়ও লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে ধর্মীয় উগ্রতার(!) অভিযোগে তাঁকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি,এক রাজনৈতিক সমাবেশে কিছু ইসলামি কবিতা পাঠ করার কারণে এমন একজন সৎ, যোগ্য ও জনপ্রিয় নগরপতিকে “কামালবাদী” সামরিক বাহিনীর আদালতের বিচারে কারাগারে যেতে হয়।

তুর্কি ভাষার কবিতাগুলোর অনুবাদ এরকম, “মসজিদ আমাদের ব্যারাক। গম্বুজ আমাদের হেলমেট। মিনার আমাদের বেয়নেট। মুসল্লিরা আমাদের সৈনিক এবং এই পবিত্র দল পাহারা দিবে আমাদের দীনকে।
( এই কবিতার মধ্যে ধর্মীয় উসকানি ও “কামালবাদ”-এর প্রতি অবমাননার গন্ধ পায় সেক্যুলার শাসকরা।) যদিও কবিতাটি শিক্ষামন্ত্রণালয় অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

দীর্ঘ ১০ মাস কারাজীবন ভোগকরার পরে “এরদোগান”মুক্তি লাভ করেন। তারপর, তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজেই একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করবেন, এরই ফলশ্রুতিতে ২০০১ সালে তার হাতে জন্ম নেয় নতুন রাজনৈতিক দল “একে পার্টি “(জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা একেপি)।

প্রতিষ্ঠার অল্প দিনের মধ্যেই দলটি জনসমর্থনের মাধ্যমে এক নম্বর অবস্থানে চলে আসে। দলটি ১৯৮৪ সালের পর প্রথমবার তুরস্কের ইতিহাসে একদলীয় দল হিসেবে এবং পরপর ৫ বার (২০০২, ২০০৭, ২০১১,২০১৪, ২০১৮) সাংসদীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়। রাষ্ট্রপতি হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ক্ষমতাসীন এই দলের সভাপতি ও প্রধান দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবং ২০০৩ -২০১৪ পর্যন্ত তিনি একেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্বও অত্যন্ত সুনাম ও সফলতার সাথে পালন করেন।
অতঃপর, ২০১৪ সালে তিনি তুরস্কের ১২ তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথগ্রহণ করেন।

একে পার্টির হাত ধরেই ‘এরদোগানে’র সামনে এগিয়ে যাওয়া:
‘এরদোগান’ প্রতিষ্ঠিত একেপি ক্ষমতা লাভের পর থেকে তুরস্কের আকাশে এক নতুন সূর্যের অভ্যুদয় ঘটে এবং দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দাভাবসহ ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক শৃঙ্খলা ফিরে আসে এবং তুরস্ক ধীরেধীরে স্থায়ী ও টেকসই উন্নতির পথে অগ্রসর হতে শুরু করে। বিশেষকরে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বানিজ্যিক প্রবেশাধিকারের চুক্তি, বিগত দশবছর ধরে চলাকালীন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও তুর্কি লিরার (তুর্কি মুদ্রা) মুল্য পুনর্নিধারণ, সুদের হার কমানো, অতীতে উসমানী শাসনাধীন দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, বিশ্বমহলে নেতৃস্থানীয় ও সৌহার্দ্যপুর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তিকে মুল লক্ষ্য রেখে বৈদেশিক নীতি গ্রহণ, বিরোধী বিক্ষোভকারীদের সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও তাঁর দল একেপি ক্ষমতা পেলে তুরস্কের রাস্তাঘাটের পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক উন্নতি ঘটে।
বসফরাস প্রণালীর উপর তুরস্কের সবথেকে আকর্ষণীয় এবং সারা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ব্রিজের কাজ সম্পন্ন হয় একেপি সরকারের আমলেই। এবং তুরস্কের সাথে বহির্বিশ্বের ভিসাগত যে জটিলতা ছিলো ‘এরদোগান’ প্রধানমন্ত্রী হবার পরে সব সমস্যার সমাধান ঘটান ইসলামপ্রিয় এবং জনপ্রিয় এই নেতা।
আর ‘কামাল আতাতুর্কে’র স্যেকুলার সরকার কতৃক নিষিদ্ধ হওয়া আরবি ভাষার পরিবর্তে তুরকি ভাষায় আযানের যে প্রচলন ছিলো সে আইন সংশোধন করে পুনরায় আরবি ভাষায় আযানের অনুমোদন করে একেপি সরকার। এরফলে ধর্মীয় মহলে এবং বিশেষকরে মুসলমানদের নিকট দলটি আরো বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে।

এরূপ নানাধরনের কল্যাণকর কাজের জন্য ‘ এরদোগান’ যেমন তুরস্কের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, ঠিক তদ্রূপ এই দল তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে।’


ইনসাফ সাংবাদিকতা কোর্স

ইনসাফ সাংবাদিকতা কোর্সদেশের প্রথম ইসলামী ঘরানার অনলাইন পত্রিকা ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আয়োজনে শুরু হতে যাচ্ছে স্বল্পমেয়াদী সাংবাদিকতা কোর্স।অংশগ্রহণ করতে যোগাযোগ করুন এই নাম্বারে-০১৭১৯৫৬৪৬১৬এছাড়াও সরাসরি আসতে পারেন ইনসাফ কার্যালয়ে।ঠিকানা – ৬০/এ পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০।

Posted by insaf24.com on Monday, October 29, 2018