ভারতের দেওবন্দের মত করে স্বীকৃতি দিলে আমরা নেবো: আল্লামা শফী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

unnakmed-4

দেশের শীর্ষ আলেম শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক)সহ দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক কওমি বোর্ডসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দের এক বৈঠক আজ (৩ অক্টোবর) সোমবার দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসায় মহাপরিচালকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক), হবিগঞ্জ দ্বীনি শিক্ষাবোর্ড, ইত্তেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া মুন্সীগঞ্জ, ইত্তেহাদু উলামা-ই-মাদারিসিল কওমিয়া ভোলা, তানযীমুল মাদারিস ফেনী, তালীমী বোর্ড মাদানী নগর, এদারায়ে তা’লিমিয়া বি-বাড়ীয়া ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম মহিলা মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড সভাপতি ও প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন।

বৈঠকে বেফাক সভাপতি দেশের শীর্ষ আলেম শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, কওমী মাদ্রাসাসমূহ দারুল উলূম দেওবন্দের উসূল তথা নীতি-আদর্শ মতে পরিচালিত হয়। সনদের ইস্যুসহ যে কোন বিষয়ে দেওবন্দের নীতি-আদর্শের পরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ যেভাবে পরিচালতি হয়, সনদের বিষয়ে দারুল উলূম দেওবন্দের নীতিমালা যেরকম, আমরা সেভাবে চলতে চাই। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ সে দেশের সরকারের সাথে কোনরূপ নিয়ন্ত্রণমূলক ও দাপ্তরিক সম্পর্ক ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের শিক্ষাক্রমসহ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতদসত্ত্বেও হিন্দু অধ্যুষিত একটা দেশের সরকার স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেওবন্দসহ অন্যান্য কওমি মাদ্রাসার সনদকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে। ভারতের কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা আর্ধ্বেক ভাড়া দিয়ে যাতায়াতসহ সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রদেয় সকল সুবিধা ভোগ করছেন।

তিনি বলেন, হিন্দু অধ্যুষিত একটা দেশে উলামা-মাশায়েখ ও মাদ্রাসা ছাত্ররা কোন ধরণের সরকারী নিয়ন্ত্রণ ও বিধির আওতায় যাওয়া ছাড়াই যদি বিশেষ মর্যাদা ও সুবিধা পেয়ে থাকেন, এ পর্যায়ে আমাদের সরকারের কাছে জিজ্ঞাসা, তারা বৃহৎ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্যে ন্যুনতম ভারত সরকারের মতো মর্যাদা ও সুবিধা দিচ্ছেন কি?

তিনি বলেন, বেফাকসহ দেশের অন্যান্য কওমি বোর্ড ও বড় বড় মাদ্রাসা দাওরায়ে হাদীস উত্তীর্ণ ছাত্রদেরকে সনদ দিয়ে থাকে। এসব সনদকে দারুল উলূম দেওবন্দের মতো ‘মান’ দেওয়ার প্রশ্নে কওমি নীতি-আদর্শ শতভাগ অক্ষুণ রেখে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্যে আগামী ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের মতো আমাদের সনদের মান দিতে সরকার রাজি না হলে, ইংরেজ শাসনামল থেকে বিগত দুইশত বছরেরও অধিক সময়কাল কওমি মাদ্রাসাসমূহ জনগণের সাহয্য-সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে যেভাবে চলে আসছে, সেভাবে চলবে।

বৈঠকে বেফাক সভাপতি সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সর্বাবস্থায় আলেম সমাজের ঐক্যকে আরো মজবুত করার প্রতি লক্ষ্য ও যত্নবান হতে হবে। ছোটখাটো মতভেদ নিয়ে কেউ কারো পেছনে কটূক্তিমূলক কথা বলবেন না। আমাদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে বৃহৎ পরিসরে দৃঢ় করার জন্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যারা বুঝতে চাইবেন না, তাদেরকে বুঝানোর জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

বৈঠকে বক্তব্য রাখেন বেফাক সহ-সভাপতি আল্লামা আশরাফ আলী, আল্লামা তফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী, আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী, আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী, আল্লামা আনওয়ার শাহ, মাওলানা মুফতী ওয়াক্কাস, মহাসচিব মাওলানা আব্দুল জাব্বার জাহানাবাদী, মাওলানা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস ফরিদাবাদ, মাওলানা হাফেজ নূরুল ইসলাম, মাওলানা আনাস ভোলা, মুফতী হাবীবুর রহমান ফেনী, মুফতী ফয়জুল্লাহ, মুফতী মাহফুজুল হক, মাওলানা সাজেদুর রহমান বি-বাড়ীয়া, মুফতী মিযানুর রহমান সাঈদ, মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবীব, মাওলানা হাফেজ তাজুল ইসলাম, মাওলানা ইদরিস নাজিরহাট, মাওলানা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মাওলানা জুবায়ের আহমদ, মুফতী বশীরুল্লাহ মাদানী নগর, মুফতী নূরুল আমীন, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস আরজাবাদ, মুফতী আবু ইউসুফ, মুফতী রেজাউল করীম, মাওলানা আহমদ উল্লাহ প্রমুখ।

বৈঠকে বেফাকসহ অন্যান্য বোর্ড নেতৃবৃন্দ একমত পোষণ করে বলেন, আগামী ১৭ অক্টোবর জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে কওমি মাদ্রাসাসমূহের দাওরায়ে হাদীসের সনদকে ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের মতো মান দেওয়ার প্রশ্নে সকলের মতামত ও পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তারা বলেন, জনগণের সাথে উলামা-মাশায়েখ ও কওমি মাদ্রাসার গভীর সম্পর্ক বিনষ্ট করার জন্যে দেশী-বিদেশী ইসলাম বিদ্বেষী চক্র গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা উলামায়ে কেরামের ঐক্যকে বিনষ্ট করতে বিভিন্ন কূটকৌশল ও ফাঁদ পাতছে। কওমি শিক্ষার প্রতি জনগণের ভুল ধারণা তৈরীর উদ্দেশ্যে বক্তৃতা-বিবৃতি ও মিডিয়ার মাধ্যমে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। ভুল ও আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিতে সহজ-সরল উলামায়ে কেরামকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করছে। এ ব্যাপারে আমাদের সকলকে বিচক্ষণতার সাথে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। নেতৃবৃন্দ সকলের বক্তব্যেই এটা ছিল যে, ‘সনদসহ যে কোন বিষয়ে ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের নীতি-আদর্শের বাইরে এক কদমও পা রাখা যাবে না। অন্যথায় আমাদের যে কোন ভুলের জন্যে ভবিষ্যত প্রজন্মসহ গোটা জাতির কাছে আমাদেরকে জবাবদেহি হতে হবে’।

বৈঠকে তিনটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

১। ৩ অক্টোবরের বৈঠকে অনুপস্থিত কয়েকটি বোর্ড নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ ও আলোচনার জন্যে ৯ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটি গ্রহণ করা হয়। সদস্যগণ হলেন- মাওলানা আশরাফ আলী, মাওলানা তফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী, মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, মুফতী মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, মাওলানা আব্দুল জাব্বার জাহানাবাদি, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, মাওলানা লোকমান, মুফতী মিজানুর রহমান ও মাওলানা মাহফুজুল হক।

২। দাওরায়ে হাদীসের সনদের মানসহ কওমি মাদ্রাসার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর লিখিত বক্তব্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তরের জন্যে ৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নির্ধারণ করা হয়। তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগের মাধ্যমে শিডিউল নির্ধারণ করে দ্রুত সময়ের মাধ্যমে এই লিখিত বক্তব্য হস্তান্তরের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

৩। আগামী ১৭ তারিখ জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলন সফল করার লক্ষ্যে যার যার অবস্থান থেকে গুরুত্বের সাথে কাজ করার বিষয়ে তৎপর হওয়ার জন্যে বলা হয়।

সবশেষে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর দোয়া পরিচালনার মাধ্যমে বৈঠক শেষ হয়। বৈঠক শেষে নব-গঠিত লিয়াজোঁ কমিটি আল্লামা আব্দুল হালিম বুখারী ও সুলতান যওক নদভীর সাথে আলোচনা করার জন্যে পটিয়া ও দারুল মাআরিফ মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।