জানুয়ারি ২৩, ২০১৭

কওমি বিরোধী অপতৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে: আল্লামা শফী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

untidtled-1বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও বেফাক সভাপতি শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতি বহাল করে স্কুল কলেজসহ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মহীনতা ও নাস্তিক্যবাদি ধ্যানধারণার শিক্ষা কায়েম করার পর কার্যতঃ এখন ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, স্বাভাবিকভাবে কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করা শিক্ষিত তরুণ আলেমদের প্রাপ্ত সনদের সরকারী মান থাকার একটা ন্যায্য অধিকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কওমি আলেমদেরকে আদর্শচ্যুত করা, মাদ্রাসাসমূহের স্বাধীন শিক্ষাক্রম পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং নানা বিভ্রান্তিকর প্ররোচণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানসমূহের আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিনষ্ট ও আলেমদের মধ্যে বিভক্তি আনার নানা তৎপরতা চলছে। আলেম সমাজ ও তৌহিদী জনতাকে যে কোন অপতৎপরতা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, দেশের আলেম সমাজের ঐক্যকে আরো জোরদার করার পাশাপাশি বিচক্ষণতার সাথে দেওবন্দী মসলক তথা নীতি-আদর্শে অটল অবিচল থাকাটাই বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর ইচ্ছায় ষড়যন্ত্রকারীরা কখনোই সফল হবে না।

আজ সকাল ১০টায় ফেনী জেলার কওমি মাদ্রাসাসমূহের পরিচালক ও শিক্ষকদের নেতৃস্থানীয় ৩০ সদস্যের এক প্রতিনিধি দল কওমি সনদের স্বীকৃতি প্রশ্নে বেফাক সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফীর গৃহীত অবস্থানের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন থাকার কথা জানাতে আসলে তাদের উদ্দেশ্যে তিনি এসব কথা বলেন। কওমি মাদ্রাসার আভ্যন্তরিণ শৃঙ্খলা, শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের গভীর আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধ বিনষ্টের মাধ্যমেও বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরীর ষড়যন্ত্র হতে পারে বলে সতর্ক করে আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, কতিপয় দরবরি আলেমের অপতৎপরতা আমরা লক্ষ্য করছি। এ সম্পর্কে কওমি শিক্ষক-ছাত্র সকলকেই সজাগ থাকতে হবে। তিনি বেফাক নিয়ে যে কোন ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, বেফাক কওমি মাদ্রাসাসমূহের প্রতিনিধিত্বকারী সর্ববৃহৎ ও একমাত্র কেন্দ্রীয় বোর্ড। বেফাকের প্রতিনিধিত্ব দেশব্যাপী রয়েছে। বেফাক নিয়ে যে কোন অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রকারীরা জনগণের কাছে সঠিক ইসলামী শিক্ষার দুশমন বলেই চিহ্ণিত হবে। আলেম সমাজ ও কওমি মাদ্রাসা নিয়ে যে কোন চক্রান্ত প্রতিহত করতে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের পাশে থাকবে।

প্রতিনিধি দলে ছিলেন মাওলানা আবুল কাসেম ভূঁইয়া (পরিচালক- পদুয়া কাসেমুল উলূম মাদ্রাসা), মাওলানা আফজালুর রহমান (সহকারী পরিচালক- শর্শদী মাদ্রাসা), মুফতী রহিমুল্লাহ কাসেমী (মুহাদ্দিস- লালপুল সুলতানিয়া মাদ্রাসা), মাওলানা সাঈদুর রহমান (পরিচালক- কৌশল্লা মাদ্রাসা), মাওলানা শিব্বির আহমদ (মুহাদ্দিস- ওলামা বাজার মাদ্রাসা), মাওলানা আবুল কাসেম (সহকারী পরিচালক- লালপোল সুলতানিয়া মাদ্রাসা), মাওলানা ইউসুফ (মুহাদ্দিস- ফুলগাজী আশরাফিয়া মাদ্রাসা), মাওলানা আবুল কাসেম (মুহাদ্দিস- মহিপাল হোসাইনিয়া মাদ্রাসা), মাওলানা হুসাইন আহমদ (পরিচালক- চকবস্তা এমদাদিয়া মাদ্রাসা), মাওলানা হুসাইন আহমদ উসমানী (সোনাগাজী মাদ্রাসা), মুফতী আবুল কাসেম (সহকারী পরিচালক- ঘাটঘর মুঈনুল উলূম মাদ্রাসা), মাওলানা নূরুল হুদা করীমপুরী (দাগনভূঁইয়া মাদ্রাসা), মাওলানা আব্দুল হাই (পরিচালক- মদীনাতুল উলূম পাঁচগাছিয়া ফেনী), মাওলানা আনোয়ার উল্লাহ, মাওলানা ওমর ফারুক, মাওলানা আব্দুল হান্নান, মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ, মাওলানা আনোয়ার হোসেন, মাওলানা শহীদুল্লাহ, মাওলানা ইকরাম, মাওলানা হারুন প্রমুখ।

কওমী মাদ্রাসার সনদের মান নির্ধারণী ইস্যুতে শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী’র অবস্থান ব্যাখ্যা করে বক্তব্য রাখেন বেফাক সভাপতির প্রেসসচিব মাওলানা মুনির আহমদ। এরপর ফেনী জেলা উলামায়ে কেরামের প্রতিনিধি দলের পক্ষে মাওলানা আবুল কাসেম ভূঁইয়া ও মুফতী রহিমুল্লাহ কাসেমী কওমী সনদ ইস্যুতে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর বর্তমান ও ভবিষ্যযে যে কোন সিদ্ধান্তে গভীর আস্থা ও সর্বাত্মক সর্মথনের কথা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, বেফাক সভাপতির অবস্থানের বাইরে ফেনী জেলার কওমি মাদ্রাসাসমূহ এককদমও পা রাখবেন না। তারা চলমান সনদ ইস্যুকে কওম ও মিল্লাতের বিরুদ্ধে সুগভীর ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করে বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসুদ একের পর এক বিতর্কিত ও ক্ষতিকর কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলেন, কওমি মাদ্রাসা পরিচালনার মুখ্য উদ্দেশ্য রেজায়ে মাওলা বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। সনদ মূল লক্ষ্য নয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেওবন্দের মতো সনদের মান পাওয়া গেলে ভাল। অন্যথায় নেসাবের ক্ষতি করে আমরা সনদের মান অর্জনের তোয়াক্কা করি না।

ফেনী জেলা ওলামায়ে কেরামের প্রতিনিধি দলকে উদ্দেশ্য করে বেফাক সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, গত ৩ অক্টোবর বেফাকসহ আঞ্চলিক কওমি মাদ্রাসা বোর্ডসমূহের প্রতিনিধিদের বৈঠকেও আমি স্পষ্ট করে বলেছি, কওমী মাদ্রাসাসমূহ দারুল উলূম দেওবন্দের উসূল তথা নীতি-আদর্শ মতে পরিচালিত হয়। সনদের ইস্যুসহ যে কোন বিষয়ে দেওবন্দের নীতি-আদর্শের পরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ যেভাবে পরিচালতি হয়, সনদের মান নির্ধারণের বিষয়ে দারুল উলূম দেওবন্দের নীতিমালা যেরকম, আমরা সেভাবেই চলতে চাই। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ সে দেশের সরকারের সাথে কোনরূপ নিয়ন্ত্রণমূলক ও দাপ্তরিক সম্পর্ক ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের শিক্ষাক্রমসহ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতদসত্ত্বেও হিন্দু অধ্যুষিত একটা দেশের সরকার স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেওবন্দসহ অন্যান্য কওমি মাদ্রাসার সনদকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে। অথচ বাংলাদেশ ৯২ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হওয়া সত্ত্বেও কওমি মাদ্রাসার সনদের সরকারীভাবে কোন মান দেওয়া হচ্ছে না। এটা দুঃখজনক।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার সনদের সরকারী মান নির্ধারণ না থাকাটা এখনকার নতুন সমস্যা নয়। এটা বৃটিশ শাসনামল থেকেই চলে আসছে। কিন্তু হঠাৎ করে কওমি সনদের সরকারী স্বীকৃতি দিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদি সরকারের দিক থেকে অতি আগ্রহ প্রকাশ এবং কারো কারো দিক থেকে যেনতেনভাবে এই স্বীকৃতি গ্রহণে অতিউৎসাহী তৎপরতা গভীর ষড়যন্ত্রের সন্দেহ তৈরী করে।

তিনি বলেন, ২০১০ সালে ধর্মহীন শিক্ষানীতি জারির পর সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা তথা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী শিক্ষা ও মুসলিম সংস্কৃতিক ভাবধারার পাঠ পর্যায়ক্রমে উৎখাত, ২০১১ সালে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম ও আয়ের উৎসে কঠোরভাবে সরকারী নিয়ন্ত্রণারোপের জন্যে বিশ্বব্যাংকের নজিরবিহীন প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ২০১৩ সালের ৭ মে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশ হওয়া বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে ইউকিলিকসের ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে এমন সন্দেহকে আরো জোরালো করে। তাছাড়া গত কয়েক বছর ধরে চিহ্নিত কিছু পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন মিডিয়া ও সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নানা সময়ে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দিয়ে নানা বিতর্কিত সুপারিশ ও মন্তব্য করেছে।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, বেফাকসহ কওমি নেতৃবৃন্দের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ছাড়া সরকার একতরফা পছন্দ মতো কমিটি নির্ধারণ করে দিলে এবং সেই কমিটির ক্ষমতা শুধুমাত্র সুপারিশ বা প্রস্তাবনার মধ্যে সীমিত রাখলে, তাতে তো কওমি মাদ্রাসার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও স্বাধীন শিক্ষাক্রম পরিচালনার অধিকার শুরুতেই হরণ করা হয়ে গেল।

তিনি বলেন, কওমী মাদ্রাসা সরকারী অর্থে চলে না। আর্থিক ও নৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নিজেদের সন্তানদেরকে এসব মাদ্রাসার পড়াশোনা করানোর মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে জনগণই এসব মাদ্রাসা চালায়। যে কারণে এসব মাদ্রাসার নাম হয়েছে কওমি মাদ্রাসা। আর স্বাধীনভাবে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করতে পারা, এটা মৌলিক নাগরিক অধিকার।

তিনি বলেন, বেফাকসহ দেশের অন্যান্য কওমি বোর্ড ও বড় বড় মাদ্রাসা দাওরায়ে হাদীস উত্তীর্ণ ছাত্রদেরকে সনদ দিয়ে থাকে। দারুল উলূম দেওবন্দের মতো আমাদের এসব সনদের মান নির্ধারণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে শিক্ষাক্রম পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা অক্ষুণœ রেখে। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের মতো আমাদের সনদের মান দিতে সরকার রাজি না হলে, ইংরেজ শাসনামল থেকে বিগত দুইশত বছরেরও অধিক সময়কাল কওমি মাদ্রাসাসমূহ জনগণের সাহয্য-সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে যেভাবে চলে আসছে, সেভাবেই চলবে।

তিনি বলেন, দাওরায়ে হাদীসের সনদের মান থাকা উচিত, তবে সেটা স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে কোনভাবেই নয়। সনদের মান আদায়ের জন্যে দেন-দরবার ও দাবী জানানোর জন্যে বর্তমান সময়কে উপযুক্ত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন আমাদেরকে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার মান বৃদ্ধি, আদর্শ ও নৈতিকতায় আরো উন্নতি সাধনের চেষ্টা এবং আভ্যন্তরীণভাবে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে গভীর মনোনিবেশ করতে হবে।

তিনি বলেন, একথাটা বার বার সামনে আনা জরুরী, কওমি ছাত্ররা সনদের মান পাওয়াকেই একমাত্র লক্ষ্য স্থির করে মাদ্রাসায় ভর্তি হয় না। দুনিয়াবী মোহ থেকে মুক্ত থেকে গভীর মনোযোগ অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে কুরআন-হাদীসের সঠিক শিক্ষা অর্জন করে সেটাকে সাধারণ মুসলিম জনসাধারণের মাঝে পৌঁছানোর মাধ্যমে রেজায়ে মাওলা বা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই তারা কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে থাকে। সুতরাং যেনতেনভাবে স্বকীয়তা ও স্বাধীন শিক্ষাক্রম পরিচালনার অধিকার এবং দ্বীনি শিক্ষাদান ও গ্রহণের আদর্শ পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে সনদের স্বীকৃতি নেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারী আলীয়া মাদ্রাসাসমূহের ধর্মীয় শিক্ষাকে সংকোচন করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে, এখন আলীয়া মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে একজন পরিপূর্ণ দ্বীনি আলেম হওয়া প্রায় অসম্ভব। আমাদের সকলেরই মনে রাখা চাই, যে কোন ভুল পদক্ষেপের কারণে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে এজন্যে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এবং সবশেষে আল্লাহর কাছে কঠোর জবাবদেহি হতে হবে।

তিনি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, ছলছাতুরির আশ্রয় নিয়ে কওমি শিক্ষাক্রম ও ব্যবস্থাপনায় যে কোন ধরণের নিয়ন্ত্রারোপ বা স্বাধীনভাবে ধর্মীয় শিক্ষার্জনের মৌলিক অধীকার হরণের অপচেষ্টা কোনভাবেই সহ্য করা হবে না। আলেম সমাজ জনগণকে সাথে নিয়েই এটা প্রতিহত করবে। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে, নাগরিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষাসহ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে সাহায্য করা। অথচ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণকে নানাভাবে বিভক্তিকরণের কাজই চলছে। এটা হতাশাজনক।