হাইয়াতুল উলইয়া কতৃক জামিয়া লালখান বাজারের পরীক্ষা স্থগিত; কী বলছেন মাদরাসা কর্তৃপক্ষ? | insaf24.com

হাইয়াতুল উলইয়া কতৃক জামিয়া লালখান বাজারের পরীক্ষা স্থগিত; কী বলছেন মাদরাসা কর্তৃপক্ষ?

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | এম  মাহিরজান


দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া লালখান বাজার (মাদরাসার) পরীক্ষা স্থগিত করেছে কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড সমূহের সম্মেলিত বোর্ড আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতুল কওমিয়া কর্তৃপক্ষ।

আজ (১৭ মার্চ) বোর্ডের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানিয়েছেন হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া। সকাল ১০টায় ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসায় এই বৈঠক শুরু হয়। চলে দুপুর ২টা পর্যন্ত। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হাইয়াতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা আহমদ শফী। বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন, মাওলানা আশরাফ আলী, মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার শাহ, মুফতী মোহাম্মদ ওয়াক্কাস, মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, মুফতী ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, মুফতি রুহুল আমিন, মাওলানা মুহিব্বুল হক, মুফতি নুরুল আমিন, মুফতি মোহাম্মদ আলী, মাওলানা আনাস মাদানী, মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরী প্রমুখ।

মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া বলেন, লালখান মাদরাসার পরিচালক মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী দাওয়াতে তাবলীগের বিতর্কিত মুরব্বী মাওলানা সাদ কান্দলবী’র বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের সিদ্ধান্ত ও উলামায়ে কেরামের অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন এবং মাওলানা সাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাই তার মাদরাসার তাকমিল জামাতের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান প্রধানের ভুলের কারনে মাদরাসার সকল শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল করা কতোটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নের জবাবে হাইয়ার এই সদস্য বলেন, এটা আগে থেকেই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, তাবলীগের বিতর্কিত মুরব্বী মাওলানা সাদ কান্দলবী’র পক্ষে অবস্থান নিলে তাদের বিষয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। আর লালখান বাজার মাদরাসার মুফতী ইজহারের মাদরাসা। তাই মুফতী ইজহার যেহেতু সাদের পক্ষ নিয়েছেন, তাই তার মাদরাসার বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তাহলে কি লালখান বাজার মাদরাসার যেসব ছাত্ররা পরিক্ষার জন্য নিবন্ধন করেছিল, তারা এবার পরীক্ষা দিতে পারবেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া বলেন, হয়তো ছাত্রদের বিকল্প কোন ব্যবস্থায় পরীক্ষা নেয়া হতে পারে। সে বিষয় সামনে আলোচনা করা হতে পারে।

মুফতী ইজহার ছাড়াও তো আরো অনেকেই মাওলানা সাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মাদরাসার বিষয় কি কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আপনারা? এই প্রশ্নের জবাবে মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া বলেন, মুফতী ইজহার ছাড়াও মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁকে হাইয়ার চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে ডাকা হবে অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য। কারণ তিনি তার অবস্থান ইতিপূর্বে স্পষ্ট করেন নি। তাই তাঁর মাদরাসার বিষয়ে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে লালখান বাজার মাদরাসার কার্যনির্বাহী মুহতামিম মুফতী হারুন ইজহার বলেন, আমরা অনেক আগে জানিয়েছি যে, জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া লালখানবাজারের কোন ছাত্র-শিক্ষক অভিভাবক ও শুভানুধ্যায়ী ও আমাদের কেউ মাওলানা সাদের কখনো অনুসারী ছিলনা। আমরা মূলধারার ওলামাদের সঙ্গে আছি আদর্শিক ও ঐতিহ্যিক কারণে। আমার বাবার (মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী) কিছু বক্তব্য একান্ত তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়, এটার সাথে আমাদের কোন যোগসূত্র নেই।  এবং গত সপ্তাহে সাদের অনুসারীরা আমাদের মাদরাসার মাহফিলকে প্রভাবিত করতে চাইলে আমরা সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা স্থগিত করি। আমার বাবা মাদরাসার কার্যকরী কোন দায়িত্বে সেই অর্থে নেই। মাদরাসার কার্যকরী দায়িত্বে আমি ও মাওলানা জালাল উদ্দীন রয়েছি। 

তিনি বলেন, আমাদের এরকম সুস্পষ্ট অবস্থান সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এহেন ন্যক্কারজনক সিদ্ধান্তের পিছনে বাতিল শক্তির চক্রান্ত রয়েছে বলে আমরা সন্দেহ করছি।

মুফতী হারুন ইজহার বলেন, হাইয়া কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে একটি বারের জন্যও জানতে চাওয়া হয়নি বিষয়টি। তারা আমাদেরকে অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগও দেননি। এভাবে কোনরকম সুযোগ না দিয়ে একটা স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত জুলুম ছাড়া কিছু নয়।

আপনারা এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন কিনা? জানতে চাইলে হারুন ইজহার বলেন, আমরা অবশ্যই এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবো। মাদরাসার সকল শিক্ষকদের সাথে বৈঠক করে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবো ইন শা  আল্লাহ।

এদিকে মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর মেজ ছেলে ও লালখান বাজার মাদরাসার সাবেক মুহাদ্দীস মাওলানা মুসা বিন ইজহার বলেন, জামিআতুল উলুম আল ইসলামীয়া লালখানবাজার একটি ইতিহাস একটি চেতনার নাম। চলমান হিজরী শতাব্দীর শুরুতে পটিয়ার হযরত মুফতী আজিজুল হক রহ. এর খাস শাগরিদ কুতুবুল আকতাব হযরত ইয়ার মুহাম্মদ শাহ রহ. এর দীর্ঘ দুআর পর আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন পন্থী বাতিল কর্তৃক সৃষ্ট বহু প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো এই জামিআ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কওমী অঙ্গনে যুগান্তকারী বেশ কিছু কাজের সূচনা হয়েছিল এই জামিআর হাত ধরে। বহু আল্লাহর মকবুল বান্দা বুযুর্গদের অশ্রু এবং অসংখ্য তালিবানের উলুমে নবুওয়্যতের রক্তের উপর প্রতিষ্ঠিত প্রিয় এই জামিআ। ইমামুল হারামাইন শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আস সুবাইল রহ. শায়খ আলী মিয়া নদভী রহ. সহ দেশ বিদেশের সমসাময়িক প্রায় সকল বুযুর্গদের পদচারনায় বারবার ধন্য হয়েছে এই জামিআর মাটি।

তিনি বলেন, মাওলানা সাআদ ইস্যুতে ব্যাক্তি বিশেষের ভুলের কারণে এই জামিআকে কলংকিত করার অধিকার কারো নেই। ব্যাক্তির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। বারবার পরিবার এবং জামিয়ার সকল ছাত্র শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অবস্থান স্পষ্ট করার পরও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত কোনভাবেই মেনে নেয়ার মত নয়। যাদেরকে সাথে নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হল তাদের মধ্যে এমন লোকও আছেন যারা দেওবন্দিয়্যতের চেতনা বিরোধী কাজের সাথে সুস্পষ্টভাবে জড়িত।

মাওলানা মুসা বিন ইজহার বলেন, কোন রকমের যোগাযোগ এবং জবাবদিহিতার সুযোগ না দিয়ে সম্পূর্ণ সাংগঠনিক রীতি বিরোধী এই সিদ্ধান্তকে আমার কাছে স্বার্থান্ধ অতি উৎসাহীদের দ্বারা প্ররোচিত, বিদ্বেষপ্রসূত এবং সুযোগ সন্ধানীদের দীর্ঘদিনের ঝাল মিটানোর প্রয়াস ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। অবিবেচনাপ্রসূত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আমাদের সকলকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্থ করছে।