‘কওমী মাদরাসা’ হিসেবেই কওমীকে স্বীকৃতি দিতে হবে-‘সরকারী মাদরাসা’ বানিয়ে নয় : মুফতী শামসাবাদী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুফতী-আবুল-হাসান-শামসাবাদী
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী। দেশের প্রথম সারির একজন মুফতী, লেখক, গবেষক। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়-তিনি দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ইসলামী ম্যাগাজিন মাসিক আদর্শ নারীর সফল প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

এছাড়াও তিনি ইসলামী পত্রিকা পরিষদ বাংলাদেশের সভাপতি, আল-হিদায়াত ফাউণ্ডেশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ নূরানী তা’লীমুল কুরআন ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট-এর মহাপরিচালক এবং মাদরাসা খাতুনে জান্নাত (রা.)-এর প্রিন্সিপাল।

সম্প্রতি কওমী মাদরাসার সরকারী স্বীকৃতির বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা হচ্ছে। চলমান এ বিষয়ে এবং কওমী মাদরাসার সরকারী স্বীকৃতির ভাল-মন্দ খুটিনাটি বিষয় নিয়ে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলেন ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশেষ প্রতিনিধি মাহিরজান।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম : সরকার কওমী মাদরাসাকে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী বা কওমী মাদরাসার স্বীকৃতির প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী : সরকার কর্তৃক কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি বা সনদ প্রদান তো ফুজালায়ে কওমীর জাতীয় অধিকার। সুতরাং এটার প্রয়োজন নিয়ে ভাবার অপেক্ষা রাখে না। তবে যারা এর পক্ষে বলেন, তারাও কওমীর মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই বলেন এবং যারা এর বিপক্ষে বলেন, তারাও কওমীর কল্যাণের চিন্তা করেই তা বলেন। সুতরাং কারো দৃ্ষ্টিভঙ্গিই অবহেলা করার মতো নয়।

তবে এক্ষেত্রে আমার মত হলো, যদি কওমী মাদরাসাকে কওমী রেখেই সরকার স্বীকৃতি দেয় অর্থাৎ কওমী স্বকীয়তা বজায় থাকে এবং দেওবন্দ মাদরাসার আদলে স্বীকৃতি হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা উচিত। এতে কওমী আলেমগণের দ্বারা দেশ ও সমাজ বেশী উপকৃত হতে পারবে আশা করি।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: কওমী সনদের স্বীকৃতি প্রদানে বর্তমান সরকার আগ্রহ দেখাচ্ছে। অথচ এর আগে বিএনপি সরকারের আমলে কওমী মাদরাসার স্বীকৃতির দাবীতে অনেক আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু সেই দাবী পূরণে তৎকালীন সরকার পদক্ষেপ নিয়েও তা বাস্তবায়ন করেনি। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী : গোড়া থেকেই বলছি। এ ভারত উপমহাদেশে বৃটিশ-ইঙ্গদের উপনিবেশের পূর্বে তদানীন্তন দরসে নিজামীর কওমী মাদরাসাগুলো সরকারের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানরূপে বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু বৃটিশ সরকার এসে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার বিরুদ্ধে খড়গ চালিয়ে তৎকালীন কওমী মাদরাসাগুলোর এলোট বাতিল করে এ মাদরাসাগুলোকে প্রশাসন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর কালক্রমে তীব্র আন্দোলনে এদেশ থেকে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও তাদের কারিকুলামই চালু থাকে।

অতঃপর মুসলিম স্বান্ত্রত্য চেতনায় ভারত থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন মুসলিম দেশরূপে ‘পাকিস্তান’ আত্মপ্রকাশ করে। এরপর স্বাধীকারের আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে ‘বাংলাদেশ’ নামে এদেশের বাংলাভাষী মুসলমানদের স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়।

ইতিহাসের এ পরিক্রমায় এ মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশে একের পর এক অনেক মুসলিম শাসক রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার মূলধারা কওমী মাদরাসার উপর আপতিত বৃটিশী সেই খড়গই বহাল রয়েছে। তাই সময়ের বড় দাবী হয়ে পড়েছে–আমাদের জাতীয় শিক্ষাকে বৃটিশের সেই ইসলামী শিক্ষা সংকোচন নীতির রাহুগ্রাস থেকে বের করে আনা। সুতরাং এ পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষার ধারক কওমী মাদরাসাগুলোকে জাতীয় শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় মূল্যাবোধের যথাযথ সংরক্ষণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

তাই কওমী মাদরাসার স্বীকৃতির জন্য কোন প্রকার দাবী বা আন্দোলন ছাড়াই নৈতিকভাবেই সরকারের কর্তব্য হয়ে যায় বিষয়টির দিকে বাস্তবতার নিরিখে নজর দেয়ার। কিন্তু তারপরও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এ নিয়ে এ যাবত বহু আন্দোলন হয়েছে।

এ ধারায়ই বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে কওমী উলামা-মাশায়িখের নেতৃত্ব বিভিন্নরকম আন্দোলন হয়েছে। এক্ষেত্রে শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)ও মুফতী ফজলুল হক আমিনী (রহ.) জোরালো ভূমিকা পালন করেন। উলামায়ে কওমীর সেই আন্দোলনের ধারায়ই ১৫ এপ্রিল-২০০৫ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে কওমী ছাত্রদের ব্যাপক অংশগ্রহণে জাতীয় ছাত্র কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। তেমনিভাবে ২৫ মে-২০০৬ জাতীয় উলামা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তখন রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ ও গণমিছিলে আন্দোলন তীব্রতর হয়। এরপর ৫ জুলাই-২০০৬ মুক্তাঙ্গনে গণমিছিল হয়। সেখান থেকে ১৬ আগষ্ট-২০০৬ পল্টনে ঐতিহাসিক মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়। ১৬ আগষ্ট-২০০৬ পল্টন ময়দানে কওমী সনদের স্বীকৃতির দাবিতে সর্ববৃহৎ মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) ঘোষণা করেন–‘ স্বীকৃতি ছাড়া আমরা ঘরে ফিরে যাবো না।’ সে সময় উত্তাল জনস্রোতকে সাথে নিয়ে মুক্তাঙ্গনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করেন শাইখুল হাদীস (রহ.)। লাগাতার ৫ দিন সেই অবস্থান কর্মসূচি চালানোর পর সরকার কওমী মাদরাসাকে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে তাদেরকে আশ্বস্ত করে।
সেই প্রেক্ষিতে ২১ আগষ্ট-২০০৬ তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার কওমী মাদরাসা শিক্ষার সরকারী স্বীকৃতির ঘোষণা দেয় এবং এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করে। উক্ত প্রজ্ঞাপনটি ছিল নিম্নরূপ :

“১। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ২৯ আগষ্ট-২০০৬ তারিখের শাখা:১৬/বিবিধ-১১)/২০০৩(অংশ) -৮৮৭ সংখ্যক প্রজ্ঞাপন মাধ্যমে কেবলমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরবি সাহিত্য এবং ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে শিক্ষকতা, কাজীর দায়িত্ব/ মসজিদের ইমামতির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের কওমী মাদরাসার দাওরা ডিগ্রী এমএ(ইসলামিক স্টাডিজ/আরবি সাহিত্য) ডিগ্রীর সমমানের হিসেবে বিবেচিত হবে মর্মে নীতিগত সিদ্ধান্ত জ্ঞাপন করা হয়।
২। উক্ত প্রজ্ঞাপনের অনুমতিক্রমে সরকার দেশের সকল কওমি মাদরাসার সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
৩। উক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়রে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন/বিধিবিধান অনতিবিলম্বে প্রনয়ন করা হবে।”

সেই সরকারের গৃহিত এ পদক্ষেপ প্রত্যক্ষ করে কওমী অঙ্গনের সকলে ধারণা করে নেন যে, কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি হয়ে গিয়েছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা বাইতুল মুকাররমের উত্তর গেটে মুফতী ফজলুল হক আমিনী (রহ.)-এর আহবানে উপস্থিত কওমী উলামা-ত্বালাবা সেই সরকারপ্রধানকে ধন্যবাদ জানিয়ে শুকরিয়া সমাবেশ করেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরে কোন অশুভ শক্তির কারসাজিতে তা বাস্তবতার আলো দেখার পরিবর্তে মূলো হয়ে ঝুলে থাকে। কওমীর স্বীকৃতির সরকারী প্রজ্ঞাপন কার্যকরি করা হয় না।

এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সেই প্রজ্ঞাপনকে আমলে আনা বা কার্যকর করার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে তা তথৈবচ ঝুলে থাকে।

অতঃপর বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্র্রথম টার্মে কওমী মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করলেও তা কার্যকারিতার রূপ পায়নি। তারপর এ সরকার দ্বিতীয় টার্মে ক্ষমতায় এসে দেশের সকল শিক্ষাধারাকে সরকারী আওতায় আনার পদক্ষেপ হিসেবে কওমী মাদরাসাকে স্বীকৃতিদানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু কওমী অঙ্গনের প্রতিনিধিদের অনৈক্য ও অনাগ্রহকে দায়ী করে তা বাস্তবায়নে সময় ক্ষেপন করা হয়। ফলে কওমী সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি বিলম্বিত হতে থাকে।

এ পর্যায়ে কওমী মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থার স্বীকৃতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল ১৭ সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের আমীর শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে এবং কো-চেয়ারম্যান করা হয় মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদকে ও সদস্য সচিব করা হয় মাওলানা রুহুল আমীনকে। কিন্তু বেফাকসহ বিভিন্ন কওমী বোর্ড ও বহু কওমী উলামায়ে কিরাম নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ ও মাওলানা রুহুল আমীন সাহেবকে মেনে নেননি। যার কারণে সেই কমিটি সবার নিকট গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
তবুও সরকার সামনে অগ্রসর হয় এবং উক্ত কমিটির উপস্থিত সদস্যবৃন্দের দ্বারা কওমী নেসাব সংস্কারের রূপরেখাসহ কওমী সনদের স্বীকৃতির কার্যক্রম এগিয়ে নেয়।

এরপর কার্যকরভাবে কওমী সনদের স্বীকৃতির বিষয় বেগবান করার লক্ষ্যে সম্প্রতি ২৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ সদস্যের একটি নতুন কমিটি গঠন করে। কিন্তু এতেও উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গের নেতৃত্ব কার্যকর থাকায় বেফাকসহ বিভিন্ন কওমী মাদরাসা বোর্ড ও বহু উলামায়ে কিরাম সেই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেন এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন দাবী পেশ করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানান। তাদের আপত্তির মুখে ইতোমধ্যে সরকার পূর্বের ১৭ সদস্যের কমিটিকে পরবর্তী তিনমাসের জন্য মেয়াদ বাড়িয়ে সচল করেছে। তবে সে কমিটি নিয়েই পূর্ববর্ণিত কারণে টানাপোড়েন কাটেনি।

এভাবে বিভিন্নরূপে বর্তমান সরকারের কওমী সনদের স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণকে বাস্তবতার উপলব্ধি ও বিগত সরকারের ব্যর্থতাকে জয় করার পদক্ষেপ বলেই আমি মনে করি। তবে অনেকে এটাকে আপত্তিকর শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমের বিরুদ্ধে কওমী বোর্ড ও কওমী উলামায়ে কিরামের চলমান আন্দোলনকে দমন করার কৌশল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সে কথা কতটা সঠিক বা বেঠিক–সময়ই তা বলে দিবে।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: আপনি যেমন বললেন যে, সম্প্রতি সরকার কওমী সনদের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে পূর্বের ১৭ সদস্যের কমিটির পর সম্প্রতি মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবকে আহবায়ক করে ৯ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

কিন্তু বেফাকসহ উল্লেখযোগ্য অনেক কওমী বোর্ডের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিনিধিকে এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমতাবস্থায় তারা সেই নতুন কমিটিকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন। আবার ইতোমধ্যে সচল করা পূর্বের ১৭ সদস্যের কমিটি নিয়েও একই রকম আপত্তি তোলা হচ্ছে। এমতাবস্থায় কওমী সনদের স্বীকৃতির যথার্থ বাস্তবায়ন কী করে সম্ভব হবে বলে আপনি মনে করেন?

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী : কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি বিষয়ে সকল কওমী প্রতিনিধিগণের অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন। যাতে সেই স্বীকৃতি কওমী অঙ্গনে বিভাজন সৃষ্টি না করে। অন্যথায় কওমী মাদরাসাগুলো দু’ভাগ হয়ে ‘সরকারী কওমী মাদরাসা’ ও ‘বেসরকারী কওমী মাদরাসা’ রূপে দু’ধারা চালু হবে–যা আলিয়া মাদরাসার সাথে মিলে ত্রিধারার রূপ পরিগ্রহ করবে। আর তা সুফল বয়ে আনার পরিবর্তে পারস্পরিক রেষারেষি ও বিভেদকেই উস্কে দিবে। তাই সরকারের উচিত, এ বৃহত্তর কাজকে বিচ্ছিন্নভাবে সমাধা না করে যথাসম্ভব সকল কওমী প্রতিনিধিগণকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস চালানো।

এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহবানকে আমলে নেয়া যেতে পারে। সম্প্রতি তিনি কৃষি ইন্সটিটিউটের উলামা সম্মেলনে এক বক্তৃতায় বলেছেন, “আমরা কওমী শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে চাই। তাদেরকে রাস্ট্রীয় কাঠামোতে এনে সরকারী স্বীকৃতি দিতে চাই। আপনারা বোর্ড গঠন করে আমাদের কাছে আসুন।”

এ বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহবান বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তা হলো, “আপনারা বোর্ড গঠন করে আমাদের কাছে আসুন।” এর মানে হচ্ছে–কওমী বোর্ডগুলোর অনৈক্যের কারণে সরকারের গৃহিত কওমী স্বীকৃতির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই তিনি ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বীকৃতি গ্রহণের জন্য বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর দেখা যাচ্ছে যে, দেশের কওমী আলেম সমাজের মধ্যে কওমী সনদের স্বীকৃতির ব্যাপারটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে। তদুপরি কওমী সনদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য সম্প্রতি নতুনভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করার পর দেশের কওমী মাদরাসাসমূহের বোর্ডগুলো সজাগ হয়ে এ পরিস্থিতিতে কর্তব্য নির্ধারণে তৎপর হয়েছে।

সুতরাং এমতাবস্থায় অনায়াসে সকল বোর্ডের প্রতিনিধিগণকে একসাথে করে তাদের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে কওমী সনদের স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। আর তা-ই সার্বিকভাবে সকলের জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে আমি মনে করি।


“অন্যথায় কওমী মাদরাসাগুলো দু’ভাগ হয়ে ‘সরকারী কওমী মাদরাসা’ ও ‘বেসরকারী কওমী মাদরাসা’ রূপে দু’ধারা চালু হবে–যা আলিয়া মাদরাসার সাথে মিলে ত্রিধারার রূপ পরিগ্রহ করবে।”

-মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: সম্প্রতি বেফাকের মাধ্যমে সকল কওমী বোর্ডকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু অনেক কওমী বোর্ড বেফাকের অধীনে একীভূত হতে অনীহ হওয়ায় এক্ষেত্রে অচলাবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তা ছাড়া কারো ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক পলিসিও এক্ষেত্রে সক্রিয় থাকতে পারে। তারপরও বেফাক সকল বোর্ডকে একত্রিত করে ঐক্যবদ্ধভাবে কওমী স্বীকৃতি আদায়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে কওমী উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? কিংবা এক্ষেত্রে আপনার নিকট বিকল্প কোন ফর্মূলা আছে কি?

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী : এ ব্যাপারে আমাদের অত্যন্ত সচেতনতার সাথে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কওমী মাদরাসা শিক্ষার জাতীয় শিক্ষারূপে স্বীকৃতি ফুজালায়ে কওমিয়্যার জাতীয় অধিকার। কারো ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা অমূলক পদক্ষেপে যেন তাদের সেই অধিকার যুগ যুগ ধরে শুধু মুলো হয়ে ঝুলে থাকার ভাগ্যবরণ না করে। তাই ব্যক্তিগত স্বার্থদ্বন্দ্ব বা রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে এখানে প্রশ্রয় দেয়া উচিত হবে না। কে কোন নেতৃত্বের সাপোর্টার বা কোন সরকারের মাধ্যমে স্বীকৃতি নিলে কী স্বার্থ হাসিল হবে-সেই ক্ষুদ্র চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সার্বিকভাবে কওমীর কল্যাণকেই মুখ্য করতে হবে।

এ জন্য যেহেতু বিগত সরকার সুযোগ পেয়েও তা বাস্তবায়ন না করে ঝুলিয়ে রেখে গিয়েছে, তাই এখন নগদ হিসেব করাই যুক্তিযুক্ত মনে করি। তা ছাড়া কওমীর ঐতিহ্য কওমীকেই রক্ষা করতে হবে-এ জন্য সরকারে কে আছে সেটা মূল বিবেচ্য নয়। এভাবে সকলের আত্মস্বার্থ বিসর্জন ও উদার নীতির প্রতিফলনই এখানে কাম্য।

এ অবস্থায় বেফাকের পক্ষ থেকে যে কওমী ঐক্যের চেষ্টা করা হচ্ছে, তা সময়ের দাবী পূরণে ভাল ‍উদ্যোগ। দু‘আ করি, সেটা সফল হোক।

তবে বেফাকের এ উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া না গেলে, অযথা সময় ক্ষেপন না করে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা এভাবে করা যেতে পারে যে, সকল বোর্ডকে একিভূত করে ঐক্যবদ্ধভাবে কওমী স্বীকৃতি গ্রহণের জন্য সকল বোর্ডের মাঝে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে একটি ‘লিয়াজোঁ বোর্ড’ গঠন করা যেতে পারে, যার মধ্যে দেশের সকল কওমী বোর্ডের সমান অংশীদারিত্ব থাকবে। আর তা গঠনের প্রক্রিয়া এই হবে যে, প্রথমে একজন সর্বজন গ্রহণীয় আলেমের নেতৃত্বে সকল কওমী উলামায়ে কিরামকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালাতে হবে। এ জন্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব রূপে হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফী সাহেব (দা. বা.) আমাদের মাঝে আছেন। তাই তাঁকে মুরব্বী বানিয়ে প্রথমে সকল কওমী বোর্ডের প্রতিনিধিবৃন্দ ‘কওমী উলামা-প্রতিনিধি কমিটি’ রূপে একক প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হবেন। এরপর তারা সকলে মিলে একটি একক কওমী লিয়াজোঁ বোর্ড গঠন করবেন। তারপর বেফাকসহ দেশের সকল কওমী বোর্ডকে সেই লিয়াজোঁ বোর্ডের আন্ডারে ঐক্যবদ্ধ করবেন। এভাবে সকল বোর্ডের প্রতিনিধিগণ মিলে সম্মিলিতভাবে একক বোর্ড গঠন করলে তার মাধ্যমে কওমী স্বীকৃতির যাবতীয় কাজ আনজাম দেয়া সহজ হবে। আর তা সকলের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য হবে আমি মনে করি।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: কওমী সনদের স্বীকৃতির প্রেক্ষাপটে কওমী মাদরাসাসমূহের সিলেবাস পরিবর্তনে সরকার কী ভূমিকা রাখতে পারে? এ ব্যাপারে সরকারী নিয়ন্ত্রণ কতটুকু গ্রহণযোগ্য বলে আপনি মনে করেন?

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী : কওমী সনদের সরকারী স্বীকৃতির প্রেক্ষাপটে সরকার কওমী মাদরাসা শিক্ষাকে প্রচলিত জাতীয় শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যশীল করার জন্য কওমী মাদরাসার সিলেবাসভুক্ত দ্বীনী কিতাবাদির সাথে কিছু জাগতিক জ্ঞানের বই-পুস্তক তথা, সায়েন্স, কমার্স, কম্পিউটার-নলেজ প্রভৃতি সংযোজনের ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সেটা সরকারের মাধ্যমে নয়, বরং কওমী উলামা-প্রতিনিধিগণের মাধ্যমে বা কওমী লিয়াজোঁ বোর্ডের মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে-সরকারী স্বীকৃতিতে কওমী মাদরাসা যেন ‘সরকারী মাদরাসা’ তথা আলিয়া মাদরাসা হয়ে না যায়।

অবশ্য সরকার ১৫ অক্টোবর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ‘কওমী মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়া’ নামে কওমী মাদরাসা শিক্ষা সনদ প্রদান বাস্তবায়নের জন্য ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ গঠন ও তৎসংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালার প্রস্তাবিত খসড়া প্রকাশ করেছে। আর তা জনসাধারণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে কমিশনের এই ই-মেইল qawmicommissionbd@gmail.com এড্রেসে ই-মেইল করে মতামত জানাতে বলা হয়েছে।
উক্ত আইনের খসড়ার বিবরণ নিম্নরূপ-

“বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ
ঢাকা, আশ্বিন, ১৪২৩/অক্টোবর, ২০১৬
সংসদ কতৃর্ক গৃহীত নিম্নেলিখিত আইন- আশ্বিন, ১৪২৩/অক্টোবর, ২০১৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ
করিয়াছে এবং এতদ্বারা এই আইনটি সর্বসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা যাইতেছে যে, “বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ” Bangladesh Qawmi Madrasah Education Authority)
প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রণীত আইনের খসড়া।
যেহেতু কওমি মাদরাসার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, মানউন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের সনদ প্রদান কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য একটি কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং তৎসম্পর্কিত বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজন।
সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইলঃ
১। সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও প্রবর্তনঃ
(১) এই আইন “বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৬” নামে অবহিত হইবে।
(২) ইহা অবিলম্বে কার্যকর হইবে।
২। সংজ্ঞাঃ
বিষয় বা প্রসঙ্গের পরিপন্থী কোন কিছু না থাকিলে, এই আইনে-
(ক) “কর্তৃপক্ষ” অর্থ ধারা ৩ এর অধীন প্রতিষ্ঠিত “বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ” বুঝাইবে;
(খ) “সরকার” অর্থ বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বুঝাইবে;
(গ) “চেয়ারম্যান” অর্থ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান;
(ঘ) “সদস্য” অর্থ কর্তৃপক্ষের কোন সদস্য এবং চেয়ারম্যানও এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হইবে;
(ঙ) “বিধি” অর্থ এই আইনের অধিনে প্রণীত বিধি;
(চ) ‘‘প্রবিধান’’ অর্থ এই অইনের অধীনে প্রণীত প্রবিধান;
(ছ) “বোর্ড” অর্থ এই আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডসমূহকে বুঝাইবে;
(জ) “অধিভুক্ত মাদরাসা (এলহাকভুক্ত)” অর্থ কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত/অনুমোদিত কওমি মাদরাসা বুঝাইবে;
৩। কতৃর্পক্ষ প্রতিষ্ঠাঃ
(১) এই আইন বলবত হইবার পর সরকার যথাশীঘ্র সম্ভব এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা “বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ” নামে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করিবে।
(২) কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হইবে এবং ইহার স্থায়ী ধারাবাহিকতা ও একটি সাধারণ
সিলমোহর থাকিবে এবং সরকাররের পূর্বানুমোদনক্রমে ইহার স্থাবর ও অস্থাবর উভয় প্রকার সম্পত্তি অর্জন করিবার, অধিকারে রাখিবার ও হস্তান্তর করিবার ক্ষমতা থাকিবে। কর্তৃপক্ষ স্বীয় নামে মামলা দায়ের করিতে পারিবে বা ইহার বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা যাইবে।
৪। কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ঃ
কর্তৃপক্ষের কার্যালয় ঢাকায় থাকিবে।
৫। কর্তৃপক্ষের গঠনঃ
নিম্নেবর্ণিত চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সমন্বয়ে কর্তৃপক্ষ গঠিত হইবে যথাঃ-
(ক) চেয়ারম্যান;
(খ) (১) উপ-ধারা ৬(১) অনুসারে নিযুক্ত ৮ (আট) জন সদস্য অনুমোদিত বোর্ডসমূহের সুপারিশের আলোকে নিয়োগ প্রদান করা হইবে।
(২) মহিলা কওমি মাদরাসার প্রতিনিধি ১ (এক) জন;
(৩) কওমি মাদরাসার উল্লেখযোগ্য বোর্ডসমূহ যথাক্রমে-
(ক) বেফাকুল মাদারিস বাংলাদেশ (খ) ইত্তেহাদুল মাদারিস চট্টগ্রাম (গ) এদারায়ে তালীম সিলেট (ঘ)
তানযীমুল মাদারিস উত্তরবঙ্গ (ঙ) গওহরডাঙ্গা বেফাক বোর্ড, গোপালগঞ্জ ইত্যাদি প্রধানগণ/সচিবগণ পদাধিকার বলে।
(গ) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত সচিব পদাধিকার বলে।
৬। চেয়ারম্যান ও সদস্যগণের নিয়োগ, পদত্যাগ, অব্যাহতি ইত্যাদিঃ
(১) কওমি শিক্ষায় শিক্ষিত ও ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ শীর্ষ পর্যায়ের আলেম, চেয়ারম্যান এবং ধারা ৫(খ) এ উল্লিখিত সদস্যগণ অনুমোদিত বোর্ডসমূহের সুপারিশের আলোকে নিয়োগপ্রাপ্ত হইবেন।
(২) কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সদস্য, তবে কর্তৃপক্ষের সচিব ও পদাধিকার বলে নিয়োজিত সদস্যগণ ব্যতীত, নিম্নেবর্ণিত শর্তে কর্মরত থাকিবেনঃ
(ক) চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্য খণ্ডকালীন ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করিবেন;
(খ) চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য সদস্যের সম্মানী ভাতা এই আইনের বিধান সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত হইবে।
(৩) চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য সদস্য, তবে কর্তৃপক্ষের সচিব ও পদাধিকারবলে নিয়োজিত সদস্যগণ ব্যতীত তাঁহার নিয়োগের তারিখ হইতে ৪ (চার) বৎসরের মেয়াদে স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন এবং পুনরায় নিয়োগের যোগ্য হইবেন।
(৪) চেয়ারম্যান অথবা কোন সদস্যের প্রতি কর্তৃপক্ষের ২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ) সদস্য অনাস্থা প্রকাশ করিলে সরকার তাহাকে দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি প্রদান করিতে পারিবে।
(৫) সরকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে চেয়ারম্যান স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন। অন্য সদস্যরা স্বীয় পদ স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে চেয়ারম্যানের কাছে করিতে পারিবেন। কিন্তু অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হইবে।
(৬) চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে তিনি তাঁহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে, শূন্য পদে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত কিংবা চেয়ারম্যান পুনরায় স্বীয় দায়িত্ব পালনে সমর্থ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের ২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ) সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে মনোনীত কোনো সিনিয়র সদস্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করিবেন।
৭। চেয়ারম্যান ও সদস্যপদের অযোগ্যতাঃ
১. কোন ব্যক্তি চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে মনোনীত বা নিযুক্ত হওয়ার যোগ্য হইবেন না যদি তিনি-
ক. উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন;
খ. দেউলিয়া হিসেবে ঘোষিত হন;
গ. আদালত কর্তৃক নৈতিক পদস্খলনজনিত অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইয়া থাকেন যদি না যে অপরাধের কারণে তিনি দণ্ডিত হইয়াছেন তাহা ক্ষমা করা হইয়া থাকে অথবা তাহার দণ্ডপ্রাপ্তির তারিখ হইতে ৫ (পাঁচ) বছর অতিক্রান্ত হইয়া থাকে।
২. চেয়ারম্যান অথবা সদস্য হিসেবে মনোনয়ন লাভ বা নিয়োগের পর কোন ব্যক্তি যদি ১ উপ-ধারায় বর্ণিত মতে অযোগ্য হন তবে তাঁহার মনোনয়ন বা নিয়োগ বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে।
৮। কমিটিঃ
কর্তৃপক্ষ উহার কাজে সহায়তার জন্য প্রযোজনেবোধে, এক বা একাধিক কমিটি নিয়োগ করিতে পারিবে এবং উক্তরূপ কমিটির সদস্য সংখ্যা, দায়িত্ব এবং কার্যধারা নির্ধারণ করিতে পারিবে।
৯। কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও কার্যাবলি হইবে নিম্নরূপ যথাঃ
(ক) “বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন” এর কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, কওমি বোর্ডসমূহের কার্যক্রম পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন;
(খ) কওমি মাদরাসাসমূহের পরিদর্শন পদ্ধতি নির্ধারণ;
(গ) কওমি মাদরাসাসমূহ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার লক্ষ্যে ‘দারুল উলূম দেওবন্দের’র ৮ (আট) টি মূলনীতি যার উপর কওমি মাদরাসার ভিত্তি তার আলোকে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন;
(ঘ) কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ নিম্নবর্ণিত ০৪ (চার) টি স্তরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কওমি বোর্ডসমূহকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে;
স্তরসমূহঃ
(১) ইবতিদাইয়্যাহ (প্রাথমিক)
(২) মুতাওয়াসসিতাহ (নিম্ন মাধ্যমিক)
(৩) সানাবিয়্যাহ আম্মাহ (এস.এস.সি)
(৪) সানাবিয়্যাহ খাস্সাহ (এইচ.এস.সি)
(ঙ) পৃথক কওমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ কওমি উচ্চ শিক্ষার ০২ (দুই) টি স্তর
যথাক্রমে মারহালাতুল ফযিলত (স্নাতক সম্মান) ও মারহালাতুত তাকমিল (দাওরায়ে হাদিস-স্নাতকোত্তর) পর্যায়ের মাদরাসাসমূহের সনদপ্রদানকারী ও অ্যাফিলিয়েটিং অথরিটি হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করিবে। তবে এই আইনের আলোকে অধিভুক্ত কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীগণ বর্ণিত সনদ লাভের যোগ্য হইবেন।
(চ) কওমি শিক্ষার মান উন্নয়নে কতৃর্পক্ষ বিধিমোতাবেক কওমি মাদরাসা স্থাপন, প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করিবে;
(ছ) কওমি মাদরাসা শিক্ষার জন্য উপযোগী পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করা;
(জ) কওমি মাদরাসা শিক্ষায় জ্ঞানের বিকাশ, বিস্তার ও অগ্রগতির লক্ষ্যে শিক্ষাদান ও গবেষণার ব্যবস্থাকরা;
(ঝ) কওমি মাদরাসা শিক্ষকগণের বুনিয়াদি, চাকুরিকালীন এবং বিষয়ভিত্তিক প্রাগ্রসর জ্ঞানের প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা গ্রহণ;
(ঞ) কওমি মাদরাসা এবং তৎসংযুক্ত অফিস, হোস্টেল বা হল পরিদর্শন করা;
(ট) শিক্ষার উনড়বয়নের স্বার্থে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের বাহিরের বিশ্ববিদ্যালয় বা বিখ্যাত কোন মাদরাসার সহিত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও যৌথ একাডেমিক কার্যক্রম গ্রহণ করা;
(ঠ) শিক্ষার্থী ও শিক্ষকমন্ডলির মধ্যে একাডেমিক শৃঙ্খলা বিধান ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
(ড) একাডেমিক, শিক্ষামূলক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের বিধি অনুযায়ী সহপাঠ্যক্রম কার্যাবলিতে উৎসাহদান এবং শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মে পারদর্শিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা;
(ঢ) অধিভুক্ত মাদরাসার একাডেমিক কার্যক্রম সরেজমিনে তদারকি ও কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করা।
১০। কর্তৃপক্ষের সভাঃ
(১) এই ধারা অন্যান্য বিধানাবলি সাপেক্ষে, কর্তৃপক্ষ উহার সভার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করিতে পারিবে।
(২) চেয়ারম্যান কর্তৃক নির্ধারিত স্থান ও সময়ে সভা অনুষ্ঠিত হইবে এবং চেয়ারম্যানের সম্মতিক্রমে কর্তৃপক্ষের সচিব এইরূপ সভা আহ্বান করিবেনঃ তবে শর্ত থাকে যে, বৎসরে অন্ততঃ কর্তৃপক্ষের ৪ (চার) টি সভা অনুষ্ঠিত হইবে।
(৩) সভায় উপস্থিত ১/৩ (এক-তৃতীয়াংশ) সদস্যের উপস্থিতিতে সভার কোরাম গঠিত হইবে।
(৪) চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে ধারা ৬(৬) এ উল্লিখিত সদস্য কর্তৃপক্ষের সভায় সভাপতিত্ব করিবেন।
(৫) উপস্থিত সদস্যগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সভার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে এবং ভোটে সমতার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের দ্বিতীয় বা নির্ণায়ক ভোট প্রদানের ক্ষমতা থাকিবে।
(৬) শুধুমাত্র কোন সদস্যপদে শূন্যতা বা কর্তৃপক্ষ গঠনে ত্রুটি থাকিবার কারণে কর্তপক্ষের কোন কার্য বা কার্যধারা অবৈধ হইবে না এবং তৎসম্পর্কে কোন প্রশ্নও উত্থাপন করা যাইবে না।
১১। কর্তৃপক্ষের সচিবঃ
(ক) কর্তৃপক্ষের ১ (এক) জন সচিব থাকিবেন। তিনি যাবতীয় সাচিবিক দায়িত্ব পালন করিবেন।
(খ) সচিব কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং তাঁহার চাকুরির শর্তাদি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত হইবে।
(গ) সচিব পদ শূন্য হইলে, কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে সচিব তাঁহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে শূন্য পদে নবনিযুক্ত সচিব কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত কিংবা সচিব পুনরায় স্বীয় দায়িত্ব পালনে সমর্থ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মনোনীত কোন ব্যক্তি সচিবরূপে দায়িত্ব পালন করিবে।
(ঘ) সচিব কর্তৃপক্ষের সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা হইবেন; এবং এই আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে, কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দেশিত কার্যাবলি সম্পাদন, ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব সম্পাদন করিবেন।
১২। কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগঃ
ধারা ১৯-এর বিধান সাপেক্ষে, কর্তৃপক্ষ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী উহার দায়িত্ব সুষ্ঠভাবে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবে এবং তাঁহাদের চাকুরির শর্তাবলি প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত হইবে।
১৩। কর্তৃপক্ষের তহবিল:
১. কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ নামে একটি তহলিল সংগঠিত হইবে যাহাতে জমা হইবে-
(ক) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত প্রবিধান অনুযায়ী আদায়যোগ্য অর্থ;
(খ) সরকার কতৃর্ক প্রদত্ত অনুদান;
(গ) কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড হতে বিধিমোতাবেক প্রাপ্ত অর্থ;
(ঘ) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত ঋণ;
(ঙ) কর্তৃপক্ষের নিজস্ব আয়;
(চ) কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান;
(ছ) সরকারের অনুমোদনক্রমে কোন বিদেশী সরকার, সংস্থা বা কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা হইতে প্রাপ্ত অনুদান;
(জ) অন্য কোন বৈধ উৎস হইতে প্রাপ্ত অর্থ;
(ঝ) গ্রহণকৃত দান, সম্পদ হইতে অথবা প্রবিধান অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অধিকারের বা ব্যবস্থাপনায় থাকবে এমন সকল সম্পত্তি হইতে প্রাপ্ত সকল অর্থ ও ফিস ইত্যাদি;
২. কর্তৃপক্ষের নামে ব্যাংক একাউন্ট থাকিবে এবং বিধি অনুসারে সকল অর্থ কোনো তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখিতে হইবে।
৩. এই তহবিলে জমাকৃত অর্থ প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে উত্তোলন করা যাইবে।
৪. এই তহবিল হইতে কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা হইবে।
৫. কর্তৃপক্ষের তহবিল বা উহার অংশবিশেষ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করা যাইবে।
৬. সংশ্লিষ্ট অর্থ বৎসরে কর্তৃপক্ষের ব্যয় নির্বাহের পর উদ্বৃত্ত থাকিলে কর্তপক্ষের নির্ধারিত তহবিলে জমা প্রদান করিতে হইবে।
১৪। বাজেটঃ
(১) কর্তৃপক্ষ প্রতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করিবেন।
(২) কর্তৃপক্ষ প্রতি আর্থিক বছরের শেষে সরকারের নিকট আর্থিক কার্যক্রমের বিবরণী সম্বলিত প্রতিবেদন দাখিল করিবেন।
১৫। হিসাব রক্ষণ ও নিরীক্ষাঃ
(১) বাংলাদেশে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি প্রতিবছর কর্তৃপক্ষের হিসাব নিরীক্ষা করিবেন।
(২) কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও ফরমে কর্তৃপক্ষের হিসাব সংরক্ষণ করিবে এবং হিসাবের বার্ষিক বিবরণী প্রস্তুত করিবে।
(৩) কর্তৃপক্ষের হিসাব প্রত্যেক অর্থ বছরে একবার কতৃর্পক্ষ কর্তৃক নিযুক্ত চার্টার্ড একাউনটেন্ট ফার্ম দ্বারা পরীক্ষিত ও নিরীক্ষিত হইবে।
১৬। বিধি প্রণয়নের ক্ষমতাঃ
এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কর্তৃপক্ষ বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে।
১৭। প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতাঃ
এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কর্তৃপক্ষ প্রবিধান প্রণয়ন করিতে পারিবে।
১৮। বিদ্যমান কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিধানঃ
এই আইন কার্যকর হইবার সংগে সংগেঃ-
এই আইন প্রবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে, যে সকল কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তাহা পূর্ববৎ বহাল থাকিবে এবং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন-কানুন পরিবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মরত জনবল সম্পর্কিত নিয়োগ ও পদোন্নতির শর্তাবলি বহাল থাকিবে।”

এ কওমী কর্তৃপক্ষের নীতিমালা দ্বারা বুঝা যাচ্ছে-কওমী মাদরাসার শিক্ষা সনদ প্রদান বাস্তবায়নের জন্য সরকারের মাধ্যমে গঠিত কর্তৃপক্ষ এতদসংশ্লিষ্ট যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সর্বময় ক্ষমতা প্রাপ্ত হবে। এ কর্তৃপক্ষ এখনো গঠন করা হয়নি। নীতিমালা চূড়ান্ত করার পর সেই আলোকে গঠন করা হবে। সরকার এ কর্তৃপক্ষকেই কওমী মাদরাসার সিলেবাস সংস্কার, পরিচালনার নীতিমালা তৈরী প্রভৃতি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিবে-যা এ কর্তৃপক্ষের দ্বারা বাস্তবায়িত হবে। সুতরাং এ কর্তৃপক্ষকে যথার্থ কওমী প্রতিনিধি হতে হবে। এর প্রত্যেক সদস্যকে সম্পূর্ণরূপে কওমী স্বার্থ সংরক্ষণকারী ও কওমী আদর্শের যথাযথ ধারক-বাহক হতে হবে। যাতে তারা কওমীর ঐতিহ্য ও নীতি-আদর্শ রক্ষার প্রশ্নে সরকারের সাথে কোনরূপ আপোষ না করেন। তাহলেই কওমীর স্বকীয়তা বজায় রাখার সাথে কওমী শিক্ষার সনদ লাভ সম্ভব হবে আশা করি।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: কওমী স্বীকৃতির ভাল-মন্দ দিকগুলোর বিচার-বিশ্লেষণে অনেকে অনেক কথা বলেন। এ ব্যাপারে আপনার দিক-নিদের্শনা কামনা করছি।

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী : এ ব্যাপারে এক কথায় বলতে গেলে কওমীকে কওমী হিসেবেই সরকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। তাই কওমী মাদরাসাসমুহের পা্ঠ্যক্রম-সিলেবাস, শিক্ষা-কারিকুলাম, নীতি-বিধি সবই কওমী কর্তৃপক্ষ তথা সেই ঐক্যবদ্ধ কওমী উলামা-প্রতিনিধিবৃন্দ বা কওমী লিয়াজোঁ বোর্ড কর্তৃকই প্রণীত হওয়া আবশ্যক। আর সরকারের নিয়োজিত ‘কর্তৃপক্ষ’ শুধু তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী হবেন। সুতরাং কওমী লিয়াজোঁ বোর্ডই প্রয়োজনে সময়োপযোগী আবশ্যকীয় বিষয়াদি যুক্ত করে কওমী শিক্ষাকে কাঙ্ক্ষিত মানে উত্তীর্ণ করবেন। এক্ষেত্রে সরকার বা সরকার কর্তৃক গঠিত কর্তৃপক্ষ শুধু সেসব নিরীক্ষণ করতে পারবেন এবং অনুমোদন দিতে পারবেন। কিন্তু সরকার বা কর্তৃপক্ষ সেসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। সেগুলো কওমী লিয়াজোঁ বোর্ডই নিয়ন্ত্রণ করবে। এভাবে সরকার যদি কাঙ্ক্ষিত শর্ত মেনে কওমীর স্বকীয়তা বজায় রেখে স্বীকৃতি দেয়, তাহলেই তা গ্রহণীয় হবে।

কিন্তু সরকার সেসব শর্ত না মানলে, কওমীর স্বকীয়তাকে বিসর্জন দিয়ে স্বীকৃতি গ্রহণ করা কওমীকে ধ্বংস বা আলিয়ায় পর্যবসিত করারই না্মা্ন্তর হবে। যা দারুল উলূম দেওবন্দের চেতনার পরিপন্থী। তাই দারুল উলূম দেওবন্দ-এর আদর্শভিত্তিক কোন কওমী মাদরাসা এরূপ স্বীকৃতি গ্রহণ করতে পারে না।

মোদ্দা কথা, কওমী মাদরাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে সরকার কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি দিলেই কেবল তা গ্রহণযোগ্য হবে। সেই অবস্থায় এর বিরোধিতা করার কোন কারণ থাকতে পারে না। অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে যদি দেওবন্দ মাদরাসা সে দেশের সরকারের স্বীকৃতি নিয়েও স্বকীয়তা বজায় রেখে চলতে পারে, আমাদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে দারুল উলূম দেওবন্দের আদর্শভিত্তিক কওমী মাদরাসাগুলো কেন সরকারের স্বীকৃতি নিয়েও স্বকীয়তা বজায় রেখে চলতে পারবে না?

তাই কামনা করছি, কওমী স্বীকৃতি আর মুলো হয়ে ঝুলে না থাক। অতিসত্বর তা স্বকীয়তার সাথে বাস্তবায়িত হোক। ফারেগীনে কওমিয়্যার জাতীয় অধিকার তথা কওমী শিক্ষার জাতীয় স্বীকৃতি যত তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত হবে, দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণে কওমী অঙ্গনের নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক উলামায়ে কিরাম তত দ্রুত বলিষ্ঠ অবদান রাখতে পারবেন। এতে শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে অনেক ধাপ এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় সোনার বাংলাদেশ।