জানুয়ারি ১৭, ২০১৭

আলেমদের কাজ সনদ নির্ভর নয়: মুফতী ফয়জুল্লাহ

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুফতী ফয়জুল্লাহ


বর্তমান সময়ে বহুল আলোচিত কওমি মাদ্রাসার সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা মান থাকা বা না থাকা নিয়ে খোলামেলা এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর যুগ্ম মহাসচিব ও ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতী ফয়জুল্লাহ।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশেষ প্রতিনিধি মাহিরজান


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: কওমি মাদ্রাসার সনদের মান নির্ধারণের বিষয়ে বর্তমান ব্যাপক আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

মুফতী ফয়জুল্লাহ: উলামায়ে কেরাম মহান আল্লাহ কর্তৃক স্বীকৃত। অন্য কারো স্বীকৃতি থাকুক আর না থাকুক, আল্লাহর স্বীকৃতিই মুমিন আলিমের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মহান আল্লাহর স্বীকৃতির জন্যই আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড। সরকার দাবী করছে, তারা কওমি মাদ্রাসার উন্নয়ন চায়, স্বীকৃতি দিতে চায়। আমরাও তাদের দাবীকে আস্থায় নিয়ে বলতে চাই, স্বাধীন, নিয়ন্ত্রণমুক্ত, হস্তক্ষেপমুক্ত, শিক্ষানীতিমালা ২০১০, প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০১৬’এর সুনির্দিষ্ট কিছু ধারা-উপধারার আওতামুক্ত সিলেবাস ও পাঠ্যসুচী, শিক্ষার ধারা, শিক্ষাপদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিষয়ে স্বকীয়তা বজায় রাখার নিশ্চয়তা সাপেক্ষে “কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদকে চূড়ান্তভাবে এ্যারাবিক ও ইসলামিক স্টাডিজে এম.এ সনদের মান” দেয়া হোক।আমরা নিতে পারি।অন্য কোন ক্লাস বা জামাতের মান চাই না, নিবো ও না।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: আপনারা আসলে কি চান ?

মুফতী ফয়জুল্লাহ: দেখুন, কুরআনী শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম উলামাদেরকে আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে শিক্ষিত হিসেবে গণ্য করা হয় না।তাদেরকে নিরক্ষরদের কাতারে শামিল করে রাখা হয়েছে। আমরা চাই উল্লেখিত শর্তাবলীর ভিত্তিতে কুরআনী শিক্ষায় শিক্ষিতদেরকেও শিক্ষিত হিসেবে গণ্য করা হোক। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোরআনী শিক্ষা আজ উপেক্ষিত। কোরআনী শিক্ষার প্রতি এমন উপেক্ষা নিয়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সে শিক্ষা ডেকে আনছে ভয়াবহ বিপর্যয় ও কষ্ট। জ্ঞানের ভূবনে আখিরাত চেতনার মিশ্রন হলে জান্নাতের পথে চলা সহজতর হয়। ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হলে অসংখ্য পথের ভীড়ে সঠিক পথ চেনা মুশকিল। জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস পবিত্র কোরআন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এমন বহু নামী দামী ‘শিক্ষিত মূর্খ’ লোক দেখবেন, যারা বিভ্রান্তির ঘূর্নাবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে।তাই আমরা তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের ভিত্তিতে শিক্ষার জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করার দাবী করছি। সেই সাথে শিক্ষার সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার আহবান জানাচ্ছি।


%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%ab%e0%a6%a4%e0%a7%80-%e0%a6%ab%e0%a7%9f%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b9ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: আপনারা যদি সনদের মাধ্যমে চাকুরীর সুযোগ নিতে চান, তবে তো বর্তমান শিক্ষা কারিকুলাম আপনাদেরকে অনুসরণ করতেই হবে। তাই না?

মুফতী ফয়জুল্লাহ: না, আমরা চাকুরীর জন্য লেখা পড়া করি না, করাইও না। এটা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। মনে রাখবেন, কোরআনী শিক্ষা শিখা/শেখানোর মাধ্যমে প্রথমত দুনিয়া আখেরাতে নিজেদের মুক্তি ও সাফল্য এবং দ্বিতীয়ত জাতির ঈমান আমল ও আখলাক গঠন, দীন কায়েম ও সংরক্ষণ এবং এর প্রচারের মাধ্যমে উভয় জাহানের কামিয়াবীই প্রধান লক্ষ্য। সনদ বা চাকরি এই শিক্ষার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নয়।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম:  তবে তো আপনারা সরকারী চুকুরী থেকে বঞ্চিত থাকবেন?

মুফতী ফয়জুল্লাহ: সরকারি সনদ ছাড়াও আমরা যার যার যোগ্যতা ও সামর্থ অনুযায়ী কাজ করছি। কওমি আলেমদের কাজের পরিধি ও লক্ষ্য সনদ নির্ভর নয়। কাজের জন্য আমাদের সামনে হাজারও পথ খোলা আছে। তাছাড়া সরকারি চাকরীর আসন মাত্র ১৪/১৫ লাখ। আলেম উলামার সংখ্যা প্রায় কোটি। সরকার কতজনকে চাকুরী দিবে? আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের দেখুন, তারা যেখানে আজ তাদের সার্টিফিকেট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সব বিষয়ে ভর্তিই হতে পারে না, সেখানে আমরা কি পাওয়ার আশা করতে পারি? মনে রাখবেন, আমাদের চাকুরী দিলেও ইমাম, বিয়ের কাজীর চাকুরী দিবে! কয়টা দিবে? এখন কি আমরা ইমামতি করছি না? আমাদেরকে সব কিছু গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, বুঝতে হবে, সমস্যার গভীরে যেতে হবে। না বুঝে খুশি হওয়া ভালো নয়। স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য বেশি উতলা ও উন্মুখ  হওয়া কখনোই কল্যাণকর হবে না। সম্ভাব্য সুবিধার দিকগুলো নিয়ে রঙিন স্বপ্ন না দেখা উচিত। দেশী-বিদেশি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন থাকা অপরিহার্য।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: সরকার কওমী মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কওমী মাদরাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়।এ ব্যপারে আপনি কি বলবেন?

মুফতী ফয়জুল্লাহ: কওমী মাদরাসা শিক্ষা যুগোপযোগী করার ভাষাটিই আপত্তিকর। কওমী মাদ্রাসায় জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস পবিত্র কোরআন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা প্রদান করা হয়।এসব মাদরাসা যারা চালান এবং এখানে যাদের সন্তানরা লেখাপড়া করে, তারা প্রয়োজন মোতাবেক সিলেবাস পরিমার্জন করে থাকেন। সমৃদ্ধকরণের এই ধারা অব্যাহত আছে ও থাকবে।যেভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সিলেবাসগুলো সেখানকার শিক্ষকরা করে থাকেন। এখানে সরকারি হস্তক্ষেপ অহেতুক সমস্যা ডেকে আনবে।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: কওমী মাদ্রাসার সাথে বর্তমান শিক্ষার পুরোপুরি সমন্বয় কি সম্ভব?

মুফতী ফয়জুল্লাহ: দেখুন, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিগুলোতে ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে।মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে ডাক্তার তৈরি করে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করা হয়। কওমি মাদ্রাসায় দ্বীনের আলিম তৈরি করে। কেও আলিম হতে চাইলে তাকে মাদ্রাসায় পড়তে হবে। অন্যকোনো উচ্চতর শিক্ষায় আগ্রহী হলে, তবে তাকে আন্যান্য শিক্ষালয়েই পড়তে হবে। এখানে তার পুরোপুরি সমন্বয় কি করে সম্ভব? আপনি যদি সমন্বয় করার জন্য আমাকে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকর্তৃক প্রণীত, বাংলা, ইংরেজি, নৈতিক শিক্ষা, বাংলাদেশ স্টাডিজ, বিশ্ব পরিচয়, গণিত, পরিবেশ পরিচিতি, তথ্য-প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান বিষয়ের পাঠ্যপুস্তকসমূহ মাদ্রাসার জন্য বাধ্যতামূলক করেন, তবে আমি বলবো আগে আপনি অন্য সব শিক্ষালয়ে কুরআন, হাদীস, ফিকহ, উসুলে ফিকহ, তাফসীর, আকায়েদ, নাহব, সারাফ বাধ্যতামূলক করুন।এটা কি সম্ভব? অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ইসলামী আকীদা বিশ্বাসের ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত।


ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম: আপনার অনেক ব্যস্ততার মধ্যে সাক্ষাৎকার প্রধান করার জন্যে এবং ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সময় দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ।

মুফতী ফয়জুল্লাহ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।