মার্চ ২৩, ২০১৭

সনদ স্বীকৃতির নামে মাদ্রাসা শিক্ষাকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে: জুনাইদ বাবুনগরী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী (3)বাংলাদেশ ক্বওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক)এর কার্যনির্বাহী বোর্ডের সদস্য, দারুল উলূম হাটহাজারীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী বলেছেন, কওমি মাদ্রাসার সনদের সরকারী স্বীকৃতির নামে ধর্মীয় শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র কওমি মাদ্রাসাসমূহকে আদর্শচ্যুত করার ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কওমি মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণের জন্যে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সরকারের প্রতি জোরালো চাপ দেওয়ার প্রতিবেদন আমরা বিভিন্ন সংবাদপত্রে দেখতে পেরেছি।

২০১৩ সালে ফাঁস হওয়া ইউকিলকসের রিপোর্টে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তায় কওমি মাদ্রাসায় সেক্যুলার শিক্ষা চালুর সরকারী উদ্যোগ সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা ছিল, যা প্রথমআলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কওমি মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে বলে দৈনিক জনকণ্ঠসহ কয়েকটি সেক্যুলার চিন্তার পত্রিকায় বেশ কিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কওমি শিক্ষার উন্নয়নের নামে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ, বিতর্কিত ও একতরফাভাবে কওমি কমিশন গঠন, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কওমি মাদ্রাসাকে শৃঙ্খলায় আনয়নের উদ্যোগের তথ্য প্রকাশসহ আরো নানা আলামতে এমন সন্দেহ জোরালো হচ্ছে। বর্তমানে কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে অতি উৎসাহি তৎপরতার সাথে ষড়যন্ত্রের সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, শিক্ষানীতির একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার আলোকে সনদ স্বীকৃতির নামে মাদ্রাসা শিক্ষাকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে।

জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, আলেম সমাজ এক থাকতে পারলে কোন ষড়যন্ত্রই সফলতার মুখ দেখবে না, উল্টা ষড়যন্ত্রকারীরাই উচ্ছেদ হয়ে যাবে।

১৬ অক্টোবর সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী এই কথা বলেন।

বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, কওমি মাদ্রাসায় ইসলামের সঠিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এসব মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের পার্থিব ভোগ-বিলাসিতার কোন লক্ষ্য ও চাওয়া-পাওয়া থাকে না। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে রাসূল (সা.)এর নির্দেশনা মতে পবিত্র কুরআন-হাদীস ও ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে আদর্শ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশ গঠনে ভূমিকা রাখা।

কওমি মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষকরা কোন ধরণের চরমপন্থা লালন করেন না। এসব প্রতিষ্ঠানে কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলাম বিরোধী যে কোন কাজে প্রতিবাদের বাইরে রাজনৈতিক কারণে সরকার বিরোধী কোন আন্দোলন হয় না। তিনি বলেন, ইসলাম বিদ্বেষী শক্তির প্ররোচণায় সরকার যেন এসব মাদ্রাসার প্রতি কোন বিরূপ মনোভাব না রাখে, সে জন্যে এসব বিষয়গুলো খেয়াল করতে পারে।

তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা অনুভব করেই জনগণ এসব মাদ্রাসার প্রতি সাহায্য-সহযোগিতা, নৈতিক সমর্থনসহ তাদের সন্তানদেরকে এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াতে দেন। সুতরাং কওমি মাদ্রাসাগুলো কোন ব্যক্তি বিশেষের নয়, বরং জনগণের মাদ্রাসা। এ কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানকে কওমি মাদ্রাসা বা জনগণের বিদ্যালয় বলা হয়।

তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবে স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম পালন এবং তদলক্ষ্যে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করতে পারা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ধর্মীয় শিক্ষায় কোনরূপ হস্তক্ষেপ করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে না।

এ পর্যায়ে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, উলামায়ে কেরামের সম্মিলিত কোন সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে যদি কওমি মাদ্রাসাসমূহের সনদের স্বীকৃতির নামে নিয়ন্ত্রণের কোনরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে দেশের আলেম সমাজ কওমি মাদ্রাসাকে রক্ষার জন্যে কওমকে সাথে নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে একটুও পিছপা হবে না।

তিনি বলেন, কোটি কোটি তৌহিদী জনতা এসব মাদ্রাসার ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা বজায় রাখার বিষয়ে সজাগ। এখন আলেম সমাজের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে মজবুত রাখতে হবে। কারণ, নানা পর্যায় থেকে আলেমদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর নানা ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। এসব ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সকলকে সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাসমূহ দারুল উলূম দেওবন্দের উসূল তথা নীতি-আদর্শ মতে পরিচালিত হয়। সনদের ইস্যুসহ যে কোন বিষয়ে দেওবন্দের নীতি-আদর্শের পরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ যেভাবে পরিচালতি হয়, সনদের বিষয়ে দারুল উলূম দেওবন্দের নীতিমালা যেরকম, আমরা সেভাবে চলতে চাই। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ সে দেশের সরকারের সাথে কোনরূপ নিয়ন্ত্রণমূলক ও দাপ্তরিক সম্পর্ক ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের শিক্ষাক্রমসহ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরাও ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের মতো আমাদের মাদ্রাসাসমূহ রাখতে চাই। ভারতের কওমি মাদ্রাসা পড়–য়া আলেমদেরকে যেমন সেদেশের সরকার অন্যান্য শিক্ষিত নাগরিকের মতো মূল্যায়ণ করেন, সেই দেশের কওমি সনদকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়ন করে তরুণ আলেমদেরকে ভর্তির ও গবেষণার সুযোগ দেয়, আমাদের দেশেও সরকার কওমি শিক্ষিত দাওরায়ে হাদীসের সনদধারীদেরকে অন্যান্য শিক্ষিতদের মতো মর্যাদাজনক চোখে দেখতে হবে। ধর্ম সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগকে বাধাহীন করতে হবে। আমাদের দেশেও দাওরায়ে হাদীসের সনদকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়ন করে তরুণ আলেমদেরকে উচ্চতর গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স করার সুযোগ দিতে সরকারকে উদ্যোগী গতে হবে। কিন্তু এর বাইরে সনদের স্বীকৃতির খোলসে নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করা হলে, সেটা সরকারকেই বেকায়দায় ফেলে দেবে। তখন আলেম সমাজ ও কোটি কোটি তাওহিদী জনতা এমন পদক্ষেপকে সরাসরি ইসলামী শিক্ষার শেষ অবলম্বনের বিরুদ্ধে ধরে নিয়ে সম্মিলিতভাবে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে।

আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী সতর্ক করে বলেন, কোন দরবারী আলেম যদি কওমি নীতি-আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কওমি সনদের স্বীকৃতির নামে এসকল দ্বীনি মাদ্রাসাকে সরকারী নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পথকে সুগম করতে সহযোগিরূপে ভূমিকা পালন করতে থাকে, তবে দেশের আলেম সমাজ ও তৌহিদী জনতার কাছে তারা ঘৃণিত, ধিকৃত হয়ে নাস্তিক্যবাদের দোসর হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হবে।

বিবৃতিতে আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, আজ শুধু স্কুল পাঠ্যবই বা সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা নয়, নাস্তিক্যবাদি চক্র খাঁটি ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র কওমি মাদ্রাসার উপর শকূনী নজর দিয়েছে। ক্বওমি সনদের স্বীকৃতির নামে তারা বিভিন্নভাবে সরলমনা আলেমদেরকে প্ররোচিত করতে চাইছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা সাধারণ শিক্ষা থেকে ইসলামকে উচ্ছেদ করে নাস্তিক্য ও হিন্দুত্ববাদের শিক্ষা চালু করছে, তারা কখনো কি খাঁটি ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র ক্বওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বন্ধু হতে পারে?

আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী উলামায়ে কেরামের প্রতি বর্তমান সংকটময় সময়ে ছোটখাটো মতভেদ ভুলে সর্বাবস্থায় ক্বওমী নীতি-আদর্শের উপর সীসাঢালা প্রাচীরের মতো মজবুত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ষড়ন্ত্রকারীদের সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কোনভাবেই আবেগের বশে ও মোহগ্রস্ত চিন্তা থেকে কোন মন্তব্য করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তারা নানা প্রলোভন দেখিয়ে বিভ্রান্ত করে উলামায়ে কেরামের পায়ে শেকল পরাতে চাচ্ছে। আলেমদের ভেতরে বিবেদ তৈরি করার জন্যে কাউকে যেন প্ররোচিত করে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, তৎকালীন বৃটিশ আমলেও যখন আমাদের শাসন ব্যবস্থা স্বাধীন ছিল না, তখনও দারুল উলূম দেওবন্দসহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের হাজার হাজার ক্বওমি মাদ্রাসা স্বাধীনভাবে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে পরিচালিত হয়েছিল। এমনকি বর্তমানে আমাদের বিশাল প্রতিবেশী দেশ ভারতেও কট্টর হিন্দুত্ববাদি বিজেপি শাসনামলে সেই দেশের ক্বওমি মাদ্রাসাসমূহ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ইসলামী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে। স্বীকৃতি নিয়ে দেওবন্দের আলেমগণও কোন দেন-দরবার বা প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনা তুলছেন না। এ নিয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদি বিজেপি সরকারও কোন প্রশ্ন তুলেনি। অথচ ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে আজ ইসলাম, মুসলমান ও ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে বেশী হুমকির শিকার।