কাওমী সনদের মান দেওবন্দের আদলে হতে হবে; অন্য কোনো পন্থা মানা হবে না: আল্লামা শফী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

53928433_nবেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়্যাহ বাংলাদেশের সভাপতি ও হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী বলেছেন, এদেশে কওমী মাদরাসাসমূহ দেওবন্দের নীতি আদর্শ মতে পরিচালিত হয়, কওমী সনদের ইস্যুসহ যেকোনো বিষয়ে দেওবন্দের নীতি আদর্শের পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

ভারতে দারুল উলূম দেওবন্দ যেভাবে পরিচালিত হয়, সনদের মান নির্ধারণে দেওবন্দের নীতিমালা যেরকম, এদেশে কওমী মাদরাসা পরিচালনা করা এবং সনদের মান নির্ধারণ সেভাবেই হতে হবে।

আজ রাজধানীর মিরপুর আরজাবাদ মাদরাসা মাঠে ‘কওমী স্বীকৃতি’ বিষয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় কওমী উলামা মাশায়েখ সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

সম্মেলন উপলক্ষে সকাল থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে শীর্ষ পর্যায়ের উলামায়ে কেরামগণ সম্মেলন মাঠে উপস্থিত হতে শুরু করেন। প্রধান অতিথি মঞ্চে আসার পূর্বেই সম্মেলন মাঠ, আশপাশের রাস্তা, মসজিদ কানায় কানায় পূর্ন হয়ে যায়।

শাইখুল ইসলাম আল্লামা শফী বলেন, অন্য কোনো পন্থা মানা হবে না। বাংলাদেশে কওমী মাদরাসার সনদের সিকৃতি না থাকাটা নতুন সমস্যা নয়, এটা বৃটিশ আমল থেকে চলে আসছে, কিন্তু হঠাৎ করে বর্তমান ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার কওমী সনদের সরকারী সিকৃতি দিতে অতি আগ্রহ প্রকাশ করছে। কোনো কোনো উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে যেন তেনভাবে এ সিকৃতি গ্রহণে অতি উৎসাহী অপতৎপরতা গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বহন করছে। গত কয়েক বছরের সংবাদ ও ঘটনা পর্যালোচনা করলে এ ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আল্লামা আহমদ শফী বলেন, কওমী স্বীকৃতির ষড়যন্ত্রের বিরোদ্ধে জোরদার ঐক্য গড়তে তুলতে হবে উলামায়ে কেরামকে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধী দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসা দীন ও ইসলামের বহুমূখী খেদমত আঞ্জাম দিয়ে আসছে, যার ফলে ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসাবে সারাপৃথিবীতে দারুল উলূম দেওবন্দ একটি বহুল পরিচিত প্রতিষ্ঠান, সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশের হাত থেকে এ উপমহাদেশকে মুক্ত করার পিছনে দেওবন্দের অবদান অবিস্মরণীয়।

এদেশের কওমী মাদরাসাসমূহ সেই দারুল উলূম দেওবন্দেরই অনুসারী, দেওবন্দের মতই এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মপ্রান মুসলমানদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি, ঈমান-আমল, আখলাক ও নৈতিক চিন্তাধারা গঠণে মৌলিক ভূমিকা পালন করে আসছে এবং কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী চরিত্রবান দেশপ্রেমীক সুনাগরিক তৈরি করা এবং ইসলাম মহান বাণী সর্বস্তরের জনসাধারানের পৌছে দেয়া-ই কওমী মাদরাসার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। এদেশে কওমী মাদরাসার সাথে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আত্মার সম্পর্ক বিদ্যমান। এ মাদরাসাসমূহ সম্পূর্নভাবে সায়ত্ব শাষিত। দেওবন্দের অষ্টক মূলনীতিই হলো এ প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্দেশিকা।

এ মূলনীতির অন্যতম হলো- এসব প্রতিষ্ঠানের সকীয়তা ও মৌলিকত্ব অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে সরকারী সাহায্য গ্রহণ না করা ও নিয়ন্ত্রনমুক্ত থাকা। তবে এটা রাষ্ট্র বা সরকারের কর্তৃপক্ষ হওয়া নয় বরং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করে ও সংবিধানের আনুগত্ব প্রদর্শনী (কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী না হলে) কওমী মাদরাসা কখনো পিছপা হয়নি।

আল্লামা আহমদ শফী আরো বলেন, গত দেড়শত বছর থেকে স্বাধীনভাবে চলে আসা কওমী মাদরাসা সমূহের শিক্ষা সনদের মান দেওয়ার লক্ষ্যে কওমী মাদরাসা শিক্ষা কমিশন গঠন, বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন প্রনয়নসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারীসহ সরকার নানান পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার পিছনে কারো কারো অতি মাত্রায় আগ্রহ সম্পর্কে আমরা কম-বেশি অবগত। কিন্তু এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই কারো কারো অতি উৎসাহমূলক তৎপরতা দেখে কওমী মাদরাসার স্বকীয়তা, শায়ত্ব শাসন অক্ষুন্ন রাখার বিষয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কিন্তু আমরা মনে করি যে, শত বছর ধরে চলে আসা কওমী মাদরাসার স্বকীয় নীতি আদর্শ, স্বাধীন শিক্ষাক্রম, পরিচালনা বিন্দু মাত্রও নষ্ট হবে না এবং সরকারের নিয়ন্ত্রন থাকবে না এমন নিশ্চয়তা পেলেই আমরা সরকার থেকে দাওরায়ে হাদীসের সনদের মান নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনায় বসতে পারি। অন্যথায় আমরা যেভাবে আছি সেভাবে থাকাই আমাদের জন্য নিরাপদ।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের বেশ কিছু ধারা কওমী মাদরাসা স্বাধীনভাবে চলার পরিপন্থী, তারপরেও আমাদেরই কারো কারো অতি উৎসাহে সরকার একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েই চলছে। সঙ্গত কারণেই আমাদের সকলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে এসকল বিষয়ে চুড়ান্ত অবস্থান নির্নয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। আর এ প্রেক্ষিতেই আজকের জাতীয় কওমী উলামা মাশায়েখ সম্মেলন। তিনি আজকের সম্মেলনে আগত উলামা-মাশায়েখগণকে ধন্যবাদ দিয়ে আগামীতেও যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্যের ডাক আসলে সর্বাত্মক সাড়া দেওয়ার আহবান জানিয়ে দেশ-জাতী ও মুসলিম উম্মার কল্যাণ কামনায় দোয়া ও মুনাজাতের মাধ্যমে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব সমূহের মধ্যে রয়েছে:

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এবং তদালোকে প্রণীত শিক্ষা আইন ২০১৬এর খসড়া অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে চক্রান্তমূলকভাবে বাদ দেওয়া ইসলামী ভাবধারার গল্প, রচনা ও কবিতাসমূহ পুন: অন্তর্ভূক্ত করতে হবে এবং হিন্দুত্ববাদী ও ইসলাম বিদ্বেষী কবিতা, গল্প ও রচনাবলী শিক্ষা সিলেবাস থেকে বাদ দিতে হবে।

শিক্ষার সর্বস্তরে ইসলামী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষাকে (যা ফরজে আইন) বাধ্যতামূলক করতে হবে।

পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন পর্যালোচনা কার্যক্রমে দক্ষ ও বিজ্ঞ আলেমগণের পারর্শ নিতে হবে। প্রস্তাবিত কওমী মাদরাসা শিক্ষনীতি-২০১২ এবং এর আলোকে তৈরীকৃত কওমী মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৩ এর খসড়া বাতিল করতে হবে।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ এর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গঠিত ৯ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ও কমিটির সকল কার্যক্রম বাতিল করতে হবে।

যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার নামে কওমী মাদরাসার স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্রতা বিলুপ্ত হয় এমন কোন সিদ্ধান্তগ্রহণ থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে।

পুরান ও নতুন মক্তব হাফেজিয়া ও কওমী মাদরাসা স্থাপন ও পরিচালনা সরকারী নিবন্ধনের আওতামুক্ত থাকতে হবে।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন: শাইখুল হাদীস মাওলানা আশরাফ আলী, আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, শায়খুল হাদীস মাওলানা তাফাজ্জুল হক হবীগঞ্জী, মাওলানা মোহাম্মদ তৈয়ব জিরী, মাওলানা মুফতী মোহাম্মদ ওয়াক্কাস, শায়খুল হাদীস মাওলানা নূর হোছাইন কাসেমী, মাওলানা জোনাইদ বাবুনগরী, মাওলানা আব্দুল মালেক হালিম, মাওলানা আনোয়ার শাহ, মাওলানা মোস্তফা আযাদ, মাওলানা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস ফরিদাবাদ, মাওলানা আবুল কালাম, মাওলানা আব্দুল হামীদ পীর সাহেব মধুপুর, মাওলানা মোবারক উল্লাহ বি-বাড়িয়া, মাওলানা আতাউল্লাহ হাফিজ্জী, মাওলানা হিফজুর রহমান, মাওলানা নূরুল ইসলাম খিলগাঁও, মাওলানা সাজেদুর রহমান, মাওলানা মাওলানা আবুল কালাম, মুফতী মীযানুর রহমান সাঈদ, মাওলানা সলীমুল্লাহ নাজীরহাট, মাওলানা আব্দুর রহমান হাফিজ্জী, মাওলানা মাহবুবে ইলাহী উজানী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, মাওলানা আনোয়ারুল করীম যশোর, মাওলানা নূরুল হুদা ফয়জী, মাওলানা তাজুল ইসলাম পীর সাহেব ফিরোজ শাহ, মুফতী ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা উবায়দুর রহমান মাহবুব, মুফতী কুতুব উদ্দীন নানুপুরী, মাওলানা ইসমাঈল নূরপুরী, মাওলানা জোনায়েদ আল হাবীব, মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মুফতী হাবীবুর রহমান ফেনী, মাওলানা আব্দুল্লাহ সাভার, মাওলানা ইসমাঈল কিশোরগঞ্জ, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা আব্দুল আওয়াল, মাওলানা আব্দুল কাদের না:গঞ্জ, মাওলানা ফয়জুল্লাহ সন্দীপী, মাওলানা লোকমান মাযহারী ও মাওলানা আযহারুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া সম্মেলনে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত উপস্থিত বিশিষ্ট উলামায়ে কেরামের নাম ঘোষনা করা হয়।

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, মাওলানা মাহফুজুল হক ও মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। বেফাক সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফীর লিখিত বক্তব্য পাঠ করে শুনান মাওলানা মুনীর আহমদ। সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ বলেন, বেফাকের মাধ্যমে সকল বোর্ডভুক্ত দাওরায়ে হাদীসের সনদের মূল্যায়ন করে ধর্মীয় ও সকল ক্ষেত্রে কওমী সনদধারী আলেমদের সংযুক্ত হওয়ার পথ উন্মূক্ত করার দাবী করেন। তারা দাওরায়ে হাদীসের সনদধারী তরুন আলেমদের জন্য সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে আরবী ও ইসলামী বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স, মাষ্টার্সসহ উচ্চতর গভেষণার সুযোগ অবারিত করার দাবী করেন। তারা কওমী ছাত্রদের জন্য পরিবহনে অর্ধেক ভাড়াসহ সাধারণ শিক্ষার ছাত্রদের জন্য প্রযোজ্ঞ সকল সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবী করেন।

নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, খোৎবা বাধ্যতামূলক করে সরকার মসজিদ সমূহকে নিয়ন্ত্রন করতে যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে একইভাবে কওমী মাদরাসা নিয়ন্ত্রনে সরকার ব্যর্থ হবে। তারা বলেন, সরকারী আলেম ফরীদ-রুহুলদের সাথে কওমী উলামাগণ নেই। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষার জন্যই তারা সরকারের মাধ্যমে তাদের পছন্দনীয় একটি কমিশন গঠন করে তাদের নেতৃত্বে কওমী সনদের স্বীকৃতি ঘোষণার পায়তারা করছে। এদেশের কওমী উলামায়েকেরাম এদের চক্রান্ত প্রতিহত করবে। সরকার যদি ফরীদ-রুহুলদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে কওমী শিক্ষা ধারা নিয়ন্ত্রনের উপর হাত দিতে চায়, তাহলে হিতে বিপরীত হবে। নেতৃবৃন্দ সরকারকে কওমী স্বীকৃতি বিষয়ক চক্রান্ত থেকে সরে আসার আহবান জানান।