মঙ্গল শোভাযাত্রা সাধারণ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে
মঙ্গল শোভাযাত্রা সাধারণ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে

মঙ্গল শোভাযাত্রা সাধারণ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে

খন্দকার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ


এ বছর মঙ্গল শোভাযাত্রায় তেমন বেশি মানুষ হয়নি। মানুষের চেয়ে পুলিশই বেশি হয়েছে। ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ১লা বৈশাখ ১৪২৬ তারিখের দৈনিক কালের কন্ঠে একজন অংশ গ্রহণকারী বলেছেন “আগে এখানে ভিড়ে দাঁড়ানো যেত না। এবার মানুষ অনেক কম। তার চাইতে পুলিশ অনেক বেশি। মঙ্গল শোভাযাত্রায় মানুষের চাইতে পুলিশের সংখ্যাই বেশি। মনে হচ্ছে এটা পুলিশের শোভাযাত্রা”।

১৫ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক জনকণ্ঠ লিখেছে “অতিমাত্রায় কড়াকড়িতে উৎসবের স্বাভাবিক ছন্দ ম্লান”।

১৫ এপ্রিলের দৈনিক সমকাল লিখেছে “কড়া নিরাপত্তায় বর্ষবরণ উৎসব ম্লান”।

কেউ কেউ বলছেন কড়া নিরাপত্তার কারণে মানুষ কম হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে হিন্দু সংস্কৃতির জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ ঘটানোর ব্যর্থ চেষ্টার ফলে সাধারণ মানুষ এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বয়কট করেছে। মুর্তির ছবি, লক্ষীদেবীর বাহন পেঁচার প্রতিকৃতি, ময়ুরের অবয়ব ইত্যাদি যা হিন্দু ধর্মের পূঁজার অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেগুলোকে বাঙ্গালী সংস্ককৃতি বলে গেলানোর অপচেষ্টাকে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে সচেতন ওলামায়ে কেরাম ও শিক্ষিত মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে অনলাইনে যথেষ্ট লেখালেখি, বক্তব্য-বিবৃতি এসেছে। মানুষ সচেতন হয়েছে। তাই এবার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে।

অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভাল নয়। বাড়াবাড়িরও একটা সীমা থাকা উচিত।

শাহবাগ আন্দোলনও মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে। ভোট দেয়া মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে, তাও অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে। ওলামায়ে কেরামকে জঙ্গি প্রমাণের অপচেষ্টাও মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে। যত বড় শক্তিই ব্যবহার করা হোক না কেন, বাস্তবতাবিবর্জিত কোনো কিছুই মানুষকে বেশি দিন গেলানো যায় না। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। জনমানুষ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত বাস্তবতাবিবর্জিত উল্লেখিত সবগুলো বিষয়েই অতিরঞ্জিত করার পেছনে কিছু মহল তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। এমনকি রাষ্ট্রীয় শক্তি পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছিল এইসব অপচেষ্টাগুলোতে। কিন্তু কই? একটাও ত মানুষকে বেশি দিন গেলানো যায় নি।

বাংলাদেশের ৯০% মানুষ ধর্মপ্রিয় মুসলমান। বাঙ্গালী সংস্কৃতি বলে যা করা হবে তাতে তাদের জীবনাচরণ ও ধর্মীয় রীতিনীতির ছাপ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ধর্ম ইসলামকে ব্যঙ্গ করে হিন্দু সংস্কৃতিকে বাঙ্গালী সংস্কৃতি বলে চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা যে বড় ধরণের বোকামী ছিল তা মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে।

বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের উপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে কারা? তাদের পরিচয় অনেকেই জানেন না। তারা আজিব এক চিজ। তারা সেক্যুলার গোষ্ঠী। তারা মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরিচয় মুছে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক হয়ে যাওয়ার উপদেশ দেয়। আবার নিজেরা হিন্দু সম্প্রদায়ের হোলি ও দুর্গা পূঁজা ইত্যাদিতে অংশ গ্রহণ করে এবং আমাদেরকেও সেখানে আহবান করে। স্লোগান তুলে “ধর্ম যার যার উৎসব সবার”। কিন্তু কোরাবানীর ঈদে সেই স্লোগান তারা ভুলেও কখনো উচ্চারণ করে না। আমি আর আপনি যদি কোরবানীর ঈদে সেই স্লোগান দেই, তারা ভিষণ মাইন্ড করবে। তখন আমাদেরকে তারা উপাধী দেবে সাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ তারা চায় মুসলমান সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় মুছে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক হয়ে যাক। আবার হিন্দু সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ঠিকই ধরে রাখুক এবং আপনি অসাম্প্রদায়িক তা প্রমাণ করার জন্য আপনাকে “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” মেনে নিয়ে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতে হবে। তবেই আপনি অসাম্প্রদায়িক হতে পারবেন।

এই যে মুসলমান সম্প্রদায়কে তাদের ধর্মীয় পরিচয় মুছে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক হবার উপদেশ দেয়া হচ্ছে, আবার হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পূঁজায় অংশ নিয়ে “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলা হচ্ছে, এটা কেন করা হচ্ছে? সাম্প্রদায়িকতা কি শুধু মুসলিম পরিচয়ের মধ্যেই পাওয়া যায়? হিন্দু সম্প্রদায়, বৌদ্ধ সম্প্রদায়, চাকমা সম্প্রদায়ের আলাদা পরিচিতির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পাওয়া যায় না? উল্লেখিত কোনো একটি সম্প্রদায়ই তাদের আলাদা পরিচিতি মুছে দিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের সাথে একাকার হয়ে যেতে রাজি নয়। এ কারণে কৌশলে বাঙ্গালী সংস্কৃতি নাম দিয়ে হিন্দুওয়ানী সংস্কৃতিকে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমদেরকে গেলানোর অপচেষ্টা করেছে এত দিন সেই চিহ্নিত সেক্যুলার সম্প্রদায়টি। তাদের সেই অপকৌশল সাধারণ মানুষ ধরে ফেলতে পেরেছে বলেই তারা মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে দেব-দেবীর ছবি নিয়ে মিছিল করা প্রত্যাখ্যান করেছে।

যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি অবস্থান করে আসা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের জন্য এদেশের সুনাম আছে। সেই সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্যই সেক্যুলার মহলটি বিভিন্ন সময় ধর্মীয় উস্কানী দিয়ে থাকে। পহেলা বৈশাখের সাদামাটা অনুষ্ঠানে হাতি, পেঁচা ও দেব-দেবীর মুর্তি বহণ করে সেটাকে মঙ্গল শোভাযাত্রা নাম দিয়ে তারা সেই অপকর্মটিই করতে চেয়েছিল। লক্ষীদেবীর বাহন পেঁচা। সেই পেঁছা নিয়ে বছরের প্রথম দিনে মিছিল করলে লক্ষীদেবী এসে তাতে বসবেন। এতেই পুরো বছর ভাল কাটবে। মঙ্গল হবে সবার। তাই এর নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা।

হিন্দুরা তাই মনে করে। কিন্তু মুসলিমরা মনে করে তাকদিরের ভাল মন্দের মালিক আল্লাহ। কোনো দেবী নয়। তাই সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ এই যাত্রাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রত্যেক ধর্মের মানুষ তাদের ধর্মের আলোকে যে কোনো উৎসব বা মেলা করুক। কেউ কাওকে বাঁধা দেয়ার কোনো নজির অন্তত বাংলাদেশে দেখা যায়নি কখনো। কিন্তু এক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতিনীতি অন্য সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দিলে ত সমস্যা বাড়বে। তাই যার যার আচার অনুষ্ঠান তাদেরকে স্বাধীনভাবে করতে দিন। কারোটা কারো উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। এতেই রয়েছে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ।

[প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]