শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের নিয়ে অমূলক প্রশ্ন তোলার আগে একটু ভাবুন!

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুনির আহমদ | আল্লামা শাহ আহমদ শফী’র প্রেস সচিব


মুনির আহমদ

মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা গ্রহণ শেষে গত ২৯ অক্টোবর হেফাজত আমীর শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (দা.বা.) দেশে ফিরেন এবং হাটহাজারী পৌঁছাতে রাত প্রায় ৯টা বেজে যায়। পরদিন সকাল ৯টায় জামিয়া প্রধান অফিসে আসেন এবং জামিয়ার শিক্ষাবিভাগীয় ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জরুরী বৈঠক আহবান করেন ত্রৈমাসিক পরীক্ষার তারিখ চূড়ান্তকরণ, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনাসহ জামিয়ার সার্বিক খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য।
 
এর মধ্যে জামিয়ার শিক্ষক-কর্মকর্তাগণ একে একে হযরতের সাথে দেখা করতে আসছিলেন এবং হযরতও সালাম, মুসাফাহা ও মোয়ানাকা করে পৃথক পৃথকভাবে সকলের খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যরা কে কেমন আছে, সেটাও জেনে নিচ্ছেন।
 
বৈঠকের নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট বাকী। এর মধ্যে জামিয়ার শিক্ষক-কর্মকর্তাগণ আসতে শুরু করেছেন। হযরত কোন ভূমিকা ছাড়াই প্রথমে বললেন, “কওমি সনদের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছোট-খাটো মতপার্থক্য ভুলে সকলকে এক থাকার জন্যে কত করে চাইলাম, কিন্তু কারো কারো ভূমিকা তো খুবই হতাশাজনক”। হযরত কারো নাম না নিয়েই এই হতাশা প্রকাশ করে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। এরপর আমার কাছে জানতে চাইলেন, “আজকের পত্রিকায় প্রধান প্রধান কী কী খবর আছে, বল”।
আমি হাতে থাকা দৈনিক ইনকিলাব ও প্রথম আলো থেকে প্রধান প্রধান শিরোনামগুলো পড়ে শুনালাম এবং হযরতের নির্দেশে কয়েকটি সংবাদের বিস্তারিতও পড়ে শুনালাম।
এরপর হযরত সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটা বিষয়ে জানতে চাইলেন-
১। আওয়ামীলীগের কাউন্সিলে দলের কমিটিতে নতুন কে কে এসেছেন এবং কাকে কাকে বাদ দেওয়া হয়েছে?
২। কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা কোন পর্যায়ে এবং এই নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনার সর্বশেষ খবর কি?
৩। পাকিস্তান-ভারত উত্তেজনায় চীনের সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থান কী?
৪। চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে কী কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন?
৫। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের খবর কী? নির্বাচনের কয়দিন বাকী আছে? এবং হিলারী ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় সর্বশেষ কার পাল্লা ভারি?
এর মধ্যে কওমি সনদের বিষয়সহ দেশের আভ্যন্তরীন আরো কিছু বিষয়েও জানতে চাইলেন।
 
আমি একে একে হযরতের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছি, আর ভেতরে ভেতরে বিস্ময়ে অভিভূত হচ্ছি। হযরত দীর্ঘ ১১ দিন মালয়েশিয়ায় চিকিৎসার কাজে ব্যস্ত সময় পার করেছেন, অথচ কত নিখুঁতভাবে দেশের ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির খবররাখবরও মনে রেখেছেন।
নিয়মিত কাজের রুটিন হিসেবে প্রতিদিন সকাল ১০/১১টার পর এক/দেড় ঘণ্টা সময় হযরতকে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা থেকে আভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক খবর পড়ে শুনাতে হয়। প্রায় সময়ই খবর পড়া শেষে হযরত বলেন, আরো কি কি খবর আছে, দেখ। মাঝে মাঝে বলেন, মোবাইলে দেখ, তাজা খবর কী আছে? কখনো হযরত প্রোগ্রামে বাইরে থাকলে অথবা অফিসিয়াল কাজে আমি বাইরে থাকলে হযরত আগের দিনের খবরও পৃথকভাবে জানতে চেয়ে বলেন, “গতকাল পত্রিকায় কী কী খবর ছিল?”
দীর্ঘ ২৩ বছর হযরতের সান্নিধ্যে সময় পার করছি। মিডিয়ায় কাজ করার সুবাদে দেশ-বিদেশের নানা পরিস্থিতি ও খবরাখবর বলা যায়, নখদর্পনে। অথচ, জামিয়া পরিচালনা ও বুখারী শরীফের দরসদানের গুরু দায়িত্বের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম, বেফাকের কাজ, দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎদান এবং বিভিন্ন মাদ্রাসা, ইসলামী সংগঠন ও উলামায়ে কেরামের নানা পরিস্থিতি ও সংকটের সমাধান দেওয়াসহ আরো শত কাজে হযরতকে ব্যস্ত থাকতে হয়।
আমি অবাক হয়ে দেখি, এত শত ব্যস্ততার মধ্যেও হযরত কত নিখুঁতভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবরা-খবর রাখেন এবং গুরত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। হযরত চুপচাপ খবর শুনেন। কখনো কখনো হালকা মন্তব্য করেন। কিন্তু দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে হযরতের কোন কোন মন্তব্য ও নিখুঁত ব্যাখ্যায় রীতিমতো অভিভূত হয়ে যেতে হয়।
 
মাঝে মাঝে আমার ঘনিষ্ঠ কোন কোন ফেসবুক বন্ধুর পোস্ট বা দূর-দুরান্তের কেউ কেউ হয়তো মুহাব্বত ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে, অথবা নিছক হযরতের অবস্থানকে ছোট করার জন্যে আড়ালে আবড়ালে বলার চেষ্টা করেন, “এই বয়সে হযরত তো বরকত হিসেবেই আছেন। এই বয়সে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার / হেফাজত পরিচালনার / বেফাক পরিচালনার / কওমি সনদ নিয়ে কথা বলার বা সার্বিক পরিস্থিতি উপলব্ধিতে নিয়ে বিভিন্ন সংকট সমাধানে হযরতের শরীরিক সমর্থ বা হুঁশ-জ্ঞান কতটা থাকতে পারে!”
 
হযরতের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা নিয়ে ফেসবুক বুদ্ধিজীবীদের এধরণের উক্তির পোস্ট দেখার পর অথবা কারো কাছে নানা আলাপচারিতায় আত্মম্ভরিতায় ভোগা কোন কোন নেতৃবৃন্দের হযরত সম্পর্কে বালখিল্য উদ্ধৃতি শোনার পর মনে মনে উপহাসের হাসি দেওয়া ছাড়া আর কিউ বা করার থাকে?!
 
সুতরাং যে কোন শীর্ষ ব্যক্তিত্বের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজেকে বোকা হিসেবে সাব্যস্ত করছেন না তো, একটু ভাবুন!!! মনে রাখতে হবে, শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা নিজেদের মেধা, দক্ষতা ও অধ্যাবসায়ের মধ্য দিয়েই শীর্ষস্থানে পৌঁছেন এবং অবস্থান ধরে রাখেন। আপনি মন্তব্যকারীর সার্বিক জ্ঞান ও মেধা যদি এতই বেশি থাকত, তবে আপনিই তো শীর্ষস্থানে থাকবার কথা!