আরাকান মুসলমানদের হাত ছাড়া হলে বাংলাদেশের জন্য বিপদ আছে

মীর ইদরীস
মাওলানা মীর ইদরীস

মায়ানমারের আরাকান অঞ্চলে বিগত কিছুদিন ধরে মুসলমানদের ওপরে অমানবিক জুলুম-নির্যাতন চালানো হচ্ছে। যদিও বহু বছর ধরে মায়ানমার সরকার মুসলিম নিধন করে চলেছে, কিন্তু ইদানীং কালে অতীতের চেয়ে অনেকগুন বেশী জুলুম হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদগুলোতে এসেছে। এইসব বিষয় নিয়ে ইনসাফের বিশেষ প্রতিনিধি আলাউদ্দিন বিন সিদ্দিকের সাথে কথা হয়ছে হেফাজতে ইসিলমের কেন্দ্রিয় নেতা,বাংলাদেশ খেলাফত আনদলনের যুগ্ম মহাসচিব  মাওলানা মীর ইদরীসের সাথে।

ইনসাফ : মায়ানমার সরকারের দাবি রোহিঙ্গা মুসলিমরা সেদেশের অধিবাসী নয় এবিষয়ে আপনার মতামত কি?

মীর ইদরীস : এটা মিথ্যে কথা কারণ ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় যে হাজার বছর ধরে মুসলমানদের অধিনে ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা ওই অঞ্চল শাসন করত। গত শতকের মধ্যভাগে ইংরেজরা যখন ভারত ছেড়ে যায় তখন-ই মূলত এই অঞ্চলে অস্থিরতা শুরু হয়, এবং এই অস্থিরতার বীজ ইংরেজরাই বপন করে যায়। অনেকটা ফিলিস্তিনের মত।

ইনসাফ: এই হত্যাযজ্ঞ কার সার্থে হচ্ছে বলে মনো হচ্ছে আপনার?

মীর ইদরীস : এই অস্থিরতাকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে পশ্চিমাদের স্বার্থের কারনে। ভৌগলিক ভাবে আরাকান অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, এছাড়াও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল আরাকান। মূলত এ কারনেই তারা এই অঞ্চলে অস্থিরতাকে পুষে রাখছে।

ইনসাফ: এবিষয়ে পশ্চিমা বিশ্ব এবং জাতিসংঘের ভুমিকা কেমন মনে হচ্ছে?

মীর ইদরীস : খেয়াল করবেন, পশ্চিমারা সব সময় রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে। পশ্চিমাদের খেলার পুতুল জাতিসংঘ দায় সারা বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দিতে বললেও মায়ানমার সরকারকে কার্যত তেমন কোন চাপ দেয়নি বললেই চলে। এ থেকেই বুজা যায় আসলে তারা আন্তরিকভাবে চাইছে না যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলা গণহত্যা বন্ধ হোক।
এছাড়াও আপনি খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে, পশ্চিমা স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট এন.জি.ও গুলোও পশ্চিমাদের মিত্র আমাদের দেশের এক মাত্র শান্তিতে নোবেল জয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস সাহেব ও তার ইউনুস সেন্টার আরাকানের নির্মম এই হত্যাযজ্ঞের কোন রকম প্রতিবাদ না করে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। আমরা জানি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত আরাকানিরা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসের ভাষায় কথা বলেন। তিনি কি তাদের আহাজারি শুনেন না?

ইনসাফ : আরাকানে মুসলিম নিধনে যদি রাজ্যটি মুসলমানদের হাত ছাড়া হয়ে যায় তাহলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে বলে আপনি আশংকা করেন?

মীর ইদরীস : যদি কোন কারনে যদি আরাকান মুসলমানদের হাত ছাড়া হয়, তাহলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্যেও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি আমাদের দেশের অখণ্ডতায়ও আঘাত আসতে পারে।

আপনি জানেন, আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের সিংহভাগ উপজাতি বৌদ্ধরা পশ্চিমা এনজিও-র প্রলোবনে ইতিমধ্যেই খৃষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। যদি আরাকানেও মুসলিম শূন্য হয়ে যায়, এবং বৌদ্ধরাও সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়, তাহলে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল, আরাকান ও ভারতের বেশ কিছু অঞ্চল নিয়ে দক্ষিণ সুদানের মত ‘জুমল্যান্ড’ তথা এই অঞ্চলে একটি খৃষ্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবার পথ সুগম হবে। যা পশ্চিমাদের স্বপ্ন।

দ্বিতীয়ত যেহেতু চিনের সাথে মায়ানমারের সম্পর্ক ভালো, তাই আশংকা থেকে যায় যে বাংলাদেশও ভারতকে চাপে রাখার জন্য চিন মায়ানমারের এই অঞ্চলটাকে অর্থাৎ আরাকানকে ব্যবহার করে কৌশলগত শুবিধা নিতে পারে, যা আমাদের দেশের জন্য মঙ্গলজনক নাও হতে পারে। আমি আগেই বলেছি বিভিন্ন দিক থেকে আরকান একটা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

ইনসাফ : ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আরাকানের মুসলমানরা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভুমিকা কি হওয়া উচিৎ বলে মনে করছেন?

মীর ইদরীস :প্রথমত মানবিক কারনে আমাদের সরকার ও জনগণের উচিৎ আরাকানের মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। সীমান্তের ওপারে আমাদের ভাই-বোনদের নির্মম ভাবে হত্যা করা হচ্ছে, তাদের ঘরবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ মাদরাসাগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, এবং ভরা আমন মৌসুমে ফসল ঘরে তুলার সময় তা জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর আমরা এই পারে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকব, এটা গুরুত্বর অমানবিক।

আমাদের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আরাকান মুসলমানরা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিলো, তারা আমাদের স্বাধিকার সংগ্রামে আমাদের পাশে থেকেছে। যার কারনে স্বাধীনতার স্থপতি মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে কক্সবাজার লাল দিঘীর মাঠে এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘আরাকান আমাদের মুসলমানদের’।
এবং স্বাধীনতাকামীদের সাহায্যে-সহযোগিতা করা আমাদের সাংবিধান স্বীকৃত বিষয়।

ইনসাফ : মায়ানমারে মুসলিম নিধন ইস্যুতে মুসলিম বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক শক্তী গুলোর ভুমিকা কেমন হওয়া উচিৎ?

মীর ইদরীস : আমি মনে করি মুসলিম বিশ্ব এবং মানবতাবাদী সকল আন্তর্জাতিক শক্তী গুলোর উচিৎ মায়ানমারকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ধর্ম-কৃষ্টি- কালচার ও যাবতীয় নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। অথবা রোহিঙ্গাদের স্বাধীনতার আন্দোলনে সহযোগিতা করে তাদের নিজস্ব দেশ গড়তে সাহায্য করা।

এবং গনতন্ত্রের মুখোশ পরা চরম মুসলিম বিদ্ধেষি অং সাং সূচির শান্তিতে পাওয়া নোবেল পুরস্কার বাতিল করার জন্য আবেদন করা।