ইন্ডিয়া টুডের এক্সক্লুসিভ ভিডিও: মারধরের এক পর্যায়ে প্যান্ট ভিজে যায় কানাইয়ার

রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতারের পর জেএনইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি কানাইয়া কুমারকে পুলিশ হেফাজতে মারধর করা হয়। এমনকি মারধরের এক পর্যায়ে তার পরনের প্যান্টও ভিজে যায়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কানাইয়াকে দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টে হাজির করা হয়। আদালতে তোলার আগে কোর্ট চত্বরে পুলিশের উপস্থিতিতেই কানাইয়া কুমার ও উপস্থিত সাংবাদিকদের মারধর করেন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সমর্থক আইনজীবীরা। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিজেপি সমর্থক আইনজীবী বিক্রম চৌহান। কানাইয়াকে চড় মারতে নিজেদের গর্বের কথাও জানান তারা। যার অনেকগুলো বিষয় ধরা পড়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের ক্যামেরায়।

Vikram-Singh-Chauhan--Yashpal-Singh-and-Om-Sharma
আদালত চত্বরে কানহাইয়ার ওপর হামলার ঘটনায় প্রধান তিন অভিযুক্ত বিজেপি সমর্থক আইনজীবী বিক্রম চৌহান, ইয়াশপাল সিং এবং ওম শর্মা

ইন্ডিয়া টুডে’র অনলাইনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ হেফাজতের মধ্যেই ন্যাক্কারজনকভাবে কানাইয়াকে মারধরের ঘটনা স্বীকার করছেন উচ্ছ্বসিত এসব আইনজীবীরা। এই আইনজীবীদের কাউকেই এখনও গ্রেফতার করা হয়নি।

ওই হামলার ঘটনায় তিন প্রধান ব্যক্তি বিজেপি সমর্থক আইনজীবী বিক্রম চৌহান, ইয়াশপাল সিং এবং ওম শর্মা। তাদের নেতৃত্বেই ১৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টে কানাইয়া ও সাংবাদিকদের ওপর ওই বর্বরোচিত আক্রমণ চালানো হয়।

আদালত চত্বরে কানাইয়ার ওপর হামলার ঘটনায় প্রধান তিন অভিযুক্ত বিজেপি সমর্থক আইনজীবী বিক্রম চৌহান, ইয়াশপাল সিং এবং ওম শর্মা।

প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে এটা পরিষ্কার যে, কানাইয়ার ওপর আদালত প্রাঙ্গনে ওই হামলা কোনও স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা ছিল না। বরং সেটা ছিল পুরোটাই পূর্বপরিকল্পিত। কথিত রাষ্ট্রবিরোধীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্যই ওই ঘটনা ঘটানোর পরিকল্পনা করা হয়।

ওই হামলার বিশদ অনুসন্ধানের জন্য আক্রমণের মূল হোতাদের সঙ্গে কথা বলেন ইন্ডিয়া টুডে’র স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম। প্রথমেই কথা হয়, প্রধান অভিযুক্ত হরিয়ানার ৩৮ বছরের আইনজীবী বিক্রম চৌহানের সঙ্গে কথা বলেন ইন্ডিয়া টুডে’র স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম। আলাপচারিতায় আদালত প্রাঙ্গণে এমন ঘটনা ঘটানোর কারণে তার মধ্যে কোনও অনুশোচনা দেখা যায়নি। বরং ওই ঘটনায় তাকে বেশ উচ্ছ্বসিত মনে হয়েছে।

bbcd-Kanhaiya-kumar-02ইন্ডিয়া টুডে’র সঙ্গে আইনজীবী বিক্রম চৌহানের কথোপকথন নিচে তুলে ধরা হলো:

বিক্রম চৌহান: আমরা ওই ছেলেকে তিন ঘণ্টা ধরে মারধর করেছি।

ইন্ডিয়া টুডে: আপনি?

বিক্রম চৌহান: তাকে।

ইন্ডিয়া টুডে: কাকে? রিপোর্টার নাকি কানাইয়া?

বিক্রম চৌহান: আমরা তাকে ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলতে জোর করেছি।

ইন্ডিয়া টুডে: তিনি কি সেটা বলেছেন?

বিক্রম চৌহান: তিনি সেটা বলেছেন। আমি তাকে সেখান থেকে যেতে দিতে পারি না।

ইন্ডিয়া টুডে: তিনি কি এটা বলেছেন যে, ‘ভারত মাতা কি জয়?’

বিক্রম চৌহান: হ্যাঁ। তিনি বলেছেন, ‘ভারত মাতা কি জয়’। তাকে তাকে দিয়ে এটা বলিয়েছি। তিন ঘণ্টা ধরে আমরা তাকে মারধর করেছি। এতে তার প্যান্ট ভিজে যায়। আমরা তাকে ব্যাপক মারধর করেছি।

ইন্ডিয়া টুডে’র সঙ্গে আরেক আইনজীবী ইয়াশপাল সিং-এর কথোপকথন:

ইন্ডিয়া টুডে: আপনি কি এটা আবারও বলবেন যে, তাকে যখন আদালতে তোলা হয় তখন আপনি কি করছিলেন?

ইয়াশপাল সিং: আমরা তাকে ছাড়বো না। তাকে আমরা মারধর করতেই থাকবো। আমি পেট্রোল বোমার সাহায্য নেবো। আমার বিরুদ্ধে কি মামলা করা হয় সেটা বিষয় না। তাকে আমি ছাড়বো না, যদি আমার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগও আনা হয়। আমি জেলে যাবো। আমার সাক্ষাতকারে আমি বলেছি, গ্রেফতার হলে আমি জেলে যাবো। আমি একই জেলে যেতে চাই। কানাইয়ার সেলে গিয়ে তাকে আরও মারধর করতে চাই।

ইন্ডিয়া টুডে: সেলের ভেতরে?

ইয়াশপাল সিং: হ্যাঁ। আমি তার সেলে যাবো এবং সেখানে গিয়েই তাকে মারধর করবো। সম্ভবত আমি জামিন চাইবো না। এক থেকে দুই দিনের জন্য আমি জেলে যাবো।

ইয়াশপাল সিং: আমরা সাংবাদিকদের মারধর করেছি। জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির (জেএনইউ) অধ্যাপকদের পিটুনি দিয়েছি। সবার সঙ্গেই এটা হয়েছে। আপনি যদি এই দেশে বাস করেন, তাহলে আপনাকে এই দেশ নিয়েই কথা বলতে হবে। এটা আমরা সবাই জানি। তারপর কানাইয়া। আপনাকে সত্যি বলতে গেলে ওই ঘটনায় পুলিশ আমাদের পুরোপুরি সহযোগিতা করেছিল।

ইন্ডিয়া টুডে: পুলিশ আপনাদের সমর্থন দিয়েছিল?

ইয়াশপাল সিং: হ্যাঁ।

Kanhaiya-kumar-05আইনজীবী বিক্রম চৌহানের সঙ্গে আরও কথোপকথন:

বিক্রম চৌহান: দেখুন, এটা যদি ভারত হয় তাহলে এ সমর্থন (পুলিশের) সবসময়ই থাকবে। কিছু লোকজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ)-এর লোকজনও ছিলেন। তারা বলেছেন, স্যার এটা ভালো হচ্ছে। আমি বলেছি, আসুন। তারা বলেছেন, স্যার আমরা ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় আছি… কিন্তু ভালো, ভালো।

বিক্রম চৌহান: দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টে খুব বেশি সংখ্যক আইনজীবী ছিলেন না। সেখানে মাত্র ১০০ থেকে ৫০০ জন আইনজীবী ছিলেন।

বিক্রম চৌহান: আমরা একটি বোমা (প্রতীকি অর্থে) নিক্ষেপ করেছিলাম। সেখানে বাইরের অনেক ছেলেরা ছিল। অনেককেই ডাকা হয়েছে। আমি ফেসবুকে লিখে তাদেরকে আসার জন্য অনুরোধ করেছি। এখন আমাদের কিছু করতে হবে। বড় কিছু।

ইন্ডিয়া টুডে: বলুন।

বিক্রম চৌহান: না, এখনও চিন্তা করে দেখিনি। তবে এটা ঘটবে।

ইন্ডিয়া টুডে: কিন্তু এটা কি পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে?

বিক্রম চৌহান: ক্ষুদিরাম বসুর বয়স ছিল ১৭। ভগত সিং-এর বয়স এমনকি ২৩ পর্যন্ত ছিল না। আমরা যা করেছি, ভালোই করেছি।

অভিযুক্তরা গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি দিলেও এর আগে আদালত প্রাঙ্গনে কানাইয়াকে মারধরের খবর নাকচ করে দিয়েছিলেন দিল্লির পুলিশ কমিশনার বি এস বাস্যি। গত সপ্তাহেই তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি না কানাইয়াকে পেটানো হয়েছে। সেখানে খুব ধাক্কাধাক্কি হচ্ছিল। আমরা আগে থেকেই ধাক্কাধাক্কি হবে বলে ধারণা করেছিলাম। তাই ব্যাপক পুলিশি পাহারায় তাকে সেখানে আনা নেওয়া করা হয়েছে। আমাদের কর্মকর্তারা তার খেয়াল রেখেছেন। কানাইয়াকে পুলিশ সদস্যরা ঢেকে রেখেছিলেন।’

উল্লেখ, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ মঙ্গলবার ভারতের পার্লামেন্টে হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত আফজাল গুরুকে ২০১৩ সালে ফাঁসিতে ঝোলানোর বর্ষপূর্তি পালন করেন ভারতের জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটির একদল শিক্ষার্থী। এ সময় তারা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ স্লোগান দেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে বিজেপি নেতা মহেশ গিরি ও বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপি’র করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি কানাইয়া কুমারকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে