বিজয়দিবস: বাংলাদেশ ও ভারতের বিপরীত-ভাবনা

বিজয়দিবস: বাংলাদেশ ও ভারতের বিপরীত-ভাবনা

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

আজ ১৬তম ডিসেম্বর, ২০১৬: বাংলাদেশের ৪৫তম বিজয়দিবস। ১৯৭১ সালের এইদিনে বাংলাদেশ পাকিস্তানী শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র-যুদ্ধ শেষে চূড়াণ্ত বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা অর্জন করে। আমাদের দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের যাত্রায় আমরা জেনেছি, শিখেছি ১৯৭১ সালে এদেশের মুক্তিপাগল মুক্তিযোদ্ধা-জনতা সকল ক্ষেত্রে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এদেশের মাটিতে লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করে। আমাদের ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলো, পাঠ্যবইগুলো এই সবকই দিয়ে এসেছে পরম্পরায়। স্মর্তব্য, ১৯৭১ সালে প্রতিবেশী ভারত এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে মূলত রাজনৈতিক কারণে। অবশ্য এটাও ঠিক যে, ভারত সেদিন বাংলাদেশ থেকে আশ্রয় নেয়া অসংখ্য শরনার্থীকে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে মানবিক সাহায্যের পথকে করে রেখেছিলো উম্মুক্ত। বাংলাদেশের সেসব মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা ভারতে গিয়েছিলেন পিতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের প্রশিক্ষণ নিতে তৎকালিন ভারত-সরকার তাঁদেরকে সশস্ত্র-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমি আগেই বলেছি, ১৯৭১-ভারতের অংশ গ্রহণের মৌলিকভিত্তি ছিলো রাজনৈতিক। সেদিক থেকে তৎকালিন ভারতীয় প্রশাসন বরাবরই আগাগোড়া সেই বিন্দুকে কেন্দ্র করে তাদের পরিধিকে সচল রাখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী অব্যাবহিত পরে এদেশে ভারতীয় সেনার উপস্থিতি বজায় রেখে সেই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর একটি দীর্ঘস্থায়ী ভিটা রাখতে সচেষ্ট ছিলো ইন্দিরা গান্ধীর সরকার। কিন্তু তাদের বাড়াভাতে পানি ঢেলে দেন শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এসে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে প্রথম বৈঠকে সেনা সরিয়ে নেয়ার সরাসরি অনুরোধ করে। অন্যথায়, আজো এ দেশের মাটিতে ইরাক-আফগানিস্তানের মতো ভারতীয় সেনাঘাঁটি পালতে হতো। সেদিনকার পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের তাৎক্ষণিক সাহসিকতার কারণে একদিকে যেমন নবস্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশ বিদেশী সৈন্যমুক্ত হয় তেমনি নতুন রাজনৈতিক যাত্রার পথ সুগম হয়। একজন প্রয়াত বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা( নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না) সেদিনকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে লিখেছিলেন: বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন ইন্দিরা গান্ধীকে বলে ভারতীয় সেনা সরিয়ে না দিতেন তবে এদেশের স্বাধীনতার যে কী অবস্থা হতো তা মনে করে গা শিউরে ওঠে। শেখ মুজিবুর রহমানের এই দেশপ্রেমী সাহসিকতাকে অবশ্য সহজভাবে নেয় নি তৎকালিন ভারত-সরকার। ভারতীয় বিভিন্ন লেখায় সেই বিষয়টি উঠে এসেছে এভাবে যে, সৈন্য সরিয়ে নিয়ে ভারত বিরাট ভুল করেছিলো। সেই থেকে ভারতীয় প্রশাসনে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে প্রথম নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর উদ্ভব হয়। বলাবাহুল্য, শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনে একজন মুসলিম লীগের কর্মী হিসেবেই বেড়ে উঠেছেন যা তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লে বোঝা যায়। সঙ্গত কারণে, তৎকালিন এই পূর্বপাকিস্তানের ভূখণ্ডের প্রতি তার যে দরদ ছিলো তা ফুটে ওঠে সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীকে সেনা প্রত্যাহারের অনুরোধের মধ্য দিয়ে।

বলছিলাম, আমাদের ৪৫তম বিজয়দিবস সম্পর্কে। বিজয়দিবসের প্রেক্ষাপটের সাথে যদিও ভারত জড়িত কিন্তু বিজয়দিবসের অাভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গীতে বাংলাদেশের সাথে ভারতে বিপরীত অবস্থান দৃশ্যমান। আমরা যেখানে বলছি ১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ-মুক্তিযুদ্ধ, ভারত সেখানে বলছে পাক-ভারতযুদ্ধ। আমরা যখন বলছি একাত্তরে এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এদেশের স্বাধীনতা এনেছিলো, ভারত তখন বলছে : ৭১-এ ভারত পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলো। আমাদের ব্যাখ্যায় যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা প্রধান হয়ে এসেছে অন্যদিকে ভারতের ব্যাখ্যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা প্রধান হয়ে ওঠে নি, প্রধান হয়ে উঠেছে ভারতীয় সেনাদের শৌর্যবীর্য আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের সৈন্যক্ষয় ও বিজয়। বিষয়টি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তীকালে এতো প্রকট ছিলো না। এটা প্রকট হয়ে ওঠে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদের সরকারের আমল থেকে। তখন থেকেই ১৬তম ডিসেম্বর কোলকাতায় ধুমধামের সাথে পালিত হয় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক বিজয়দিবস যেখানে বরাবরই উপেক্ষিত থাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ নিয়ে এখানকার আওয়ামী প্রশাসন আর আওয়ামী ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবিরা কিন্তু একদম নীরব। যেন কিছু বলাটা কবীরা গুনা’র সামিল। এখন প্রশ্ন হলো: এমন হচ্ছে কেন? এর মূল কারণ আমি আগেই বলে এসেছি। বলেছি, ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের অংশ গ্রহণ মূলত রাজনৈতিক। ভারত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানকে ভাঙ্গার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। এটা অনস্বীকার্য সত্য। ভারত তার বহুল পরিচিত ‘নেহরুত্ত্ব’র বাস্তবায়নে তৎকালিন পূর্বপাকিস্তানকে খণ্ড করার সার্বিক চেষ্টা চালিয়ে গেছে। এরপর ভারত স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশকে ‘মৈত্রীচুক্তি’র নামে গোলামীচুক্তি আর অর্থনৈতিক দাসত্বের মাধ্যমে ভারতের অলিখিত অঙ্গরাজ্য বানানোর সব কলকাঠি নাড়তে থাকে। কিন্তু বাধ সাধে ‘৭৫-র ১৫তম আগস্টের ঘটনা। অভিযোগ ওঠে, সেই পটপরিবর্তনের মধ্যে সিআইএ’র সাথে ভারতও সক্রিয় ছিলো। কারণ ভারত চাইছিলো তাদের দৃষ্টিতে স্বাধীনচেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবর্তে একজন ভারতপন্থী অনুগতকে ক্ষমতায় বসাতে। এমনিতেই বাংলাদেশের মাটি থেকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য হওয়ায় ভারত ক্ষুব্ধ ছিলো। খুব সম্ভবত ভারতের প্রথম পছন্দ ছিলো তাজুদ্দীন আহমদ এবং পরবর্তীতে খালেদ মোশাররফ। কিন্তু দু’জনেই নিহত হওয়াতে ভারতের পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং পরিস্থিতি সিআইএ’র নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাজুদ্দীন আহমদ যে ভারতঘেঁষা সেটা শেখ মুজিবুর রহমান বিলক্ষণ জানতেন। তাই শেখ মুজিবুর রহমান তাজুদ্দীন আহমদকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। বিষয়টি তাজুদ্দীন আহমদের ডায়েরির বয়ান থেকে আঁচ করা যায়। যাই হোক, সেটা ভিন্নবিষয়।

বিজয়দিবস নিয়ে ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশ-ভারতের এই বিপরীত মেরুকরণের একটা সুদূরপ্রসারী দিক আছে। এখানে গোপন করে রাখা হয়েছে একটি গভীর ষড়যন্ত্রমূলক সাংস্কৃতিক ও মানসিক আগ্রাসনের বিকাশ ও বিস্তৃতি। বলাবাহুল্য, বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার একটি সূক্ষ্ম ভারতবান্ধব সরকার। আমার এখনো মনে আছে, খুব সম্ভবত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় আমল হবে। সনটা এ মুহূর্তে সঠিক মনে পড়ছে না। সে বছর শেখ হাসিনা ভারতে যান রাষ্ট্রীয় সফরে। সেই সফর উপলক্ষ্যে বিবিসি হিন্দী একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে ভারতের কুটনীতিক বীণা সিক্রিও উপস্থিত ছিলেন যিনি বাংলাদেশে কাজ করেছিলেন। বীণা সিক্রিকে সেই অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হযেছিলো: শেখ হাসিনার সফর থেকে ভারত কী পরিবর্তন চায়। জবাবে বীণা সিক্রি বলেন: ভারত এই সফর থেকে প্রধানত দু’টো বিষয় পেতে চায়। এক. বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সংস্কার এবং বাংলাদেশের তরুণসমাজের মধ্যে ভারত সম্পর্কে ইতিবাচকতা সৃষ্টি। বীণা সিক্রিকে প্রশ্ন করা হয়, সেনা এবং তরুণসমাজের মধ্যে ইতিবাচকতা সৃষ্টি কীভাবে সম্ভব? তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ভারতে প্রশিক্ষণ দেবে আর তরুণদের ভারতে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেবে। এতে উভয় ক্ষেত্রে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটবে। আসলে বাংলাদেশের তরুণসমাজ আর সেনাসমাজ নিয়ে ভারতের খুব দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা আছে। সেটার-ই একটা অংশ হলো মনো-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। ভারত আমাদের তরুণসমাজে এই বীজ রোপণ করতে চায় যে, ১৬তম ডিসেম্বর একটি বৃক্ষ যার একটি শাখা ভারতে আর অন্যটি বাংলাদেশে। এই বৃক্ষের মূলকাণ্ড ভারতে। কারণ তাদের কথায় ভারত না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। অথচ ৭ম নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের সময় নিহত খালেদ মোশাররফ স্পষ্টভাবে বলে গিয়েছেন: যুদ্ধের পরিস্থিতি যেখানে গিয়ে দাঁড়ায় তাতে ভারত সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যেতো। কারণ, সেই সময় মুক্তিযোদ্ধরা পাক-বাহিনীকে প্রায় পুরোপুরি পর্যুদস্ত করে ফেলেছিলো। সেদিনকার যুদ্ধরত অনেক পদস্থ সামরিক মুক্তিযোদ্ধারাও স্বীকার করেন যে, মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় টের পেয়ে ভারত শেষ সময়ে সৈন্য পাঠিয়ে কৃতিত্ব আত্মসাৎ করে। যাই হোক, যুদ্ধে ভারতের সৈন্যপ্রেরণকে ভারত মূল নিয়ামক হিসাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে আসছে প্রথম থেকেই। এই বিষয়টি ভারত আমাদের তরুণসমাজে ঢুকাতে বদ্ধপরিকর। একশ্রেণীর আওয়ামী লেখক ভারতের হয়ে এ বিষয়ে নির্লজ্জ ওকালতি করে যাচ্ছে। ভারত চাইছে, তরুণসমাজ তাদের ধারণাটা গ্রহণ করলে একসময় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবগাঁথা গৌণ আকার ধারণ করবে। প্রধান হয়ে দেখা দেবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের বিজয় এবং ভারতনির্ভর বাংলাদেশের স্বাধীনতার নতুন ইতিহাস ও মনন। সময়ের পরিক্রমায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথভাবে ১৬তম ডিসেম্বরে বিজয়দিবস পালন করবে পাক-ভারতযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে নয়। সেদিন হয়তো আমাদের তরুণেরা বলবে এই বিজয়দিবসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত যুদ্ধে জিতেছিলো। আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় স্বাধীন হয়েছিলো বাংলাদেশ। এই নতজানু মানসিকতার দ্বার উম্মোচিত হলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে তার স্বাধীনতা হারাবে যদিও কাগজের স্বাধীনতাই সম্বল হবে কপালে। এটাই হচ্ছে ভারতের গোপন সাংস্কৃতিক ও মানসিক আগ্রাসন যা এখানে প্রবিষ্ট করানোর চেষ্টা চলছে ভেতর এবং বাইরে থেকে। তাই আমাদের তরুণদের চাই দেশপ্রেমী সচেতনতা এবং সঠিক ইতিহাসের সন্ধান। অন্যথায় রোহিঙ্গাদের নির্মমভাগ্য এই জনপদে বরণ করতে হবে। এটাই হোক আজকের বিজয়দিবসের সব চাইতে প্রাসঙ্গিক ভাবনা।