বিজয় দিবসের ভাবনা

বিজয় দিবসের ভাবনা


মুনির আহমদ
লেখক- প্রেসসচিব : হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী।


দুঃখ-বেদনা-আনন্দে উদ্বেল ছিল, আচ্ছন্ন ছিল প্রতিটি মানুষ। অর্গলবদ্ধ মানুষ হঠাৎ মুক্তির আনন্দে যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিক সতর্কতাও যেন কাউকে স্পর্শ করতে পারছিল না। দিনটি ছিল বিজয়ের। বিজয় দিবস। এমন দিন স্বাধীন জাতির জীবনে একবারই আসে। তাই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চায় প্রতিটি জাতি। আর এ দিনটি কালের পরিক্রমায় আসে আত্মজিজ্ঞাসার ক্ষণ হিসেবে; এমন কি, হিসাব-নিকাশের সময় হিসেবে।

আজ ৪৫ বছরে এসে তাই বহু প্রশ্ন জাগছে। বিতর্কের ঝড় বইছে। চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে কতখানি গরমিল? কে করল তা? প্রশ্ন উঠছে, যারা অভূতপূর্ব ঐক্যের মাঝ দিয়ে, অপরিমিত ত্যাগের মহিমায় বলীয়ান হয়ে স্বল্পতম সময়ে শত্রুকে পরাজিত করেছিল, ছিনিয়ে এনেছিল তাদের আকাঙ্খিত মুক্তি, তারা সেই ঐক্য ও ত্যাগের কথা কেন ভুলে গিয়ে বিভক্তির পথে চলতে শুরু করল? কেন দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারল না এবং স্বপ্নের উন্নতির সিঁড়িপথে চলতে পারল না?

যারা স্বজনকে হারিয়েছিল, তাদের স্বাভাবিক দুঃখ-বেদনা ছিল। তারা আশায় বুক বেঁধেছিল সুদিনের। যারা বিজিত হয়েছিল, তারাও এই কাতারে ছিল। তবে বিজয়ে সবাই আনন্দিত ছিল এ জন্য যে, ভয়ঙ্কর দিনগুলোর অবসান হয়েছিল। কিন্তু সুদিনের পথের দিশা তো মিলল না। কার জন্য এমন হলো? জনগণ কি ভুল করেছিল তাদের নেতা নির্ধারণে? কারণ, পথের দিশা তো দেখায় দিশারী, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাহলে কি পথ বাতলাতে তারা পারেনি? বাংলাদেশের ৪৬তম বিজয় দিবসে এ প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি করে ঘুরেফিরে আসছে।

এ প্রশ্নগুলো আসছে এ জন্য যে, দেশের মানুষ দেখল, যারা তাদের সুখের দিনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আত্ম ও স্বার্থত্যাগ দাবি করেছিল, সেসব নেতা-দিশারীরা নিজেদের আত্ম তো দূরের কথা, স্বার্থও বিন্দুমাত্র ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল না। বরং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে দলবাজি করেছে, মানুষের কণ্ঠরোধ করেছে, জনগণকে বিভক্ত করেছে, রক্তের হোলি খেলছে যখন ইচ্ছে তখনই। জনগণ অবাক বিস্ময়ে দেখল, যারা বহুল আলোচিত ২২ পরিবারকে উৎখাত করে সুষম শাসনের কথা বলল, তারা সোনার মুকুট পরিয়ে সন্তানদের বিয়ের পিঁড়িতে বসাচ্ছে তখন, যখন মানুষ ক্ষুধার্ত, স্বজন হারানোর যন্ত্রণাকর বেদনায় গুমরে কাতরাচ্ছিল। জনগণ দেখল, এসব নেতা তাদের সম্পদ দখল করে নিচ্ছে নানা অপবাদ দিয়ে, নানা ছুতোয়। আর অর্থের পাহাড় গড়া ও ভোগ-বিলাসিতায় হাবুডুবু খাচ্ছে। সে সাথে সংবাদমাধ্যমকে শৃঙ্খলবদ্ধ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার সাথে সাথে জনগণের ঐক্যকে নিজ স্বার্থে ব্যবহারের লক্ষ্যে বিভক্তির রাজনীতি প্রচলন করে নিজেদেরই বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকার সূচনা করল। এ জনবিভক্তির রাজনীতি আজ বহু শীর্ষ সর্পদানবে পরিণত হয়েছে। যার অমোঘ পরিণতিতে নতুন বিভক্তির রাজনীতি জন্ম নিয়ে এখন ডালপালা গজানো শুরু হয়েছে।

মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, তাহলে স্বাধীনতার সুখ কি শুধু জনগণ ও নেতৃত্বের একাংশের জন্য এবং তা নির্ধারণ করবে বাইরের শক্তিগুলো? জনগণ আরো অবাক বিস্ময়ে দেখল, তাদের বিশ্বাসের কথা, সুখ-দুঃখের কথা, পছন্দ-অপছন্দের কথা তারা বলতে পারছে না। বিশ্বাসী বলে পরিচয় দিলে ক্ষমতাবানরা তাদের অপবাদ দিচ্ছে, তাদের অপাংক্তেয় করার চেষ্টা করছে। অথচ এরাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্বাসের। বলেছিল কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক আইন-কানুন হবে। তারা জনগণকে বলেছিল, ধর্মের নামে তাদের ধোঁকা দেয়া হচ্ছে। অথচ তারা এমন দিনের জন্য তো সর্বোচ্চ ত্যাগ করেনি। জনগণের ওপর সূক্ষ্ণ চাপে সৃষ্টি করা হলো তাদের সংস্কৃতি, সংস্কার, জীবনধারা পালটে ফেলার। সে সাথে বিজাতীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার জোর চেষ্টা চলছে। এর ফলে দেখতে হচ্ছে ব্যাপক নৈতিক অবক্ষয়। এ ধারায় সন্তানদের নাম পরিবর্তনেরও হিড়িক পড়ে যায়।

জনগণ বিশ্বাস করেছিল, গণতন্ত্র আসবে যেখানে তাদের মতামতের মূল্য থাকবে। এরা শুনেছিল স্লোগান, যাতে বলা হয়েছিল, “জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা করা হবে”। অথচ যারা এ স্লোগান দিলো, তারাই দখল করে নিলো সে অধিকার এবং যোগ হলো পেশিশক্তি ব্যবহারের নতুন মাত্রা। জনগণ দেখল, বহুমত প্রকাশের অধিকার নিষিদ্ধ হলো এবং যতটুকু গণতান্ত্রিক অধিকার তাদের ছিল, তাও হারিয়ে ফেললো। স্বাধীনতালগ্নে যারা নেতৃত্বের দাবিদার হলেন, তাদের ক্ষমতা-সম্পদ বাড়ল, কিন্তু জনগণের বঞ্চনার ইতিহাসের ইতি হলো না।

বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে প্রতি বছর। প্রতিবারই একই প্রতিজ্ঞা, সিদ্ধান্ত, সংকল্প নেয়া হয়। তা হলো জনগণের কল্যাণ, সব অবিচার-অনাচার নির্মূল, দুর্নীতির কণ্ঠরোধ, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার প্রসার। স্বাধীন মানুষের যা পাওনা, তা নিশ্চিত করার। অথচ যারা এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছেন, তারাই ভুলে গেছেন তাদের অঙ্গীকারের কথা। তাদের সে প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দেয়ার আর সুযোগ মিলেনা জনতার।

বাংলাদেশের আজকের বিভ্রান্তি, অশান্তি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে হলো, সত্য বলার ওপর অলিখিত ভীতিকর নিষেধাজ্ঞা। অথচ সবাই জানে, অন্ততঃ ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত ছিল বা আছে, আসল সত্যটা কী? বাংলাদেশের কতগুলো মৌলিক ও বুনিয়াদি বিষয়ের সত্য তথ্য জনগণের কাছে আজো স্বচ্ছ করে তুলে ধরা হয়নি। বরং সেসব বিষয়ে জনগণের মাঝে ছড়ানো হয়েছে বিভ্রান্তি। তারা সবাই সত্য বলতে ভয় পাচ্ছে। বাংলাদেশের বয়স যেহেতু প্রায় চার দশক ছুঁই ছুঁই, তাই কোনো কোনো কায়েমি গোষ্ঠী ভাবছে এসব মৌলিক বিষয়ে জীবন্ত সাক্ষীদের বিদায় নেয়ার পালা এসেছে। তরুণ প্রজন্ম তাই থেকে যাবে বঞ্চিত সত্য তথ্য থেকে। আর বিভ্রান্তির অশান্তি দূর হবে না। যদিও বলা হয়, ইতিহাস সাক্ষী। কিন্তু তখন কেবলই সাক্ষ্য দেবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় রোমান সাম্রাজ্য ছিল, গ্রিক সাম্রাজ্য ছিল, ওসমানীয় সাম্রাজ্য ছিল। কিন্তু কখন তার বাঁক ঘুরে গিয়েছিল, তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। কারণ, তখনো শাসক সত্য তথ্য প্রকাশে বাধা দিয়েছে। তবে এখন একটি আশার কথা, তথ্য এখন চাইলেও সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা সম্ভব নয়- যদি না মানবসমাজের একাংশকে নিশ্চিহ্ন না করা হয়।

বাংলাদেশের ৪৬তম বিজয় দিবসে বলা যায়, জাতির কাঠামো আজো শক্তভাবে তৈরি হয়নি। এ কাজে প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিরা নিজেরাই কখনো সচেতন ছিলেন কি না সন্দেহ। কারণ, জাতিকে কাপড়ের সাথে তুলনা করা যায়। এর বুনন সুন্দর হয় যদি প্রতিটি সুতা পাশাপাশি সহাবস্থান করে, একে অন্যকে সাহায্য করে বলেই কাপড়টি শক্ত হয়। জাতির সুতা প্রতিটি মানুষ। জন্মলগ্ন থেকেই নেতৃত্ব সবাইকে এক ডোরে না বেঁধে বরং বিভক্ত করে শাসক হয়েছেন এবং শাসন করেছেন। ফলে পদার্থবিদ্যার সূত্র অনুসারে, একে অপরকে দূরে সরাতে গিয়েই জাতির বুননটি দুর্বল থেকে গেছে। যেমন- সেক্যুলারিজম, সমাজতন্ত্রের ধুয়া তুলে জাতিসত্তাকে, তার ভিত্তিকে দুর্বল করার প্রয়াস রয়েছে অব্যাহত। এর সুযোগ নিয়েছে কায়েমি শক্তি, বিদেশী শক্তি বারবার। আর যারা এদের প্রতিহত করতে পারত, তারাই বরং এদের ধারক, বাহক হয়েছে; হয়েছে তাদের ক্রীড়নক।

তবে এখনো সময় আছে। এ কথা সবাইকে, বিশেষ করে যারা ক্ষমতায় যেতে চান বুঝতে হবে, স্বাধীনতা থাকলে, স্বাধীন থাকা যায়। দেশ থাকলে দেশের বাসিন্দা হওয়া যায়। একটি অতি প্রচলিত কথা হলো স্বাধীনতা অর্জন কঠিন, আর তাকে রক্ষা করা আরো কঠিন। স্বাধীনতা রক্ষার পরীক্ষা প্রতিক্ষণে হয় সবার, এককভাবে, সমষ্টিগতভাবে। বাংলাদেশের জনগণকে ভাবতে হবে, আমরা এককভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছি কি না প্রতিক্ষণ। দোষারোপের খেলায় হয়তো বা জিতে যাচ্ছি। লগি-বৈঠার রাজনীতি হয়তো সাময়িক বিজয় আনছে। বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হয়তো আচ্ছন্ন রাখছে হৃদয়কে। কিন্তু তা কি স্বাধীনতা রক্ষার কবচ?

এবারের জাতীয় দিবস এসেছে এ দেশের জীবনে আরেকটি পরীক্ষা হিসেবে। এ পরীক্ষা হবে জাতির আগামী দিনের সঠিক পথ অনুসরণ করার পরীক্ষা। সব প্রশ্ন, সব সন্দেহকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে সে পথকে আঁকড়ে ধরতে হবে। ভুল হলে আর তা শোধরানো যাবে না। বার বার কি কোনো সহায়ক শক্তি আসবে, বাংলাদেশের জনগণকে রক্ষা করার জন্য? তারা কি তার জন্য কোনো মূল্যই নেবে না? আর সে মূল্য অবশ্যই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। তা চলে গেলে আমাদের আর রইল কি?