জানুয়ারি ২৪, ২০১৭

অনুপম আদর্শ: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

অনুপম আদর্শ: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |


বুরহান আজিজ
জামেয়্যাহ ৪র্থ বর্ষ :
জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া চট্টগ্রাম


হাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চির প্রশংসিত সত্তা। হে আল্লাহ! পূর্ণ করো তাঁর সমাধি করুণার শিশির ও শান্তির সমীরণে।
তিনি প্রতিটি মুমিন বান্দার আত্মার বান্ধব। এ বন্ধন জীবন্ত সবুজ ও সদা প্রাণময়। আমরা যখন তাঁর নামখানা উচ্চারন বা শ্রবণ করি, সঙ্গে সঙ্গে বলি- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে মানবতার মুক্তির চিরন্তন সওগাত, অফুরন্ত রহমতের প্রদীপ্ত প্রতিশ্রুতি হিসেবে প্রেরণ করেছেন। বলে দিয়েছেন- وما أرسلناك إلا رحمة للعالمين ‘আমি তো আপনাকে জগতসমূহের রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি।’

জীব হোক কিংবা জড়, মানব কিংবা দানব, বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী, ধনাঢ্য কিংবা দরিদ্র, আরবি কিংবা অনারবি, শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত সকলের তরেই তিনি ছিলেন রহমত।

এ ধুলোর ধরায় তাঁর আগমন প্রাক্কাল ছিলো অনাচারীর অভয়ারণ্য। এমন কোনো মন্দ, নির্লজ্জ কাজ ছিলো না যা ঘটতো না এই নশ্বর পৃথিবীতে। জীবন্ত মানুষ পুঁতা থেকে শুরু করে হেন কোনো অন্যায় কাজ ছিলো না যা তারা করতো না।

পৃথিবীর কোথাও ছিলো না সামান্যতম আলো। চারিদিকে জমাটবদ্ধ অন্ধকার। শুভ কল্যাণকর ভালো বিষয়াদি যেনো নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো, চিরতরে মুছে গিয়েছিলো পৃথিবীর মানচিত্র থেকে।

এমন নাযুক ও চরম সংকটে পৃথিবী যখন দিশেহারা কক্ষচ্যুত ঠিক তখনই আল্লাতালা করুণা করলেন, দয়ার দরোজা খুলে দিলেন পৃথিবীর দিকে। প্রেরণ করলেন রাহমাতুললিল আলামিনকে।

যাঁর নিবিড় পরিচর্যায় কোমল স্পর্শে পৃথিবী হয়ে ওঠলো বসবাসযোগ্য। পাল্টে গেলো পৃথিবীর রূপ-বৈচিত্র। ঘন সিয়া কেটে দেখা মিললো প্রভাত কিরণের। আলো জ্বলমলে পৃথিবী। হায়েনারূপ মানুষগুলো বদলে গেলো সোনার মানুষে। এ যে অন্য এক দুনিয়া। নতুন আরেক পৃথিবী। যেনো এক পরশ পাথর তিনি।

আর তা কেনই বা হবে না। মানবিক গুণাবলীর এমন কোনো দিক নেই যা তাঁর মাঝে ছিলো না পূর্ণ মাত্রায়। সকল গুণাবলীর একত্র সমাবেশ ছিলো তাঁর জীবন। যেমন তাঁর জ্ঞান তেমনি গুণ। কী কর্মে কী আদর্শে কোথাও কোনো অপূর্ণতা নেই। নিখুঁত সুনিপুণ তাঁর সবকিছু। যেমন তাঁর ভেতরের সৌন্দর্যে বিমোহিত হতো সকলে, তেমনি বাহ্যিক অবয়ব দর্শন- অবলোকন করতো মুগ্ধ নয়নে। তাঁর দর্শন সাহচর্য লাভ এ তো এক অমূল্য রতন। যে কেউ তাঁকে একবার দেখেছেন বা তাঁর সঙ্গ লাভে ধন্য হয়েছেন হাজার চেষ্টায়ও তিনি তাঁকে ভুলতে বা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারেন নি।

দেখুন হযরত সাহাবায়ে কেরাম রা. এর ভাব ও ভাষায় রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাহ্যিক সৌন্দর্যের অনুপম বর্ণনা, ‘হযরত জাবের ইবনে সামুরা রা. বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবলোকন করছিলাম। তখন তাঁর পরিধানে এক জোড়া লাল কাপড় ছিলো। আমি একবার তাঁর দিকে আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার কাছে মনে হলো, তিনি চাঁদের চেয়েও সুন্দর।’

আরেক হাদিসে ‘হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতই সুন্দর ও স্বচ্ছ ছিলেন যে, মনে হতো যেনো রূপোর উপাদানে তৈরী।’

এতো বাহ্যিক সৌন্দর্যের এক টুকরো বর্ণনা। বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন মানবীয় ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের আধার। আল্লাহ তাআলার ভাষায়, وإنك لعلى خلق عظيم ‘নিশ্চয় আপনি মহৎ চরিত্রের অধিকারী।’

এ চরিত্র বা আখালাকের শান্ত-সৌম্য শক্তির জোরে পুরো পৃথিবী এসে জমেছিলো তাঁর পদতলে। বিপন্ন, বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত মানবতার মেরুদণ্ড সোজা করেছিলেন এ চরিত্র-মাধুর্যের সুকোমল পরশে। কঠিনপ্রাণ শক্তহৃদয় আজন্ম শত্রুরাও তাঁর চারিত্রিক সৌন্দর্যের কাছে অবশ হয়ে যেতো। গলে যেত মোমের মতো।

মানবতার যেকোনো সংকট-অভাবে, শঙ্কায়-হতাশায় তারা যেনো দারস্থ হয় রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম আদর্শের। সে ঘোষনাই ধ্বনিত আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালামে- ‘রাসূলের জীবনে তোমাদের জন্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’
মানুষ মাত্রই সংকট-শঙ্কা, অভাব-হতাশা থাকবেই। তা থেকে বেরিয়ে আসার এবং শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কেবল রাসূলের আদর্শেই নিহিত। এ আদর্শকে পাশ কাটিয়ে যত আদর্শ-বিপ্লব জন্ম নিবে তা কেবল হতাশা আর বিশৃঙ্খলাই বৃদ্ধি করবে। তিনি এমন একজন মানব ছিলেন, যাঁর মহামানব হওয়ার বিষয়টি মুসলিম অমুসলিম সকলেই দ্বিধাহীন স্বীকার করতে বাধ্য এবং করছেনও।
একজন মানুষ জীবনের যে পর্যায়েই থাকুক, যে পেশাই গ্রহণ করুক যদি সে সফল হতে চায়, তাহলে তার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হলেন রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

যদি কেউ একজন আদর্শ বাবা হতে চায়, তাহলে সে যেনো ফাতেমার বাবা মুহাম্মদকে দেখেন। চায় যদি আদর্শ স্বামী হতে, তাহলে খাদিজা-আয়েশার ঘরের ভেতর যেনো জেনে নেয়। চায় যদি একজন সফল ব্যবসায়ী হতে তাহলে সিরিয়া-মক্কার ব্যবসায়ী মুহাম্মদকে অনুসরণ করে। যদি বিজয়ী সেনাপতির ‘বিজয় উৎসব’ উদযাপনের বেনজির আদর্শ দেখতে চায় তাহলে মক্কা বিজয়ী মুহাম্মদ থেকে উত্তম কিছু পৃথিবীর কে কখন কোথায় দেখেছে! যদি একজন ন্যায়-নিষ্ঠাবান, সফল-নিষ্কলঙ্ক রাষ্ট্রপতির সন্ধান পেতে চায়, তাহলে যেনো মুহাম্মদকে অনুরসণ করে। এভাবে একজন আদর্শ শিক্ষক যদি কেউ হতে চায়, তাহলে যেনো পৃথিবীর সোনালিযুগের শ্রেষ্ঠমানুষ হযরত সাহাবায়ে কেরাম রা. এর শিক্ষক মুহাম্মদকে খুঁজে নেয়। যদি কেউ বন্দি নির্যাতিত অসহায় দরিদ্রের করণীয় জানতে চায়, তাহলে মক্কার শিয়াবে আবি তালেবের বন্দি নির্যাতিত অসহায় দরিদ্র মুহাম্মদের আদর্শ অনুসরণ করে।

আপনি সমাজের যে পেশার-শ্রেণীর, ধর্মের-বর্ণের হোন না কেনো আপনার জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।

এর বাইরে আপনি যত বড় আদর্শবাদীই হোন না কেনো তাতে শান্তির নামে অশান্তি ও অরাজকতা, শুদ্ধতার নামে ভণ্ডামি ও মরীচিকার আধিক্য ছাড়া আর কিছুই নেই।

আজ বড় বেশি প্রয়োজন রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত আদর্শের অনুসরণ ও সমাজের সকল স্তরে বাস্তবায়ন।

বিশেষত আমাদের অনুজ প্রজন্মের আত্মায় রাসূলের মু‏হাব্বতের বীজ বপনের ব্যবস্থা করা। তাঁর চারিত্রিক সৌন্দর্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। ব্যাপক পঠন-পাঠন, চর্চা-অনুশীলনের পথ সুগম কর। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে নির্দেশই আমাদেরকে দিয়ে গেছেন।

‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের তিনটি অভ্যাসের দীক্ষা দাও-
১. তোমাদের নবীর মুহাব্বত তাদের অন্তরে গেঁথে দাও।
২. তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে।
৩. কুরআন তিলাওয়াতে সক্ষম করে গড়ে তোলো।’
আসুন, রাসূলের এ নির্দেশ পালন করে রোজ হাশরে হাউজে কাওছার পানে নিজেকে ধন্য করার উপযুক্ত করার প্রয়াস পাই।