মার্চ ২৪, ২০১৭

এসো হে যুবক রাসূলের পথে

এসো হে যুবক রাসূলের পথে

Latest posts by মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী (see all)

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

তুমি কি জানো হে যুবক?

এই পৃথিবী: যেখানে আজ তুমি ফেলে চলেছো তোমার ধুলি-ওড়ানো কদম; যেখানে তুমি বসে ভাবছো তোমার বুকে ঝড়তোলা অজস্র স্বপ্ন; খা’বের স্রোতে যেখানে তোমার যৌবনের উচ্ছ্বাসিত গানে ভেসে চলেছো; যেখানে তোমার উদ্দাম-ঘোড়ার দ্রুততায় পিছু ফেলে চলেছো সকল অতীত–সেই পৃথিবী–সেই জীবন-কানন কেমন ছিলো তোমার নয় কেবল, তোমার পূর্বপুরুষদেরও অনেক অনেক আগে? তুমি কি ভেবেছো কোনদিন? তোমার নেশাক্ত জিন্দেগীর অচেনামোড়ে যখন হারিয়ে ফেলেছিলে সত্যের বন্দেগী তখন কি কখনো ভুলের উচ্ছ্বাসে মনে পড়েছিলো সেই প্রশ্নখানি? হে যুবক, আজ করজোড়ে অনুরোধ করি, বড়ো ব্যথিত-হৃদে তোমার সম্মুখে অঞ্জলী মেলে যাচনা করি একটি সরল আর ছোট্ট আবেদন–নিবেদনের গোসলে যা ধুয়েধুয়ে আজ এনেছি তোমার দ্বারে। ফিরায়ে কি দেবে মোরে? হে যুবক, আমি তোমাকে আত্মসাৎ করতে আসি নি, আসি নি তোমাকে নির্গম কোন পথে হারাতে, আসি নি বিফল, অনর্থক কোন পথের লাগাম ধরে টানাতে। তুমি কেবল তোমার চক্ষুটাকে উম্মোচিত করো, তোমার মেধার দরোজার ফাঁক দিয়ে একবার দেখো কী সওগাত আমি তোমার জন্য নিয়ে এসেছি।

হে যুবক, তুমি ভাবো! অন্তত ক’ফোঁটা ক্ষণের খরচে একটু ধ্যানমগ্ন হও! একদিন এই পৃথিবী ধূসর ছিলো, ধুলিতে নিমগ্ন ছিলো প্রতিটি জনপদ। যুদ্ধবিগ্রহ আর অত্যাচার-অনাচার ছিলো নিত্যসহচর। দূর্বলের ওপর সবলের খবরদারি, মাযলূমের পিঠে জালিমের চাবুক চাপকানোর লেলিহান সংস্কৃতির জোয়ারে তলিয়ে গিয়েছিলো দুনিয়ার তাবৎ মাঠ-প্রান্তর। মানুষে মানুষে বন্দনার বিভৎস কুঠুরিতে বন্দী হয়ে পড়েছিলো তামাম ইনসানিয়্যাৎ। বিমূর্তসত্ত্বার জায়গা দখল করে নেয় মূর্তির প্রহেলিকা। সামাজিক বন্ধনের ছিন্নভিন্ন চিৎকার-ধ্বনি পথ খুঁজে পায় নি কোন আশ্রয়ের। আত্মার রোনাজারিতে চাপা পড়েছিলো মুক্তির আহাজারি। বহুত্ববাদের প্রাসাদ গড়ে উঠেছিলো একত্ববাদের শূণ্যভিটায়। বেকসুর মানবতা বারবার কেঁদে উঠেছিলো একফোঁটা পানির তৃষ্ণায়। মাসুম শিশুকন্যার হৃদয়বিদারী ক্রন্দনধ্বনি চাপা পড়েছিলো জিন্দাকবরের পাষাণ মাটিতে। কেউ ছিলো না মুক্তির দিশারী–মুক্তির কাণ্ডারী।

তারপর, হাজারো নয়, লক্ষ নয় অগণিত আদমসন্তানের আত্মার ক্ষুধা নিবারণে, বনী আদমের হারানোসম্বল ফিরিয়ে দিতে এ বিশ্বের মহান খালিক ও মালিক ধরার বুকে পাঠালেন এক আলোকবর্তিকা; সূর্যের চেয়ে যা আলোকময়; পূর্ণিমার চেয়ে যা স্নিগ্ধময়; শ্বেতপালকের চেয়ে চরিত্রময় এক শিশু। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে; এ মাহাবিশ্বের প্রতিটি গ্রহ-উপগ্রহে, বৃক্ষের প্রতিটি শাখা-পল্লবে, জীবনের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে উঠলো আনন্দের হিল্লোল সানন্দের কল্লোল আর উচ্ছ্বাসের কলরোল। সে-ই একটি নাম, একটি পবিত্রশব্দের গুলজার–‘মুহাম্মাদ’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আলোড়িত হলো পঙ্কিলবিশ্ব, কম্পিত হলো জালিমের তখত্, বাদশাহী-মহল দুলে উঠলো নতুন নেতৃত্বের আধিপত্যরশ্মিতে, সাগরের উত্থালঢেউ থেমে গেলো নবতরীর আগুয়ান-মিছিল অবলোকন করতে। আকাশের তারাগুলো দেখলো জাযীরাতুল আরবের ধুলিকণায় নক্ষত্রের অনির্বাণরশ্মি। জাজ্বল্যমান সূর্য শরমে মাথা নুয়ে দিলো মরুর নতুন সিপাহসালারের জুলফিকারের আলোকচ্ছটায়। মুক্তির নতুনধ্বনিতে–শান্তির প্রগাঢ়বাণীতে চমকে উঠলো এই দুনিয়ার নিগৃহীত মানবতা।

সময়ের চাকা ঘুরলো আপনবৃত্তে। শিশু মুহাম্মাদ কদম বাড়ালেন কৈশরে, কিশোর থেকে যুবকের দহলিজে। যে আরব দেখে নি সভ্যতা; দেখে নি ভব্যতা; শোনে নি মানবতার একটানা সুর, বোধ করে নি শাসক-শাসনের অদম্য ইচ্ছা সেই আরব দেখালো বিশ্বকে আযাদীর মানচিত্র–দেখালো মানবতার অভূতপূর্ব সঞ্চার। যুবক মুহাম্মাদের যৌবন স্রোতের গড্ডালিকা প্রবাহে বয়ে যায় নি মুরুর বুকে; বয়ে গিয়েছিলো আরবীয় সমাজে পুরাতন ভেঙ্গে নতুনসৃষ্টির উদ্দীপনায়। ঝগড়া-বিবাদের সনাতন খোলস উৎপাটন করে সম্প্রীতি আর সৌহার্দের কাননভূমি জেগে উঠলো মক্কার অলিতে-গলিতে। ধৈর্য-সহ্যের ক্ষমতায় পরাভুত হতে থাকলো সকল কৃষ্ণবন্ধন। মক্কার জনজীবন দেখলো এ এক নতুন যুবকের নবযৌবন। কণ্ঠে তাঁর এক নতুন কণ্ঠস্বর। এই স্বর দিন বদলে দেবার উচ্চস্বর। যুবক মুহাম্মাদ’র বয়স তখন চলিশ। অবশেষে হেরার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো মুক্তির অবিচ্ছিন্ন কালাম, অহীর স্পষ্ট আহকাম। যে তাওহীদের অমীয়বাণী ভুলে গিয়েছিলো পথহারা বান্দা, তাদেরি সম্মুখে পেশ করা হলো আল্লাহর একত্ববাদের কাউসার আর অংশীবাদের মূলোৎপাটনকারী শমশীর। অবাক হলো তাবৎজাহান। যুক্তি আর বাস্তবতার অভেদ্য আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হতে থাকলো হাজারো বছরের সনাতন মুর্তির বন্ধন। মানুষ বুঝলো, বিমূর্তসত্ত্বার অকাট্য যৌক্তিকতা। শুরু হলো মুক্তির দুয়ারে নীরব আত্মসমর্পণ। ক্ষেপে উঠলো শাসকের তখত। শত নিন্দা, অত্যাচার, বিচ্ছিন্নতা আর নিন্দুকদের অপকৌশলের ব্যূহ পেরিয়ে অব্যাহত থাকলো আলোর যাত্রা। মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহর এই সুকঠিন পথে সম্বল হয়ে রইল আল্লাহর উপর পূর্ণতাওয়াক্কুল, শপথের দৃঢ়তা আর কুরআনের বাণী। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে, সত্যের জন্যে প্রাণের পিতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে হিজরাত করে চলে গেলেন নবীর শহর মাদীনাতুল মুনাওয়ারায়।

শুরু হলো মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহর পবিত্র-জীবনে এক ব্যতিক্রমধর্মী অধ্যায়। এতোদিনের ধৈর্যের সংজ্ঞায় আনা হলো পরিবর্তন। আসমানী নির্দেশ এলো জিহাদের। নিজেদের প্রতিরক্ষায়, মানবতার মুক্তির মিছিলে জমা পড়লো নতুন হাতিয়ার–জিহাদ। অবাকবিশ্ব তাকিয়ে রয় ইসলামের ঝাণ্ডাতলে মুসলিম-মুজাহিদদের রণযাত্রা দর্শনে। ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে বিদীর্ণ হলো দুনিয়ার তিনভাগ জল আর একভাগ স্থল। মুক্তি পেলো মানবতা; মুক্তি পেলো মানব মানবের দাসত্ব হতে। মহাজনী শোষণ, সুদভিত্তিক বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি ধসে দেয়া হলো। এলো অর্থনৈতিক মুক্তি আর বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজকাঠামো। মদীনার তেইশটি বছরের সংস্কার, সংগ্রাম বিশ্বকে উপহার দিলো শিক্ষা, দীক্ষা আর উন্নত সভ্যসমাজ।

এসো হে যুবক রাসূলের পথে!

হে যুবক, তুমি দূর্বল নও। তুমি অপদার্থ নও। তুমি অসহায় নও। তুমি জাগো, জাগো রাসূলের পথে; যে পথ সংস্কারের; যে পথ পুরাতন ভেঙ্গে নতুন সৃষ্টির; যে পথ জালিমের জিঞ্জির থেকে মাযলূমকে মুক্তি দেবার; যে পথ অন্যায়-অনাচার থেকে সমাজকে মুক্ত করার; যে পথ স্বৈরাচারের প্রাসাদ ভেঙ্গে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার। তুমি নামায পড়বে, কুরআন পড়বে, তাওহীদের কথা বলবে, শিরক আর বিদআতের বিরুদ্ধে আওয়ায তুলবে। তুমি শেষরাতে ক্রন্দনধ্বনিতে খাস-গোলামের বিনয় বিলাবে। তুমি সমাজে শান্তি আনবে, স্বস্তি আনবে। তুমি মানুষকে আল্লাহর পথে ধাবিত করবে। এসো হে যুবক, আজ নতুন শপথে বলিয়ান হও, নতুন প্রত্যয়ে আগুয়ান হও! তুমি নির্যাতিত নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলবে। তুমি নির্যাতিতার পাশে দাঁড়াবে। তুমি শোষিতশ্রেণীর কথা বলবে। তুমি শোষকের চোখ-রাঙানি উপেক্ষা করে শোষকের বিরুদ্ধে কথা বলবে। তুমি ক্ষুধার্তের মুখে তুলে দেবে নিত্যাহার। হে যুবক, তুমি গোলাম নও। তুমি আযাদ-সন্তান। এসো রাসূলের পথে। এসো এ সমাজে সুন্নাতের মিছিলের জাগরণ তুলতে। এ পথ নিঃসন্দেহে জানো রাসূলের সংগ্রামীপথ।