নবীজি (সাঃ) কিসের তৈরী? দলিল ভিত্তিক দন্দের নিরসন

নবীজি (সাঃ) কিসের তৈরী? দলিল ভিত্তিক দন্দের নিরসন

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |


মুফতী আরিফ মাহমুদ হাবীবি
খতিব: শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় কাশিপুর বড় মসজিদ, নারায়ণগঞ্জ
সিনিয়র মুদাররিস : জামেআ কাসেমুল উলূম মাদানীয়া ফতুল্লা- নারায়ণগঞ্জ


চলছে রবিউল আউয়াল মাস, বিশ্বনবী (সাঃ) এর ভূপৃষ্ঠে শুভাগমন ও ইন্তেকালের ঐতিহাসিক স্মরণীয় মাসের নামই রবিউল আউয়াল। জোতিষশাস্রে পারদর্শী বিদগ্ধ উলামাদের এক বিরাট জামাত তাঁর জন্ম নিয়ে দুটি মত প্রকাশ করেছেন, তার একটি হলো আট (৮) অপরটি হলো নয় (৯)। তবে ইন্তেকাল নিয়ে সবাই একমত যে,এ মাসের বার (১২) তারিখই। রাসূল (সাঃ) কে আল্লাহ তায়ালা মানবতার জন্য মেসেঞ্জার করে পাঠিয়েছেন মানব রুপেই। মানুষের হিদায়াতের জন্য কোনো ফেরেশতাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠাননি। কিন্তু আফসোস! একদল বন্ধুরা রাসুলের আদর্শ ব্যতিরেকে নূর আর মাটি নিয়ে কাঁদা ছুড়োছুড়ি।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যেই ষড়যন্ত্র চলছে, তার মূল কারণ এবং সেই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বকে সমাজে-রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করার বিষয় যেখানে এই মুহূর্তে প্রধান আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত, সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয় বাদ দিয়ে তার আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে অনেকে ব্যস্ত। বাংলাদেশে মহানবী (সাঃ) নূরের না মাটির তৈরি আলেম-ওলামাদের মাঝে এ আলোচনা বেশি। এর প্রভাব পড়ছে শ্রোতাদের মাঝে ও। আলেমদের একটি অংশ বিশেষত: এক শ্রেণীর তরিকাপন্থী ওয়ায়েজীন বলছেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হচ্ছেন নূরের তৈরি। অন্যপক্ষ বলছেন তিনি হচ্ছেন মাটির তৈরি। উভয়পক্ষ কুরআন হাদিস থেকে স্ব স্ব সমর্থনে দলিল পেশ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে লিখব লিখব করে ভাবছি। গত ৩রা ডিসেম্বর ফোনে একজন জানালেন যে, তিনি শুনতে পাচ্ছেন, তার পার্শ্ববর্তী গ্রামে একজন ওয়ায়েজ, সূরা আল মায়েদার ১৫নং আয়াতে মুহাম্মদ (সাঃ) যে নূরের তৈরি সে কথা বলা হয়েছে বলে ওয়াজ করছেন। উল্লেখ্য, এ আয়াতটি হচ্ছে ‘‘ক্বাদ যা আকুম মিনাল্লাহী নুরুন ও কিতাবুন মুবিন।’ অর্থাৎ ‘‘আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্যই তোমাদের কাছে ‘নূর’ এবং স্পষ্ট বিধান গ্রন্থ এসেছে’’। নিতান্তই দ্বীনি স্বার্থেই এ বিষয়ে কিছু লিখার প্রয়োজন অনুভব করলাম। এ বিষয়ে কোরআন সুন্নাহ, ইসলামী চিন্তাবিদ ও নিজস্ব বুঝ (Understanding of Islam) অনুযায়ী কিছু লিখার চেষ্টা করছি।

নবী কি ছিলেন?
মহানবী মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) ছিলেন নবী- শেষ নবী। তাঁর পর আর কোন নবী আসবেন না এটাই ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি মানুষ ছিলেন? নাকি ফেরেশতা ছিলেন? যদি মানুষ হয়ে থাকে, তাহলে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, সকল মানুষই আদমের সন্তান আর আদম হলো মাটির তৈরি। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘কুল্লুকুম মিন আদম ওয়া আদম মিন তরাব’’।
তোমরা সকলেই আদম থেকে উদগত আর আদম হলো মাটির তৈরি। এতো গেল সকল মানুষের গঠনতত্ত্ব। প্রতিটি মানুষের গঠনতত্ত্ব বা প্রকৃতি সম্পর্কে আল্লাহর বর্ণনা নিম্নরূপ : ‘‘(হে নবী বলে দিন) নিশ্চিতভাবে আমি (আল্লাহ) মানুষকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি।’’ ‘‘ইন্নি খালেকুল ইনসান মিন ত্বীন’’ (সূরা ছোয়াদ : ৩৮:৭১)।

উপরোক্ত আয়াতে মানুষ বুঝাতে আদম ও ইনছান শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষ বা মানবজাতি বুঝাতে আর একটি শব্দ পবিত্র কোরআনে ব্যবহার করা হয়েছে আর তা হলো ‘বাশার’ (এরাবিক ইংলিশ ডিকশনারী, পৃঃ ৫)।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘‘হে নবী বলে দিন, (ইন্নামা আনা বাশারুন মিসলুকুম) নিশ্চিতভাবে আমি তোমাদের মতই মানুষ’’ I am only a man like you (আল কাহফ : ১৮:১১০) পূর্ব যুগের সকল নবীগণও (বাশার) মানুষ ছিলেন এবং তাদের বর্জন ও অস্বীকারকারীরাও তার স্বীকার করেছেন। যেমন- এ প্রসঙ্গে আল কোরআন বলছে, তারা তাদের নবীদের অস্বীকার করে বলতো তোমরাতো আমাদের মতই মানুষ। নবীগণও বলেছেন- (ইন্না নাহনু ইল্লা বাশারুন মিস্লুকুম তবে আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা তিনি অতি দয়া প্রদর্শন করেন। (সূরা ইবরাহীম, ১৪: ১১-১২)। নবুয়াত বা কিতাব দান কোন (বাশারের) মানুষের কাজ নয় বরং এটি আল্লাহর কাজ। তিনি বলেন, যাকে আল্লাহ কিতাব দিয়েছে তার একথা বলার অধিকার নেই যে, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমার এবাদত কর। (সূরা আল ইমরান, ৩:৭৯)

অতএব আল্লাহর ভাষায় বাশার হলো : মানুষ আর সকল মানুষই মাটির তৈরি। (সূরা আর রহমান, ৫৫:১২, আল হিজর, ১৫:২৬, আল মু’মিনুন, ২৩:১২)।
সকল নবী ছিলেন বাশার। সকল মানুষ আল্লাহর খলিফা। সূরা আল বাকারা ২:৩০, মুহাম্মাদসহ সকল নবীই হচ্ছেন আল্লাহর খলিফা। (Vicegerent)

নূরের তৈরি মানুষ
আল্লাহ সকল কিছুরই সৃষ্টিকর্তা। মানুষ কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুর বহুমুখী ব্যবহার জ্ঞান তাদের দেয়া হয়েছে। যে মানুষকে তিনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, তিনি ইচ্ছা করলে যে কোন কিছু থেকেই তাকে সৃষ্টি করতে পারতেন। কারণ তার ক্ষমতা অসীম। মানুষের সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে আল্লাহ এবং তার রাসূল স্বয়ং বলেছেন, সকল মানুষ এবং মুহাম্মাদ (সা.) নিজেও মাটির তৈরি। আল্লাহর নবীতে বিশ্বাসী কোন মানুষ সচেতনভাবে স্বজ্ঞানে এর বিপরীত বলতে পারেন না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো অনেক মুসলিম তাই বলে থাকেন। তারা বলছেন, মুহাম্মাদ (সা.) নূরের তৈরি। তারা কুরআনের যে কয়টি আয়াত দলিল হিসেবে পেশ করেন তা হলো, সূরা আল মায়েদার ১৫নং এবং আল আহজাবের ৪৫ নং আয়াতদ্বয়। আল মায়েদার আয়াতটি হলো: যে আহলে কিতাবগণ: তোমাদের কাছে আমার রাসূল আগমন করেছেন। কিতাবের যেসব অংশ তোমরা গোপন করতে তিনি তার থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক বিষয় মার্জনা করেন। তোমাদের কাছে এসেছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি এবং একটি সমুজ্জ্বল গ্রন্থ (নুরুন ও কিতাবুল মুবিন)। অর্থাৎ পাপাচারের অন্ধকার দূরীভূতকারী এবং আল্লাহর স্পষ্ট বিধানগ্রন্থ। আহজাবে বলা হয়েছে ‘হে নবী আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়করূপে উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। (‘দায়িয়ান’ ওয়া ‘সেরাজাম’ মুনিরা)।

নূর অর্থ আলো- জ্যোতি। মুনির অর্থ উজ্জ্বল, সেরাজ অর্থ বাতি। সেরাজাম মুনিরা অর্থ উজ্জ্বল বাতি। এ দু’টি আয়াতের সাদামাটা অর্থ হলো তোমাদের কাছে আলো এসে গেছে। আর এসে গেছে উজ্জ্বল বাতি। আলোর কাজ হলো অন্ধকার দূর করা। পবিত্র কুরআনে চাঁদের আলোকে বলা হয়েছে নূর, আর সূর্যের আলোকে বলা হয়েছে ‘দিয়া’। (সূরা ইউনুস: ১০:৫)। অন্ধকার ঘুচানোই আলোর কাজ। জাহেলিয়াতের অন্ধত্বই প্রকৃত অন্ধকার। এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, জাহেলিয়াত দূরীকরণের মহৌষধ হলো দ্বীন ইসলাম। অতএব, সূরা আল মায়েদায় বর্ণিত নূর যে সাধারণ অর্থের নয় এবং তা মুহাম্মাদ (সা.) নন বরং তা ইসলাম, এটিই যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তবও বটে। আল আহযাবে বর্ণিত সেরাজাম মুনিরা (উজ্জ্বল বাতি) দ্বারা মুহাম্মাদ (সা.)-এর গুণাবলী বা দায়িত্ব বুঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে, নবী মুহাম্মদ (সা.) হচ্ছেন সাক্ষী, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী, আল্লাহর নির্দেশের প্রতি দাওয়াতদানকারী এবং আল্লাহর অবাধ্যতাজনিত পাপাচারের অন্ধকার বিদূরিতকারী উজ্জ্বল বাতিস্বরূপ। এ আয়াতদ্বয়ের কোথাও কাউকে নূরের তৈরি বলা হয়নি।

মুহাম্মাদ (সা.)সহ সকল মানুষ মাটির তৈরি, এর সত্যতা কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা (decisively definite evidence) দ্বারা প্রমাণিত। শরীয়তের পরিভাষায় এ জাতীয় প্রমাণকে বলা হয় ‘দলিলে কাতয়ী’। এর অর্থ দালিলে কাতয়ী (অকাট্য দলিল) দ্বারা প্রমাণিত বা প্রতিষ্ঠিত কোন রায় বা সিদ্ধান্ত বা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করতে হলে অনুরূপ কোন দলিলে কাতয়ী ছাড়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে মুহাম্মাদ (সা.)সহ সকল মানুষ মাটির তৈরি। আর ‘মুহাম্মাদ (সা.) নূরের তৈরি’ প্রমাণ করতে হলে কুরআন সুন্নায় এ জাতীয় বাক্য স্পষ্টভাবে থাকতে হবে এবং পূর্বের বাক্যটি পরের বাক্য দ্বারা রহিত (মানসুখ/abrogated) হয়ে যা করে তার প্রমাণ থাকতে হবে। আর কিয়ামতের আগে পরেও কেউ এমন প্রমাণ পেশ করতে পারবে না। নূর পবিত্র কুরআনের ২৪টি নামের একটি নাম। সেরাজাম মুনিরা মুহাম্মাদ (সা.)কে দেয়া আল্লাহর একটি স্নেহময়ী নাম- যেমনটি মোজাম্মিল, মোদাচ্ছির। পবিত্র কুরআনে কিছু কিছু শব্দ ব্যবহার হয় রূপক অর্থে (Metaphoric)। যেমন হামজাতু আসাদুল্লাহ ওয়া আসাদ রাসূলিল্লাহ অর্থাৎ হামযা হচ্ছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিংহ। এখানে সিংহ হিংস্র জানোয়ার অর্থে নয়। বরং অতীব সাহসী হিসেবে বুঝানো হয়েছে। তেমনি মুহাম্মাদ (সা.) হচ্ছেন উজ্জ্বল বাতি। অতএব, এ বাতির সংশ্রবে আসতে পারলেই দূরীভূত হয়ে যাবে যাবতীয় জাহেলিয়াত যুক্ত অন্ধকার।

নূর দ্বারা সমস্ত আসমানি কিতাব এবং ইসলামকেও বুঝানো হয়েছে। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন, নিশ্চিতভাবে আমি নাযিল করেছি তাওরাত তাতে আছে হেদায়েত এবং নূর। (আল মায়েদা, ৫:৪৪, আল নিসা, ৪:৯১)।
অতএব ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসূলের প্রতি এবং নূরের (কুরআন) প্রতি যা আল্লাহ নাযিল করেছেন (আল তাগাবুন, ৪:৮) নূর অর্থ আল্লাহ প্রদত্ত বিধান ও বিধান গ্রন্থ। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘এটি হচ্ছে একটি কিতাব একে আমি নাযিল করেছি, যাতে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে (মিনাজ যুলুমাতে ইলান নূর) আনা যায়।’ (ইবরাহীম, ১৪:১, আল ছাফ ৬১:৮)’। নূর মূলত: আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে আর তিনি নিজেই নূর। যেমন আলোর উপর আলো যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তার আলোর প্রতি পরিচালিত করেন। (আল নূর ২৪:৩৫) (নুরুন আলা নূর-ইয়াহদি ইলা নূরিহী মান ইশায়া)।

নূরের স্পষ্ট বর্ণিত হলেও মুহাম্মাদ (সা.)কে নূরের তৈরি যারা বলেন, তারা বলে থাকেন যে, মহানবীর কোন ছায়া ছিল না, তাঁর পেশাব-পায়খানাও পবিত্র, তার পেশাব পায়খানা বের হওয়া মাত্র মাটি তা গিলে ফেলতো, তাঁকে মৃত ব্যক্তির নিকট স্বশরীরে হাজির করা হবে যাতে মৃত ব্যক্তির মান নাবিয়ুকা প্রশ্নের জবাব দানের সুবিধা হয় ইত্যাদি। এসবের চেয়েও মারাত্মক কথা হলো যেখানে আল্লাহ নিজেই নূর সেখানে মুহাম্মাদ (সাঃ)কে নূরের তৈরি বলার অর্থ হলো তিনিও নূর। আল্লাহ ও নূর, মুহাম্মাদ (সাঃ) ও নূর আল্লাহও শাহেদ মাশুহুম মুহাম্মাদ (সাঃ) ও শাহেদ মাশহুদ, তাহলে দুয়ের মধ্যে আর পার্থক্য থাকলো কোথায়? এ নূরতত্ত্ব আবিষ্কারকগণ আল্লাহর গুণাবলী নবীর প্রতি আরোপ করে আল্লাহ ও নবীকে একাকার করে দিচ্ছেন। যে কাজ আল্লাহর দ্বারাই একমাত্র সম্পাদনযোগ্য তা নবীর দ্বারা সম্ভব বলছেন, তাদের আচরণে, কাব্যে, গানে, সাহিত্যে। যেমন গায়াক বলেছেন, এমন কে আছে যে মুহাম্মাদের দরবার থেকে খালি হাতে ফিরে আসে? ইত্যাদি। মুহাম্মাদ (সাঃ)কে অতি প্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী বানিয়ে তাকে স্রষ্টার আসনে বসানোই এ তত্ত্ববাদীদের মূল লক্ষ্য যা শিরক ছাড়া কিছু নয়। মুসলিমদের মুশরিক বানানোর এ এক গভীর ষড়যন্ত্র-যেমনটা করেছিল পূর্ববর্তী নবীর অনুসারীরা বিশেষ করে ঈসা (আঃ)-এর ক্ষেত্রে। ঈশ্বরের সাথে তুলনা করতে হলে অথবা কাউকে ঈশ্বর বানাতে হলে তার অতি প্রাকৃতিক গুণাবলীর কথা বলতে হবে, তাকে অপরাপর মানবমন্ডলী থেকে ভিন্ন প্রকৃতির দেখাতে হবে। যেহেতু সরাসরি মুহাম্মাদ (সাঃ)কে খোদা বা খোদার পুত্র বলার সুযোগ নেই কুরআনের উপস্থিতিতে সেহেতু নূরের প্রলেপে তাকে আল্লাহ্র নূরের সাথে একাকীভূত করে মুসলিমদের মুশরিক তরিকায় নিয়ে যাওয়ার কৌশল পাতা হয়েছে ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই ইসলামের সুচতুর শত্রুরা তা করে আসছে। এ কাজে তারা সফল। হামদের স্থলে নাতে রাসূলের চর্চার। এতো গেল ইসরাইলি বা ঈসায়ী রেওয়াতের প্রতিফলন। অনুরূপভাবে কুরআন নিয়ে যারা গবেষণায় রত তাদের অনেকেও ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেন আয়োতে মাহকামা ও মোতাশাবিহার পার্থক্য নির্ণয় করতে গিয়ে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট (মোহকামাত) আর কিছু আয়াত রূপক (মোতাশাবিহাত) সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা আছে ফিতনা সৃষ্টি এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে এর মধ্যকার রূপকগুলোর অনুসরণ করে তারা। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘‘বোধশক্তি সম্পন্ন ছাড়া আর কেউ এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না।’’ (আল ইমরান) নূরের নবীর ধারকদের ওয়াজ মাহফিল বক্তৃতা বিবৃতি লিখনী পর্যালোচনা-আলোচনার প্রতিটি বাক্যকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায় যে, ইসলামের কল্যাণ নয় বরং মুসলিম সমাজে এর দ্বারা ফিতনাই ছড়ানো হচ্ছে বেশি, জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়ার স্থলে মুসলিমদের ঠেলে দেয়া হচ্ছে জাহান্নামের কাছাকাছি। স্বল্প শ্রমে জাহান্নাম ভর্তি করার এটা একটা কূটকৌশল যার ফাঁদে পা দিয়েছেন ইসলামের মূল তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞ একশ্রেণীর মুসলমান।

আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে বানোয়াট কথা ও এর পরিণতি অতীব ভয়াবহ। কারণ যিনি যা নয় তাকে তা বলা, যার যে ক্ষমতা তার চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর গণ্য করা, সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকেও অগ্রহণযোগ্য। ইসলামে তা চরম দন্ডনীয় অপরাধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, মানুষ মাটির তৈরি-যদি সচেতনভাবে কেউ বলে তার নূরের তৈরি, এরূপ কথাকে চরম মিথ্যাচার এবং এমন ব্যক্তিকে মহা জালেম হিসেবে আখ্যায়িত করেচে আল কুরআন। (আল কুরআন, আল ছাফ: ৬১:৮)।
মহানবী মুহাম্মাদ (সা) বলেন, যে ব্যক্তি আমার থেকে কোন তথ্য বর্ণনা করে এবং সে জানে যে তথ্যটি মিথ্যা, এমন ব্যক্তি একজন মিথ্যাবাদী’’।
মান ইহাদিসু সাইয়ান ওয়া হুয়া ইয়ালামু হিয়া কিযবুন ফাহুয়া আহাদুল কাজিব।
অপর এক হাদিসে রাসূল আল্লাহ (সা) বলেন, যে ব্যক্তি আমার নামে কোন অসত্য কথাকে হাদিস বলে চালিয়ে দেয়, সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়। অপর এক হাদিসে মহানবী (সা) বলেছেন, আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তোমরা অতিরঞ্জিত করো না। কেননা ঈসা (আঃ) এর অতি প্রশংসা করতে গিয়ে তাকে তারা আল্লাহ্র আসনে বসিয়েছিল।

যেসব ব্যক্তি বা আলেম জেনে বুঝে অথবা যাচাই বাছাই না করে মহানবী (সাঃ) যা নন, তা তার প্রতি আরোপ করেন অর্থাৎ তিনি নূরের তৈরি বলে থাকেন কোন প্রকার দলিলে কিতয়ী ছাড়াই এটা হবে একটা মিথ্যা অপবাদ। পবিত্র কুরআনের ভাষায় এরা মহা জালেম, ফেতনাবাজ ও মিথ্যাবাদী। বাস্তবতাও হচ্ছে তাই। এ জাতীয় ভদ্র লোকদের সমাবেশ থেকে অপরাপর ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও ইসলামী দলের বিরুদ্ধে কুৎসা, মিথ্যা অপবাদ অশালীন বাক্য ছড়ানো হয়। হাব-ভাবে মনে হচ্ছে এই কুৎসা রটনাই যেন হচ্ছে তাদের জীবনের একমাত্র মিশন। এই কুৎসা যদি গীবতে পরিণত হয় তা যদি মিথ্যা অপবাদে পরিণত হয়, তাহলে এর পরকালীন পরিণতি ভাববার সময়ও যেন তাদের নেই। পরিশেষে একরাশ আফসোস! যাদেরকে মহান রব্বে কারিম বুঝ শক্তি দেয়ার পর ও সত্যটা অনুধাবন করতে ব্যার্থ হচ্ছে…।।