কোরআনের অনন্য বাহক সালেম মাওলা আবি হুজাইফা (রা.) | insaf24.com
কোরআনের অনন্য বাহক সালেম মাওলা আবি হুজাইফা (রা.)

কোরআনের অনন্য বাহক সালেম মাওলা আবি হুজাইফা (রা.)

কাজী আবুল কালাম সিদ্দীকহজরত রাসুলে করিম (সা.) একদিন সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা চার ব্যক্তির কাছ থেকে কোরআন শিক্ষা করো। আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ, সালেম মাওলা আবি হুজাইফা, উবাই ইবনে কা’আব ও মুয়াজ ইবনে জাবাল।’ আমরা অনেকেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ, উবাই ইবনে কা’আব ও মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) সম্পর্কে কম-বেশি অবগত আছি। কিন্তু চতুর্থজন কে এই সালেম মাওলা আবি হুজাইফা? যাকে কোরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্ভরযোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন?

তিনি ছিলেন পাতলা গড়নের একজন ক্রীতদাস। মেধা ও প্রতিভার গুণে ইসলাম তাকে আসীন করে সম্মানের কাতারে। হজরত সুবাইতা বিনতে ইউ’য়ার তাকে আজাদ করে দেন। সুবাইতা ছিলেন আবি হুজাইফা (রা.) এর স্ত্রী। সুবাইতা তাকে নিঃশর্ত আজাদ করে দিলে আবু হুজাইফা তাকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। আর হুজাইফা ইবনে উতবা (রা.) ছিলেন বনু আবদে শামসের অন্যতম নেতা ও পরম সম্মানিত ব্যক্তি। মক্কার কোরাইশ সর্দার ইসলামের চির দুশমন উতবার ছেলে হচ্ছেন এই হুজাইফা। তিনি ঘোষণা দিলেন, সালেমকে আমার পালিত ছেলে হিসেবে গ্রহণ করলাম। তখন থেকে সবাই সালেমকে সালেম ইবনে আবি হুজাইফা নামে সম্বোধন করতে থাকে।
ইসলামী দাওয়াতের সূচনালগ্নেই যারা লাব্বাইক বলে সাড়া দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে আবু হুজাইফা ও তার পালিত ছেলে সালেমও ছিলেন। তারা বাবা-ছেলে দুইজনে নীরবে ও বিনীতভাবে তাদের রবের ইবাদত করে চললেন এবং কোরাইশদের নির্মম অত্যাচারের মুখে সীমাহীন ধৈর্য অবলম্বন করলেন। একদিন পালিত ছেলে গ্রহণের প্রথা বাতিল করে কোরআনের আয়াত নাজিল হলো, ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামে সম্পৃক্ত করে ডাকো।’ প্রত্যেক পালিত ছেলে আপন আপন জন্মদাতা পিতার নামে পরিচিতি গ্রহণ করল। যেমন জায়েদ ইবনে মুহাম্মদ হলো জায়েদ ইবনে হারিসা। কিন্তু সালেমের পিতার পরিচয় ছিল অজ্ঞাত। তাই তিনি পরিচিত হলেন ‘সালেম মাওলা আবি হুজাইফা’ তথা আবু হুজাইফার বন্ধু, সাথী, ভাই বা আজাদকৃত দাস সালেম হিসেবে।
মুসলমানদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পর তাদের দ্বীনি ভাই অপেক্ষা অধিক প্রিয় আর কিছু ছিল না। এটা আমরা আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে দেখেছি। তেমনিভাবে দেখে থাকি সম্ভ্রান্ত কোরাইশ আবু হুজাইফা ও তার পিতৃ পরিচয়হীন অজ্ঞাত অখ্যাত দাস সালেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে। জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি তারা ছিলেন একই দেহে দুইটি প্রাণের মতো। একই সঙ্গে থেকেছেন। একই সঙ্গে চলেছেন। জীবন কাটিয়েছেন একসঙ্গে। মৃত্যুও হয়েছে একই সঙ্গে। এটাই ইসলামের সুমহান আদর্শ। তারা গড়তে পেরেছেন ইসলামের ছোঁয়ায় কিংবদন্তি হওয়ার অনুপম কীর্তি।
হজরত সালেমের ঈমান ছিল সিদ্দিকিনদের ঈমানের মতো এবং আল্লাহর পথে তিনি চলেছিলেন মুত্তাকিনদের মতো। সমাজে তার স্থান কী এবং তার জন্ম-পরিচয়ই বা কী সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি। ইসলাম যে নতুন সমাজ বিনির্মাণ করেছিল, সেই সমাজ তাঁর তাকওয়া ও এখলাসের জন্য তাকে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। দৃঢ়ভাবে কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি অধিক সম্মানিত, যে অধিক মুত্তাকি।’
শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরামরাও মানতেন সালেমের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা। সর্বদা প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করতেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকারী সাহাবায়ে কেরাম দীর্ঘ সময় ধরে হজরত সালেম (রা.) এর পেছনে মসজিদে কুবায় নামাজ আদায় করেন। তিনি ছিলেন কিতাবুল্লাহর দলিল। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের তার কাছ থেকে কোরআন শিক্ষা করার নির্দেশ দেন। বিশ্বস্ততা ও কল্যাণের আধাররূপে প্রমাণ মেলে রাসুল (সা.) এর ঘোষণায়। তিনি বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যিনি তোমার মতো লোককে সৃষ্টি করেছেন সেই আল্লাহর জন্য সব প্রশংসা।’ সুমধুর কণ্ঠস্বর এবং বেশি কোরআন হিফজ থাকার কারণে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সালেমকে অত্যধিক সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হতো।
হজরত সালেম (রা.) এর ঘটনা হচ্ছে হজরত বেলাল (রা.) এর মতো আর ১০ জন ক্রীতদাস ও গরিব-দুস্থ সাহাবির মতো। যারা অবর্ণনীয় কষ্ট-নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। আর এক সময় তারা হেদায়েতের সন্ধানকারী ও মুত্তাকিদের ইমাম হিসেবে পরিগণিত হন। সালেম ছিলেন ইসলামের সব গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি। তার দ্বারা পরিবর্তন সাধিত হতো পরিবেশে। সুললিত কণ্ঠের অধিকারী হওয়ায় সহজেই তিনি দ্বীনের পথে মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারতেন। হকের পথে ছিলেন অবিচল। অন্যায়-অবিচার দেখলে মুখ বন্ধ করে রাখা ছিল তার অভ্যাসের বিপরীত।
রাসুলে করিম (সা.) আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। আবু বকরের খেলাফত মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীদের ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হলো। তাদের সঙ্গে সংঘটিত হয় ভয়াবহ ইয়ামামার যুদ্ধ। এমন ভয়াবহ যুদ্ধ এর আগে ইসলামের ইতিহাসে আর সংঘটিত হয়নি। মুসলিম বাহিনী মদিনা থেকে ইয়ামামার উদ্দেশ্যে বের হলো। সালেম এবং তার দ্বীনি ভাই আবু হুজাইফা অন্যদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন। যুদ্ধের প্রথম পর্বে মুসলিম বাহিনী কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে তারা বুঝতে পারে, যুদ্ধ যুদ্ধই এবং দায়িত্ব দায়িত্বই। হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ নতুন করে তাদের সংগঠিত করেন এবং অভূতপূর্ব কায়দায় তিনি বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। প্রথমত যখন মুসলিম বাহিনী পিছু হটে যাচ্ছিল, তখন হজরত সালেম চিৎকার করে আল্লাহর পথে শাহাদাতের ওপর অঙ্গীকার করান। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের দিকে তাদের আহ্বান করতে থাকেন। তারপর উভয়ে শত্রুবাহিনীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আবু হুজাইফা একদিকে চিৎকার করে বলছেন, ‘ওহে কোরআনের ধারকরা, তোমরা তোমাদের আমল দ্বারা কোরআনকে সজ্জিত করো।’ আর অন্যদিকে মুসাইলামা কাজ্জাবের বাহিনীর ওপর তরবারির আঘাত হানছেন। আর একদিকে সালেম চিৎকার করে বলছেন, ‘আমি হবো কোরআনের নিকৃষ্ট বাহক, যদি আমার দিকে শত্রু বাহিনীর আক্রমণ আসে।’ মুখে তিনি একথা বলছেন আর দুই হাতে তরবারি শত্রু সৈন্যের গর্দানে মারছেন।
এক ধর্মত্যাগীর অসির তীব্র আঘাত তার ডান হাতে পড়ল। হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি বাম হাতে পতাকাটি উঁচু করে ধরেন। বাম হাতটিও শত্রুর আঘাতে কেটে পড়ে গেলে পতাকাটি গলার সঙ্গে পেঁচিয়ে ধরেন। এ অবস্থায় তিনি উচ্চারণ করতে থাকেন কোরআনের এ আয়াত, ‘অতীতে কত নবীর সহযোগী হয়ে কত আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিই না যুদ্ধ করেছে। আল্লাহর পথে তাদের উপর যে বিপদ মুসিবত আপতিত হয়েছে, তাতে তারা দুর্বল হয়ে পড়েনি এবং থেমেও যায়নি। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ এই ছিল তার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তের স্লোগান।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মুরতাদদের একটি দল সালেমকে ঘিরে ফেলে। মহাবীর সালেম লুটিয়ে পড়েন। তখনও তার দেহে জীবনের স্পন্দন অবশিষ্ট ছিল। মুসাইলামা কাজ্জাবের নিহত হওয়ার সঙ্গে মুসলমানদের বিজয় ও মুরতাদদের পরাজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। মুসলমানরা আহত-নিহতদের খোঁজ করতে লাগল। সালেমকে তারা জীবনের শেষ অবস্থায় খুঁজে পেল। এ অবস্থায় সালেম তাদের জিজ্ঞেস করেন, আবু হুজাইফার অবস্থা কী?
-সে শাহাদাতবরণ করেছে।
-যে ব্যক্তি আমার দিক থেকে শত্রু বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা করেছিল তার অবস্থা কী?
-শহীদ হয়েছে।
-আমাকে তাদের মাঝখানেই শুইয়ে দাও।
-তারা দুইজন তোমার দুইপাশেই শহীদ হয়েছে।
হজরত সালেম শেষবারের মতো শুধু একটু মুচকি হাসি দিয়েছিলেন। আর কোনো কথা বলেননি। সালেম এবং আবু হুজাইফা উভয়ে যা আন্তরিকভাবে কামনা করেছিলেন, তা লাভ করেন। তারা একসঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন, একসঙ্গে জীবনযাপন করেন এবং একসঙ্গে একস্থানে শাহাদাতবরণ করেন।
হজরত ওমর ইবনি খাত্তাব (রা.) সালেমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। মৃত্যুর আগে খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে বলেছিলেনÑ
‘আজ সালেম জীবিত থাকলে শূরার পরামর্শ ছাড়াই আমি তাকে খেলাফতের দায়িত্ব দিতাম।’

(ড. খালিদ মুহাম্মদ খালিদ প্রণীত ‘রিজালুন হাওলার রাসুল’ আরবি গ্রন্থ থেকে অনূদিত)