ইসলামবিদ্বেষী চক্রের গায়ে জ্বালা ধরেছে : আল্লামা শফী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

হেফাজতে ইসলামের আমীর  শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী

২০১২ সালের পরে স্কুল পাঠ্যবইয়ে নাস্তিক্যবাদি ও বিজাতীয় ধ্যান ধারণার সংযোজিত চরম বিতর্কিত কিছু লেখা বাদ দিয়ে তদস্থলে যুগ যুগ ধরে স্কুল পাঠ্যবইয়ে বিদ্যমান থাকা নৈতিকতা ও আদর্শিক শিক্ষার জনপ্রিয় কিছু গল্প ও কবিতা পুনরায় চলতি সনের স্কুল পাঠ্যবইয়ে সংযোজন করায় ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠীর গায়ে জ্বালা ধরেছে বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন, হেফাজতে ইসলামের আমীর দেশের শীর্ষ আলেম শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

তিনি বলেন, স্কুল পাঠ্যবইয়ের কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনে ইসলামবিদ্বেষী চক্রের গায়ে জ্বালা ধরেছে। আজ (১৪ জানুয়ারী) শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদপত্রে দেওয়া এক বিবৃতিতে হেফাজত আমীর উপরোক্ত মন্তব্য করেন।

হেফাজত আমীরের প্রেসসচিব মাওলানা মুনির আহমদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে হেফাজত আমীর আরো বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রতিবাদের পর সরকারের নীতি নির্ধারকগণ বিষয়টির গুরুত্ব ও নাজুকতা উপলব্ধি করতে পেরে সিলেবাসে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতের দাবী শতভাগ পুরণ করা হয়েছে বলে যারা বিতর্ক তুলতে চাচ্ছে, যারা সাম্প্রদায়িকতার বিষয়বস্তু আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে ইসলামী ভাবধারার গল্প কবিতার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন, মূলতঃ তারাই মুসলমানদের ঈমানী চেতনাবোধ মুছে ফেলে বাংলাদেশে ইসলাম বিদ্বেষ ও নাস্তিকতা ছড়িয়ে দেওয়ার এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। এরা যে শুধুই ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী কার্যকলাপে জড়িত তা নয়, বরং এরা মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধেও হুমকি তৈরি করছে। তারা নানাভাবে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে দেশের বৃহৎ মুসলিম জনসমাজকে বিক্ষুব্ধ করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে আধিপত্যবাদি শক্তির আগ্রাসনের পথ সুগম করতে চায়। পাঠ্যবইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসলাম বিদ্বেষী এই চক্রের বক্তব্য গ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। যারা স্কুল পাঠ্যবইয়ে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তনেও বির্তক তুলতে চাইছে, তাদের ডাকে দেশের একশ জন মানুষও সাড়া দিবে না। এরা সমাজ ও জনবিচ্ছিন্ন। এদেরকে কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে।

হেফাত আমীর আরো বলেন, ২০১৬ সালের ৮ই এপ্রিল হেফাজতে ইসলাম স্কুল পাঠ্যবই নিয়ে এক দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে হেফাজত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে, “দেশের স্কুল-কলেজ ও ইউনির্ভার্সিটিগুলোতে কোটি কোটি মুসলমানের সন্তানকে নাস্তিক্যবাদ ও হিন্দু তত্ত্বের বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। অভিভাবক ও পিতা-মাতা জানেন না, তাদের সন্তানদেরকে স্কুল পাঠ্যবইয়ে কী কী পড়ানো হচ্ছে?”। হেফাজতের এই অভিযোগ ছিল যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। কারণ, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও সংযোজন-বিয়োজনের নিয়ম হচ্ছে, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আদর্শিক নৈতিকতা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতি রেখে এক ধরনের সামাজিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের রীতি এবং নিয়ম অনুসরন করতে হয়। এবং সেই সামাজিক অংশগ্রহণের আলোকে এনসিসিসিতে বা ন্যাশনাল কারিকুলাম কো-অর্ডিনেশন কমিটি পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, ২০১৬ সালেই আমরা বুঝতে পারি যে, ২১০৩ সাল থেকে স্কুল পাঠ্যপুস্তকে একধরণের কাঠামোগত পরিবর্তন হয়ে গেছে। সেখানে দেখা গেছে, যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান থাকা দেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, এমন জনপ্রিয় গল্প ও কবিতাগুলো বাদ দিয়ে সেখানে হিন্দু তত্ত্ব ও নাস্তিক্যবাদি ধ্যানধারণার গল্প ও কবিতা সংযোজন করা হয়েছে। অথচ এই পরিবর্তনের বিষয়ে স্কুল ছাত্রদের পিতা-মাতা বা অভিভাবকরা মোটেও অবগত নন। তখন আপত্তি তোলাটা খুবই যৌক্তিক। গণতান্ত্রিক শাসনে দেশের যে কোন নাগরিকই এমন প্রশ্ন তুলতে পারেন। তখন আমরা এ বিষয়ে আইন সম্মতভাবেই সরকার প্রধান হিসেবে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। ২০১২ সাল থেকে ২০১৩ সালের বইগুলোতে কী কী মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে, তার তুলনামূলক একটা তালিকাও আমরা তুলে ধরেছি। তালিকায় দেখানো হয়েছে যে, ২০১২ সাল পর্যন্ত চলে আসা সিলেবাস পরিবর্তন করে ২০১৩ সাল থেকে স্কুল পাঠ্যবইয়ে এমন ১৭টি রচনা বাদ দেয়া হয়েছে, যেগুলো নৈতিকতা ও আদর্শিকভাবে স্বীকৃত হয়ে আসছে কয়েক যুগ ধরে। তার পরিবর্তে এমন ১২টি নতুন রচনা সংযোজন করা হয়েছে, যেগুলো তাত্ত্বিকভাবে সরাসরি হিন্দুত্ব ও নাস্তিক্যবাদি ধ্যানধারণার সাথে যুক্ত। তবে এর মানে এটা নয় যে, ২০১২ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান থাকা সিলেবাস আমাদের কাঙ্খিতই ছিল। সেই সিলেবাস নিয়েও আমাদের অভিযোগ ও বলার ছিল।

হেফাজত আমীর বলেন, স্কুল পাঠ্যবই নিয়ে আমাদের আপত্তি ও অভিযোগের প্রতি দেশবাসীর সর্বাত্মক সমর্থন ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনও আমাদের দাবীর যৌক্তিকতা স্বীকার ও একাত্মতা প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের নীতিনির্ধারকগণও পাঠ্যবইয়ের এমন পরিবর্তনে বিস্ময় ও উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, হেফাজত কোন রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নয়। হেফাজত অরাজনৈতিক অবস্থান থেকেই জাতীয় স্বার্থ, নৈতিক আদর্শ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় নিয়েই কথা বলে। স্কুল পাঠ্যবই নিয়েও হেফাজত চেয়েছে নৈতিক আদর্শ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতি রেখে সামাজিক চাহিদা অনুপাতে যেন পাঠ্যবই প্রণয়ন করা হয়। গুটি কয়েক দুষ্টুচক্রের ষড়যন্ত্রে হিন্দুত্ব ও নাস্তিক্যবাদি ধ্যান ধারণার শিক্ষা ৯০ ভাগ মুসলিম শিশুদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, তার তো যৌক্তিকতা থাকে না, তা তো মানা যায় না।

বিবৃতিতে হেফাজত আমীর আরো বলেন, স্কুল পাঠ্যবই নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গণতান্ত্রিক শাসনের দায়বদ্ধতা ও জবাবদেহিতা থেকে সরকার যদি ইতিবাচক পরিবর্তন করে, তবে সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এখানে হেফাজতের একার খুশী বা অখুশী হওয়ার প্রশ্ন নয়। আমরা চাই, চলতি সনের স্কুল পাঠ্যবইয়ে কী কী পরিবর্তন হয়েছে, সেটা ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, সামাজিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে যাচাই করে দেখা হোক। আমরা আলেম সমাজও যাচাই করে দেখব। ইতিবাচক পরিবর্তন হলে তো ভাল কথা। ভুল কিছু থেকে গেলে সেটা নিয়েও তো আলোচনা হতে হবে।
বিবৃতিতে হেফাজত আমীর আরো বলেন, স্কুল পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতের দাবী শতভাগ পুরণ হয়েছে বলে যারা বিতর্ক তুলতে চাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ সেই চিহ্নিত গোষ্ঠীকে ভালভাবেই চিনে। এরা সমাজ বিচ্ছিন্ন অতিক্ষুদ্র একটা অংশ; যাদের কাজই হচ্ছে নৈতিক আদর্শ ও ইসলামী চেতনাবোধের বিপক্ষে এবং নাস্তিক্যবাদ ও স্বেচ্ছাচারিতার পক্ষে কথা বলে ভোগবাদি সমাজ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করা। মূলতঃ এরা দেশী-বিদেশী আধিপত্যবাদি শক্তির ক্রীড়নক হয়ে কাজ করে এবং নিজেরা ভোগবাদিতা ও স্বার্থ চরিতার্থ করে। এরা শুধু দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার ক্ষতি করছে তা নয়, বরং তারা ইসলামী আদর্শ ও মুসলিম চেতনাবোধেরও ক্ষতি করছে। এরা ‘ও’ দিয়ে ‘ওড়না’ লেখায় সাম্প্রাদয়িকতা ও অসামঞ্জস্য খুঁজে পায়, কিন্তু ‘র’ দিয়ে ‘রথ টানি’, ‘ত’ দিয়ে ‘তবলা বাজাই’, ‘ঢ’ দিয়ে ‘ঢাক বাজাই’, ‘ঋ’ দিয়ে ‘ঋষি’র মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও অসামঞ্জস্য খুঁজে পায় না।

আল্লামা শাহ আমদ শফী আরো বলেন, হেফাজতের কোটি কোটি কর্মী-সমর্থক বাংলাদেশে উড়ে এসে জুড়ে বসেনি। এটা বাংলাদেশ, মিয়ানমার নয় যে, অং সান সুচির মতো মুসলমানদের ও আলেমদের বিরুদ্ধে যা খুশী বলে পার পেয়ে যাওয়া যাবে। প্রয়োজনে ইসলাম বিদ্বেষী ভোগবাদি এই নাস্তিক্যবাদি চক্রকে উৎখাত করতে আওয়াজ তুলতে হবে। কারণ, এরা বার বার ইসলাম ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে দেশে গোলযোগ ও প্রশাসনিক সংকট তৈরি করে চরমপন্থার প্রতি উস্কানী দিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়।

হেফাজত আমীর স্কুল পাঠ্যবইয়ে হেফাজতের দাবী শতভাগ পুরণ হয়েছে বলে কয়েকটি পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলের উস্কানীমূলক সংবাদ প্রতিবেদন ও চিহ্নিত ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানের সমালোচনা করে বলেন, ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদের মুখপত্রের ভূমিকা বাদ দিয়ে দেশের গণমানুষের মুখপত্রের ভূমিকা পালন করুন। অন্যথায় আপনারাও নাস্তিক্যবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত ও প্রত্যাখ্যাত হবেন।