ইসলাম নির্মূলবাদী চক্র শিক্ষা ও সাংস্কৃতি নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে: আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

হেফাজত মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, স্কুল পাঠ্যবইয়ে কয়েক বছর আগে সংযোজন করা নাস্তিক্যবাদি ও বিজাতীয় ধ্যান ধারণার চরম বিতর্কিত কিছু গল্প-কবিতা বাদ দেওয়ায় ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠীর গায়ে জ্বালা ধরে গেছে।

তিনি বলেন, জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রতিবাদের পর সরকারের নীতি নির্ধারকগণ বিষয়টির গুরুত্ব ও নাজুকতা উপলব্ধি করতে পেরে সিলেবাসে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতের দাবী শতভাগ পুরণ করা হয়েছে বলে যারা ইসলাম বিদ্বেষী উস্কানীমূলক কথাবার্তা বলছেন, যারা সাম্প্রদায়িকতার বিষয়বস্তু আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে ইসলামী ভাবধারার গল্প কবিতার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন, মূলতঃ তারাই মুসলমানদের ঈমানী চেতনাবোধ মুছে ফেলে বাংলাদেশে ইসলাম বিদ্বেষ ও ভোগবাদিতা ছড়িয়ে দেওয়ার এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। এরা নানাভাবে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে দেশের বৃহৎ মুসলিম জনসমাজকে বিক্ষুব্ধ করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে আধিপত্যবাদি শক্তির আগ্রাসনের পথ সুগম করতে চায়। পাঠ্যবইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসলাম বিদ্বেষী এই চক্রের বক্তব্য গ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, যারা স্কুল পাঠ্যবইয়ে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তনেও বির্তক তুলতে চাইছে, তারা সমাজ ও জনবিচ্ছিন্ন। এদেরকে কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে।

আজ (শুক্রবার)  এশিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ও প্রাচীন ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিল ও দস্তারবন্দী সম্মেলনে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

হেফাজত মহাসচিব নামোল্লেখ না করে বলেন, দেশী-বিদেশী কিছু প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া স্কুল পাঠ্যবই নিয়ে ইসলাম নির্মূলবাদিদের মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করে চলেছে। এসব মিডিয়া বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক আদর্শের উপর নানাভাবে আঘাত দিয়ে ও হেয়প্রতিপন্ন করে যাচ্ছে। এসব পত্রপত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে সকলেই চেনেন। তাদের উচিত, ইসলাম নির্মুলবাদিদের মুখপত্রের ভূমিকা পালনের পরিবর্তে বাংলাদেশের গণমানুষের চিন্তা ও আদর্শকে তুলে ধরা। অন্যথায় তারা গণমানুষের রোষাণলে পড়তে সময় লাগবে না।

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, ২০১৩ সালের পর স্কুল পাঠ্যবই থেকে যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান থাকা ১৭টি গল্প ও কবিতা এক সাথে বাদ দিয়ে তদস্থলে হিন্দুত্ব ও নাস্তিক্যবাদি মতাদর্শের নতুন ১২টি গল্প ও কবিতা সংযোজন করা হলো। অর্থাৎ- ২০১৩ সালের পর একসাথে ২৯টি গল্প ও কবিতা পরিবর্তিত হয়ে মুসলমান শিশুদের ঈমান ধ্বংসের এতবড় আয়োজন ঘটে গেল, কিন্তু এখন স্কুল পাঠ্যবই নিয়ে যে বা যারা চেঁচামেচি করছেন, তারা তখন এত বড় পরিবর্তনে টু শব্দটিও করেনি। মূলতঃ তাদের ষড়যন্ত্র ও উৎসাহেই আদর্শ বিরোধী এই বিশাল পরিবর্তন হয়েছিল। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, এটা সকলেরই জেনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশের স্কুল পাঠ্যবইয়ে ইসলাম এবং জাতীয় আদর্শ ও চেতনাবিরোধী কোন লেখা থাকতে দেওয়া হবে না। নাস্তিক্যবাদি ধ্যান-ধারণার এখনো অনেক লেখা ও ছবি রয়ে গেছে, এগুলোও পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি ইসলাম বিদ্বেষী শিক্ষানীতি ও শিক্ষা আইন পরিবর্তন করতে হবে। এখনো স্কুল পাঠ্য বইয়ে ৩০-৪০ ভাগ অমুসলিম লেখকের মুসলিম আদর্শ বিরোধী গল্প কবিতা রয়ে গেছে।

হেফাজত মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, হাইকোর্ট প্রাঙ্গণের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বেষ্টনি দিয়ে আড়াল তৈরি করে গ্রিক দেবীর মূর্তি নির্মাণ চরম নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, ৯০ ভাগ মুসলমান তো নয়ই, বরং হিন্দু, বৌদ্ধরাও আমার জানামতে গ্রীক দেবী থেমিসে বিশ্বাস রাখে না। কোন মুসলমান গ্রীক দেবী থেমিসকে ন্যায়পরায়ণার প্রতীক বিশ্বাস করলে তার ঈমান থাকবে না। এমন বিশ্বাস কুফরী ও শিরকী চিন্তা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই মূর্তি স্থাপনের কোনই যৌক্তিকতা নেই। এটা জনগণের আদর্শিক চিন্তা-চেতনার ঘোরতর বিরোধী এবং বাংলাদেশ থেকে ইসলাম ও মুসলিম পরিচিতি মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র। এই মূর্তি অবশ্যই অপসারণ করতে হবে। অন্যথায় ষড়যন্ত্রকারীদেরকে অবশ্যই গণরোষের প্রতিফল ভোগ করতে হবে।

হেফাজত মহাসচিব বলেন, ইসলাম নির্মূলবাদী চক্র বরাবরই শিক্ষা ও সাংস্কৃতি নিয়েই সবচেয়ে বেশী ষড়যন্ত্র করে আসছে। একদিকে তারা স্কুল পাঠ্যবইয়ে নাস্তিক্য পাঠ যুক্ত ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আদর্শচ্যুত করতে ষড়যন্ত্র করছে, অন্যদিকে তারা দাড়ি, টুপি, হিজাব নিয়ে নানাভাবে বাধা তৈরি ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বিজাতীয় নগ্ন ও ভোগবাদি সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চায়। জনগণের সামনে তাদের এই ষড়যন্ত্রের রূপ ও ধরণ এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে। সনদের স্বীকৃতির নামে খাঁটি ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায়। তিনি বলেন, ওলামায়ে কেরাম ও মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে বুঝতে হবে, সনদের স্বীকৃতি নয়, বরং প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আলেমদের পায়ে শেকল পরানো এবং তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে হরণ করা।

কওমী সনদের সরকারী স্বীকৃতির ইস্যুটা সম্পূর্ণই প্রতারণাপূর্ণ উল্লেখ করে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, সরকারী আলীয়া মাদ্রাসাসমূহের সনদের শতভাগ সরকারী স্বীকৃতি আছে। কিন্তু বড় বড় সরকারী পদে ফাযেল, কামেল পাশ সরকারী আলেমদেরকে নিয়োগ পেতে তো দেখা যায়ই না, বরং কোন প্রাইমারী স্কুলেও শিক্ষকতার পদে কোন আলীয়া মাদ্রাসা শিক্ষিতকে নিয়োগ দেওয়া হয় না। অথচ অনেক প্রাইমারী স্কুলের মুসলিম শিশুদেরকে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বইয়ের ক্লাস নিতে হয় হিন্দু শিক্ষকদের কাছে। এমনকি, আলীয়া মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহেও সকল বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার্জনের সুযোগ রাখা হয়নি। সুতরাং কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদের সরকারী স্বীকৃতি নিয়ে কী অর্জিত হবে? বরং কওমি সনদের সরকারী স্বীকৃতি নেওয়া হবে চরম আত্মঘাতি।