কাকে খুশী করতে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গনে দেবী মূর্তি ? : আল্লামা শফী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গ্রিক দেবির মূর্তি স্থাপনের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সেটা অপসারণের দাবী জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমীর দেশের শীর্ষ আলেম শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

তিনি বলেন, সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সামনে গ্রিক দেবির মূর্তি স্থাপন বাংলাদেশের গণমানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আদর্শিক চেতনার একেবারেই বিপরীত। কোন মুসলমান মূর্তিকে ন্যায় বিচারের প্রতীক বিশ্বাস করলে বা এমন ভাবনা অন্তরে পোষণ করলে, তার ঈমান থাকবে না। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমন মূর্তি স্থাপনের চাহিদা ও সুযোগ, কোনটাই নেই। এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। অবিলম্বে এই মূর্তি অপসারণের দাবী জানিয়ে হেফাজত আমীর বলেন, অন্যথায় ঈমান, আক্বীদা ও ঐতিহ্য রক্ষার লক্ষ্যে মূর্তি অপসারণের দাবীতে প্রয়োজনে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলবে।

আজ (৬ ফেব্রুয়ারী) হেফাজত আমীরের প্রেসসচিব মাওলানা মুনির আহমদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শফী এসব কথা বলেন।

হেফাজত আমীর বলেন, যারা সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গনে গ্রিক দেবির মূর্তি স্থাপন করেছেন, তারা বাংলাদেশের মানুষের মনে হয়তো এমন একটা বিশ্বাস, ভাবনা তৈরি করতে চাচ্ছেন যে, আমাদের বিচারকরা গ্রিক দেবির অনুসারী। দেবির স্বর্গীয় আইন আর আদেশ কার্যকর করাই আমাদের বিচারকদের কাজ। অর্থাৎ- বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং জনগণের বিশ্বাস বা ঈমানের কোনই মূল্য নাই; যেটা এই কোটি কোটি মানুষের কাছে আইন, নীতিনৈতিকতা ও সামাজিক বিধিবিধান উৎপত্তির ক্ষেত্র ও মানদন্ড হতে পারে। গ্রিক দেবিই আমাদের একমাত্র আরাধ্য। পাশাপাশি এই দৃশ্য নিত্যদিন বাংলাদেশের মানুষ দেখবে, যাতে গ্রিক দেবির প্রতি তাদের ভক্তি ও শ্রদ্ধা আরো নিবীড় হবে, এটাই হয়তো তাদের আশা। তাছাড়া গ্রিক দেবী স্থাপনকারীরা থেমিসের গায়ে শাড়ি জড়িয়ে এই দেবীকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য বলে প্রমাণ করারও একটা অপচেষ্টা চালিয়েছেন।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, এটা কেবল সুপ্রিমকোর্টের বিচারক, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে হেয় ও অপমান করা নয়, বরং কোটি কোটি মুসলমানকে ঈমানহারা করার এবং বাংলাদেশের মুসলিম ঐতিহ্য ও পরিচিতি মুছে ফেলার সুগভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।

হেফাজত আমীর বলেন, সরকারের ভেতরে ইসলাম বিদ্বেষী কিছু কুচক্রী ও বিদেশী তল্পিবাহক জেকে বসেছে। তারা জনগণের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে বিদেশী প্রভুদের খুশী করতে সরকারকে ভুল পরামর্শ দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। পাশাপাশি জোর-জুলুম, লুটপাট, অন্যায় আধিপত্য ও ভোগবাদিতা কায়েমের জন্যে তারা ইসলামের ন্যায়-নীতি ও আদর্শিক চেতনাবোধকেই প্রধান বাধারূপে চিহ্নিত করে নানা দিক দিয়ে ইসলাম ও মুসলিম ঐতিহ্যের উপর আঘাত হানতে উৎসাহ যোগাচ্ছে সরকারকে। যার পরিণতিতে বাংলাদেশে জনসংখ্যায় ৯০ ভাগ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানরা নানাভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতায় বাধাপ্রাপ্ত ও অধিকার হারাচ্ছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শ ও চেতনাবোধের উপর একের পর এক আঘাত হানা হচ্ছে। তিনি বলেন, একদিকে দাড়ি, টুপী, হিজাবসহ ইসলামী পোষাক, ধর্মীয় সভা-সেমিনার ও মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা, নানাভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে নাচ-গান, নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, ভোগবাদের নানা আয়োজন, নাস্তিক্যবাদি শিক্ষা ও আদর্শিক ধ্যান-ধারণা ও বিদেশী সংস্কৃতিকে উৎসাহ যোগানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, কার্যতঃ ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আদর্শিক আগ্রাসন চলছে। এমন অপতৎপরতা চলতে থাকলে নিশ্চিতভাবে এক সময় গণঅসন্তোষ থেকে গণবিস্ফোরণ এবং ভয়ানক সংঘাত শুরু হওয়ার আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

হেফাজত আমীর বলেন, বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। ইসলাম ধর্মমতে মূর্তিপূজা এবং মূর্তিকে যে কোন ভাল-মন্দ ও ন্যায়-নীতির প্রতীক রূপে বিশ্বাস করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই কোন মুসলমান গ্রিক দেবী থেমিস বা থেমিসের অনুরূপ কোন দেবিকে ন্যায় বিচারের প্রতীক রূপে বিশ্বাস করলে সাথে সাথে তার ঈমান চলে যাবে। এ পর্যায়ে হেফাজত আমীরের জিজ্ঞাসা, বাংলাদেশের জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, আদর্শিক চিন্তা ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে গিয়ে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাকে খুশী করতে গ্রীক দেবী থেমিসের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে? তিনি বলেন, এই মূর্তি অবশ্যই অপসারণ করতে হবে। সাথে সাথে জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, আদর্শিক ঐতিহ্য ও চেতনা বিরোধী বিজাতীয় এই মূর্তি স্থাপনের ষড়যন্ত্রের সাথে যে বা যারা জড়িত, তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

তিনি সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গন থেকে গ্রিক দেবী অপসারণ প্রশ্নে দেশবাসীর প্রতি সোচ্চার প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটা জাতীয় পর্যায়ে ঈমান-আক্বীদা ও আমাদের ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন। এই বিষয়ে আপোষকামিতার কোনই সুযোগ নেই। তিনি এ পর্যায়ে বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং পরাশক্তি আমেরিকার উদাহরণ টেনে বলেন, প্রতীমা পূজা হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ভারতের সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গনে দেব-দেবির কোন মূর্তি স্থাপন করা হয়নি। অন্যদিকে খ্রীস্টান অধ্যুষিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টে সফল আইন প্রণেতা হিসেবে মুসলমানদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম অঙ্কিত রয়েছে। তিনি বলেন, ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের মুসলমানদের এমন গৌরবময় ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে গ্রীক দেবী থেমিসকে এনে শাড়ি পরাতে হবে কেন? সুপ্রিমকোর্টের সামনে ভাস্কর্য স্থাপন করতে চাইলে সেটা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আদর্শের সাথে মিল রেখেই তো করা উচিত।

তিনি বলেন, বর্তমানে বহুল উচ্চারিত ৭১এর চেতনার কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। ৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধে কঠিন ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তানী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্যে; মুসলিম পরিচিতি ও চেতনাবোধ মুছে ফেলবার জন্য নয়। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, মুসলিম পরিচিতি ও ইসলামী চেতনাবোধ সমুন্নত রাখার উদ্দেশ্যেই তৎকালীন বৃটিশ সাম্রাজ্য থেকে অত্র অঞ্চল বিভক্ত হয়ে স্বাধীন হয়েছিল। হেফাজত আমীর সরকারের প্রতি গুটি কয়েক নাস্তিক ও আধিপত্যবাদি বিদেশী শক্তিকে সন্তুষ্ট করার পরিবর্তে জনগণকে খুশী করার ও তাদের প্রত্যাশা পুরণের লক্ষ্যে সরকার পরিচালনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারের ভেতরে ঝেঁকে বসা ইসলাম নির্মুলবাদীদের ঝেড়ে ফেলে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও হতাশা দূর করুন।