যখন রিপোর্টার ছিলাম

যখন রিপোর্টার ছিলাম

মতিউর রহমান চৌধুরীরিপোর্টারের ডায়েরি লিখতে গিয়ে প্রথমেই আমার অবস্থান পরিষ্কার করতে চাই। আমার কোনো বিশেষ দলের প্রতি আনুগত্য নেই। দল নয়, ভালো কাজের সমর্থন দেই বরাবর। যেমন- যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে বর্তমান সরকারকে সমর্থন দেই। আবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করায় তীব্র সমালোচনা করি। দীর্ঘ ৪৬ বছরের রিপোর্টিং জীবনে নিজেকে ঘটনার একজন পর্যবেক্ষক হিসেবেই দেখতে চেয়েছি। বলে রাখি, সাংবাদিকতায় রিপোর্টাররা হলো রাজা। রিপোর্টার হিসেবে যে মজা পেয়েছি, সম্পাদক হয়ে তা পাইনি। বরং প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত কম্প্রোমাইজ করে চলেছি। সাদাকে সাদা বলতে পারছি না। কেন পারছি না, সচেতন পাঠকেরা সবই জানেন। এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। সময় বদলায়। কৌশলও বদলে যায়। সুদীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে নানা কিসিমের সরকার দেখেছি।

কখনও গণতান্ত্রিক, কখনও একদলীয়। কখনও নির্ভেজাল সেনা শাসন। কখনও আধা সামরিক শাসন। আবার গণতন্ত্রের যুগে নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতাও দেখে চলেছি। নিজে ঝুঁকি নিয়েছি। অন্যকেও ঝুঁকি নিতে দেখেছি। আগে দেখতাম, রিপোর্টাররা ঝুঁকি নিতো। এখন দেখছি সম্পাদকরা ঝুঁকি নিচ্ছেন। কেন এমন হলো তা দেখে শুধু ভাবি, কিন্তু জবাব পাই না। শুরুটা মফস্বল সাংবাদিকতা দিয়ে। তখন সাংবাদিকতা ছিল নেশা। পরে হয়ে গেলো পেশা। তখনই আপস করতে শিখলাম। চাকরি হারিয়েছি একাধিকবার। জেলে গিয়েছি। ডিজিএফআইয়ের অন্ধকার সেলে ১৭ ঘণ্টা কাটিয়েছি।

অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়েছে অন্তত তিনবার। গাড়ি হাইজ্যাক করে টাঙ্গাইলে নিয়ে গিয়ে উল্লাস করার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছি। সরাসরি যুদ্ধ কভার করার সুযোগ হয়েছে। দুনিয়া দেখেছি অনেক কাছে থেকে। ফুটবল দুনিয়ার সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করার অনন্য সুযোগ কয়জনের ভাগ্যে জোটে। ব্রডকাস্টার হয়েছি। টিভি উপস্থাপক হয়েছি। সবই কিন্তু রিপোর্টার থাকার সুবাদে। আর যদি বলেন সম্পাদক হয়ে তাহলে কি কিছুই পাইনি? হয়তো পেয়েছি। তবে আমার বিবেচনায় বিড়ম্বনাটাই বেশি। এই বিড়ম্বনা যে কত কষ্টের তা বলতে বা বোঝাতে পারবো না। একজন সহকর্মী দিনভর খেটেখুটে একটি রিপোর্ট নিয়ে এলেন। যে কোনো বিবেচনায় রিপোর্টটি চমৎকার। রিপোর্টারকে বাহবা দিলাম। জানেন, একটু পরেই বার্তা সম্পাদককে বললাম, এই রিপোর্ট কি যেতে পারে? হেসে দিলেন বার্তা সম্পাদক। অর্থাৎ রিপোর্টটির মৃত্যু হয়ে গেলো। এটা তো নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক সময় বার্তা সম্পাদক নিজেই সিদ্ধান্ত নেন আমাকে না জানিয়েই। আশা করি আপনাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। স্বাধীন বাংলাদেশে এটা কি কেউ ভেবেছিল? যাই হোক, মনস্থ করেছি রিপোর্টারের ডায়েরি লেখার। এখন থেকে নিয়মিত-অনিয়মিত লিখবো।

চোখ রাখুন। দেখুন সাংবাদিকতায় আসা এবং থাকা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ওয়েব দুনিয়ার পাঠকেরা আশা করি প্রতিক্রিয়া জানাবেন। লিখতে সহযোগিতা করবেন। আপনার মতামত আমরা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবো।


যখন রিপোর্টার ছিলাম