সেক্যুলার মনস্তত্বের সংকট

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুফতী হারুন ইজহার চৌধুরী


[বইমেলার ভিতরে-বাইরে আত্মবিস্মৃত বাঙালি মুসলিম তরুণদের জন্য নিবেদিত]

বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যের উপর প্রাধান্য বিস্তারকারী মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানের একটি সংখ্যালঘু অংশ যারা সেক্যুলারিজমের মানসিক রোগে আশংকাজনক পর্যায়ে আক্রান্ত, তারাই সুস্থ সবল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের জন্য অদ্যাবধি দিয়েই চলেছেন মুখরোচক ও শ্রুতিমধুর হরেক রম প্রেসক্রিপশন। প্রতারণার এ কসরৎ এপ্রিল ফুলকেও হার মানায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহমিকায় মত্ত জাতীয়তাবাদী মুসলিম বাঙালির ঔদাসিন্য, সরলতা ও নির্লিপ্ততা এবং চেতনার অবক্ষয় হেতু আমাদের শুনতে হচ্ছে মোরগের অবর্তমানে মুরগীর ডাক। অথচ আমাদের কালচার তো ছিলো ‘প্রভাতফেরির’ আরো বহু আগে সুবহে সাদিকের আজানে জেগে ওঠার কালচার। আমাদের সংস্কৃতি তো ছিল তপ্তরোদে ‘মঙ্গলযাত্রায়’ দাহ্য হওয়ার আগে ফজরের জামাতে সকালের স্নিগ্ধ হাওয়ায় সিক্ত হওয়ার সংস্কৃতি। সূর্যের ‘প্রথম আলো’ বিকিরিত হওয়ার পূর্বেই যারা ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আল্লাহর জিকিরের অবগাহনে প্রফুল্লচিত্ত হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব সুস্থ সংস্কৃতির যাত্রীদের সামনে পেশ করা হচ্ছে আলোর প্রেসক্রিপশন।
হিন্দু তার সংস্কৃতির চেতনায় কোন মানস সংকটে নিপতিত নয়। বৈদিক প্রেরণায়, বৈষ্ণব কাব্যের তরঙ্গে, উপনিষদের পুরাতন ভাবে হিন্দু তার মনের খোরাক খুঁজে পায়। আর মুসলমান তার ঠিকানার সন্ধান পায় কোরআনের পাতায় পাতায়, হজ্বের অনুশীলনে আর তাকবিরের ধ্বনিতে।
সংস্কৃতির এ দুই ভিন্ন ধারার জলপ্রপাত হাজার বছর ধরে বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে পাশাপাশি বয়ে চলেছে। সংঘাতে-সহাবস্থানে, বর্জনে-গ্রহণে, উভয়ের সাংস্কৃতিক স্রোতধারা নানান সময় নানাভাবে রুপায়িত হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম উভয় সংস্কৃতির ধারক-বাহকদের চেতনার মধ্যে কোন মনন সংকট ছিল না। প্রত্যেকের মন নিজ নিজ সংস্কৃতির প্রতি ছিল স্থির অবিচল। স্বকীয়তা বিসর্জিত হয়নি। পরস্পরের প্রতি তির্যক হওয়ায় সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার আভাস থাকলেও তা জন্মেছিল স্বকীয়তার উৎস স্থল থেকেই। এ সমস্যা হতে পারে গোঁড়ামির তবে আত্মপরিচয়ের নয়।
বিষয়টা এ পর্যন্ত এভাবে চলে আসছিল স্বাভাবিক গতিতে। পাশ্চাত্য সভ্যতার ঝড়ো হাওয়া সর্বশক্তি নিয়ে যখন হানা দিল এবং হিন্দু ও মুসলিম সমাজ উভয়ই যখন নতুন সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলো তখনও উভয় সংস্কৃতি ধ্বংসযজ্ঞের ভিতর থেকেই খুঁজে নিলো নবনির্মাণের নতুন উপকরণ। নব্য ধনতান্ত্রিক পশ্চিমা নখদন্তের আচঁড় লেগেছিলো হিন্দু-মুসলিম উভয় সভ্যতার উপর। কিন্তু ভারতকে পূর্ণাঙ্গভাবে পশ্চিমাকরণের শিক্ষা-প্রকল্প ভেস্তে গেল আম গাছে আমড়া ফলনের মাধ্যমে অর্থাৎ এতো ঝড়-তুফানেও মুসলমান-হিন্দুদের আত্মপরিচয় বিস্মৃত হয়নি। বিসর্জিত হয়নি তাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা।

উক্ত ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং সাংস্কৃতিক বেড়ায় মীমাংসিত ঐতিহ্যের ছন্দপতন ঘটানোর প্রয়াস কীভাবে শুরু হয়? জাতীয় আত্মপরিচয়ে এবং সংস্কৃতির স্বকীয়তাবোধে কীভাবে দানা বাধলো মনস্তত্ত্বের সংকট?

pluralism বা বহুত্ববাদের কথা বলে অথবা himanity বা মানবতাবাদ এর পর্দা টাঙিয়ে কিংবা উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনার শ্লোগান দিয়ে উক্ত ‘মনস্তত্বের সংকট’ কে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে লাভ নেই। আঁতে ঘা লাগাতে পারে কিন্তু এটাই বাস্তব সত্য যে, সেক্যুলারদের অবিশ্বাসী মন এবং ঐতিহ্যের লেজকাটা চেতনা বরাবরই ভোগ করতে থাকে একটা মানসিক অস্থিরতা। আস্তিক্যবাদী পারিপার্শ্বিকতার মাঝে অবিশ্বাসী সেক্যুলার একটা ভয়-ভয় অনুভবে কালাতিপাত করে। তার এহেন ফেয়ার কমপ্লেক্স তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত হতে, কল্পনার জগত নির্মাণের মাধ্যমে। অন্ত:সারশূন্য চিন্তার এ ধ্বজাধারী নিজের মনের ভয় দূর করার জন্য যখন চিৎকার করতে থাকে, সরল পথচারী সেটাকে ধরে নেয় সাহসের গর্জন এবং চেতনার জাগরণ।

যাদের স্থির কোন দর্শন নেই তারা শব্দমালা আর কথামালাকে বাহন করে এগুতে চায়। সাহিত্যকে তারা সুচতুরভাবে ব্যবহার করে অস্ত্র হিসেবে, কোন কিছু সৃষ্টির জন্য নয় বরং আদর্শ ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও চেতনার দীর্ঘ সময়কাল থেকে সৃষ্টি হওয়া সৌধকে ধ্বংস করার জন্যই।
কমিউনিজমের ইতিহাসে তাই আমরা দেখতে পাই সৃষ্টির চেয়ে ধ্বংসই বেশী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাশিয়ার চিঠিতে সমাজতন্ত্রের অসারতা তুলে ধরেছেন সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় যৌক্তিক বিচারের মাধ্যমে।

মনস্তত্ত্বের সংকটে আক্রান্ত ও আদর্শিক দেওলিয়া এ সেক্যুলার শ্রেণির আস্ফালনে সমালোচনা আছে প্রচুর; সমাধান নেই। তির্যক আক্রমণের নেতিবাচক পরিত্রাহী চেঁচামেচিতে ভরা তাদের সাহিত্য নাটক শিল্প ও তথ্য যন্ত্রে কিন্তু নেই গঠনমূলক কোন উপায়। তথায় আছে, সমাজের শোচনীয় অবস্থার কারণগুলো অনুসন্ধান করার বাস্তব কর্মপন্থা ও প্রস্তাবনার স্থলে সহানুভূতিহীন দোষ চর্চার নির্মমতা। এ কোন মানবতাবাদী চরিত্র? আত্মমর্যাদাবিরোধী আত্মঘাতী চাপাবাজীতে কোন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কৌলিন্য? নৈতিক দৈন্যদশা থাকলে এবং মতাদর্শিক ভিত মজবুত না থাকলে কেবলই আশ্রয় নিতে হয় অতি তাত্ত্বিকতায়।

মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম সংস্কৃতির সর্বচেনা, সর্বজানা ধারণা ও চর্চার বিরুদ্ধে সেক্যুলার মন যে বিশাল সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছে তাকে সাধারণ মুসলিম মানসের বিশাল দিগন্তে সহনীয় করে তোলার জন্য তাতে কল্পিত তাত্ত্বিকতার প্রলেপ দেয়া হয়েছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন: “বিশেষ একটা চাপরাশ পরা সাহিত্য দেখলেই গোড়াতেই সেটাকে অবিশ্বাস করা উচিত। কোন একটা চাপরাশের জোরে যে সাহিত্য আপন বিশিষ্টতার গৌরব খুব চড়াগলায় প্রমাণ করতে দাঁড়ায়, জনাব তার গোড়ায় একটা দুর্বলতা আছে। তার ভিতরকার দৈন্য আছে বলেই চাপরাশের দেমাক বেশী হয়”। (রবীন্দ্র রচনাবলী )

ঐতিহাসিক দার্শনিক আর্নল্ড টয়েনবী বলেন, এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণিই হচ্ছে ইন্টারনাল প্রলেতারীয়েত। দুই সভ্যতার সংঘাতকালীন উদ্ভুত কলাকৌশল ও রীতিনীতিগুলো দ্রুত আয়ত্ব করে বুদ্ধিজীবীরা ভাবেন তারাই সংস্কৃতির দিশারী ধারক ও বাহক। অতএব, স্বদেশে ও বিদেশে তারা অপরিত্যাজ্য কিন্তু যতদিন যায় তাতে দেখা যায় তাদেরও ঠাঁই নেই সমাজে। (মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ সংস্কৃতির রুপান্তর-আ: মওদুদ)
আগামী পর্বের শিরোনাম : [ সেক্যুলার বাঙালী সংস্কৃতি একটি ধর্ম ]