সেকুল্যার বাঙালি সংস্কৃতি একটি ধর্ম

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুফতী হারুন ইজহার চৌধুরী


[বইমেলার ভিতরে-বাইরে আত্মবিস্মৃত বাঙালি মুসলিম তরুণদের জন্য নিবেদিত]


ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আশ্রিত বাংলাদেশের সাহিত্য সমাজের চেতনার ডায়রীতে স্থান পেতে পারে পৃথিবীর সকল মতাদর্শিক ‘মিথ’ অথবা পরিভাষা কিন্তু ‘মুসলিম সংস্কৃতি’ এর প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ। সাহিত্যের ধূর্ত দুর্বৃত্তরা বলে ‘কালি ও কলমে’ রবীন্দ্রনাথই মূর্তমান হবেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদী বঙ্কিমের এখানে ঠাঁই নেই। আমরাও বলি এসব চতুর চালাক সাহিত্যকর্মীরা হিন্দুবাদী নয়। তবে তারা আবার হিন্দুবিদ্বেষীও নয়। কিন্তু এ ছন্দের পতন ঘটে মুসলিম জাতীয়তার ক্ষেত্রে অর্থাৎ এরা সাহিত্য চেতনায় ইসলামবাদী নয় সাথে সাথে তারা আবার ইসলামবিদ্বেষীও বটে। হিন্দুত্ত্বকে স্পেস দিতে সমস্যা নেই কিন্তু সংস্কৃতির চেতনায় ইসলামি দর্শন ও ঐতিহ্যের কোন স্পেস থাকবে না।

এভাবেই বাঙালি সেক্যুলারের মানস সংকট আমাদের সামনে ধরা পড়ে। আর বঙ্কিমে তো হিন্দুত্বের ঝাল খুবই উৎকট। এতো ঝালে বাঙালি মুসলিম সমাজে হিতে বিপরীত হবে।তার চেয়ে বরং কৌশলের দাবী হলো, দক্ষ রবীন্দ্র হাতের তুলিতে আঁকা হিন্দুত্বকে বাঙালিত্বের পাইপ দিয়ে চালান করা যেখানে হিন্দুত্বের ঝাল হবে টক, মিষ্টি মিশ্রিত স্বাদের। এজন্য মুসলিম সংস্কৃতির অপোনোদনে একজন গোঁড়া, প্রতিক্রিয়াশীল বাবু বঙ্কিমের চেয়ে একজন উদার রক্ষণশীল বাবু রবীন্দ্র বেশী কার্যকর ফর্মুলা।এ সকল বিচারে আমরা বলতে পারি- ধর্মনিরপেক্ষ বাঙলা সংস্কৃতি বললে হিন্দু সংস্কৃতির বেশী ক্ষতি নেই। ক্ষতিটা মুসলিম সংস্কৃতির। একজন ১০টা ঘুষি দিলো, আরেকজন দিলো ২টি। তৃতীয় ব্যক্তি এসে যখন তাদেরকে আপোষ করিয়ে দিলো তখন এটা নিরপেক্ষতার আড়ালে পরোক্ষ পক্ষপাতিত্ব। এটাই ধর্মনিরপেক্ষ বাংলা সংস্কৃতির স্বরূপ -যে সংস্কৃতি বাঙালি নববর্ষের বৈশাখী মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুসলমানদের মিলিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে হিন্দুবাদী কালচারগুলোর অনুষঙ্গসমূহকে বহাল তবিয়তে বাকী রেখেই। অথচ মৌসুমী প্রবাহের বৈচিত্রময় পরিবর্তনে বৈশাখের আগমনকে প্রকৃতির উপর স্রষ্টার প্রত্যক্ষ হাতের স্পর্শ অনুভব ও বাংলা সন তারিখের হিসেবকে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত মনে করাকে মুসলিম কালচার বললে তাতে তাদের আপত্তি হয়। যে সংস্কৃতিতে খুবই সমাদৃত একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গা ২১ ফেব্রুয়ারী আমি কি তোমায় ভুলিতে পারি’। কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতির চেতনাবোধ থেকে উৎসারিত কবিতাটি তাদের নিকট শ্রুতিকটু “ও আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান/অনাদৃত একলা যখন গভীর ব্যথায় ছিলে মগন/ নিল তখন বক্ষে তোমায় লক্ষ মুসলমান।

পুরো বঙ্গদেশ তথা পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের দিগন্তজুড়ে মুসলিম সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতির দুটি প্রাণবন্ত ধারা চলমান রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি এবং তারও আগে ধর্মনিরপেক্ষ সর্বভারতীয় সংস্কৃতির তৃতীয় ধারাটি নির্জীব আগাছার মত যা বাঙালি কিংবা ভারতীয় গণমানুষের হৃদয়ে নতুন জীবনের ছোঁয়া দিতে পারেনি। বামপন্থী রাজনীতির কোলে দুগ্ধপোষ্য হয়েও সংস্কৃতির সেক্যুলার ধারাটি তরুতাজা হতে পারেনি। সমাজতন্ত্রের পতন আমাদের সংস্কৃতি ও রাজনীতির আবহকেও প্রভাবিত করেছে। পরাজিত বাম তথা তাদের উত্তরসূরীগণ সাম্যবাদের ধ্বনি ছেড়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি যৌথ সংস্কৃতি এর প্রকল্পেই তাদের সকল ধ্যান নিয়োজিত করেছে বলে মনে হয়। এখন তাদের মনজুড়ে মার্কসবাদের স্থলে বাসা বেঁধে নিয়েছে রবীন্দ্রবাদ, অথচ মৌলিকত্বের বিচারে এবং জড়বাদ ও স্টালিনবাদ বাদ দিলে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় মার্কসবাদ রবীন্দ্রবাদের চেয়েও প্রাসঙ্গিক। যদি বলা হয় সাহিত্য-সংস্কৃতির কথায় তাত্ত্বিকতার বির্তক কেন? আরে তার উত্তর তো আগেই দেয়া আছে। আবারো বলি তোমরাই বা কেন মার্কসবাদী খোলস পাল্টে রবীন্দ্রবাদী সেজে গেলে? ভাষা,সাহিত্য আর সংস্কৃতির সীমানা তোমরাই অতিক্রম করে একটা নতুন মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছো! না হয় এপার বাংলা ওপার বাংলার ডজন ডজন হিন্দু-মুসলিম সাহিত্যিক নক্ষত্রগুলো চর্চায় বিস্মৃত কেন?

একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য এবং নতুন একটি ধারা প্রবর্তনের জন্য চাই একজন আইকন। তিনি রবীন্দ্রনাথ। নব্য বাঙালি সংস্কৃতি নামক ধর্মের যিনি অবতার স্বরূপ। যে ধর্মের বাইবেল গীতাঞ্জলী, যার রথযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা, যার উপাসনালয় শহীদ মিনার। পৌত্তলিক ধর্মের ন্যায় এ সাংস্কৃতিক ধর্মও জায়গায় জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেছে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি। আছে প্রভাতফেরি।

আমরা দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারি এবং যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ করতে পারি যে, কোন সাহিত্যিক তাড়নায় নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আদর্শিক স্বার্থেই পশ্চিমবঙ্গে সমাহিত রবিন্দ্রনাথকে পূর্ববঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির যাদুমন্ত্র দিয়ে জাগিয়ে তোলা। এখানে একটি ভাষার প্রতি অনুরাগের চেয়ে একটি মতবাদের প্রতি আসক্তিই মুখ্য। ভাষা,সাহিত্য ও সংস্কৃতি যে উদ্দেশ্য পূরণের বাহন মাত্র। রবিন্দ্রগবেষক গোলাম মুরশদের ভাষায় কিন্তু পুনরায় এ প্রতিষ্ঠা তার সাহিত্য কর্মের জন্য নয়। নিরপেক্ষ মানবিক সংস্কৃতির প্রতীক হন তিনি। সুতরাং বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের সঙ্গে মরণোত্তর রবীন্দ্রনাথের যে যোগাযোগ ঘটে তা অতিঘনিষ্ঠ এবং সে যোগাযোগ আদৌ সাহিত্যে সীমাবদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো একটি সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেন। এ শক্তির ওঠ-পড়া আনুপাতিক ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ও আন্দোলনের সঙ্গে (রবীন্দ্র বিশ্বে পূর্ববঙ্গ ,পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা পৃ. ২৭০)