মাতৃভাষার গুরুত্ব ও আমাদের করণীয়

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |


মাওলানা তানভীর বিন আব্দুস সালাম
শিক্ষার্থী : দারুল ইফতা হাটহাজারী মাদরাসা


 

প্রথম কথা:
ভাষা মনের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন। সব প্রাণীরই নিজস্ব ভাষা আছে। এটা তার জন্মগত। পশু-পাখি, জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদি সকল প্রাণীই তার মনের ভাব প্রকাশের জন্য ধ্বনি বা আওয়াজ দিয়ে থাকে। অন্য সব প্রাণীর ধ্বনি বা তাদের মুখ-নিঃসৃত শব্দ আমরা বুঝতে পারি না। তারা নিজেরা হয়ত তাদের পরস্পরের ভাষা বুঝতে পারে।

ধ্বনি-তরঙ্গ বা প্রতিটি আওয়াজেরই একটি প্রবহমানতা ও বৈচিত্র্য থাকে। ধ্বনির প্রবহমানতার ফলে এক একটি শব্দের সৃষ্টি হয়। অন্য সব প্রাণীর মুখ-নিঃসৃত ধ্বনির এ প্রবহমানতা ও বৈচিত্র্য সীমাবদ্ধ। তাই তার দ্বারা কোনো শব্দ বা শব্দসমষ্টির সৃষ্টি হয় না, কেবল থাকে একটি ধ্বনি বা ব্যঞ্জনা। কিন্তু মানুষের মুখ-নিঃসৃত ধ্বনির প্রবহমানতা ও বৈচিত্র্য সীমাহীন।

তাই এরদ্বারা বিভিন্ন শব্দ বা শব্দসমষ্টির সৃষ্টি হয়। প্রতিটি দেশেই রয়েছে তার অধিবাসীদের জন্য একটি ভাষা। মাতৃভাষা নামেই স্বীকৃত তা৷ তারা এই ভাষায় বলে, লিখে কখনও দুঃখজড়িত ঘটনা, কখনও বা আনন্দের বাক্যমালা। আমরা বাঙ্গালী। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। অ, আ, ই, ক, খ, গ, ঘ আমাদের মায়ের ভাষা, বাবার ভাষা৷ মায়ের মুখ থেকে আমরা এ ভাষা শিখেছি শৈশবে। কখনও আব্বু, কখনও আম্মু বলে ডাকতে শিখেছি সেই শিশুবেলায়।

মাতৃভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
জ্ঞান অর্জন বা চর্চার মাধ্যম হলো ভাষা। আল্লাহতায়ালা আদম(আ) কে জ্ঞান শিক্ষাদানের আগে ভাষা শিখিয়েছেন৷ ভাষা ছাড়া জ্ঞান শিক্ষাদান বা অর্জন অত্যন্ত কঠিন। তাই ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন: (অনুবাদ) তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাবপ্রকাশের উপযোগী ভাষা৷ (সূরা আর রহমান, আয়াতঃ৩-৪) ভাষার মাধ্যমে আল্লাহ আদমকে (আ.) একে একে সবকিছুর শিক্ষা দেন এবং এ শিক্ষার মাধ্যমেই তিনি নানা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন।

তারপর আল্লাহর ইচ্ছায় জ্ঞানের পরীক্ষায় তিনি ফেরেশতাদেরকেও হার মানাতে সক্ষম হন। এভাবেই মানুষ সকল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বা আশরাফুল মাখ্লুকাত হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়। এ মর্যাদার মূল ভিত্তি হল জ্ঞান। আর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হলো ভাষা। মহান স্রষ্টা এভাবে পরিকল্পনা করে আদম(আ.) কে সৃষ্টি করে তাঁকে ভাষা শিক্ষা দেন এবং সেই ভাষার মাধ্যমে তাঁকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করেন। এরপর জ্ঞানের দ্বারা আদম (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব তিনি প্রমাণ করেন। এটা মহান স্রষ্টার এক সীমাহীন মহিমা ও অপরিসীম কুদরত বৈ আর কিছুই নয়। এ কুদরত প্রদর্শনের জন্যই তিনি আকাশমণ্ডলী বা সৌরজগৎ ও বৈচিত্র্যময় সুন্দর পৃথিবী, বিভিন্ন বর্ণে-গোত্রে বিভক্ত মানুষ ও ভাষার সৃষ্টি করেছেন।

এ সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা: (অনুবাদ) এবং তাঁর (আল্লাহর) নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। (সূরা রূম,আয়াতঃ২২) উপরোক্ত আয়াতে একথা স্পষ্ট হয়েছে যে, আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী, বিভিন্ন বর্ণ-গোত্র ও ভাষার বৈচিত্র্য সবই আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরত ও নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বজগতে অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে যেমন নানা বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়, মানবজাতির মধ্যেও তেমনি বিদ্যমান রয়েছে নানা বর্ণ-গোত্র ও ভাষার মাধ্যমে সৃষ্ট চমৎকার বৈচিত্র্য। এসব বৈচিত্র্যের মাধ্যমে মহান স্রষ্টার অসীম কুদরত ও ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এটাকে যথারূপে উপলব্ধি করার মাধ্যমেই স্রষ্টার মহানত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব।

আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের অন্যত্র ইরশাদ করেছেন:(অনুবাদ) “আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।” (সূরা ইব্রাহীম, আয়াতঃ৪) এ আয়াতে আরো বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক নবীকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠানো হয়েছে এবং তাঁর মাতৃভাষাতেই আল্লাহতায়ালা ওহী বা ঐশী আদেশ প্রেরণ করেছেন। অতএব, এর দ্বারা প্রত্যেক মানুষের মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা ফুটে উঠেছে৷ বাংলা আমাদের মাতৃভাষা।

এ ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা আমাদের কর্তব্য। এ ভাষাকে উপেক্ষা করা কিছুতেই উচিত নয়। মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে কোনো মানুষ বা জাতি কখনও উন্নতি লাভ করতে পারে না৷ মাতৃভাষার গুরুত্ব সীমাতীত৷ ব্যক্তিগত,পারিবারিক বা সামাজিক বিভিন্ন কাজ সম্পাদনে এর প্রয়োজন অসীম৷ জীবনপথের প্রতিটি শাখাতেই মাতৃভাষার মুখাপেক্ষী প্রতিটি মানুষ৷ পরিবারে বা সমাজে সুন্দর ও সফল জীবন যাপন করার জন্য মাতৃভাষার বিকল্প নেই৷

একমাত্র মাতৃভাষা দ্বারাই সম্ভব মনের ভাব, ইচ্ছা, আকাঙ্খা, মিনতি বা আবদার নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা৷ ভিনদেশী ভাষার সহায়তায় যদিও সম্ভব মনের ভাব বা ইচ্ছার প্রকাশ ঘটানো তবে তা কিছুতেই পরিপূর্ণ নয়৷ নিঁখুত প্রকাশশৈলীতে তা কখনও উত্তীর্ণ হতে পারে না৷ বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নেলসন ম্যান্ডেলার একটি কথা এখানে বেশ চমৎকার! তিনি বলেন, কারো সম্বোধনে যদি তুমি এমন ভাষা ব্যবহার করো যার জ্ঞান সে শিখে অর্জন করেছে তাহলে হয়ত তোমার কথা সে বুঝতে পারবে কিন্তু যদি তার মাতৃভাষায় তাকে সম্বোধন করো তাহলে সে সহজেই তা হৃদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হবে!

মাতৃভাষায় বিদেশী ভাষার মিশ্রণ ও এর ক্ষতি:
বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের অহংকার৷ এ ভাষার প্রতিটি বর্ণেই ভেসে উঠে বায়ান্নর শহীদ যুবকদের জমাট রক্তের চিহ্ন! এই ভাষার প্রতিটি বর্ণে আছে শতশত মায়ের কান্না, অসংখ্য যুবকের মরা লাশের গন্ধ। কিন্তু আজ আমাদের এক শ্রেণীর দ্বারা এই ভাষা চরম লাঞ্ছিত। তারা বিদেশী ভাষা নিয়ে অত্যন্ত উল্লোসিত। তাদের কথায় কথায় ইংরেজী শব্দের অনুপ্রবেশ অত্যন্ত পীড়াদায়ক দেশপ্রেমিক প্রতিটি বাঙ্গালীর জন্য।

ভিনদেশী ভাষায় তাদের এই সীমাতীত বিচরণ কিছুতেই মেনে নেওয়া যায়না। সচেতন কোন নাগরিকই তা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। বাংলাভাষায় ভিনদেশী ভাষার মিশ্রণে একদিকে যেমন হয় বাংলামায়ের প্রতি অবমাননা, তেমনি ভাষার জন্য জীবনোৎসর্গকারী বাংলা মায়ের সন্তানদের প্রতিও হয় অবিচার৷ বর্তমান বাঙ্গালী যুবকদের মুখে ভিনদেশী ভাষার প্রতিযোগিতা দেখে শহীদ যুবকদের করুণ কণ্ঠগুলি ভেসে উঠে বাংলাকাশে। এই কণ্ঠগুলোই একদিন দিয়েছিল বক্ষভেদী স্লোগান, রাজপথে দিয়েছিল তাজা রক্তের স্রোত! কিন্তু আজকের যুবকদের দ্বারা তারা অবমাননার চূড়ান্ত শিকার৷ তাদের রক্ত কণিকার মূল্যায়নে চরম ব্যর্থ আমরা৷ ভিনদেশী ভাষার প্রতি আমাদের অধিক আগ্রহ আর চর্চাসক্তি দেখে লজ্জিত হয় ভাষাশহীদদের আত্মা৷

মাতৃভাষা রক্ষায় আমাদের করণীয়:
মাতৃভাষা পরিপূর্ণ রক্ষার্থে প্রথমতঃ ভিনদেশী ভাষার সীমাতীত ব্যবহার পরিত্যাগ করা অত্যাবশ্যক। ভিনদেশী ভাষার প্রতি অত্যাধিক আগ্রহ ও আসক্তি বর্জন করার দ্বারাই কেবল সম্ভব মাতৃভাষার রক্ষা৷ আজকের যুবক,বৃদ্ধ,নারী,পুরুষ থেকে শুরু করে শিশু শ্রেণীতে পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের কথায় কথায় ইংরেজি শব্দ ব্যবহারের যে অধিক প্রবণতা তা আমাদের মাতৃভাষার জন্য কিছুতেই কল্যাণকর নয়৷ আমাদের মাতৃভাষার জন্য তা চরম হুমকি৷ আমাদের অব্যাহত অসতর্কতায় অচিরেই তা ধ্বংসস্তুপে নিক্ষেপ করবে, কোন সন্দেহ নেই৷ ফলে আমাদের মাতৃভাষা হয়ে পড়বে অস্তিত্বহীন৷ ধ্বস ধরবে মাতৃভাষার নিখুঁত দেহে!

দ্বিতীয়তঃ আমাদের শিশু ও আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে মাতৃভাষার নব চেতনায়৷ তাদের মাঝে সৃষ্টি করতে হবে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা,আগ্রহ,আসক্তি৷ তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে মাতৃভাষার প্রকৃত ইতিহাস ও রক্তস্নাত জন্মকথা৷ মনে রাখা জরুরী যে, শিশু হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের একটি৷ এটি বাস্তবিক সত্য৷ আজকের শিশুরা আগামীর নির্মাতা৷ প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনার বাতিঘর৷ শিশুদের প্রতিই আমাদের মনযোগ নিবিড় হওয়া উচিৎ সর্বাগ্রে৷ শিশু শিক্ষার সবচে সঙ্গত, স্বাভাবিক ও কার্যকরী মাধ্যম হলো তাদের স্ব-স্ব মাতৃভাষা৷ মাতৃভাষাই হলো শিশু শিক্ষার মূল ভিত্তি৷ শিশু শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার দ্বারা এটি আজ সুপ্রতিষ্ঠিত৷ শৈশবে ভিন্ন ভাষায় শিক্ষা লাভের ফলে ভাব ও ভাষার প্রকৃত সেতুবন্ধন গড়ে উঠেনা৷

এর করুণ পরিণতি সম্পর্কে বিখ্যাত কবি রবিন্দ্রনাথ “শিক্ষার হেরফের” প্রবন্ধে লিখেছেন: আমাদের বাল্যকালের শিক্ষায় আমরা ভাষার সহিত ভাব পাই না আবার বয়স হইলে তাহার বিপরীত ঘটে, যখন ভাব জুটিতে থাকে তখন ভাষা পাইনা৷’ সুতরাং ভাব ও ভাষার সুষম বিকাশের লক্ষ্যে প্রয়োজন শিশুকে তার মাতৃভাষায় যথাযথ শিক্ষিত করা৷ আজকের দিনে বিশ্ব যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজনে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই৷ এই বাস্তবতায় যে কেউ ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করতে পারেন৷ কেবল ইংরেজি কেন, নিজেকে সম্মৃদ্ধ করতে বিশ্বের আরও বহু ভাষা আয়ত্বিকরণেও কোন বাধা নেই৷

কিন্তু শিশু শিক্ষার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মাতৃভাষার পরিপূর্ণ শিক্ষা৷ বাঙ্গালী শিশুর জন্যে বাংলা ভাষার গাঁথুনি মজবুত হলে অন্যান্য ভাষা শিক্ষায় তা বরং সহায়ক হবে৷ বহুতল অট্টালিকা তৈরীর জন্য যেমন মজবুত ভিত্তির প্রয়োজন তেমনি বহু ভাষাবিদ হওয়ার জন্যে সবার পূর্বে মাতৃভাষায় যথার্থ দখল থাকা আবশ্যক৷ আপনার শিশুর বহু ভাষায় দক্ষতা অর্জন অবশ্যই প্রশংসনীয়৷ উন্নত জীবন প্রতিষ্ঠায় তা অত্যন্ত কার্যকরী গুণ৷ কিন্তু নিজ মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে ভিনদেশী ভাষার প্রতি যত্নবান হওয়া কিছুতেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়৷ মাতৃভাষা শিক্ষায় আপনার সন্তানকে সহযোগিতা করুন৷ তার মাঝে সৃষ্টি করুন মাতৃভাষার ভালোবাসা৷ তার শিক্ষামাধ্যম নিশ্চিত করুন মাতৃভাষাতেই৷ আপনার সন্তানের দ্বারাই সম্ভব মাতৃভাষার আগামীর পথচলা৷

তারাই পারবে আমাদের মায়ের ভাষার অস্তিত্ব ধরে রাখতে আগামীতে৷ তারাই পারবে আমাদের রক্তার্জিত বাংলা ভাষার গায়ে নতুন প্রাণ দিতে ইনশাআল্লাহ! শেষ কথাঃ প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষা তাদের নিকট অমূল্য রত্ন৷ একটি জাতির অহংকার তাদের মাতৃভাষা৷ মাতৃভাষা একটি জাতির পরিচয় ও পরিচায়ক৷ মাতৃভাষার পরিচর্যায় যত্নবান হওয়া অত্যন্ত জরুরী৷ মায়ের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় সচেতন থাকা আবশ্যক সব শ্রেণীর মানুষের ৷