ভাষা আন্দোলনের নেপথ্য কথা

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

তারেকুল ইসলাম


প্রতিবছর ভাষার মাস এলেই আমরা একুশের চেতনায় উৎফুল্ল ও উদ্বেলিত হয়ে উঠি। আমাদের আবেগে ভাষাপ্রেম প্রবল ঝঞ্ঝায় উথালপাথাল করে দুলে ওঠে। চেতনা ও হৃদয়ের গভীরে আলোড়ন তোলে। ভাষার মাস নিয়ে, একুশের চেতনা নিয়ে সারাদেশে আলোচনা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের জোয়ার বয়ে যায়। দেশের বুদ্ধিজীবী ও লেখকশ্রেণি পত্রপত্রিকায় নানা ধরনের ও বহুমাত্রিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখা শুরু করেন। এবারও তথৈবচ, কোনো ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বা একুশের চেতনা সংক্রান্ত আমাদের চিন্তা ও ভাবনা প্রকৃতার্থে কতটা মৌলিক ও গভীরতর হয় তা আলোচনার দাবি রাখে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, বামপন্থী ও সেক্যুলার শ্রেণির ইতিহাসবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ বা কলাম লিখতে গিয়ে ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত পরিপূর্ণভাবে উল্লেখ ও উপস্থাপনের ব্যাপারে কিছুটা সীমাবদ্ধ বা অনুদার হয়ে থাকেন। বস্তুতপক্ষে ভাষা আন্দোলনের উৎপত্তি ও উৎসের ইতিহাসকে আজ মনে হয় অতি সচেতন ও সূক্ষ্মভাবেই খণ্ডিত করা হচ্ছে। সেইসব তথাকথিত প্রগতিশীলদের অনেকেই বায়ান্ন’র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিলে সালাম-রফিক-বরকত-জব্বারের শহীদ হওয়ার ঘটনা দিয়েই তাদের লেখা শুরু করেন। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বছর তথা ১৯৪৭-এর দেশবিভাগের বছরই ভাষা আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে। এ সংগঠনটির পুরো নাম ছিল পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস। আমাদের দেশ তখনো পাকিস্তান থেকে পৃথক না হওয়ায় সংগঠনটির নামের আগে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি ছিল। কথা হচ্ছে, বায়ান্ন’তে যারা মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন, যারা পাক হানাদারের বুলেটবৃষ্টির মুখে শহীদ হলেন- সেদিন তাদেরকে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়েছিল কে বা কোন সংগঠন? সেদিনও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ছিল। এ সংগঠনগুলোও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শরিক হয়েছিল। কিন্তু কার বা কোন সংগঠনের অধীনে ও নির্দেশনায় তারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে একাট্টা হন? কোন সংগঠনের উদ্যোগ ও উদ্যমের মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়? সেই উত্তর কোথায় আজ? নতুন প্রজন্মকে সেই সংগঠনের নাম ও ইতিহাস জানতে দেয়া হচ্ছে না কেন?

ভাষাসৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর লিখেছেন, “১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকা সফরে এসে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলে বসেন, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। যে নাজিমুদ্দিন ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবি নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তার এই বিশ্বাসঘাতকতায় স্বভাবত পূর্ববঙ্গের জনমত বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদের জন্য তমদ্দুন মজলিস আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ থেকে অধ্যাপক আবুল কাসেম ও আমি এই সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলাম। এই পরিষদের পক্ষ থেকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি মেডিকেল কলেজের সামনে বাংলা ভাষা সমর্থকদের ওপর পুলিশের গুলিতে রফিক, শফিক, সালাম, বরকত প্রমুখ তরুণদের রক্তে রাজপথ সিক্ত হয়ে উঠলে ভাষা আন্দোলনের নতুন গতিবেগ সৃষ্টি হয়” (সূত্র : দৈনিক ইনকিলাব, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১২)। অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, যে সংগঠনটির মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে ওঠে সেই সংগঠনটি অর্থাৎ তমদ্দুন মজলিসের কথা ঐ কথিত সুশীলদের (?) কথায়, লেখায় ও আলোচনায় গুরুত্ব পায় না। সে কারণেই বর্তমান প্রজন্ম একুশে ফেব্রুয়ারির দিন পাক হানাদারের গুলিতে শহীদ হওয়া বরকত-রফিক-জব্বার-সালামের নাম জানলেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া মূল সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের নাম ও অবদানের ইতিহাস জানতে পারে না। তাই স্মরণও করা হয় না। এমনকি এই রকম কোনো সংগঠন ভাষা আন্দোলনে কোনো অবদান বা ভূমিকা রেখেছিল কি-না তাও কার্যত তাদের অজানা। আমি এখানে তমদ্দুন মজলিসের ঐতিহাসিক অবদানকে ব্যবহার করে সেসব মহান ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগকে খাটো করার চেষ্টা করছি না মোটেও। আমি শুধু বলতে চাচ্ছি, তমদ্দুন মজলিসের নামটি কেন সেইসব কথিত সুশীলরা (?) উচ্চারণ করেন না? কী উদ্দেশ্যে তমদ্দুন মজলিসের অবদানকে তারা আড়ালে ঢেকে রাখেন? সম্ভবত তমদ্দুন মজলিসের নামের আগে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি থাকার কারণেই এ ব্যাপারে তাদের এত এলার্জি! যদি তা-ই হয়ে থাকে তাহলে সেটি তাদের রেসিজম তথা জাতিবিদ্বেষ বৈ কিছু নয়। তাদের এই রেসিজমের পেছনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা জাতিগত সাম্প্রদায়িক বা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ ও প্রধান সংগঠক অধ্যাপক আবুল কাসেম তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রকাশ্যে বাংলা ভাষায় পদার্থবিদ্যার ক্লাসে তার শিক্ষার্থীদের লেকচার দিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বাংলা ভাষায় লেকচার দেয়ার মতো হিম্মত তৎকালীন সময়ে প্রায় অসম্ভব ও প্রচ- দুঃসাহসিক কাজ ছিল। কিন্তু অধ্যাপক আবুল কাসেম দৃঢ়চিত্তে ও প্রবল মনোশক্তি নিয়ে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। এরপর থেকেই তিনি বুকের মধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার স্বপ্ন লালন করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সার্থক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। তমদ্দুন মজলিসের মূল উদ্দেশ্য ছিল, বিপ্লবী ইসলামী আদর্শের প্রতিষ্ঠা এবং পূর্বপাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে সার্থক আন্দোলনে রূপদান করা। তারও আগে উপমহাদেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, তিনি ১৯২১ সালে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯১৮ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিশ্বভারতী’তে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক হিন্দি ভাষার পক্ষে ওকালতির বিরোধিতা করে বলেছিলেন, ‘ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে বাংলা ভাষা হিন্দি অপেক্ষা উন্নততর এবং বাংলাকেই ভারতের সাধারণ ভাষায় পরিণত করা যেতে পারে’। তৎকালীন সময়ে আরো অনেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন। তবে তাদের তৎপরতা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক, তখনো ভাষা আন্দোলন জনগণের সম্মিলিত রূপ পরিগ্রহ করেনি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তখনো বিক্ষোভ, মিছিল, আন্দোলন এবং রাজপথে গণজোয়ার শুরু হয়নি। কিন্তু অধ্যাপক কাসেমের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় যুগপৎ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ প্রভৃতি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, তমদ্দুন মজলিসই হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের ‘জনক সংগঠন’। ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত অধ্যাপক আবুল কাসেমের অপরিসীম অবদানের কথাও আজ বর্তমান প্রজন্মের অগোচরে রয়ে গেছে।

বিগত ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তথ্যমন্ত্রণালয় কর্তৃক সমস্ত জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সরকারিভাবে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। সেই ক্রোড়পত্রের প্রধান কলামের এক জায়গায় ভাষা আন্দোলনের সাথে একটি মৌলিক বিষয় যুক্ত করে বলা হয়, “ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান হলেও এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি সমাজের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানি কোনো প্রদেশের মানুষের কোনো মিল ছিল না। ভাষা, আচার-আচরণ, জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কোনো দিক থেকেই কোনো সাদৃশ্য ছিল না। …সুতরাং শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে একটা জাতি হয় কি-না -এই প্রশ্নটা আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল এবং ভাষাকে ভিত্তি করে চলল নতুন করে আত্মপরিচয়ের সন্ধান। বাঙালি মুসলমান আগে মুসলমান, না আগে বাঙালি, না আগে পাকিস্তানি- কী তার আসল জাতীয়তা এ প্রশ্নটা সামনে চলে এলো” (লেখক : বজলুর রহমান)। এমন সূক্ষ্ম বক্তব্য নিঃসন্দেহে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদী কনসেপ্ট থেকে নিঃসৃত। এ বক্তব্যে লেখক যদি এটা বোঝাতে চান যে, ভাষা আন্দোলন এদেশের সর্বস্তরের তথা গণমানুষের সেক্যুলার মন-মানসিকতার ফল এবং শুধু ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি মুসলমান তাদের আত্মপরিচয় সন্ধান করেছে তাহলে তিনি চরম ভুল করবেন। আরো খোলাসা করে বলি, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান ৪৭-এর দেশভাগের সময় ধর্মীয়সত্তা ও চেতনার অভিন্নতার কারণে পাকিস্তানের সাথে গাঁটছড়া বাঁধে। কিন্তু পরবর্তীতে পূর্বপাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের জালিম শাসকদের অত্যাচার ও বঞ্চনা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। আর যখনই মাতৃভাষার ওপর আঘাত আসলো, অমনি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলিমসমাজ ধর্মীয় চেতনা ও জাতিসত্তার কথা ভুলে গিয়ে তারা মাতৃভাষার দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় উদ্ভাসিত হয়েছিল- সেক্যুলারদের এমন ধারণা সত্যিই উদ্ভট।

মাতৃভাষা সকল জাতির ন্যায্য অধিকার, সেদিন এ অধিকার যারা কেড়ে নিতে চেয়েছিল তারা স্বধর্মের লোক হলেও অন্যায় করেছিল আমাদের সাথে। তাই আমরা আমাদের অধিকার আদায়ে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমাদের ধর্মীয় জাতিসত্তা ও চেতনার সাথে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কোনো বিরোধ ছিল। আজকে এদেশে অথর্ব সেক্যুলারদের অবস্থা এমনই যে, অহেতুক ও অযৌক্তিকভাবে সবকিছুকেই তারা সেক্যুলারাইজেশন করার অপচেষ্টা চালায়। প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দোলনের সাথে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার কোনো সংযোগই ছিল না। এমনকি সেটার কোনো প্রয়োজনই হয়নি। আর তাছাড়া ধর্মের ভিত্তিতে একটি জাতি গঠন হতে পারে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়, আর যাই হোক, ইসলামী চেতনাকে উপেক্ষা করে ভাষাভিত্তিক সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তার কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না। উপেক্ষা না করলেও এটা আমাদের এখানকার জনমানসের সাথে কখনো খাপ খায়নি এবং খাপ খাবেও না। কেননা ইসলামী চেতনা ও সংস্কৃতি এদেশের মাটি, মানুষ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের মূলধারার শিকড়ের সাথে সরাসরি গভীরভাবে প্রোথিত। সুতরাং এই মূলধারার চেতনার বিপরীতে কোনো সক্রিয় ভূমিকা বা বিজাতীয় তৎপরতা স্বাভাবিকভাবেই সফল হওয়ার নয়। আর তাছাড়া ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ হচ্ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদেরই পরোক্ষ চেতনা। কিন্তু এর প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত মুসলিম বাঙালি জাতীয়তার উপস্থিতি ও চেতনাকে গৌণ করে ‘নাই’ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সেকুলারিজমের ধ্বজা ওড়ানো হয়। এখানে ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক উভয় ঘরানার জাতীয়তার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক মেরুকরণ সমকালে আরো তীব্র ও প্রকাশ্য হয়েছে। সুতরাং এই অপরিহার্য বাস্তবতাকে এড়িয়ে না গিয়ে বরং একে বোঝার ও এর সাথে সামষ্টিক বিষয়াবলীকে সমন্বয়ের প্রয়াস নিতে হবে এবং এটাও বোঝা অনস্বীকার্য যে, ইসলাম বা মুসলমানিত্বকে অবজ্ঞা করে আমরা কখনোই আত্মপ্রতিষ্ঠার পথে সফল হতে পারব না। এমনকি আমাদের আত্মপরিচয়ের সন্ধানের ক্ষেত্রে এটি যে একটি অপরিহার্য ও অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উপাদান সেটিও স্বীকার না করার কোনো উপায় নেই।

আরেকটি কথা, দুর্বার ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্ব শুধু বাঙালি মুসলমানেরই। বাংলাকে ভারতের সাধারণ ভাষা করা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতমুখী অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, বাঙালি হিন্দুদের তুলনায় বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালি মুসলমানদেরই টান ছিল বেশি। এর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রখ্যাত কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক আরিফুল হক তার ‘সংস্কৃতির মানচিত্র’ বইয়ের ‘বাংলাদেশই বাংলা ভাষার প্রাণকেন্দ্র হোক’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী বিপুল জনগোষ্ঠী সেই ১৯৪৯ সালেই হিন্দিকে তাদের জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা ভাষার বিচ্ছিন্নতাকে মেনে নিতে পারেনি। তার কারণ মুসলমানরা বরাবরই বাংলা ভাষাকে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির অংশ মনে করে এসেছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব তাহ্জীব তমদ্দুন রক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।” এছাড়া ভাষা আন্দোলন আমাদের ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধের বিরোধী ছিল না; বরং ছিল নিজস্ব তাহ্জীব তমদ্দুন, আত্মচেতনা ও আত্মপরিচয় রক্ষারই মূল অবলম্বন। প্রত্যেক জাতিই তার আত্মচেতনা ও অস্তিত্ব রক্ষার্থে জন্মগত অধিকার মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম করবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু আমাদের ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মীয় জাতীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টার পেছনে ভিন্ন চিন্তা কাজ করে। তথাকথিত প্রগতিশীলদের সেই ভিন্ন চিন্তাই হচ্ছে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ –অর্থাৎ ভাষাভিত্তিক সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ। কিন্তু মনে রাখা দরকার, “১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তনকারী হিসেবে যে সংগঠনটি গঠিত হয়েছিল তার নাম ছিল পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস। সংগঠনটির আরবি নামকরণই বলে দেয় এর আদর্শ ও উদ্দেশ্য কী ছিল। আমাদের ভাষা আন্দোলন এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি বিরোধী ছিল না। এদেশে সেক্যুলারিস্ট বা এথিস্ট চিন্তাধারা বিকাশের বাহন হিসেবে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়নি” (সংস্কৃতির মানচিত্র : আরিফুল হক)।


লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
tareqislampt@gmail.com