সংস্কৃতির জন্মস্থান মন; ভাষা নয়

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুফতী হারুন ইজহার চৌধুরী


সংস্কৃতির অনুষঙ্গে ধর্মের উপাদানকে উপেক্ষা করে ভাষাকে অতিমাত্রায় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এক অনাকাঙ্খিত বিতর্ককে হাওয়া দেয়া হচ্ছে নিহায়েত কান্ডজ্ঞানহীনভাবে। আখতার ফারুকের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য- বলাবাহুল্য, সংস্কৃতি মাটিতে জন্মেনা। ভাষায় জন্মে না। নদী-নালায় জন্মে না। টাকা পয়সায়ও জন্মে না। যেসব পন্ডিতরা এ সবে জন্মায় তারা অবশ্য হাওয়ায়ও জন্মায়। সংস্কৃতির বীজ বপিত হয় মানব মনের মনিকোঠায়। তারই বিকাশ দেখা দেয় ভাষায়, আচরণে, রীতি-নীতিতে, জীবিকা-পদ্ধতিতে, সাহিত্য- শিল্পে, সমাজ ও রাষ্ট্রে। রাষ্ট্র সংস্কৃতির ধারক, ভাষা সংস্কৃতির বাহক এবং রীতি-নীতি সংস্কৃতির পরিচায়ক। তাই ইংরেজি ভাষা যেমন একক ইংরেজ সংস্কৃতির বাহক নয়, তেমনি পাক-ভারত উপমহাদেশ একই সংস্কৃতির ধারক হয়নি।
………….. আদিকাল থেকেই ভাষা-সাহিত্য ও শিল্পকলা সংস্কৃতির বাহন হয়ে চলেছে। হোমায়ের ইলিয়ডে গ্রীক দেবতারা ভিড় জমিয়েছে, গ্রীকদের ধর্মীয় ধ্যান ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে। ব্যাস বাল্মিকীর মহাকাব্যে আর্যদের দেবীর জয় ডংকা বেজেছে। মাইকেল যেহেতু মধুসূধনও তাই তার মহাকাব্যে গৈরিক বসনে গডগডে সরা নামাবলী জপতে বাধ্য হয়েছে, বিদ্যাসাগরের সাহিত্য-সিতার বনবাসে আশ্রয় খুঁজে পেল। বঙ্কিমের সাহিত্য সতীদাহের মহিমায় ভাস্বর হল। রবীন্দ্র-সাহিত্যে উপনিষদের অতি পুরাতন ভাবের নব আবিষ্কার ঘটল। স্তুতি পেল কেবল শিবাজী আর গুরু-গোবিন্দরা। আলমগীর বা সৈয়দ আহমদ শহীদ নয়। তাই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি খ্যাতি পেয়েও বিশ্বের সবাইকে তার সাহিত্যে সুন্দর করে দেখাতে পারলেন না। ফলে তিনি আমাদের ভাষায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়েও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হতে ব্যর্থ হলেন। এটাই স্বাভাবিক।
………সবাই তো বাঙালি তবুও এ বৈপরীত্য কেন? পারবে কি সব বাঙালি একমত হয়ে তাদের মরাকে পোড়াতে কিংবা কবর দিতে? পারবে কি তারা একমত হয়ে গো দেবতার অর্চনা করতে কিংবা কোরবানি করতে? তা না পারার মূল যদি ভাষা হতো কিংবা ভৌগলিক অবস্থান হতো তাহলে অবশ্যই পারতো। কারণ, একই বাংলায় যখন কথা বলে আর একই বঙ্গদেশে বাস করে তখন না পারার কারণ কী?
কিন্তু সংস্কৃতির মূল যে ভাষা আর দেশ জড়িয়ে নেই, জড়িয়ে আছে ভাষাভাষী ও দেশবাসীর মনের গহীনে। মন তাদের যে সংস্কারে গড়া ভাষায় তারই বিকাশ ঘটবে। দেশে তারই প্রতিষ্ঠা দেখা দিবে। ভাষায় তারই বিকাশ ঘটবে। দেশে তারই প্রতিষ্ঠা দেখা দিবে। (সংস্কৃতির রূপায়ন পৃ:৯, আখতার ফারুক)
ইতিহাসবিদ আ: মওদুদ বলেন, বর্তমান যুগের রাষ্ট্রনীতির কোনখানে এই নীতি নেই যে, রাষ্ট্র দুই হলেও সংস্কৃতি এক হবে। এমনকি একই ভাষা দুই রাষ্ট্রের ভাষা হলেও এক সংস্কৃতি হতে হবে। ইংল্যান্ড ও আমেরিকা দুটি স্বতন্ত্র পৃথক রাষ্ট্র। তাদের সংস্কৃতিও পৃথক। এমনকি একই ইংরেজি ভাষা দুটি রাষ্ট্রের মাতৃভাষা হলেও। আমেরিকান ইংলিশ ও বৃটিশ ইংলিশ এক নয়। দুস্তর ব্যবধান ঘটে গেছে তাদের মধ্যে। ……. ভাষা ও সংস্কৃতি এক নয়, একার্থক নয়, সমর্থকও নয়। ভাষা ও সংস্কৃতির আবর্তন ও পরিবর্তন, বিকিরণ ও উন্নয়ন একই ধারায় হয় না। এক তালে হয় না ও একই সময়ে হয় না। তার একটি অপরের উপর নির্ভরশীল নয়। মিশরের হেজাজের জর্দানের সংস্কৃতি এক নয়, ভাষাও ঠিক এক আরবি নয়। সুতরাং ভাষা এক হলেই সংস্কৃতি এক হতে হবে রাষ্ট্র বা সমাজ বিজ্ঞানের কোন সূত্রে এ নীতির সমর্থন মেলে না। (মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ: সংস্কৃতির রূপান্তর- ৩৩৫)
কথাসাহিত্যিক আবুল মনসুর তার বিখ্যাত গ্রন্থ বাংলাদেশের কালচারে বলেছেন- “রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় কবি নন”। তার ছোট উক্তিটুকু সংস্কৃতির বির্তকে আমাদের সামনে হাজির করে একটি বড় দিকনির্দেশনা। যা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সংস্কৃতির জাতীয়তাবাদে ভাষাই মুখ্য নয়।