অজয় রায়রা সেকুলার মৌলবাদে আক্রান্ত: আজিজুল হক ইসলামাবাদী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসি অধ্যাপক অজয় রায় সরকারের প্রতি রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষত ফেসবুকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার ঝড় ওঠেছে। এছাড়া বাম ঘারানার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পাঠ্যপুস্তকে সর্বশেষ পরিবর্তনকে ‘সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি এই ইস্যুতে তারা হেফাজতের কাছে পরাজিত হয়েছেন বলেও হতাশা প্রকাশ করছেন। এসব বিষয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারেকুল ইসলাম-এর বিশেষ সাক্ষাতকার নিয়েছেন ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক সাইয়েদ মাহফুজ খন্দকার। নিচে সাক্ষাতকারটির চুম্বকাংশ তুলে ধরা হলো:


আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও তারেকুল ইসলাম

ইনসাফ: সম্প্রতি অজয় রায় সরকারের কাছে রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন। এ নিয়ে সোশাল গণমাধ্যমে খুব আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আপনার অভিমত জানতে চাই।

আজিজুল হক ইসলামাবাদী : বছর দেড়েক আগে অজ্ঞাত আততায়ীদের হাতে ছেলে খুন হওয়ায় এখনো মানসিকভাবে দুর্বল অজয় রায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের দাবি জানিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ তৌহিদি জনতার ঈমান ও ধর্মীয় অনুভূতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছেন। রায় মশাইয়ের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, তিনি ৯২ ভাগ মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশে বসে কথা বলছেন। এটা ভারত নয়, সাম্প্রদায়িক বিজেপি ও শিবসেনা’র মতো ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলার স্পর্ধা দেখানোর পরিণাম শুভ হবেনা। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ তৌহিদি জনতার প্রাণের স্পন্দন। উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সেখানে রক্তক্ষরণ ঘটানোর কোনো অধিকার তার নেই। গণতান্ত্রিকভাবে ‘মেজরিটি মাস্ট বি গ্রান্টেড’– এটা তার মতো একজন একাডেমিশিয়ানের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তাকে একটা নসিহতই শুধু করবো, দয়া করে দরবারি আলেম ও দরবারি অধ্যাপকের মতো কথা বলবেন না।


“রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ তৌহিদি জনতার প্রাণের স্পন্দন। উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সেখানে রক্তক্ষরণ ঘটানোর কোনো অধিকার তার নেই”

– আজিজুল হক ইসলামাবাদী


ইনসাফ: বাম ঘরানার অনেকেই সম্প্রতি পাঠ্যপুস্তকে সর্বশেষ পরিবর্তনকে ‘সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন’ বলে অভিহিত করছেন এবং এই পরিবর্তনের ফলে হেফাজতের কাছে তারা পরাজিত হয়েছেন বলেও হতাশা ব্যক্ত করছেন। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

আজিজুল হক: প্রথমেই বলবো, পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন ইস্যুতে তারা হেফাজতের কাছে নয়, মূলত এদেশের বৃহত্তর তৌহিদি জনতার ঈমানি আন্দোলনের কাছে পরাজিত হয়েছেন। সেকুলার মৌলবাদ ও সেকুলার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এটি তৌহিদি জনতার একটি ঐতিহাসিক বিজয় বলে আমরা মনে করি। আর যারা এই পরিবর্তনকে ‘সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন’ বলছেন, তারা আসলে পরাজয়ের ভারে দিশাহারা হয়ে প্রলাপ বকছেন। পাঠ্যপুস্তকে সর্বশেষ পরিবর্তনের মানেই হলো, এটা অনেকটা আগের সংস্করণে রিটার্ন করেছে। তাই ‘সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন’ কথাটি অযৌক্তিক ও একপেশে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কাছে সব পক্ষেরই নালিশ, অভিযোগ ও দাবি-দাওয়া উত্থাপনের সুযোগ সংবিধানসম্মত; কিন্তু বামপন্থী ও সেকুলারপন্থীরা ফ্যাসিবাদী কায়দায় আমাদের সেই কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করতে চায়। যেন এই রাষ্ট্রে মুসলমানদের কোনো অধিকার আদায়ের দাবি থাকতে পারেনা(!)। তাদের এই অপতৎপরতা আমরা রুখে দিতে বদ্ধপরিকর। সরকারের কাছে হেফাজতের মূল অভিযোগ ছিল, ইসলাম ও মুসলিম ভাবাপন্ন রচনা ও কবিতাসমূহ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দিয়ে দেশের নব্বই শতাংশ মুসলমানদের ঘাড়ের ওপর সাম্প্রদায়িক হিন্দু কবি-সাহিত্যিকদের রচনাগুলো একতরফা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিল। বরং এখানেই মূলত সাম্প্রদায়িক পরিবর্তনটা হয়েছিল। আর তাছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র ও শরৎচন্দ্রের মতো সাহিত্যিকরা যে সাম্প্রদায়িক, এটা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই, কেননা তাদের বিভিন্ন গল্প ও উপন্যাসে বাঙালি মুসলমানদের অবজ্ঞা ও গালাগালি করার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। তাহলে তাদের বিশেষ সাম্প্রদায়িক রচনাসমূহ আমরা যৌক্তিকভাবেই গ্রহণ করতে পারিনা। আমরাও এক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী। সুতরাং, সর্বশেষ পরিবর্তনের মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তককে বাংলাদেশের মূলধারায় ফেরানো হয়েছে বলে আমরা মনে করি।

ইনসাফ: অজয় রায় হেফাজত সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে একদিন শেখ হাসিনাও নাকি হেফাজতের চাপে হিজাব ও বোরকা পরে রাস্তায় বের হতে বাধ্য হবেন। এ বিষয়ে কী বলবেন?

আজিজুল হক: অজয় রায়’রা হলেন সেকুলারিজম ও প্রগতিশীলতার মুখোশধারী চরম ইসলামবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক। প্রকৃতপক্ষে এদেরকে কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক বঙ্কিমচন্দ্রের আধুনিক উত্তরসূরী বলাই সঙ্গত। এরা ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে অমূলক ভীতি তথা ইসলামোফোবিয়া ছড়াতে ওস্তাদ। স্পষ্ট করে বলতে চাই, তিনি হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভ্রান্তিকর ও অযৌক্তিক ভীতি পৌঁছে দেওয়ার অপচেষ্টা করেছেন। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর পোশাক-পরিচ্ছদ যথেষ্ট শালীন; কিন্তু তিনি হিজাব বা বোরকা পরবেন কি পরবেন না, এটা একান্তই প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটা নিয়ে কখনোই আমাদের মাথাব্যথা ছিলনা এবং এখনো নেই। বস্তুতপক্ষে, অজয় রায়’রা সেকুলার মৌলবাদ ও ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত, তাই এসব নিয়ে তাদের এত এলার্জি আর মাথাব্যথা; অথচ পরিবেশবিরোধী রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র, পণ্যদ্রব্য ও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ইত্যাদি ন্যাশনাল ইস্যুগুলো নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়না। মুসলমানদের সম্পর্কে দুর্নাম ও অমূলক ভীতি ছড়ানোর ক্ষেত্রে অজয় রায়দের পূর্বসূরীদের কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। তা হলো, ভারতবর্ষের মুঘল শাসনামলে মুসলিম শাসকরা অত্যন্ত যোগ্যতা, দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে দেশ শাসন করেছিলেন। এমনকি ভারতবর্ষ সভ্যতা ও মানবিকতার ছোঁয়া পেয়েছিল এই সোনালি মুঘল শাসনামলেই। অথচ সম্রাট জাহাঙ্গীর, বাবর ও আওরঙ্গজেবের মতো মহান ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসকদের সম্পর্কে কতিপয় কট্টর সাম্প্রদায়িক হিন্দু ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিকরা জঘন্যভাবে মিথ্যাচার, দুর্নাম ও কুৎসা রটনা করতে কুণ্ঠিত হয়নি। তাদেরই আধুনিক উত্তরসূরী অজয় রায়রা আজ হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে দুর্নাম ও অমূলক ভীতি ছড়ানোর অপতৎপরতায় ব্যস্ত। ধিক্কার জানাই তাদের সেকুলার ভণ্ডামি ও প্রগতিশীলতাকে।


ইনসাফ: সম্প্রতি অজয় রায় সেকুলার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রধর্মকে সংবিধান থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করছেন। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

তারেকুল ইসলাম: রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে বলার আগে সেকুলারিজম বা সেকুলার গণতন্ত্র নিয়ে কিছু মৌলিক বিষয় খোলাসা করা দরকার। সেকুলার গণতন্ত্র কিম্বা সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র- যেটাই বলি না কেন, এটা হচ্ছে খাস্ ইউরোপীয় বয়ান। এটা যে ইউরোপের বহু আগের ক্রসেডীয় এজেন্ডা, সেটা আগে আমাদেরকে বুঝতে হবে। তবে সেকুলারিজমের ব্যাপারে মুসলিম বাঙালি সাহিত্যিক মননে সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যতটা লক্ষণীয় ছিল, ততটা লক্ষণীয় ছিলনা হিন্দু বাঙালি সাহিত্যিক মননে; বরং সেকুলারিজম ও প্রগতিশীলতার নামে পরোক্ষভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠায় হিন্দু বাঙালি মানস চাতুর্য ও ধূর্ততার আশ্রয় নিয়েছিল। সেকুলারিজম ও প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে এবং ব্রিটিশ প্রভুদের আনুগত্য অর্জনপূর্বক বাঙালি হিন্দু মানস ভারতবর্ষের স্থানীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, সাহিত্য ও রাজনীতির অন্যতম অংশীদার মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও চেতনার অবমোচনেরও অপপ্রয়াস নিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কর্তৃক ব্রিটিশদের আজ্ঞাবাহী ও করুণাপ্রার্থী কতিপয় প্রভাবশালী হিন্দু সাহিত্যিক ও পণ্ডিতরা বাংলাভাষা থেকে জনগণের মুখের ভাষা হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দসমূহকে বিতাড়িত করে এর সংস্কৃতায়ন ঘটায়। এখানকার জনমানসে ব্যাপকভাবে একোমোডেটেড বা অভিযোজিত হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের ধর্মীয় ভাষা, শব্দ ও সাংস্কৃতিক চিহ্নগুলোকে ‘অপর’ করে রেখেছিল সাম্প্রদায়িক হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা। এভাবে দশকের পর দশক মুসলিম বাঙালি জাতিসত্তা ও জাতীয়তাকে হেয় করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে পরোক্ষভাবে হিন্দু জাতীয়তার চেতনাকে ‘সর্বজনীন’ বলে মুসলিম বাঙালি সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলে আসছে, আর এর বিপরীতে বাঙালি মুসলমানেরা যখনই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে, তখনই সেকুলারিজমের ধুয়া তুলে তাদেরকে মৌলবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মান্ধ বলে আখ্যায়িত করে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে। অজয় রায় তার বক্তব্যের মধ্যদিয়ে ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করছেন।

অজয় রায়ের মতো সেকুলার বামপন্থীরাই বরং সংবিধানে, পাঠ্যপুস্তকে, শিক্ষাব্যবস্থায় ও জাতীয় সংস্কৃতিতে শুধু সেকুলারিজমকে একতরফা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চালিয়ে বিশেষ একটা মতবাদের প্রতি অন্ধভাবে পক্ষপাতিত্ব করছেন এবং এভাবে খোদ সেকুলারিজমকেই প্রকারান্তরে একটি নতুন ধর্মে পরিণত করতে চাইছেন তারা। প্রকৃতপক্ষে তারা সেকুলার মৌলবাদী। তারাও সেকুলার সাম্প্রদায়িক, কারণ তারা দেশের সংবিধান, পাঠ্যপুস্তক ও পুরো জাতিকে শুধু সেকুলার ডগমার মধ্যেই আবদ্ধ রাখতে চান। ব্রিটিশদের শাসনকালে বাঙালির অস্থিমজ্জায় গেঁড়ে বসা ঔপনিবেশিক মনমানসিকতা এখনো ক্ষেত্রবিশেষে এতই প্রকট যে, এই ইউরোপীয় সেকুলারিজমের রসগোল্লা ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না তারা। সুতরাং হেফাজতিদেরকে মৌলবাদী বলার আগে নিজেদের চেহারা আয়নায় দেখা উচিত তাদের। হেফাজতে ইসলামের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করার আগে নিজেদের চেহারা আয়নায় দেখুক তারা। বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে তাদের- অর্থাৎ বামপন্থী এক্টিভিস্টদের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই তো ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা, এটা তারা ভুলে গেলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। তবুও তিনি করুণা করে তাদেরকে এখনো উদারভাবে দলে ঠাঁই দেন, কিন্তু তারা তো বহু আগেই গাদ্দার ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়ে রেখেছেন। এখন আওয়ামীপ্রেমী সেজে সেকুলার ভণ্ডামিতে মেতে ওঠেছেন তারা। স্বাধীনতার পর বামপন্থী রাজনীতিকরাই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী রাজনীতির চর্চা শুরু করেছিলেন, আর আজকে তারাই যখন দেশের আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থীদেরকে জঙ্গিবাদী ও মৌলবাদী বলে আক্রমণ করে, তখন তা যথেষ্ট কৌতুকবৎ হয়ে দাঁড়ায়।

যা বলছিলাম, সেকুলার বাঙালি মননে ঔপনিবেশিকতা এখনো এতই প্রকট যে, তারা ইউরোপীয় মতবাদ ও ধ্যানধারণাকে এখনো আঁকড়ে বসে আছে। উদাহরণস্বরূপ: সম্প্রতি আমরা দেখেছি হাইকোর্টের সামনে গ্রিক তথা রোমানদের ন্যায়ের দেবী থেমিসের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যাকে শাড়ি পরিয়ে এর বাঙালিকরণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম ও মূল্যবোধের মধ্যে থাকা ন্যায়বিচারের ধারণাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা সত্য যে, আমাদের আইনতত্ত্ব রোমান আইন থেকে উৎসারিত, কারণ ব্রিটিশরা আমাদেরকে দু’শো বছর ধরে যে-আইন শিখিয়েছে ও পড়িয়েছে, আমরা আজও সেইসব সেকেলে আইনগুলো অবিকল মেনে চলছি। ব্রিটিশরা এই আধুনিক যুগে তাদের আইনতত্ত্বকে অনেক আপডেট করেছে, যুগোপযোগী করেছে; কিন্তু, আমাদের কোনো আপডেট নেই, অগ্রগতি নেই। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কখনো ঔপনিবেশিকতার গোলামির চর্চা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবো না। এখন হেফাজত যখন এসবের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করছে, তখনই বামরা তাদের চিরাচরিত গৎবাঁধা বয়ানে বলছে যে, গ্রিক মূর্তি অপসারণের হেফাজতি দাবি নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী(!!)। আমি জানি না, এই গ্রিক দেবীর মূর্তির সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কী সম্পর্ক তারা খুঁজে পান।


“বর্তমান সংবিধানে তার সেকুলারিজমও যেমন আছে, একইসাথে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় অধিকারকেও সমানভাবে স্বাধীনতা ও নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তাহলে সমস্যা কোথায়? এখানে পুরো বিষয়টাই তো গণতান্ত্রিক। ধর্ম, মতবাদ ও দল নির্বিশেষে সবার দাবি মানা হয়েছে”

– তারেকুল ইসলাম


ইনসাফ: তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ইত্যাদিকেই মিন করছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি সেরকম কিছু?

তারেকুল ইসলাম: এটা তো বাম ঘরানার সেকেলে বয়ান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুলি তো শুধু মুখেই শুনি, কিন্তু আজ এর প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হচ্ছে কতটুকু? এই মূল্যায়নে আসতে হবে বৈকি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে দেশ ও জাতি গঠনের কথা তো অহরহ শুনছিই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথায় ভরে উঠছে কবিতা, গল্প ও বক্তৃতার মঞ্চ; প্রকৃতপক্ষে কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের চার দশক পরে আজও আমাদের গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ। অজয় রায়রা তো খুব আয়েস করে বলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে গণতন্ত্র, সেকুলারিজম ও সমাজতন্ত্র ইত্যাদি ইত্যাদি; কিন্তু প্রধানত আমাদের গণতন্ত্রই যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে বাকিগুলোর কথা আর কীইবা বলবো। একদিকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সেকুলার বয়ান পৌনঃপুনিক চর্বিত চর্বণ করে ক্রমশ হুজুগে রোমান্টিক হয়ে উঠছি, আর অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে সমানতালে দুর্নীতি, লুটপাট, রাজনৈতিক ও আদর্শিক মেরুকরণ আর ফ্যাসিবাদের ক্রমশ উন্নয়ন ঘটাচ্ছি।

এবার আসল কথায় আসি। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শব্দদুটি বহুল উচ্চারিত। কিন্তু, এর তো একটা বিশেষ সংজ্ঞা থাকা উচিত, যাতে করে সমগ্র জাতি ঐক্যের একটা কমন স্পেসে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সেটা কী? এটা কি কোনো আইডিওলজি নাকি স্রেফ একটি মুখরোচক শ্লোগান? কোনটি? যদি আইডিওলজি হয়, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে এর নির্দিষ্ট কমন সংজ্ঞা কী এবং দেশ ও জাতি গঠনে এর লিখিত জাতীয় রূপকল্প কী? বরং আমরা দেখছি, একেক দল একেক রকম সংজ্ঞা হাজির করছে। যার যার দলীয় ও কায়েমী স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে রাজনৈতিক ও আদর্শিক ব্যবসা করেই যাচ্ছে। আর যদি এটি কোনো আইডিওলজি না হয়, তাহলে আমি বলবো, এটা স্রেফ একটা জাতীয়তাবাদী চেতনা অথবা জাতীয়তাবাদপ্রসূত জিগির। যদি তাই হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এত হালকাভাবে ট্রিট করলে আমরা জাতি হিসেবে বেশিদূর এগোতে পারবোনা। আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অযথা বিভিন্ন আইডিওলজি অর্থাৎ বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষতা বা সমাজতন্ত্র ইত্যাদি ভারী ভারী ইউরোপীয় মতবাদের মধ্যে আবদ্ধ রাখার চেয়ে অ্যাপ্লাইড বা প্র্যাকটিকাল জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার প্রকৃত বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়াই শ্রেয়। আর এজন্যই জাতীয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটা কমন সংজ্ঞা দাঁড় করানো উচিত এবং এতে করে একটা জাতীয় ঐক্যের স্পেস তৈরি করতে সুবিধে হবে। এখন প্রশ্ন, কীসের ভিত্তিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এবং কীসের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কমন সংজ্ঞা দাঁড় করানো সম্ভব- যা ধর্ম, বর্ণ, মত ও দল নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে জাতিগতভাবে একটি কমন প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হবে এবং বিভিন্ন আদর্শিক মেরুকরণ সত্ত্বেও জাতীয় একক রাজনৈতিক সম্মিলনকেন্দ্র গঠনের মূল নিয়ামক হবে?? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলির ভিতর থেকে আরেকটি সেক্যুলার কিন্তু বামদের মতন তীব্রভাবে ইসলাম বিদ্বেষী নন আবার ইসলাম্পন্থাও চাননা এরকম একটা অংশের পক্ষ থেকে তোলা স্বাধীনতার মূলনীতি ছিল মাত্র তিনটি: সাম্য- মানবিক মর্যাদা – ইনসাফ। এগুলোর বাইরে আর কোনো কনসেপ্ট বা আইডিওলজি তথা ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এমনকি গণতন্ত্রের কথাও উল্লেখ ছিলনা। ১০ এপ্রিলের এই ঘোষণা মূলত দার্শনিক এবং ভাবগত ভাবে গণতন্ত্র, সেকুলারিজম ও সমাজতন্ত্র- এইগুলির বিরোধী না। যেকোন দেশের জনগণ ন্যায় বিচার চান। আর যে কোন জুলুম বন্ধ হোক, মানুষ শান্তিতে থাকুক- এসব কারণেই চিরন্তন ধর্মপ্রাণ গণমানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১০ এপ্রিলের ঘোষণা, নাকি ৭২ এর মূলনীতি, এইভাবে তারা ভাবেননি। তারা এও ভাবেননি যে, এইসব কায়েমী স্বার্থবাদীরা নানাভাবে ১০ এপ্রিল অথবা ৭২ এর মূলনীতিকে জনগণের স্বার্থের বিপরীতে ব্যবহার করবেন। কিন্তু ইসলামের রাজনৈতিক প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন বাদে আমরা ১০ এপ্রিল বলি আর ৭২ই বলি কোনটাই জনগনের মুক্তি আনবে না। ইসলামই ঐক্যের মূল সূত্র। ইসলামই ইতিহাসের মেলবন্ধন।

আজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সেকুলারকরণ করা হচ্ছে। আমি অভিজ্ঞতা থেকে চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, এখনো বাংলাদেশের গণমানুষ সেকুলারিজম কী জাতীয় বস্তু তা বোঝেনা। একদিকে ফ্যাসিবাদ কায়েমে সহায়ক ভূমিকা পালন করা আর অন্যদিকে সংবিধানে গণতন্ত্র, সেকুলারিজম ও সমাজতন্ত্রের এককায়ন করে এগুলো জনগণের অজ্ঞাতে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া, এটা বামদের নির্লজ্জ স্ববিরোধিতা। আবার সাম্য- মানবিক মর্যাদা – ইনসাফ ইত্যাদি এসব মতাদর্শের সেক্যুলার উৎসকে আড়াল করে জনগণের মর্মের কামনা ইসলামের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। আশার কথা হলো, সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন এদের ভণ্ডামির ব্যাপারে। আজকে বামরা যে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, সেটা তারা যদি অনুধাবন করতে পারে, তবেই মঙ্গল। এখনো কোনো ইস্যুতে তারা হরতাল দিলে বা বিক্ষোভের ডাক দিলে এসবে তৃণমূল জনগণের অংশগ্রহণ তো দূরের কথা, সাড়াও পাওয়া যায়না। জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতীত শুধু মিডিয়ার ওপর ভর করে রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন অসম্ভব। বামপন্থীরা তাই হতাশ। এমনকি বামপন্থী রাজনীতিকেরা নির্বাচনে দাঁড়ালে ভোট তো পায়ই না, উল্টো জামানত খোয়ায়। এসব থেকে বুঝা যায় তারা কতটা গণবিচ্ছিন্ন।

এখন আসি ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের ব্যাপারে। এটা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিমত আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় গানে, মিছিলে, স্লোগানে ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জয় বাংলা স্লোগানটি নিঃসন্দেহে মন্ত্রের মতো কাজ করেছিল।কিন্তু মনে রাখা দরকার, ‘জয় বাংলা’ই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র স্লোগান নয়। ‘নারায়ে তাকবীর’ও যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্লোগান, এটা অপকৌশলে জাতিকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শহুরে মধ্যবিত্ত পরিসরে মিছিল, বিক্ষোভ, রাজনৈতিক সম্মেলন, রেডিও’র খবর ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি প্রেরণা যুগিয়েছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু, সশস্ত্র যুদ্ধের ময়দানে যাঁরা আগ্নেয়াস্ত্র, মর্টারশেল ও স্টেনগান হাতে নিয়ে বর্বর পাক হানাদারদের সাথে বীরবিক্রমে মুখোমুখি যুদ্ধ করেছিলেন, তারা যুদ্ধ শুরু করতেন ‘নারায়ে তাকবীর’ স্লোগান দিয়ে আর কালেমা শাহাদাত পড়তে পড়তে যুদ্ধ করতেন, কারণ তারা মৃত্যুর অত্যন্ত কাছাকাছি ছিলেন, হয় শহীদ নাহয় গাজী। আর সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশই মুসলমান ছিলেন। এই নারায়ে তাকবীরের কথাটি আমার নয়, এটা আমার মুক্তিযোদ্ধা নানার বক্তব্য। আমার নানা ঈসমাইল মেজর জেনারেল ইবরাহিম বীর প্রতীকের আন্ডারে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি এখনো বেঁচে আছেন এবং শারীরিকভাবে মাশাল্লাহ আমার চেয়েও স্ট্রং। নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পান। সেসময়ে পাঞ্জাবিদের মুখোমুখি সশস্ত্র যুদ্ধ করার মতো হিম্মতওয়ালাদের মধ্যে আমার নানা ছিলেন একজন। রাজনীতি না করলেও তিনি কট্টর আওয়ামীপন্থী। যাই হোক, আমার নানার কাছ থেকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও গল্প শুনেছি অনেক। আমার আফসোস হয়, আজকে যারা কিনা বিদেশে বসে আরাম আয়েসে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ করেছিলেন, তাদের কাছ থেকেই আমাদের প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বয়ান শুনতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে হয় জাফর ইকবালদের মতো সুবিধাবাদী লোকদের কাছ থেকে, অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের কী ভূমিকা ছিল তা আমরা তরুণপ্রজন্ম জানিনা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে এদেশে জঙ্গিবাদী রাজনীতির প্রবর্তক বামরাই আজকে আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবক শেখাচ্ছে। তারাই আজ অযাচিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সেকুলারকরণ করছে। কী দুর্ভাগ্য!

আর এখন স্বাধীনতার মাস। স্বাধীনতার মাসে যদি স্বাধীনতার মূল্যায়ন করি, তাহলে হতাশা প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই নেই আমার। আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, এই স্বাধীন হওয়ার অর্থ কী? ভৌগোলিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন করলেও মানবিক স্বাধীনতা আমাদের এখনো সুদূর পরাহত। বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত তিন মূলনীতি: সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ আমাদের জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সার্থক হবে; অন্যথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুখের কথা কিংবা রেটোরিক হয়েই বাজবে।একইসাথে আমাদের মনে রাখা উচিত, এই তিন নীতিও একধরনের সেকুলার অবস্থান, কারণ এগুলো সার্বজনীন ধারণা, ইসলামও এগুলোর ব্যাপারে জোর দেয়; তবে যতক্ষণ আমরা ইসলামের একত্ববাদী দর্শন তথা তাওহীদের আজ্ঞাবাহী না হবো এবং মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে তাকওয়া’র জীবন গ্রহণ না করবো, ততক্ষণ সকল জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করে এই তিন নীতির প্রতিষ্ঠায় আমরা কখনো সফল হতে পারবো না।