আধুনিকতাবাদ ও ঔপনিবেশিক বাঙালি সেকুলারের মন (১)

বক্ষ্যমান প্রবন্ধটি দুই পর্বে প্রকাশিত হবে। প্রথম পর্বে আধুনিকতাবাদ সম্পর্কে ধারণা ও এর সমালোচনা; দ্বিতীয় পর্বে বাংলা কবিতায় আধুনিকতাবাদ ও ঔপনিবেশিক বাঙালি সেকুলারের মন বিশ্লেষণ। আজ প্রথম পর্ব-


তারেকুল ইসলাম

আধুনিকতাবাদের নির্দিষ্ট একক কোনো সংজ্ঞা নেই, এমনকি এটি কোনো ‘একক আন্দোলন’ও নয়, বিভিন্ন বিশেষ নান্দনিক আন্দোলনসমূহের সমষ্টিই হলো আধুনিকতাবাদ (aesthetic movements)। মজার ব্যাপার হলো, চরিত্র ও প্রবণতা অনুযায়ী এটি প্রথাগত সংজ্ঞায়ন ও স্বীকৃতিকেও উপেক্ষা করে, একইসাথে এটি প্রতিষ্ঠানবিরোধীও। এমনকি ইউরোপে এর উদ্ভব ঘটলেও এটি বিশেষ কোনো সভ্যতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে বন্ধন বা সম্পর্ক স্বীকার করেনা– অর্থাৎ এক্ষেত্রে এটি নির্বিশেষ। কাজেই, কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ার প্রবণতা সহজাতভাবেই এর নেই। ইংরেজি ‘Modern’ ও বাংলা ‘আধুনিক’– উভয় শব্দের আক্ষরিক অর্থ সমকালীন বা সাম্প্রতিক; আর অন্যদিকে, ইংরেজি ‘Modernism/Modernist’ ও বাংলা ‘আধুনিকতাবাদ/আধুনিকতাবাদী’– শব্দগুলো পারিভাষিক ও তাত্ত্বিকভাবে বিগত শতকের প্রারম্ভে উদ্ভাসিত একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রপঞ্চকে নির্দেশ করে।

ঊনিশ শতকের শেষ ভাগে ইউরোপে সাহিত্যে ও শিল্পকলায় আধুনিকতাবাদ বা মডার্নিজমের উদয় ঘটে এবং এর ক্রমশ বিকাশ ও চূড়ান্ত পরিণতি লাভের সময়কাল ধরা হয় পরবর্তী বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ অর্থাৎ ১৯১০-১৯৩০ সাল পর্যন্ত। এটি সেই সময়কার একটি নির্দিষ্ট বৈপ্লবিক প্রপঞ্চ, যেটা তখনকার বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা (status quo), শিল্পসাহিত্য, সংস্কৃতি ও মননশীলতার গতানুগতিক ধারা ও ঐতিহ্যরীতিতে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল- বিশেষত রোমান্টিসিজম ও রিয়েলিজমকে প্রত্যাখ্যান এবং ভিক্টোরিয়ান সময়কালের জনসংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও শিল্পকলার ঐতিহ্যসমূহকে নাকচ করার মাধ্যমে। ধর্ম, ঈশ্বর, ঐশ্বরিকতা, প্রচলিত বিশ্বাসব্যবস্থা, বাস্তবতা, প্রথাগত সামাজিক নৈতিক বিন্যাস, উপযোগ, প্রাতিষ্ঠানিকতা, ঐতিহ্য ও আবেগপ্রবণতা ইত্যাদির বিপ্রতীপে বিদ্রোহ করে আধুনিকতাবাদ জন্ম দেয় এক নয়া অস্থির ও বেপরোয়া শিল্পকলাবাদ– যা ছিল প্রথাসিদ্ধ স্বাভাবিক ইমাজিনেশন ও কল্পনাপ্রবণতারও অধিক কিছু অর্থাৎ এক কথায় সাহিত্যশিল্পকলায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক চরম বিমূর্ততার ইলিউশন। বিশেষত চিত্রশিল্পে এটির অন্যতম বৈপ্লবিক নন্দনতত্ত্ব হচ্ছে Impressionism (ভাবপ্রেক্ষণবাদ)– যা সেকালে একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও মূল্যবোধের বাইরে এবং নৈর্ব্যক্তিক (objective) প্রকরণের পরিবর্তে ব্যক্তির (subjective) খামখেয়ালি বিভ্রমের মধ্যদিয়ে চিত্রকলার এক বিশেষ নান্দনিক বিমূর্ততা ও প্রতীতির উদ্বোধন করেছিল। ইম্প্রেশনিজমের মতে, সত্য নিহিত থাকে মানসিক অবস্থায়- বিমূর্ত ও প্রতীতিস্বরূপ; কিন্তু বস্তুরূপে, বাস্তবতায়, বাহ্যিকতায় ও দৃশ্যমানতায় সত্যের অস্তিত্ব নেই। ফলত ইম্প্রেশনিস্টরা হয়ে পড়েছিল সাবজেক্টিভ- অর্থাৎ কবি, শিল্পী বা ব্যক্তি নিজে কী মনে করেন সেটাই হচ্ছে মূলত গ্রাহ্য বিষয়, যেখানে অন্যদের মনে করা আর না-করা দিয়ে কিছু যায় আসেনা। এজন্য তারা জনসংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখতো- অর্থাৎ অবজেক্টিভিটি থেকে দূরে থাকতো। তাদের এই অবস্থাকে আমি কলাকৈবল্যবাদকেন্দ্রিক বৈরাগ্য (dispassion) হিসেবেই অভিহিত করবো, কারণ বাস্তবতা, সমাজ, উপযোগ, ধর্ম, প্রথা ও ঐহিত্যসমূহের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে কলাকৈবল্যবাদ তথা শিল্পের জন্য শিল্পের নামে তারা প্রকারান্তরে চরম সাবজেক্টিভ হয়ে উঠেছিল। অবজেক্টিভিটি তাদের কাছে ছিল যারপরনাই উপেক্ষিত। এছাড়া আধুনিকতাবাদের ধারণায় শিল্পকলাই হচ্ছে শুরু এবং শিল্পকলাই সর্বশেষ, অর্থাৎ শিল্পসাহিত্য ও চিত্রকলায় আবেগ, বাস্তববাদিতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক ও মানবিক আবেদনের কোনো ছোঁয়া থাকতে পারবে না, বরং এসবের পরিবর্তে থাকবে শুধুই শিল্পকলার আত্মচেতনা, কৃত্রিম নান্দনিকতা ও কলাকৈবল্যবাদ (শিল্পের জন্য শিল্প)।

রেনেসাঁর উত্তরসূরী আধুনিকতাবাদ প্রচলিত বিশ্বাসব্যবস্থা ও সামাজিক নৈতিক বিন্যাসের বিপরীতে ঈশ্বরবিহীন, রোমান্টিকতাবিরোধী ও বাস্তবতাবিমুখ বিমূর্ত শিল্পকলাবাদী এক নয়া প্রপঞ্চ হিসেবে শিল্পসাহিত্যে নৈরাজ্য ও বিপর্যয়স্বরূপ আবির্ভূত হয়। ReligioPerennis.org-এ প্রাচ্যের ধর্ম ও দর্শনের ওপর গবেষক এবং আধুনিকতাবাদের সমালোচক অস্ট্রেলিয়ান লেখক Harry Oldmeadow তাঁর অনবদ্য আর্টিকেল ‘The Critique of Modernism: Scientism, Evolutionism, Phychologism and Humanism’-এ আধুনিকতাবাদের সমালোচনা করে লিখেছেন, “For the traditionalists modernism is nothing less than a spiritual disease which continues to spread like a plague across the globe, decimating traditional cultures wherever they are still to be found. Although its historical origins are European, modernism is now tied to no specific area or civilisation. Its symptoms can be detected in a wide assortment of inter-related “mind sets” and “-isms”, sometimes involved in cooperative co-existence, sometimes engaged in apparent antagonisms but always united by the same underlying principles. Scientism, rationalism, relativism, materialism, positivism, empiricism, psychologism, individualism, humanism, existentialism: these are some of the prime follies of modernist thought. The pedigree of this family of ideas can be traced back through a series of intellectual and cultural upheavals in European history and to certain vulnerabilities in Christian civilisation which left it exposed to the subversions of a profane science. The Renaissance, the Scientific Revolution and the Enlightenment were all incubators of ideas and values which first ravaged Christendom and then spread throughout the world like so many bacilli.’’ (অর্থাৎ, ঐতিহ্যবাদীদের (আধুনিকতাবাদী নন) মতে, আধুনিকতাবাদ একটি স্পিরিচুয়াল ডিজিস বা অধ্যাত্মসংক্রান্ত রোগ, যেটি দুনিয়াব্যাপী প্লেগ রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ছে এবং ঐতিহ্যিক সংস্কৃতিসমূহকে এখনো যেখানেই পাচ্ছে ধ্বংস করছে। আধুনিকতাবাদের ঐতিহাসিক উৎপত্তি ইউরোপে, তাসত্ত্বেও এটি কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সভ্যতার সাথে সম্পর্ক বা বন্ধন রক্ষা করেনা। এটির উপসর্গ বা লক্ষণগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে আন্তঃসম্পর্কিত প্রবণতা, ঝোঁক ও তত্ত্বসমূহের ব্যাপক সমষ্টির মধ্যে, যেগুলো কখনো পরস্পরের সহযোগী হিসেবে সহাবস্থান করে, আবার কখনো সুস্পষ্ট বিরোধিতায় বিদ্যমান; কিন্তু সবসময় এগুলো অভিন্ন মূলনীতি দ্বারা অবিচ্ছিন্ন থাকে। মূলনীতিগুলো হচ্ছে, বিজ্ঞানবাদ, যুক্তিবাদ, আপেক্ষিকতাবাদ, বস্তুবাদ, দৃষ্টবাদ, প্রয়োগবাদ, মনোজ্ঞবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, মানবতাবাদ ও অস্তিত্ববাদ– এগুলো হচ্ছে আধুনিকতাবাদী চিন্তার প্রধান কতিপয় গাধামি বা মূর্খতা। এই গুচ্ছ তত্ত্বগুলোর কুলুজির সন্ধান পাওয়া যেতে পারে ইউরোপীয় ইতিহাসের ধারাবাহিক বুত্তিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের মধ্যে এবং খ্রিস্টীয় সভ্যতার নির্দিষ্ট কিছু দুর্বলতার মধ্যে, যেই দুর্বলতাগুলো খ্রিস্টীয় সমাজকে অখ্রিস্টীয় বিজ্ঞানের ধ্বংসাত্মক তৎপরতার মুখে পতিত করেছিল। যেই তত্ত্ব ও মূল্যবোধগুলো প্রথমে খ্রিস্টান সমাজের (ইউরোপে) সর্বনাশ ঘটিয়েছিল এবং পরে অসংখ্য জীবাণুর মতো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেগুলোর ইনকিউবেটর (কৃত্রিমভাবে বাচ্চা ফুটানোর যন্ত্র) ছিল রেনেসাঁ- অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও আলোকায়ন।)

প্রসঙ্গত, ১৭৮৭-৯৯ পর্যন্ত সংঘটিত ফরাসি বিপ্লব ফ্রেঞ্চ সমাজের ঐতিহ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকেই ভেঙে দিয়েছিল, উদাহরণস্বরূপ রোমান ক্যাথলিক চার্চকে। এভাবে এটি ফ্রেঞ্চ সোসাইটির সামাজিক বন্ধনকেও দুর্বল করে দিয়েছিল। একইসাথে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীকে দুর্বল করে দিয়ে এটির ধারক বাহক রাজনৈতিক এক্টিভিস্টরা সংঘবদ্ধ স্বৈরশাসনতন্ত্র (collective despotism) বা সন্ত্রাসের রাজত্ব (the Regime de la Terreur) কায়েম করেছিল। তখন বিপ্লবের নামে ইউরোপ এনার্কিজম বা নৈরাজ্যবাদের এক চরম অরাজক বিভীষিকা অবলোকন করে। বস্তুতপক্ষে, ফরাসি বিপ্লবের ফসল রেনেসাঁ’ই হচ্ছে পরবর্তীকালের আধুনিকতাবাদী তন্ত্র-মন্ত্রসমূহের ইনকিউবেটর।

আধুনিকতাবাদের আরেক দম্ভ বিজ্ঞানবাদ (scientism)। উল্লেখ্য যে, বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানবাদ এক জিনিস নয়। বিজ্ঞান হলো বস্তু বা পদার্থ সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞান (science); অন্যদিকে বিজ্ঞানবাদ হলো একটি দর্শনগত বিষয়, অর্থাৎ বস্তু-অবস্তু ও হাজির-নাজির সব বিষয়কে বৈজ্ঞানিকতার আলোকে ব্যাখ্যাপূর্বক গ্রহণ বা নাকচ করা। ফলত বিজ্ঞানবাদীদের কাছে ‘ঈশ্বর’ স্বাভাবিকভাবেই একটি নঞর্থক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, কারণ ঈশ্বরকে বস্তুর ক্ষমতা ও গুণাগুণ অর্থাৎ ফিজিক্সের ফর্মুলেশন দিয়ে বিচার করলে তো ঈশ্বর কার্যত ‘নাই’ হয়ে যায়। মেটাফিজিক্স তথা অধ্যাত্মবাদ বা অধিবিদ্যাকে তারা একদমই গ্রাহ্য করেনা। সুতরাং ধর্ম, ঐশ্বরিকতা, বিশ্বাসব্যবস্থা ও স্রষ্টা/ঈশ্বর তাদের কাছে পরিত্যাজ্য। আল্লাহ বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতীয়মান করার বিষয়টি হচ্ছে একটি মেটাফিজিকাল বা অধিবিদ্যক/আধ্যাত্মিক বিবেচনা। এক আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি ঈমান আনয়ন ও তাঁর কাছে বান্দার আত্মসমর্পণের বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যক্তির অন্তরাত্মার প্রতীতি বা ইন্দ্রিয় চেতনার ওপর, কোনোভাবেই তা রেশনালিজম বা যুক্তিবাদ কিংবা লজিকের ওপর নির্ভর করেনা। লক্ষণীয় হলো, আল্লাহ কোরআনকে বিলিভার তথা বিশ্বাসীদের জন্যই উদ্দেশিত (addressed) করেছেন। তাই, যে-ফর্মুলেশনের ওপর ভিত্তি করে বস্তু বা পদার্থ অধিষ্ঠিত, সেই ফর্মুলেশনের ওপর ভিত্তি করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও ব্যক্তির ঈমানের প্রতীয়মানতা বিবেচনা করাটাই সুস্পষ্ট আহাম্মকি। আজ বিজ্ঞানবাদী বা বিজ্ঞানমনস্কদের গোঁড়ামির কারণে বিজ্ঞান আর ধর্ম উভয়ই মুখোমুখি যুদ্ধংদেহী অবস্থান নিয়েছে। অথচ বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের একটা বিখ্যাত উক্তিই আছে যে, ‘ধর্মহীন বিজ্ঞান হচ্ছে খোঁড়া, আর বিজ্ঞানহীন ধর্ম হচ্ছে অন্ধ’। মনে রাখা উচিত, বিজ্ঞান বা ধর্ম উভয়ের নামে গোঁড়ামি (bigotry) ও কুসংস্কার (prejudice) কখনোই মানবজাতির জন্য কল্যাণকর নয়।

সাধারণত ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে তর্কবিতর্কের অন্ত নেই; কিন্তু মেটাফিজিকাল বোঝাপড়ার মাধ্যমে এর অবসান ঘটানো সম্ভব, কিন্তু এটির জন্য বিজ্ঞানবাদীদেরকেও ধর্ম ও ঈশ্বর প্রশ্নে নেগোসিওশনে উপনীত হতে হবে; অন্যথায় তারা সায়েন্টিফিক ফান্ডামেন্টালিজম অথবা রেডিকাল সায়েন্টিজমের বৃত্ত থেকে মুক্ত হতে পারবে না। বিজ্ঞানবাদের সমালোচনা করে জার্মান দার্শনিক Frithjof Schuon তাঁর বিখ্যাত আর্টিকেল ‘No Activity Without Truth’-এ লিখেছেন, “modern science is a totalitarian rationalism that eliminates both Revelation and Intellect, and at the same time a totalitarian materialism that ignores the metaphysical relativity – and therewith the impermanence – of matter and the world. It does not know that the supra-sensible, situated as it is beyond space and time, is the concrete principle of the world, and consequently that it is also at the origin of that contingent and changeable coagulation we call “matter”. A science that is called “exact” is in fact an “intelligence without wisdom”, just as post-scholastic philosophy is inversely a “wisdom without intelligenc.” (Source: Studies in Comparative Religion, Vol. 3, No. 4. (Autumn 1969)। (অর্থাৎ, আধুনিক বিজ্ঞান হচ্ছে সর্বগ্রাসী যুক্তিবাদ- যা ওহী (text) ও প্রজ্ঞা উভয়কে অগ্রাহ্য করে এবং একই সময়ে এটি একটি সর্বগ্রাসী জড়বাদ বা বস্তুবাদও বটে– যা বস্তু ও বিশ্বের অধিবিদ্যক বা আধ্যাত্মিক আপেক্ষিকতা এবং সেইসাথে (বস্তু ও বিশ্বের) অস্থায়িত্বকেও অবজ্ঞা করে। বিজ্ঞানবাদ জানে না যে, সময় ও স্থানের ঊর্ধ্বে থাকা অতীন্দ্রিয় বা আধ্যাত্মিক চেতনা ও অনুভূতি হচ্ছে ইহজগতের অপরিহার্য মূল উপাদান, এবং ফলে এটি এ-ও জানে না যে, যেই সাপেক্ষিক ও পরিবর্তনশীল পিন্ডকে আমরা বস্তু বা পদার্থ বলি, সেটার উৎসে রয়েছে অতীন্দ্রিয় সূত্র। ‘নির্ভুল’ হিসেবে ভাবা এই বিজ্ঞানবাদ হলো প্রকৃতপক্ষে প্রজ্ঞাহীন বুদ্ধিমত্তা, ঠিক যেমন পাণ্ডিত্যহীন দর্শন হচ্ছে বুদ্ধিহীন জ্ঞান।)

জাগতিক সময়গুণ (time), স্থান (space) ও বস্তুর অবয়বের গুণাগুণ (physics) ইত্যাদির পরিসরে ঈশ্বর বা স্রষ্টা, গায়েব এবং অতীন্দ্রিয় অনুভূতি ও চেতনাসমূহের (supra-senses) পরিমাপ করা স্রেফ জাহেলিয়াত অর্থাৎ মূর্খতার নামান্তর; কেননা ফিজিক্সের ফর্মুলেশন দিয়ে মেটাফিজিক্সের পরিমাপ করা যারপরনাই অযৌক্তিক। অধ্যাত্মবাদ (meta-physics) ছাড়া পদার্থবিদ্যা (physics) দিয়ে গায়েব ও অতীন্দ্রিয় চেতনার ইতি-নেতি মূল্যায়ন বাস্তবাতীত। সেই যোগ্যতা ও বোধগুণ ফিজিক্সের নেই, অর্থাৎ এক্ষেত্রে এটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একে দিয়ে শুধু বস্তু বা পদার্থের পরিমাপ করাই সঙ্গত। বিজ্ঞানবাদীরা যদি মনে করেন যে, সমগ্র সত্য (the whole of truth) এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের (the whole of the world) সব জ্ঞান ও রহস্যের চাবিকাঠি তাদের হাতে, তাহলে তারা চরম ফ্যালাসির মধ্যে আছে। এই গোঁড়ামি ও প্রেজুডিস থেকে তাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। একইসাথে এটাও বলবো, বিজ্ঞানবাদী ও ধর্মপন্থী (ইসলামপন্থীসহ)- উভয়পক্ষকে যাবতীয় রকমফের গোঁড়ামি, কট্টরপন্থা ও প্রত্যাখ্যানবাদী অবস্থান থেকে সরে দাঁড়িয়ে পরস্পরের সাথে সমঝোতায় ও বোঝাপড়ায় আসতে হবে। এহেন পক্ষ-বিপক্ষের তর্কবিতর্ক দিয়ে তো দুনিয়া চলবে না। আবার একতরফা কোনো পক্ষকে খারিজ করে দিয়ে অন্য পক্ষ কর্তৃক একাকী দুনিয়া চালানোও অসম্ভব। উভয়পক্ষের কেউ কাউকে দূরে ঠেলে দিলে দুনিয়ায় কেবল নব-নব নৈরাজ্যবাদ আর নিহিলিজম তথা ধ্বংবাদেরই চর্চা হবে, শান্তি, সু-সভ্যতা ও সমৃদ্ধি হয়ে থাকবে সুদূর পরাহত।

বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যকার দ্বন্দ্বের একটা আপাত সমাধানের ব্যাপারে Harry Oldmeadow তাঁর উক্ত আর্টিকেলে লিখেছেন, “In the light of this kind of metaphysical understanding many of the apparent contradictions between “science” and “religion” simply evaporate. It is not necessary, to say the least, to throw religious beliefs on the scrapheap because they are “disproven” by modern science; nor is it necessary to gainsay such facts as modern science does uncover, provided always that what science presents as facts are so indeed and not merely precarious hypotheses.” (অর্থাৎ, এ ধরনের অধ্যাত্মবাদী বোঝাপড়ার আলোকে বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যকার প্রত্যক্ষ অনেক বিরোধের অবসান সহজেই ঘটানো যায়। এটুকুই বলবো যে, ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলার কোনো দরকার নেই, কারণ এগুলোকে তো মডার্ন সায়েন্স দ্বারা ভুল প্রমাণ করা যায়নি। অন্যদিকে, বিজ্ঞান সত্যস্বরূপ যা উপস্থাপন করে, তা যদি প্রকৃতই যথার্থ হয় এবং নিছক অনিশ্চিত অনুমান না হয়, তাহলে আধুনিক বিজ্ঞান যেসব ফ্যাক্টস বা সত্য উদ্ঘাটন করছে, সেগুলোকে অস্বীকার করারও কোনো দরকার নেই।)

আধুনিকতাবাদী প্রপঞ্চের জবরদস্ত ট্রাম্পকার্ডটি হচ্ছে হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদ, যা আমাদের দেশসহ দুনিয়াব্যাপী এখনো প্রভাবশালী আইডিওলজি হিসেবে বিরাজমান। আঠারো শতকে রেনেসাঁ’র সূচনাও হয় এটিকে ভিত্তি করে; ফরাসি দার্শনিক রুশো ছিলেন এর প্রবর্তক। তারপরে ঊনিশ শতকে মানবতাবাদকে ঘিরে গড়ে ওঠে ‘মানবধর্ম’ (a religion of humanity), ফরাসি ইতিবাদী দার্শনিক Auguste Comte-এর নেতৃত্বে। পরবর্তীকালে আধুনিকতাবাদী আন্দোলন এটিকে আরো আধুনিকরূপে গ্রহণ করেছে– অর্থাৎ আধুনিক সেকুলার মানবতাবাদ। হিউম্যানিস্টরা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে (human intelligence) জগতের সকল কিছুর মানদণ্ড জ্ঞান করে। মানুষের সম্ভাবনাকে তারা অসীম ও অনন্ত হিসেবে বিবেচনা করে। এভাবে মনুষ্য বুদ্ধিমত্তাকে সর্বেসর্বা জ্ঞান করার মাধ্যমে তারা পরমসত্তার অস্তিত্বকেও অবমূল্যায়নপূর্বক নাকচ করে। পরমসত্তা বা স্রষ্টার ধারণাকে তারা স্রেফ সামাজিক সুবিধাবাদ বা সামাজিক কুসংস্কারের ফল হিসেবে বিবেচনা করে এবং আমাদের পূর্বপুরুষগণ যাঁরা স্রষ্টা বা পরমসত্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করেই জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে মানুষকে আলোকিত করেছিলেন, তাঁদের চিন্তাভাবনাকেও তারা অনেকক্ষেত্রে অপরিশুদ্ধ বা ভ্রান্ত বলে অভিহিত করছে। F. Schuon উপরোক্ত একই আর্টিকেলে এর একটা মোক্ষম জবাব দিয়েছেন, “if men such as Plato, Aristotle or Thomas Aquinas – not to mention the Prophets, or Christ, or the sages of Asia – were not capable of remarking that God is merely a social prejudice or some other dupery of the kind, and if hundreds and thousands of years have been based intellectually on their incapacity, then there is no human intelligence, and still less any possibility of progress, for a being absurd by nature does not contain the possibility of ceasing to be absurd.” (অর্থাৎ, ঈশ্বর নিছক একটি সামাজিক কুসংস্কার অথবা এরকম কিছু একটা হবে- এমন মন্তব্য করার মতো জ্ঞান বা যোগ্যতা যদি প্লেটো, এরিস্টটল অথবা টমাস একুইনাসের মতো জ্ঞানী ব্যক্তিদের না থাকতো (নবীগণ, যীশুখ্রিস্ট ও এশিয়ার ঋষিগণের কথা নাইবা উল্লেখ করলাম), এবং হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবী যদি তাদের ‘অযোগ্যতা’ বা ‘অক্ষমতা’র ওপর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নির্ভর করে থাকে, তাহলে বলতেই হয় যে, এখানে কোনো মনুষ্য বুত্তিমত্তা নেই, এবং এখন পর্যন্ত এর উন্নতির কোনো সম্ভাবনাও অনেক কম। কারণ কোনো প্রাণিসত্তা প্রাকৃতিকভাবেই যখন বুদ্ধিহীন, তখন বুদ্ধিহীনতা থেকে মুক্তির সম্ভাবনাও সেই প্রাণিসত্তার নেই।) এখানে লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, হিউম্যানিস্টরা যেখানে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করে এবং যার উপরে আর কোনো সত্য নেই বলে জ্ঞান করে থাকে, সেখানেই আবার তারা জ্ঞানী পূর্বপুরুষদের বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কী স্ববিরোধিতা!!

জৈবিক গুণাবলির পাশাপাশি মানুষের বিশেষ দিব্যগুণও (spiritual virtue) আছে, যেটা তার আত্মা ও বিবেকের পরিচর্যা করে। তাই দিব্যগুণের প্রভাবে মানুষের জীবসত্তা ও প্রবৃত্তির সীমা লঙ্ঘনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং তার অন্তরাত্মার প্রতীতি ও বিবেকবোধের (conscience) চেতনাও সমুন্নত থাকে। কিন্তু দিব্যগুণের ব্যাপারে উদাসীন থাকলে কিংবা সেটা এড়িয়ে গেলে মানুষ স্রেফ পুঁজি ও বস্তুর অধীন হয়ে পড়ে এবং ফলত পুঁজিবাদ ও বস্তুবাদ তাকে গ্রাস করে নেওয়ার সুযোগ পায়। সুতরাং human intelligence তথা মনুষ্য বুত্তিমত্তাই শেষ কথা নয়। মনুষ্যবৃত্তি বা মনুষ্যসত্তার কাঙ্ক্ষিত জাগতিক ও আধ্যাত্মিক পরিণতিতে বুদ্ধিমত্তা ও দিব্যগুণ– উভয়টির সম্যক সম্মিলন অপরিহার্য। এছাড়া পরমসত্তার সাথে সম্পর্ক ও এর অনুসন্ধান ব্যতীত মানবজীবন অপূর্ণাঙ্গ, কারণ মানুষের ইহজাগতিকতা ও বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতা যেখানে, সেখান থেকেই পরমসত্তাসম্পর্কিত জ্ঞান ও বোধের সূচনা। ক্রমাগত জাগতিক ক্রিয়াকলাপ ও ব্যতিব্যস্ততায় মানুষ কখনো কখনো নৈরাশ্যবাদে পতিত হয়, তখন পরমাত্মার প্রতি আধ্যাত্মিক আবেদন তাকে প্রশান্তি ও স্থিরতা দান করে। পাপের গ্লানিতে নিমজ্জিত কলব বা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য পরমসত্তার আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য তার জন্য অনিবার্য হয়ে পড়ে। মানবজাতি পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই টিকে আছে। পরমসত্তার সাথে সম্পর্ক ব্যতীত মানবজাতির চিরন্তন বা পরলোকগত ভবিষ্যত সমৃদ্ধ হতে পারেনা। আর যেহেতু সামগ্রিকভাবে আধুনিকতাবাদ একটি নিরীশ্বরবাদী পশ্চিমা প্রকল্প এবং সেইসাথে এটি মানুষের ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কসমূহের সাথে বিচ্ছিন্নতাকে আরোপ করে, সেহেতু এটি প্রধানত সকল প্রকারের ধর্মীয় ভাবাদর্শ ও মানুষের স্পিরিচুয়াল ভার্চু তথা দিব্যগুণের প্রতিবন্ধক। তাই এটি বিলিভার তথা বিশ্বাসীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা।