সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে মূর্তি রাখা পরিস্কার ইসলাম বিরোধী: আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |


সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত গ্রীকদেবির মূর্তি অপসারণের দাবীতে দেশের ইসলামী দলগুলো অনেক দিন ধরেই আন্দোলন চালিয়ে আসছে। দেশের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশও একই দাবীতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে। কিন্তু ইসলামী দলগুলোর দাবী মানার মতো সদিচ্ছা সরকারের আদৌ আছে বলে বোঝা যাচ্ছেনা। শান্তিপূর্ণ একটা অন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নিরন্তর প্রয়াসও চলছে বলে অভিযোগ উঠে আসছে ধর্মীয় দলগুলো ও হেফাজতের পক্ষ থেকে। এমনই প্রেক্ষাপটে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর নায়েবে আমীর শাইখুল হাদীস আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী এর মুখোমুখী হয়েছিল ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর হবিগঞ্জ প্রতিনিধি হাফিজুর রহমান।


ইনসাফ: সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে গ্রীকদেবির মূর্তি থাকাটা কতোটুকু যৌক্তিকতা রাখে?
আল্লামা হবিগঞ্জী: সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে মূর্তি রাখা পরিস্কার ইসলাম বিরোধী কাজ। ইসলামে মূর্তি স্থাপনের কোন স্থান নেই। সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে মূর্তি স্থাপন শুধু অনৈসলামিকই নয়, এটা রাষ্ট্রের সংবিধান বিরোধীও। কারণ, রাষ্ট্রের বর্তমান সংবিধানে বিসমিল্লাহ এখনো বিদ্যমান। সাংবিধানিকভাবেই আজো এদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তাই সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এটা সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রবিরোধী একটা পদক্ষেপ। সুপ্রিমকোর্ট ন্যায় বিচারের প্রতীক। নব্বইভাগ মুসলমানের দেশে সুপ্রিমকোর্টের সামনে ন্যায় বিচারের প্রতীক হিসেবে একমাত্র কোরআনই থাকতে পারে। কোন মূর্তি বা ভাস্কর্য নয়। এর কোন যৌক্তিকতাও নেই।

ইনসাফ: অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুব আলম বলেছেন ভাস্কর্য আর মূর্তির ব্যবধান না বোঝার কারণেই আলেম-ওলামারা এর বিরোধিতা করছেন। এবিষয়ে আপনি কী বলতে চান?
আল্লামা হবিগঞ্জী: ভাস্কর্য ও মূর্তির মধ্যে প্রকৃতিগত কোন ব্যবধান নেই। নাম যা-ই দেয়া হোক, উভয়টা এক ও অভিন্ন। তাই মূর্তি স্থাপন যেমন ইসলামী শরিয়ত বিরোধী কার্যকলাপ, তেমনি ভাস্কর্য স্থাপনও। কোন ঈমানদারই এ দু’টির মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে পারে না। মূর্তিকে পছন্দ করলে যেমন ঈমান চলে যাবার আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি ভাস্কর্যকেও কেউ পছন্দ করলে ঈমান হারাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

ইনসাফ: আলেমদের মধ্য থেকে অনেকেই মনে করছেন, মসজিদের শহর ঢাকাকে মূর্তির শহর বানানোর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যেই আদালত প্রাঙ্গণে গ্রীকদেবির মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, আপনিও কি এমনটাই মনে করেন?
আল্লামা হবিগঞ্জী: শুধু ঢাকা নয়। সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনাকেই মূর্তি দ্বারা ঘেরাও করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তাই সুপ্রিমকোর্টের এই মূর্তি স্থাপন একটা পরীক্ষামূলক ব্যাপার। ঢাকার এই মূর্তি টিকে গেলে, পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সব আদালতেই ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করা হবে। এটা মুসলমানদেরকে ইসলাম বিরোধী মানসিকতায় গড়ে তোলার একটা পরিস্কার ষড়যন্ত্র। যাতে মানুষ ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন ভুলে গিয়ে বিধর্মী কৃষ্টি-কালচারে আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এ মূর্তি শুধু ঢাকাকেই নয়, একসময় সারাদেশকেই গ্রাস করবে।

ইনসাফ: কথিত বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই বলছেন, মূর্তির বিরোধিতা করা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
আল্লামা হবিগঞ্জী: এটা ভিত্তিহীন। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালেমের বিরুদ্ধে মাজলুমের লড়াই। এটা ছিল শোষণ-বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে দেশকে মুক্ত করার যুদ্ধ। দেশকে ইসলাম মুক্ত করার, মূর্তি স্থাপন করার যুদ্ধ সেটা আদৌ ছিল না। ছয়দফার আন্দোলনেও মূর্তি স্থাপনের কোন ধারা, ইসলাম বিদ্বেষী কোন দাবী ছিল না। তাই মূর্তি স্থাপনের সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যোগসূত্র খোঁজা উদ্ভটই শুধু নয়, হাস্যকরও বটে। এটা বরং দেশকে মূর্তি দিয়ে ভরে দেবার একটা ভিত্তিহীন বাহানা। আজ এতো বছর পরে এসে কেন মূর্তির সাথে চেতনার সম্পর্ক খোঁজা হচ্ছে? যিনি এ দেশের স্থপতি—শেখ মুজিবুর রহমান, তিনি তো কখনো এভাবে মূর্তি স্থাপন করেননি।

ইনসাফ: সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় ২৫ শীর্ষনেতার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানাকে পর্যবেক্ষকরা চলমান মূর্তিবিরোধী আন্দোলন ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার সরকারি চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন। এ ব্যাপারে আপনার ধারণা কী?
আল্লামা হবিগঞ্জী: কেন তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে? তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার যে হাস্যকর অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার গ্রহণযোগ্যতাই বা কতোটুকু? এসময়ে এধরণের পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে দেশকে অস্থিতিশীল করে চলমান মূর্তিবিরোধী আন্দোলনকে বিভ্রান্ত ও গতিহীন করার গভীর চক্রান্তই বলা যায়।

ইনসাফ: হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর হিসেবে চলমান মূর্তি বিরোধী আন্দোলনকে আরো বেগবান ও সফল করতে আপনার দিক-নির্দেশনা কী?
আল্লামা হবিগঞ্জী: মুসলিম অধ্যুষিত একটা দেশের সুপ্রিমকোর্টে এরকম মূর্তি স্থাপন দুঃখজনক ব্যাপার। এটা আজ জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়ে গেছে। জাতীয় ইস্যুতে মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সকল ওলামা-মাশায়েখ ও ইসলামী দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়েই দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জনগনকে সংশ্লিষ্ট করে সকল আলেম-ওলামাকে এক কাতারে নেমে আসতে হবে। প্রয়োজনে তাজা রক্ত ঢেলে হলেও অপসংস্কৃতির এই সয়লাব রুখতে হবে। নইলে অচিরেই দেশের ওপর আল্লাহ’র গজব নেমে আসবে।

ইনসাফ: দেশ-জাতির ক্রান্তিকালে আমাদেরকে মূল্যবান এ সময়টুকু দেয়ায় আপনাকে মোবারকবাদ।
আল্লামা হবিগঞ্জী: মিডিয়া জগতে দ্বীনের অসামান্য খেদমত আঞ্জাম দেয়ায় ইনসাফকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।