কওমী-সনদের স্বীকৃতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমীকরণের দোলাচল

কওমী-সনদের স্বীকৃতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমীকরণের দোলাচল

গত ১১এপ্রিল ঢাকার গণভবনে দেশের সকল বিজ্ঞ আলিম-সমাজের সম্মানে দেয়া এক অবিস্মরণীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠে উচ্চারিত হলো এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের প্রাণের চাওয়া কওমী-মাদরাসার সনদের সরকারি স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। প্রত্যাশা মোতাবেক কওমী-জগতের বলতে গেলে সবাই এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন সরবে। নানাজনের নানা অভিমত আর ব্যাখ্যায় ভরে গেছে অনলাইনের পাতা। পক্ষ-বিপক্ষ: নানান শব্দঝড়ে দুলছে যার যার মতামত প্রকাশের ডালপালাগুলো।

ব্যক্তিগতভাবে এখনই সবিস্তারে বা সোৎসাহেকিছু বলার পক্ষে যাচ্ছে না আমার ক্ষুদ্র-অভিজ্ঞতার বোঝাসমৃদ্ধ অন্তর। নদীতে যখন জোয়ার আসে তীরে বসা দর্শনার্থীর চোখে তখন অববাহিকার রূপদর্শনের লগ্ন। মনে আসে না খানিক পরে ভাটার বিরহব্যথার করুণসুর। যে নদী একটু আগে দিয়েছে যৌবনের উচ্ছ্বাস সে-ই আবার দিয়ে যায় কবর কবিতার বিরহচরণ। যে দর্শক নদীর এই গুণধর্মের কথা ভুলে যায় তার দীর্ঘশ্বাস হয় দীর্ঘতর। আফসোস আর আহাজারি যেন সঙ্গ দেয় বুকের মাঝখানটায়। তাই ভরাজোয়ারে সতর্ক হতে লোকসান দেয়ার ডর নেই।

নগদে যা জুটেছে আপাতত তাতেই হতাশার বালুচরে একটা আশার কুড়েঘর তুলতে বাধা নেই। কিন্তু আকস্মিক আগুয়ান কোন ঘূর্ণিহাওয়ায় যেন ঢলে না পড়ে সাধের স্বপ্নমহল সেদিকটায় খেয়াল রাখা জরুরী। আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা অভিন্নসত্ত্বার বন্ধনে আবদ্ধ কিনা এই মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা করা কষ্টসাধ্য। দেশের ক্ষমতার মসনদকেন্দ্রিক গাণিতিক ছক, রাজনৈতিক সমীকরণের ইন্দ্রজাল আর ধুরন্ধর প্রতিবেশীদেশের ভৌতিক আসর ইত্যাদির হিসাবনিকাশ ঘষেমেজে পরিস্কার করলে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ভেদাভেদ নিরূপণ করা সহজ হতে পারে। শেখ হাসিনা যদি রাজনীতি থেকে দূরে এসে; আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত কৌশল হতে নিরাপদ থাকতে পারেন তবে এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। আর যদি রাজনীতির রঙ্গীন গালিচার মারপ্যাঁচে ক্ষতবিক্ষত হয় কওমী-স্বীকৃতির পথচলা, ক্ষমতার মসনদের চোরাগলিপথগুলো জিহ্বার লালায়িত লালসায় কওমী-জগতকে কাছে টানার নির্লজ্জ প্রেমে আবদ্ধ করার পথ বেছে নেয় তবে কওমী-জগতের জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিইবা থাকতে পারে? তবুও শেষ রক্ষায় আশায় বুক বাঁধতে পারি।

ভয় হয় যখন অতীতে তাকাই। ২০০৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সমঝোতাচুক্তি হলো শায়খুল হাদীস মাওলানা আজীজুল হক রহ. এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাথে। আর যায় কোথায়! চারদিকে হৈহৈরৈরৈ রবে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো আওয়ামী লীগের মিত্রশক্তি ভারতপন্থী, সেক্যুলারিস্ট এবং নাস্তিক্যবাদী উপাদান। সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলো আওয়ামী লীগের সাথে টুপি-দাড়িওয়ালাদের সম্পর্ক হতে পারে না। শেষরক্ষা করতে পারলেন না শেখ হাসিনা। বাধ্য হলেন নিজের চেষ্টায় হওয়া চুক্তি থেকে সরে আসতে। সমীকরণের সমাধান দেখিয়ে দিলো শেখ হাসিনা আর আওয়ামী লীগের বন্ধনটা কোথায় কেমন।

এখন সেই শেখ হাসিনা আবার সাহস করে এগুলেন। যাঁদেরকে জঙ্গী, সন্ত্রাসী, পশ্চাদপদ, প্রতিক্রিয়াশীল ইত্যাদি না বললে তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষীয় শক্তির ঘুম আসে না তাঁদের কদম চুমতে যখন শেখ মুজিবকন্যার হস্ত প্রসারিত হয় তখন অবাক হয় ইনু-মেননদের নেতৃত্বাধীন নাস্তিক্যবাদীগোষ্ঠী যারা এ দেশ ও জাতির সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু। ইতোমধ্যে তারা জেগে উঠতে চাইছে পুরনো অস্ত্রে। জেগে উঠতে চাইছে ভারতের পদলেহী ‘প্রথম আলো’মার্কা অসৎ মিডিয়া। পেছন থেকে কাপড় টেনে উল্টোপথে টানতে চাইছে উগ্রসেক্যুলার কীটগুলো। জানি না এবার শেখ হাসিনা সাঁতরে কূলে উঠতে পারবেন কিনা।

অতএব, সাবধান! এখনো অনেক কাজ, অনেক রাস্তা বাকি। অপ্রয়োজনীয় আর সস্তা-স্তুতিবাদে জর্জরিত না হয়ে প্রয়োজন সতর্ক পাহারার। শত্রুর পাল্টা-আক্রমণের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কওমী-শিক্ষাবোর্ডগুলোর ঐক্যবদ্ধ একটি প্রতিরক্ষাব্যুহ তৈরি করে রাখা সময়ের দাবি। অন্যথায়, যে মাশুল দিতে হতে পারে তা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। আল্লাহ আমাদেরকে হিফাজত করুন।