ঝুঁকিপূর্ণ ফ্রি ওয়াই-ফাই, ফ্রি চার্জিং : জেনে নিন প্রতিরোধের উপায়

একেবারে বাধ্য না হলে দরকার নেই এ ধরনের ফ্রি সুবিধা গ্রহণের। কোথাও এভাবে চার্জ করতে বাধ্য হলে অন্তত সুইচ অফ করে নিন ফোনটি

দেশে-বিদেশে সফরকালে এয়ারপোর্ট, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, মেট্রো, রেস্টুরেন্ট, সুপার শপে বা অন্য যেকোনো জনসমাগমের স্থানে আজকাল মোবাইল ফোন চার্জের সুবিধা পাওয়া যায়- বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে দেওয়া হয় সেসব সুবিধা।

আমরা বাহনের বা স্বজন-বন্ধুর অপেক্ষায় থাকা সময়টাতে নিজের স্মার্টফোন বা ট্যাবটাকে চার্জড করে নিই সেসব স্থান থেকে। কিন্তু এটা কতটা নিরাপদ তা কি ভেবে দেখি?

নিত্যনতুন কৌশলে তথ্য চুরি বা ডাকাতি করে আপনার সর্বনাশ করার জন্য সদা তৎপর থাকে নেতিবাচক হ্যাকাররা বা তাদের তৈরি ডিভাইস

কারণ, ওইসব মুফতে পাওয়া চার্জিং ব্যবস্থার আড়ালে আপনার ফোন থেকে তথ্য চুরি হয়ে যেতে পারে বা হ্যাকড হতে পারে আপনার সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বা খোদ ফোনটিই। জরুরি প্রয়োজনে বা অবসরের ফাঁকে যখন এসব স্থান থেকে ফোন চার্জড করতে যান আপনি- তখন এটা যাচাই করার সময় বা মানসিকতা থাকে না যে ওই আউটলেটটাই হ্যাকড হয়ে আছে কি না আগে থেকে!

নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু হ্যাকারদের পরামর্শর আলোকে এখানে কিছু টিপস দেওয়া হলো কালের কণ্ঠ পাঠকদের জন্য। এতে একটু চোখ বুলিয়ে রাখুন, হতে পারে তুচ্ছ এই তথ্যই বড় ধরনের ঝামেলা থেকে বাঁচিয়ে দেবে আপনাকে কোনো জটিল মুহূর্তে।

সাইবার জগতে আজকাল তথ্য চুরির অগণন কায়দা অনুসরণ করে থাকে হ্যাকাররা

সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এনওয়াইআইটি) এক গবেষণায় দেখেছে, হ্যাকাররা এ ধরনের চার্জিং আউটলেট থেকে অন্যর মোবাইলের তথ্য চুরি ও মোবাইল হ্যাকড-করণে একধরনের সাইড চ্যানেল ব্যবহার করে। এর ফলে মোবাইলে চার্জিং কেবল যুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই ডেটা ক্যাবল সংযোগ ছাড়াই অন্য ডিভাইসে এর তথ্য চলে যেতে থাকে। এ ক্ষেত্রে আপনার মোবাইল থেকে ডেটা কোন গতিতে পাচার হবে তার একটা সূত্রের সন্ধান দিয়েছে এনওয়াইআইটি। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আপনার ফোনে চার্জ যদি ১০০% থাক তবে খুব দ্রুত আর নিশ্চিতভাবে ডেটা পাচার এবং হ্যাক হবে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন হ্যাকার বলেন, ইউএসবি চার্জিং পোর্টের মাধ্যমে হ্যাকিং সহজতর হয়।

সাইবার ল এক্সপার্টদের মতে, সেলফোনের মেশিনের পেছনের কার্যকলাপ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা সম্ভব হয় না সাধারণের পক্ষে। ডেটা চুরি হওয়াটা টের পাওয়া যায় না সচরাচর- কিন্তু যখনই এর অপপ্রয়োগ হয় তখন তার ভোগান্তি হাড়ে হাড়ে সইতে হয়।

ফ্রি চার্জিং পোর্ট দেখলেই প্রলুব্ধ হবেনা না। এর আড়ালে বিপদ ওঁৎ পেতে থাকতে পারে

আমরা অনেকেই জানি না যে ডেটা হ্যাক করার অগুণতি তরিকা আছে। বিমানবন্দরে, রেলস্টেশনে যেসব চার্জিং ইউনিট পাওয়া যায়, এসবের ব্যাকএন্ডে তা কোথোও স্টোরেজ ইউনিটে সংযুক্ত কি না তা আপনার জানার কথা নয়। সাধারণত তিন মিনিট সময়ের মধ্যে ডেটা হ্যাকড হয়ে যেতে পারে এ ধরনের সেট-আপে।

আপনার ফোন অ্যাটাক করার জন্য খুব এক্সপার্ট হ্যাকাররা বসে নেই- তাদের তৈরি করা সিস্টেমই স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেগে আছে আপনার সেলের পেছনে- ওইসব পোর্টের মাধ্যমে। আরেকটা বিপদের কথা হলো আজকাল ইন্টারনেটেও হ্যাকিংয়ের কায়দা কৌশল বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য অনেকে দিয়ে থাকেন।

এখন হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, মল বা কাফেতে ফ্রি নেট সেবা দেওয়া হয়। কিছু কিছু স্থানে ওই সব কানেকশনের আগে অনেক ক্ষেত্রেই আপনার কিছু কনফিডেনশিয়াল তথ্য জানতে চাওয়া হয়। আপনি তথ্য দিয়ে বিনা পয়সার ইন্টারনেটের ফায়দা নিতে ব্যস্ত থাকবেন আর হ্যাকার মহাশয় বা তার সেট-আপ হানি পোর্ট বা কোনো লগড ইন পেইজের মাধ্যমে আপনাকে অ্যাটাক করবে, আপনি টেরটিও পাবেন না। আপনার অজ্ঞাতসারেই আপনার সব ছবি, নম্বর, তথ্য অন্য কোথাও স্টোরেজ হতে থাকবে।

আমরা হামেশাই এটা ভুলে যাই যে- ফ্রি বা বিনা পয়সার জিনিস মানেই তাতে ঝুঁকি থাকবে। তাই রেলস্টেশনে ফ্রি চার্জিং সুবিধা দেখে খুব একটা দরকার না থাকা সত্ত্বেও ভাবলেন, করে নেই আমার মোবাইলটায় চার্জ; কিংবা রেস্টুরেন্টে ফ্রি ইন্টারনেট পেয়ে খুশি মনে ভাবলেন, দুই একটা গান, মুভি বা গেম ডাউনলোড করে নিই বা একটু ফেসবুকিং করে নিই- এই ভাবনা থেকে সরে আসুন। হ্যাকারদের মতে, এসব ফ্রি চার্জিং আর ফ্রি নেটের মাধ্যেমে আপনার ডিভাইসটি হ্যাক করা বা তা থেকে তথ্য চুরি করা ছেলেখেলার মতোই সহজ এখন।

এমন বিপদ এড়ানোর উপায় : খুব কঠিন কিছু না। প্রথমত দূরে কোথাও গেলে চার্জার সঙ্গে রাখুন। যাদের চার্জার আর ডেটা ক্যাবল একই সঙ্গে তারা চার্জারের পাওয়ার প্লাগ যাতে সঙ্গে থাকে তা নিশ্চিত করুন। যখন দরকার যে কোনো হোটেল, স্টেশন বা দোকানের পাওয়ার প্লাগে সরাসরি সংযোগ করে চার্জ করুন মোবাইল। এ ছাড়া পাওয়ার বা ব্যাটারি প্যাক সঙ্গে রাখাও এর একটি সমাধান।

ফ্রি চার্জিং বা ফ্রি ওয়াইফাই- দুটোই বিপজ্জ্নক হতে পারে

ফোনে পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখাও একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হতে পারে। এ ছাড়া চার্জ করার সময় ফোন আনলক রাখবেন না। আপনার ফোনকে সব সময় লেটেস্ট অপারেটিং সিস্টেমে আপগ্রেড করে রাখাও একটি ভালো পদক্ষেপ- তবে সবার পক্ষে এটা সম্ভব হয় না। অ্যান্টি ভাইরাস ব্যবহার অনেকের কাছে পুরনো ফ্যাশন আর ঝামেলাদার বিষয় মনে হতে পারে তবে এটা ‍কিন্তু এখনো কাজের বলেই প্রমাণিত হয়।

অনেকে অন্যের ডেটা কেবল বা চার্জার দিয়ে নিজের ফোন চার্জ করে থাকেন। এটাও একটা ঝুঁকির কাজ। যদি দেখেন কারও ডেটা কেবল একটু অন্য রকমের, মানে বেশি মোটা মনে হয় কিংবা চার্জিং পয়েন্টটা দেখতে একটু অন্যরকমের হয়- একটু সতর্ক হোন। হতে পারে ওই দেখতে অন্যরকম চার্জিং পয়েন্টে বা মোটা ক্যাবলে পেনড্রাইভ টাইপ (মেমরি কার্ড) কিছু লুকানো আছে। এই বিষয়গুলো কিন্তু অদ্ভুত মনে হলেও অসম্ভব না।

অবশ্যই মেনে চলুন : এক্সপার্টদের অভিমত হচ্ছে- খুব ইমার্জেন্সি না হলে বাইরে বা অনিরাপদ স্থানে আপনার ফোন চার্জ করার বিষয়টি মাথা থেকে ধুয়ে ফেলুন। কিন্তু ইমার্জেন্সি বলে কয়ে আসে না। এমন জরুরি পরিস্থিতিতে যখন আপনি বাধ্য হবেন যেকোনো পোর্ট থেকে ফোন কার্জ করতে- তখন চার্জিং ক্যাবল যুক্ত করার আগে আপনার ফোনটি সুইচ অফ করে নিন।

ক্রমশ হাইটেক আবহের দিকে এগিয়ে চলা দুনিয়ায় সাইবার বিপদ সম্পর্কে সদা সাবধান থাকতে হবে

চার্জিং পর্ব শেষ হওয়ার পর ক্যাবল থেকে মুক্ত করার পর ফোনটি আবার অন করুন। ফোন অফ থাকলে তা থেকে ডেটা স্থানান্তর অসম্ভব প্রায়। আর সেই কথাটি আবারও বলা হচ্ছে- সবচেয়ে ভালো হয় নিজের চার্জার দিয়ে ইলেক্ট্রিক পোর্ট থেকে সরাসরি চার্জ করুন আপনার প্রিয় ও দরকারি ফোনটিকে।

আরও মনে রাখবেন : ব্যক্তিগত ডেটা চুরির ক্ষেত্রে হ্যাকাররা যেসব বিষয়কে মাথায় রাখে তার মধ্যে আছে ব্যাটারি চার্জিং লেভেল, ট্যাপস অন দ্য স্ক্রিন (স্ক্রিনে কোন স্পিডে বা গতিতে আপনি আঙুল ছোঁয়ান), ব্রাউজার ক্যাশে (ব্রাউজার রেকর্ড), ওয়াইফাই/এলটিই ইত্যাদি। আর এসবের মধ্যে সবচেয়ে সহজ উপায়টি হচ্ছে ইউএসবি ক্যাবল/চার্জিং ক্যাবল।
সূত্র : ফ্যাক্টসপ্রেস.কম, এনবিটি


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74