বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমের রাজনীতি এবং বিভাজনের ষড়যন্ত্র

‘সেক্যুলারিজম'(Secularism) অনুবাদে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাংলাদেশে একটি বিতর্কিত ও আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সংবিধান প্রণয়ন করতে গিয়ে চারটি বিষয়কে মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে:–গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। বলাবাহুল্য, এই চারটি মৌলনীতি কোনভাবেই ‘গণতান্ত্রিক’ ছিলো না। এসব মৌলনীতিকে সংবিধান-সংশ্লিষ্ট বা সংবিধানে প্রবিষ্ট করার আগে জনগণের মত নেয়া হয় নি। এগুলো প্রকৃতপক্ষে এ ভূখণ্ডের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস বা অনুশীলনের বিষয়ও ছিলো না।
‘গণতন্ত্র’কে ব্যাখ্যানির্ভর করে যুক্তিসঙ্গত বলে চালানোর কিঞ্চিৎ চেষ্টাচরিত্র করা যেতে পারে কিন্তু বাকি তিন মৌলনীতিকে কোনভাবেই এদেশের জনগোষ্ঠীর নির্ভেজাল আকাঙ্খার প্রতীক ভাবার কোন বাস্তবতা নেই। এর পেছনে একটা ইতিহাসও আছে। উল্লেখ্য, এ চারটি বিষয় ভারতীয় সংবিধানের মৌলনীতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষপর্যায়ে কোলকাতায় আশ্রিত অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ব থেকেই পরিচিত ভারতীয় লবির বিশ্বস্ত মানুষ আওয়ামী লীগ নেতা তাজুদ্দীন আহমদ বারবার ভারত-সরকারের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের আবেদন জানাতে থাকেন। কিন্তু ভারতের কাছ থেকে কোন প্রকার সঙ্কেত না পাওয়ায় তাজুদ্দীন আহমদ উদ্বিগ্ন হন। পরে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়, ভারতীয় সংবিধানের চার মৌলনীতিকে বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত করার শর্তে ভারত নবগঠিত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত।
বিষয়টি অস্থায়ী সরকারের ভেতর তাজুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশটি বিনাদ্বিধায় গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ড. কামাল হোসেনের মতো ভারতীয় লবির লোকজন যারা সংবিধান রচনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন তারা ওয়াদামোতাবেক সংবিধানে সংশ্লিষ্ট করে নেন। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচাপতি মরহুম আব্দুর রউফ এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছিলেন প্রায় একদশক আগে। তাই নয় কেবল, এতদসম্পর্কীয় ঐতিহাসিক ঘটনাবলী এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য থেকে আঁচ করা যায় ভারতীয় চাপেই মূলত তাদের চার মৌলনীতি বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবেশ করে।
এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন সহযোদ্ধা, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, কিন্তু আওয়ামী নেতারা সংবিধান রচনায় জওয়াহেরলাল-নেতৃত্বের কংগ্রেসের অনুসরণ না করিয়া চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বের মুসলিম লীগকেই অনুসরণ করিয়াছেন।

আমাদের সংবিধান রচয়িতারাও তাই করিয়াছেন। প্রস্তাবনায় তারাও বলিয়াছেন: ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম-নিরপেক্ষতার মহান আদর্শই আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল।’ তথ্য হিসাবে কথাটা ঠিক না। আওয়ামী লীগের ছয়-দফা ও সর্বদলীয় ছাত্র এ্যাকশন কমিটির এগার-দফার দাবিতেই আমাদের মুক্তি-সংগ্রাম শুরু হয়। এইসব দফার কোনটিতেই ঐসব আদর্শের(জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম-নিরপেক্ষতা) উল্লেখ ছিলো না। ঐ দুইটি ‘দফা’ ছাড়া আওয়ামী লীগের একটি মেনিফেস্টো ছিল। তাতেও ওসব আদর্শের উল্লেখ নাই। বরঞ্চ ঐ মেনিফেস্টোতে ‘ব্যাংক-ইনশিওরেন্স, পাট-ব্যবসা ও ভারি শিল্পকে’ জাতীয়করণের দাবি ছিল। ঐ ‘দফা’ মেনিফোস্টো লইয়াই আওয়ামী লীগ ৭০ সালের নির্বাচন লড়িয়াছিল এবং জিতিয়াছিল। এরপর মুক্তি সংগ্রামের আগে বা সময়ে জনগণ, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের পক্ষ হইতে আর কোনও ‘দফা’ বা মেনিফোস্টো বাহির করার দরকার বা অবসর ছিল না। আমাদের সংবিধান রচয়িতারা নিজেরা ঐ মহান আদর্শকে সংবিধানভুক্ত করিবার ইচ্ছা করিয়াছিলেন। তাই জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ঐ ভুল তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন”( আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ: ৬২০, পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ- ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৫, খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা)। উল্লেখ্য, আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের একজন স্বীকৃত সাংবাদিক, রাজনীতি-বিশ্লেষক এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে দেখা একজন বিশিষ্ট নাগরিক যিনি তার জীবনটাই বলতে গেলে কাটিয়েছেন ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ও সমাজ বিনির্মাণের পেছনে। এখানে জনাব আবুল মনসুর আহমদের বক্তব্য একেবারে পরিস্কার। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, সংবিধানে প্রবিষ্ট সেক্যুলারিজমসহ বাকি তিনটি মৌলনীতি কখনোই মুক্তিযুদ্ধ বা জনগণের চেতনা কিংবা আদর্শ ছিলো না। এটাকে চেতনা বা আদর্শ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন আসছে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি কেন এবং কিভাবে পথ চলা শুরু করলো। এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদেরকে কতোগুলো বিষয় বুঝতে হবে। প্রথমত, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান এবং দ্বিতীয়ত, ভারতীয় আধিপত্যবাদের গুপ্তসৈনিক হিসাবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সেক্যুলারগোষ্ঠীর তৎপরতা। এসব বিষয় বুঝতে ইতিহাস-সচেতনতার পাশাপাশি ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর অন্দরে লুক্কায়িত বিভিন্ন শক্তির ঘাত-প্রতিঘাত, সংঘর্ষ, প্রতিযোগিতা ইত্যাদির পরিসংখ্যান ও চরিত্রকে সম্যকভাবে আয়ত্বে রাখতে হবে।

প্রথমেই আসি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গে। পাঠকমাত্রেই জানা থাকার কথা, সম্ভবত দশক আগে বিবিসি বাংলা শ্রোতাদের জরিপের রেখাচিত্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বলে নির্বাচিত করে। সাথেসাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা…’ গানটিকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ গান হিসাবে নির্বাচিত করে। বলাবাহুল্য বিবিসি মূলত একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ-মাধ্যম। এদের দায়িত্ব প্রধানত সংবাদ-প্রচার, সংবাদ-বিশ্লেষণ এবং বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতির ছবি উপস্থাপন। কিস্তু বিবিসি বাংলা মনে হয় এসব আচরণবিধির উর্ধ্বে। তাই তারা সংবাদের চেয়ে বিনোদন বা বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠানের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত। উল্লেখ্য, বিবিসি বাংলার প্রথমযুগ থেকেই ভারতীয়দের একটা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা ছিলো। বিবিসি সাংবাদিক ও খ্যাতিমান সংবাদ-বিশ্লেষক মরহুম সিরাজুর রহমানের প্রধান হিসাবে অবসরের পর থেকে বিবিসি বাংলাতে ভারতীয়দের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় একচ্ছত্র। বিবিসি বাংলার প্রধান হয়ে আসেন সাবির মুস্তফা যিনি ভারতীয়দের চেয়েও বড়ো ভারতীয়। তার সময়েই বিবিসি বাংলা একটি নোংরা, পক্ষপাতমূলক, একচোখা এবং বিতর্কিত সংবাদ-প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এই সাবির মুস্তফাই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি ও গান নির্বাচনের মতো একটি অহেতুক বৈশিষ্ট্যবিহীন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানটি ছিলো মূলত বিবিসি বাংলার ভারতীয় আধিপত্যবাদী চক্রের সূক্ষ্ম একটি কৌশল যার উদ্দেশ্য ছিলো বাংলাদেশের ছাত্র ও যুব-সমাজে ভারতের স্বার্থে সেক্যুলারিজম এবং কথিত বাঙ্গালি-সংস্কৃতির বীজ স্থায়ীভাবে রোপণ করা। একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, শেখ মুজিবুর রহমানকে যতেদিন এদেশের মানুষের কাছে বিতর্কিত এবং ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ে হিন্দুভাবাপন্ন করে রাখা যাবে ততোই ভারতের মুনাফা অবিরত থাকবে। শেখ মুজিবুর রহমানের মুসলিম পরিচয় যতো বেশি ফুটে উঠবে ততোই ভারত এবং তার এদেশীয় পদলেহী সেক্যুলারগোষ্ঠী বিপদে পড়বে। ভারতীয় আধিপত্যবাদী চক্র এই সমস্যাটি বুঝতে পেরেছে। তাই তারা বিবিসি বাংলার মাধ্যমে আগেভাগে শেখ মুজিবুর রহমানকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বানিয়ে তার মুসলিম পরিচয়কে সর্বাত্মকভাবে খাটো করতে চেয়েছে। এতে অন্তত সাবির মুস্তাফার মতো এজেন্টদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনমানসে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে নেতিবাচক ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টি করে রাখা যাবে যা ভারতীয় আধিপত্যবাদের জন্য হিতকর নিয়ামক বলে বিবেচিত হবে। এর ফলসরূপ জাতি বিভক্ত হবে এবং পূর্ণমুনাফা ভারত ভোগ করবে। এই ‘শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি’ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেক্যুলারচক্র শেখ মুজিবুর রহমানকে মুসলিম পরিচয়ে অভিধিত করার চেয়ে ‘বাঙ্গালি’ পরিচয়ে প্রচারিত করতে সচেষ্ট। এখন প্রশ্ন: শেখ মুজিবুর রহমান আসলে কতোটুকু সেক্যুলার ছিলেন? ১৯৯৪ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা তাদের ৪৫তম বর্ষপূর্তি-সংখ্যা প্রকাশ করে। সংখ্যাটিতে তোফায়েল আহমদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সিরাজুল আলম চৌধুরী, অজয় রায়, কে এম সোবহানের মতো কট্টর বামপন্থী ও সেক্যুলার ঘরানার লেখকেরা প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী উক্ত সংখ্যায় ‘বঙ্গবন্ধু থেকে খালেদা’ শীর্ষক একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের সেক্যুলার-চরিত্র নিয়ে মতিউর রহমান চৌধুরী লিখছেন: ” ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক রাজনৈতিক, আদর্শিক ছিলো না। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বহুবার বলেছেন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিলে এই দেশ জ্বলে উঠবে। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোরদার করা উচিৎ”( পৃ: ১৫)। শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই যে কখনো ধর্মনিরপেক্ষ বা বাঙ্গালি পরিচয় না দিয়ে নিজের মুসলিম সত্ত্বা এবং পরিচয়কে বড়ো করে দেখতেন তার প্রমাণ মেলে আওয়ামী ঘরানার বিশিষ্ট সাংবাদিক জাওয়াদুল করিমের ‘মুজিব ও সমকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে। বইটির ১৯৫ পৃষ্ঠায় ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের বরাতে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে জামাইকার রাজধানী কিংস্টনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থানের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের হোটেলকক্ষে লেখক তার প্রত্যক্ষ-শোনা কিছু কথা বইটিতে লিপিবদ্ধ করেছেন। সংবাদসংস্থা এনা’র তৎকালিন সম্পাদক গোলাম রসুলকে সিক্যুরিটিপ্রশ্নে সম্বোধন করে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন: ” আল্লাহ তাআলা না বাঁচালে কোন সিক্যুরিটি জীবন রক্ষা করতে পারে না। কোন পুলিশ বা মিলিটারি জীবন রক্ষা করতে পারে না। আমি মুসলমান হিসাবে এটা বিশ্বাস করি”( প্রথম সংস্করণ: ১৯৯১, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা)। একই পৃষ্ঠার আরো নিচের দিকে এসে জনৈক প্রশান্ত নিয়োগীর করা একটি ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি তির্যক-মন্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। এতে তিনি বলছেন: ” নিয়োগী আমার সম্পর্কে নাকি কিসব ভবিষ্যৎবাণী করেছে। কিন্তু আমি একজন মুসলমান হিসাবে ওসব বিশ্বাস করি না। আমার ধর্মেও এটা নিষিদ্ধ।” আশা করি এবার বোঝা গেলো ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি’ শেখ মুজিবুর রহমান নিজের কোন পরিচয়ে বিশ্বাস করতেন এবং তা বিনাদ্বিধায় প্রকাশও করতেন। তা’ছাড়া সবাই জানেন, স্বাধীনতা-সংগ্রামের কালে শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রতিটি ভাষণে ইনশা আল্লাহ বলতেন। এটা নিশ্চয় কোন সেক্যুলার-চরিত্র নয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমানের এই সত্ত্বাটিকে সম্পূর্ণ আড়ালে রেখে এদেশীয় সেক্যুলারচক্র বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কাছে শেখ মুজিবুর রহমানকে ধর্মনিরপেক্ষ, বাঙ্গালিত্বের প্রতীক ইত্যাদি প্রচার করে হিন্দুভাবাপন্ন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে রাতের ঘুম হারাম করে ফেলে। এরাই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় বঙ্গভবনে-গণভবনে রবীন্দ্র-সঙ্গীতের আসর বসিয়ে দেশবাসীকে জানিয়ে দেয় এ মুজিব তোমাদের সংগ্রামী মুজিব নয়। ভারতীয় আধিপত্যবাদের এদেশীয় সেবাদাসেরা সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে এমন নাযুক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান চূড়ান্তভাবে জনবিচ্ছিন্ন একজন স্বৈরশাসকে পরিণত হন। ইনু-মেনন-মতিয়া-বাদলেরা সুকৌশলে তেরি করে হত্যার উর্বরক্ষেত্র। আর তার চরম পরিণতি হয় আগস্টের বিয়োগাত্মক ঘটনায়।

এর দীর্ঘসময় পরে ক্ষমতায় আসে(১৯৯৬) মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় আসতেই নতুনরূপে দেখা দেয় সেই পুরনো সেক্যুলার অপশক্তি। এবার তাদের ক্ষেত্র আগের চেয়ে অনেক সহজ। শেখ হাসিনা নিজেকে বিনামূল্যে সঁপে দেন তাদের কাছে। দেশের একশ্রেণীর সংখ্যালঘু অত্যুৎসাহী হয়ে দেখাতে থাকেন এই ভূখণ্ড ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা নিজেদের সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি নিয়ে এতোটাই উগ্র হয়ে ওঠেন যে, মনে হয় তাদের সংস্কৃতিই জাতীয় সংস্কৃতি। এতে সরকারের স্পষ্ট মদদ ও অংশগ্রহণ দেখে আমাদের সন্দেহ জাগতো শেখ হাসিনার পরিচয়প্রশ্নে। কোলকাতায় গিয়ে শেখ হাসিনার কপালে লালটিপ আর মাথায় সিঁদুর দেয়া থেকে এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী স্বভাবতই সন্দিগ্ধ হন। প্রথম থেকেই শেখ হাসিনা শুরু করেন বিভক্তির রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, মৌলবাদ ইত্যাদি নিয়ে তিনি এমন এক ক্ষতের ভিত্তিস্থাপন করেন যার মাসুল আজ জাতিকে দিতে হচ্ছে। তিনি নিজেই এখন সেই ঘূর্ণিপাকে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছেন। পরিণতির ছবি সময়ের হাতেই রইল। ২০১৩ সালের ৫ম মে’তে সংঘটিত শাপলার গণহত্যা শেখ হাসিনাকে নিয়ে যায় এক মুসলিমবিদ্বেষী স্বৈরচারিনীর গহ্বরে। তার এই ধ্বংসাত্মক বিভক্তির রাজনীতি তাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে দূঃখজনক হলেও সত্য যে, শেখ হাসিনাকে এভাবে ব্যবহারের পেছনে কাজ করেছে সেই চিহ্নিত জাতির শত্রু সেক্যুলারগোষ্ঠী এবং ইনু-মেনন-বাদলদের সর্বনাশা বামপন্থী নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠী।

আমি আগেই বলেছি, এ’দেশ-এ’জাতি বিভক্ত হলে সুফল যাবে ভারতের হাতে। হচ্ছেও তাই। শেখ হাসিনা যতোই সেক্যুলার থাকবেন; যতোই তার বিশ্বাসের বিষয়ে, তার ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সন্দিগ্ধ থাকবেন ভারতীয় আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী ততোই মুনাফা গুনবে।এখানে যতোই বিভাজনের রাজনীতি হবে ততোই দেশ হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার শক্তি ক্রমশ দুর্বল হবে। বলাবাহুল্য, এই বিভাজনের রাজনীতি আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলবে অচিরেই। তাই দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে চাই ভারতীয় আধিপত্যবাদ-বিরোধী, সেক্যুলার-চক্রবিরোধী আর বামপন্থী নাস্তিক্যবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। এর কোন বিকল্প নেই।